প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বিটোপিয়ায় বৈশাখী আমেজ © সংগৃহীত
পহেলা বৈশাখ পেরিয়ে গেলেও উৎসবের রেশ কাটেনি রাজধানীর কর্পোরেট অঙ্গনে। সরকারি ছুটির কারণে মূল দিনে বন্ধ থাকলেও প্রথম কর্মদিবসেই বেসরকারি অফিসগুলোয় নতুন করে জমে ওঠে বর্ষবরণের আমেজ। গুলশান, বনানী, মতিঝিল ও কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন অফিসে দ্বিতীয় দিনেও চোখে পড়ে বৈশাখী উচ্ছ্বাসের বাড়তি প্রাণচাঞ্চল্য। কাজের ব্যস্ততার ফাঁকেই সহকর্মীদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি আর দেশীয় সংস্কৃতির ছোঁয়ায় মুখর হয়ে ওঠে কর্পোরেট পরিবেশ।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, ব্যাংক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে ঢুকতেই ধরা পড়ে উৎসবের আবহ। প্রবেশপথজুড়ে আলপনা, রঙিন ডালা, মাটির সরা আর গ্রামীণ সাজসজ্জা শহুরে অফিস পরিবেশকে যেন মুহূর্তেই বদলে দিয়েছে। ডেস্কের পাশে বৈশাখী নকশা, দেয়ালে পটচিত্র—সব মিলিয়ে কর্পোরেট পরিসরে ফুটে উঠেছে গ্রামবাংলার আবহ।
পোশাকেও ছিল উৎসবের ছাপ। নারীদের লাল-সাদা শাড়ি আর পুরুষদের পাঞ্জাবি অফিসজুড়ে তৈরি করেছে ঐতিহ্যবাহী পরিবেশ। কাজের ফাঁকেই সহকর্মীদের সঙ্গে ছবি তোলা, ছোটখাটো আয়োজন উপভোগ— এসবের মধ্য দিয়েই কর্পোরেট কর্মীদের দিনটি হয়ে ওঠে আনন্দঘন ও প্রাণবন্ত।
রাজধানীর একটি অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বিটোপিয়া গ্রুপ। গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, পহেলা বৈশাখ বাঙালির অন্যতম বড় উৎসব। এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও শিকড়ের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। বৈশাখ আমাদের মধ্যে নতুন উদ্যোগ ও উদ্দীপনা নিয়ে আসে। পুরোনো বছরের গ্লানি ও ব্যর্থতা পেছনে ফেলে নতুন করে শুরু করার অনুপ্রেরণা দেয়। অফিসের কর্মীরাও উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে দিনটি উদযাপন করছেন।
.jpg)
তিনি আরও বলেন, পহেলা বৈশাখ ছুটির দিন থাকায় বড় পরিসরে আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। তাই দ্বিতীয় দিনে বিশেষ খাবার ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়েছে। এতে কাজের একঘেয়েমি দূর হয় এবং কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়।
প্রতিষ্ঠানটির চিফ মার্কেটিং অফিসার আব্দুল্লাহ্ আল আলামিন বলেন, কর্পোরেট সংস্কৃতিতে কর্মব্যস্ততা সবসময় থাকে, কিন্তু শেকড়কে ভুলে যাওয়া নয়। সে ভাবনা থেকেই দ্বিতীয় দিনেও ‘হালখাতা’র আদলে একটি গেট-টুগেদারের আয়োজন করা হয়েছে। এতে টিমের মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।
দুপুরের দিকে অনেক প্রতিষ্ঠানে আয়োজন করা হয় ঐতিহ্যবাহী খাবারের। পান্তা-ইলিশ, ভর্তা-ভাত, শুঁটকি, কাঁচা মরিচ ও পেঁয়াজের পাশাপাশি ছিল মিষ্টি, বাতাসা, সন্দেশ, নকুলদানা, খৈ ও মুড়ি। কোথাও কোথাও খাবার পরিবেশন করা হয়েছে মাটির পাত্রে, যা উৎসবের আবহকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে।
কিছু প্রতিষ্ঠানে আয়োজন করা হয় ছোট পরিসরের বৈশাখী মেলা। সেখানে ছিল পিঠা, নাড়ু, মোয়া ও মুড়কির স্টল। কর্মীরা ঘুরে ঘুরে এসব উপভোগ করেন, অংশ নেন ছোটখাটো খেলাধুলা ও প্রতিযোগিতায়।
সফটভ্যান্স নামক আরেক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান মোহাম্মাদ সাজেদুল ইসলাম বলেন, সারাবছর কাজের চাপের মধ্যে সহকর্মীদের সঙ্গে এমন অনানুষ্ঠানিকভাবে সময় কাটানোর সুযোগ খুব একটা হয় না। বৈশাখের এই আয়োজন কর্মপরিবেশকে কিছুটা স্বস্তিদায়ক করে তোলে। এতে সহকর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও যোগাযোগও বাড়ে।
প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মী স্বর্ণা আক্তার বলেন, এ ধরনের আয়োজন আমাদের মতো তরুণদের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এতে নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে একটি সংযোগ তৈরি হয়। কর্মস্থলেও যে ঐতিহ্যকে অনুভব করা যায়, সেটি একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা।
শুধু খাবার বা সাজসজ্জা নয়, অনেক অফিসে আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক পর্বও। দেশি গান, কবিতা আবৃত্তি, এমনকি ছোট পরিসরের র্যাম্প ওয়াক -সব মিলিয়ে বিকেলের দিকে অফিসগুলো হয়ে ওঠে প্রাণচঞ্চল।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই কর্পোরেট বৈশাখের প্রতিফলন দেখা গেছে। সারাদিনজুড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা তাদের উদযাপনের ছবি ও ভিডিও শেয়ার করেছেন, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে অনলাইনে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ধরনের আয়োজন শুধু উৎসব উদযাপন নয়, বরং কর্মপরিবেশকে মানবিক ও প্রাণবন্ত করে তোলার একটি উপায়। আধুনিক কর্পোরেট সংস্কৃতির ভেতরেও দেশীয় ঐতিহ্যকে ধারণ করা সম্ভব — তারই একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে এই বৈশাখ উদযাপন।