ফাইভ স্টার হোটেল ও লেখক © টিডিসি সম্পাদিত
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক চেইন হোটেলগুলোর ক্রমবর্ধমান বিস্তার, এ দেশের তরুণদের সামনে বিশ্বমানের ক্যারিয়ারের এক নতুন ও অপার সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করেছে। রেডিসন, প্যান প্যাসিফিক, ইন্টারকন্টিনেন্টাল, শেরাটন, ম্যারিয়ট কিংবা ওয়েস্টিনের মতো বিশ্বখ্যাত চেইন হোটেলগুলোর হাত ধরে দেশের আতিথেয়তা শিল্পে এখন বৈশ্বিক মানদণ্ডের ছোঁয়া।
হসপিটালিটি খাতের ধারাবাহিক বিকাশ তরুণদের জন্য এক আধুনিক, গ্ল্যামারাস ও গ্লোবাল ক্যারিয়ারের পথ প্রশস্ত করছে। তবে পাঁচতারা হোটেলের বাস্তব কর্মক্ষেত্র আর ক্লাসরুমের তাত্ত্বিক জ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটানো বেশ চ্যালেঞ্জিং। বিশ্বখ্যাত এই ব্র্যান্ডগুলোর তুমুল প্রতিযোগিতার বাজারে শুধু পুঁথিগত বিদ্যা দিয়ে ক্যারিয়ারে সফল হওয়া বেশ কঠিন। তাই একজন বিশ্বমানের সফল হোটেলিয়ার হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে, সময়োপযোগী পরিকল্পনা ও বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জনের কাজটা বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই শুরু করা চাই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়েই এই গ্লোবাল চেইনগুলোতে সরাসরি ভালো অবস্থানে জায়গা করে নিতে ছাত্রাবস্থায় যে বিষয়গুলোতে সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে:
১. প্রফেশনাল কমিউনিকেশন ও ভাষার দক্ষতা
আন্তর্জাতিক চেইন হোটেলের মূল চালিকাশক্তি হলো চমৎকার যোগাযোগ দক্ষতা। হোটেলগুলোতে প্রতিদিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ-বিদেশের উচ্চপদস্থ ও গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের সেবা দিতে হয়, তাই ইংরেজিতে সাবলীল ও মার্জিত যোগাযোগের কোনো বিকল্প নেই। পেশাদার ইমেইল লিখন এবং প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের দক্ষতাও সমানভাবে বাড়াতে হবে। এর পাশাপাশি ফ্রেঞ্চ, ম্যান্ডারিন কিংবা স্প্যানিশের মতো যেকোনো একটি ভাষা জানা থাকলে, তা গ্লোবাল চেইনের ক্যারিয়ারে প্রতিযোগীদের চেয়ে অনেক এগিয়ে রাখবে।
২. গ্রুমিং ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ
আতিথেয়তা শিল্পের মূল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে চমৎকার ব্যক্তিত্ব ও উপস্থাপনার মাঝে। চেইনহোটেল গুলোতে ভালো পজিশন পাওয়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো স্মার্ট গ্রুমিং এবং বডি ল্যাঙ্গুয়েজ।হোটেলে গেস্টদের স্বাগত জানানোর সময় চেহারায় আন্তরিক হাসি, সঠিক আই-কন্টাক্ট এবং আত্মবিশ্বাসী দাঁড়ানোর ভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্যাম্পাস জীবন থেকেই এই প্রফেশনাল গ্রুমিং, নিজের ব্যক্তিত্বের অংশ করে নিতে পারলে, কর্মক্ষেত্রে তা অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে রাখবে।
৩. প্রাক্টিক্যাল এক্সপেরিয়েন্স ও এক্সট্রা-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিস
হোটেলের কর্পোরেট লাইফ শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় সীমাবদ্ধ নয়, এখানে প্রয়োজন বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন বিভিন্ন সেমিনার ও হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রি রিলেটেড সেশনে অংশ নেওয়া, ক্লাবের সাথে যুক্ত থাকা কিংবা ছোটখাটো ইভেন্ট পরিচালনার অভিজ্ঞতা একজন শিক্ষার্থীকে অন্যদের চেয়ে অনন্য করে তোলে। এর পাশাপাশি কোনো চেইন হোটেলে ইন্টার্নশিপ বা খণ্ডকালীন কাজের অভিজ্ঞতা থাকলে তা ক্যারিয়ারের পথকে অনেক সহজ করে দেয়।
৪. পজিটিভ মাইন্ডসেট ও টিমওয়ার্ক
হোটেল ম্যানেজমেন্ট মূলত একটি সুসংগঠিত দলগত কাজ, যেখানে ফ্রন্ট অফিস, হাউসকিপিং কিংবা ফুড অ্যান্ড বেভারেজের মতো প্রতিটি ডিপার্টমেন্ট একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। হোটেলের ব্যস্ত কর্মপরিবেশে যেকোনো মুহূর্তে নানামুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে, যা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সমাধান করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই বিভিন্ন গ্রুপ প্রজেক্ট বা ইভেন্ট পরিচালনার মাধ্যমে ইতিবাচক চিন্তাভাবনা বজায় রাখা এবং টিমওয়ার্কের শক্তিকে কাজে লাগানোর অভ্যাস করতে হবে। এই পজিটিভ মাইন্ডসেটই ক্যারিয়ারে দ্রুত পদোন্নতি পেতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে।
৫. ইন্ডাস্ট্রি কানেকশন ও নেটওয়ার্কিং
হসপিটালিটি সেক্টরে সফল হতে হলে নিজের একটি শক্তিশালী পেশাদার নেটওয়ার্ক তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন চেইন হোটেলের ইভেন্ট, ক্যারিয়ার ফেয়ার বা প্রফেশনাল সেমিনারে নিয়মিত যাতায়াত রাখা উচিত। এই পেশাদার যোগাযোগ, আন্তর্জাতিক হোটেলগুলোর কাজের পরিবেশ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পেতে সাহায্য করে। ছাত্রাবস্থার এই ছোট ছোট যোগাযোগগুলোই পরবর্তীতে বড় কোনো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডে স্বপ্নের ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ এনে দেয়।
আতিথেয়তা শিল্প বা হসপিটালিটি সেক্টর শুধু একটি চাকরি নয়, এটি একটি লাইফস্টাইল। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো সবসময় এমন দূরদর্শী নেতৃত্ব খোঁজে, যারা কাজের প্রতি ডেডিকেটেড এবং যেকোনো বৈরী পরিস্থিতি সামলাতে দক্ষ। ফাইভ স্টার হোটেলের চেইনগুলোতে সুযোগ পাওয়া কঠিন কিছু নয়, এর জন্য শুধু প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা এবং কঠোর পরিশ্রম করার মানসিকতা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন হলো ভুল থেকে শেখার এবং নিজেকে গড়ার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। তাই এখন থেকেই নিজেকে গ্রুম আপ করা, যোগাযোগের পরিধি বাড়ানো ও পজিটিভ মাইন্ডসেট নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আজকের ছোট ছোট প্রস্তুতিই আগামী দিনে পৌঁছে দেবে সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে।
লেখক: ইয়াহিয়া মাহমুদ
শিক্ষার্থী,ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।