অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার © টিডিসি ফটো
অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শিক্ষা শুধু পরিবর্তনের নয় এটি সতর্কতারও শিক্ষা। গণতন্ত্র টিকে থাকে নাগরিকদের সচেতনতা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে, কোনো প্রতিষ্ঠান স্থায়ী বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেকে সংশোধন করবে এ ধারণার মাধ্যমে নয়। আজ বুধবার (২১ জানুয়ারি) ইনডেপেন্ডেট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি) ২৬তম সমাবর্তনে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি জানান, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের ২৬তম সমাবর্তনে অংশ নিতে পারা তার জন্য এক গৌরবের বিষয়। সমাবর্তন আনন্দের মুহূর্ত হলেও এটি আত্মসমালোচনা ও দায়িত্ব গ্রহণেরও সময়। এটি কেবল একটি একাডেমিক অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়, বরং বৃহত্তর দায়িত্বের সূচনাও বটে।
তিনি বলেন, সমাবর্তনে আজ যেসব শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি অর্জন করছে যা তাদের জন্য নতুন দরজা খুলে দেবে ও সুযোগ সৃষ্টি করবে। তবে শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যম নয়; এটি একটি দায়িত্বও আরোপ করে। একজন শিক্ষার্থী তার অর্জিত জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে যেভাবে ব্যবহার করবে, তা শুধু তার নিজের জীবন নয় বরং সে যে সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের অংশ হবে, তার ভবিষ্যৎও নির্ধারণ করবে।
তিনি উল্লেখ করেন, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েটরা বর্তমানে দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন খাতে কাজ করছেন। তারা ব্যবসা, প্রযুক্তি, গবেষণা, উন্নয়ন, জননীতি ও সিভিল সোসাইটিতে অবদান রাখছেন। অনেকেই আন্তর্জাতিক পরিবেশে কাজ করছেন এবং পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি এ প্রতিষ্ঠানে গড়ে ওঠা মূল্যবোধ বহন করছেন। তাঁদের মাধ্যমেই বাংলাদেশ ক্রমেই দক্ষ ও বৈশ্বিকভাবে সম্পৃক্ত নেতৃত্বের উৎস হিসেবে পরিচিত হচ্ছে।
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, নেতৃত্ব শুধু পেশাগত সাফল্য বা পদমর্যাদায় সীমাবদ্ধ নয়। নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা হয় নৈতিক সংকটের মুহূর্তে যখন কথা বলার মূল্য চুকাতে হয়, নীরবতা সহজ মনে হয় এবং বিবেকের সঙ্গে সুবিধার সংঘাত সৃষ্টি হয়। এসব মুহূর্তেই নেতৃত্বের প্রকৃত অর্থ প্রকাশ পায়।
শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, গণতন্ত্র কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। এর সঙ্গে মর্যাদা, অধিকার, ন্যায়বিচার ও সুযোগের বাস্তব সম্পর্ক রয়েছে। গণতন্ত্র আপনা-আপনি টিকে থাকে না; এটি নির্ভর করে সচেতন, সম্পৃক্ত এবং প্রয়োজনে সক্রিয় নাগরিকদের ওপর। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ যখন হুমকির মুখে পড়ে, তখন নাগরিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল সনদ অর্জনের জায়গা নয়। এটি এমন এক পরিসর, যেখানে বিচারবোধ গড়ে ওঠে, কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করা শেখা হয় এবং ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য অনুধাবন ও পরীক্ষা করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ তার গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় প্রত্যক্ষ করেছে।
শিক্ষা উপদেষ্টা আরও বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল সংস্কার দাবিকে কেন্দ্র করে একটি অরাজনৈতিক ছাত্র আন্দোলন হিসেবে। পরবর্তীতে এটি দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক সংজ্ঞায়িত মুহূর্তে পরিণত হয়। বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাহসী ভূমিকা ছিল অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক। তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছে। এতে প্রমাণ হয়েছে যে নাগরিক দায়িত্ব ও গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার কোনো একক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—যেখানেই বিবেক জাগ্রত, সেখানেই তা বিদ্যমান।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ যখন আবার গণতান্ত্রিক শাসনের পথে ফিরে আসছে, তখন এই মুহূর্ত কেবল উদযাপনের নয়, বরং বহুত্ববাদী ও জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি সচেতন অঙ্গীকারের। যেখানে মতভেদ বৈধ হবে, প্রতিষ্ঠান নাগরিকদের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে, ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হবে না, অংশগ্রহণ সংকুচিত হবে না এবং ভিন্নমতকে বিশৃঙ্খলা হিসেবে দেখা হবে না।
ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার বলেন, এ প্রজন্মের দায়িত্ব হলো জুলাইয়ের মূল্যবোধগুলোকে দৈনন্দিন চর্চার মাধ্যমে সুসংহত করা, যেন ক্লান্তি বা নীরবতার কারণে সেগুলো ক্ষয়ে না যায়। গ্র্যাজুয়েটদের বুঝতে হবে, নাগরিক দায়িত্ব কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পর শেষ হয়ে যায় না। পেশাগত সাফল্য নাগরিক দায়িত্বকে গ্রাস করতে পারে না।