অধ্যাপক ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী © টিডিসি ফটো
গত ২৫ জানুয়ারি রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী।
স্নাতকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আজকের এই গৌরবময় দিনটি শুধু একটি অর্জনের উদযাপন নয়, বরং বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং অটুট প্রতিশ্রুতির এক মাইলফলক। এখন তোমাদের সামনে নতুন দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে, যেখানে শুধু জ্ঞানই নয়, সততা ও ন্যায়ের প্রতি দায়বদ্ধতাও প্রয়োজন।
অধ্যাপক হান্নান চৌধুরী শিক্ষার্থীদের সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, তোমাদের অর্জন শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং জাতির ভবিষ্যৎ গঠনের অংশ। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট ছাত্র আন্দোলনের চেতনা আজও আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয়। সেই চেতনা আমাদের শেখায় যে প্রকৃত অগ্রগতি তখনই সম্ভব, যখন আমরা বৈষম্য, দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াই।
আরও পড়ুন: উত্তরা ইউনিভার্সিটির নবম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত
তিনি আরও বলেন, একটি উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন এখনো অসম্পূর্ণ, আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব তোমাদের হাতেই। তোমাদের হাতিয়ার হবে তোমাদের শিক্ষা, সততা ও ন্যায়ের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতি।
বিশ্বের পরিবর্তনশীল চাকরির বাজারে নিজেদের প্রস্তুত করার তাগিদ প্রসঙ্গে অধ্যাপক হান্নান চৌধুরী বলেন, বর্তমান বিশ্বে শুধু ডিগ্রি অর্জন যথেষ্ট নয়, বরং প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলীই এগিয়ে থাকার মূল চাবিকাঠি। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়, ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ৮.৫ কোটি চাকরি স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে বিলুপ্ত হবে, তবে একই সঙ্গে ৯.৭ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য শিক্ষার্থীদের সব সময় নতুন কিছু শেখার মানসিকতা রাখতে হবে। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতের প্রসার এবং এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয় সমাবর্তনে।
‘‘১৯৭১ সালে মাত্র ৪টি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল, আর বর্তমানে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫০টির বেশি, যার মধ্যে ৫১টি সরকারি ও ১০০টির বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে লক্ষাধিক শিক্ষার্থী জ্ঞান অর্জন করছে। এই সম্প্রসারণ আমাদের জাতির শিক্ষার প্রতি অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
শিক্ষার মাধ্যমে শান্তি ও ন্যায়বিচারের প্রচার উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব শুধু দেশীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৈশ্বিক পরিসরেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার তাগিদ দেওয়া হয় সমাবর্তনে। বক্তারা উল্লেখ করেন, বর্তমান বিশ্বের নানা সংকট—যেমন ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজার মানবিক সংকট—শান্তির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষিত যুবসমাজের উচিত জ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা এবং সমাজে ন্যায়বিচারের আলো ছড়িয়ে দেওয়া।
অভিভাবকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেন, আজকের এই অর্জন শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, বরং তাদের পেছনে থাকা অভিভাবকদেরও, যারা তাদের সন্তানদের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। অভিভাবকদের এই আত্মত্যাগ ও সহমর্মিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
সমাবর্তনের শেষ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, আজ তোমরা শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা পেরিয়ে যাচ্ছো না, বরং একটি নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করছো। সততা, ন্যায়বিচার ও সমাজের অগ্রগতির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থেকে তোমরা তোমাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে। তোমাদের সাফল্য শুধু পেশাগত অর্জনে নয়, বরং ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে তোমাদের ভূমিকার মধ্যেই নিহিত থাকবে।
জমকালো এই আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ও রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পক্ষে তার প্রতিনিধি হিসেবে বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়) প্রফেসর ড. এম আমিনুল ইসলাম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. ইয়াসমীন আরা লেখা ও উত্তরা ইউনিভার্সিটির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. গৌর গোবিন্দ গোস্বামী। সমাবর্তনে উপস্থিত সকল অতিথিদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার জনাব কাজী মহিউদ্দিন।