বক্তব্য রাখছেন হাসনাত আব্দুল্লাহ © সংগৃহীত
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আবারও গেস্টরুম-গণরুম কালচার ফিরে আসার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কুমিল্লা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। ইতোমধ্যে ক্যাম্পাসগুলোকে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। আজ রবিবার (২৬ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলাকালে তিনি এসব বক্তব্য দেন। এ সময় সরকারবিরোধী বক্তব্য ও সমালোচনার জন্য নির্বাচনের পর থেকে এ পর্যন্ত ৯টি গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
হাসনাত আব্দুল্লাহ তার বক্তব্যে বলেন, আমরা খুব আশাহত হই, যখন এই সংসদ এত রক্ত, এত লড়াই, এত ত্যাগের পরে আজকে যখন এই সংসদটি গঠিত হয়েছে; কিন্তু এই সংসদ আবার আগের সাইকেল, দোষারোপের যে সাইকেল, একজন আরেকজনকে ট্যাগিংয়ের যে সাইকেল, মত দমনের নামে, বিরোধীদল দমনের নামে মামলার যে সাইকেল— আমরা আবার সেখানে চলে গিয়েছি।
ক্যাম্পাসগুলোতে আবারও অস্থিরতা এবং সারাদেশে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে এমন অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ক্যাম্পাসগুলো আনরেস্টের দিকে যাচ্ছে, অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে, বিরোধী দল-মত দমনের জন্য মামলা করা হচ্ছে, প্রতিমন্ত্রীকে ফেসবুকে লেখার কারণে বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসা হচ্ছে, হুইপকে সমালোচনা করলে বাসা থেকে তুলে আনা হচ্ছে। আবার আমরা আগের সংস্কৃতিতে চলে যাচ্ছি। যেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে কার্টুন শেয়ার করে বিভিন্ন স্যাটায়ার, বিভিন্ন মকারিকে প্রমোট করছে, বিরোধী মতকে প্রমোট করছে, সেখানে এই সংসদ গঠিত হওয়ার পর থেকে আজকে পর্যন্ত ৯টা ঘটনা ঘটেছে, যেখানে মত প্রকাশের জন্য বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসা হয়েছে।
আরও পড়ুন: রাজনৈতিক দলকে নির্মূলের বাংলাদেশে আমরা ফিরতে চাই না: সংসদে হাসনাত আব্দুল্লাহ
হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, আজকে ক্যাম্পাসগুলোতে আবার এক ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি করা হচ্ছে। আমি ২০২২ সালের অক্টোবরে ইউনিভার্সিটি থেকে এসেছি। আমাদের সময় গেস্টরুম-গণরুমের কালচার ছিল। আমাদের সময়ে একটা শিক্ষার্থী অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেত, আমরা সে সময়ে দেখেছি— ক্ষমতাসীন দল কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুঁজি করে নিজেদের ক্ষমতাকাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদি করার জন্য বাধ্যতামূলক রাজনীতি করাত। আজকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবার গেস্টরুম-গণরুম কালচার চালু করার প্রয়াস শুরু হয়েছে। আবার সেখানে বাধ্যতামূলক রাজনীতির কালচার শুরু করা হচ্ছে।
রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আমরা দেখেছি, ক্ষমতাসীন যারা রয়েছে, তারা তাদের সন্তানদের বিদেশে রেখে নিরাপদ ভবিষ্যত নিশ্চিত করে মধ্যবিত্ত সন্তানরা, যাদের বাবারা কল-কারখানায় কাজ করে, যাদের বাবারা রেমিট্যান্স যোদ্ধা, যাদের বাবারা কষ্ট করে সন্তানদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠায়— ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদরা তাদের সন্তানদের ব্যবহার করে ক্যারিয়ার ঝুঁকিতে ফেলে তাদের গদি বা পাটাতন শক্ত করার জন্য। নিজের সন্তানকে বিদেশে নিরাপদে রাখে, আর পরের সন্তানের ভবিষ্যতকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। আমরা এই সংস্কৃতির পরিবর্তন চাই। আমরা চাই, বিশ্ববিদ্যালয় কেবলমাত্র নেতা তৈরির হাতিয়ার হবে না। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা, পাঠচর্চা এবং একধরনের মনস্তাত্ত্বিক সমৃদ্ধি... এবং সেখানে গবেষণা হবে, সেখান থেকে বুদ্ধিজীবী এবং গবেষক আমরা জাতিকে উপহার দিতে পারব। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয়, আজকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবলমাত্র নেতা উৎপাদন করার এক ধরনের বিশেষ সার্কেলে পরিণত হয়েছে।
আরও পড়ুন: পেশাদার খুনি দিয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ, সংসদে নিরাপত্তা চাইলেন জামায়াতের এমপি
হাসনাত আব্দুল্লাহ তার বক্তব্যে বলেন, আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতা চাই। মত প্রকাশের স্বাধীনতা আগেও ছিল, আওয়ামী লীগের সময়েও ছিল। তবে সেটা সহমত প্রকাশের স্বাধীনতা। আমরা এই পার্লামেন্টের পরে শুধু মত প্রকাশের স্বাধীনতা নয়, দ্বিমত প্রকাশের স্বাধীনতা চাই। আমরা এখানে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করতে চাই নির্ভয়ে। ফেসবুকে আমরা ব্যাকস্পেস ব্যবহার করতে চাই না। কিন্তু আবার একটা ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে, আবার একটা আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
এ সময় ‘সিলেক্টিভ প্রতিবাদ’ এর সমালোচনা করেন হাসনাত। বলেন, আমরা দেখলাম, সিলেক্টিভ এক ধরনের বিরোধিতার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। আমাদের সমাজের যারা গ্রহণযোগ্য, এক ধরনের পলিটিক্যালি এলিট শ্রেণির নারীদেরকে নিয়ে যখন সমালোচনা করা হয়, তখন সেটাকে নারীদের বিরুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু যারা পলিটিক্যালি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী রয়েছে, গার্মেন্টসকর্মী রয়েছে, যারা এই দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল করার জন্য রাতদিন পরিশ্রম করে যাচ্ছে, গ্রামগঞ্জের নারীরা-মায়েরা যারা রাতদিন পরিশ্রম করে যাচ্ছে— তাদেরকে যখন স্লাটশেইম করা হয়, গালি দেওয়া হয়, সেটাকে আমরা নারীবিরোধিতা হিসেবে আমলে নেই না। এই ধরনের সিলেক্টিভ নারীবিরোধিতা করি, এই ধরনের সিলেক্টিভ নারী সমালোচনা করার যে প্রবণতা রয়েছে, সে জায়গাগুলো থেকে আমাদেরকে বের হয়ে আসতে হবে।
হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ৩৬ জুলাই এই তরুণ প্রজন্মকে কী দিয়েছে? এই জুলাইতে যারা আহত হয়েছে, ১৭ বছরে যারা নির্যাতিত-নিপীড়িত হয়েছে তাদেরকে আমরা স্মরণ করতে লজ্জা পাই। তাদেরকে মুখ দেখানোর জায়গা নাই। আমরা তাদের কিছুই দিতে পারি নাই। আমরা একটা কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য আপনাদের লড়াই ছিল, সামগ্রিক এই হাউজের লড়াই ছিল। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, যদি ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এই সংস্কার প্রস্তাবগুলো দেওয়া হত, এই সংসদের একজনকেও খুঁজে পাওয়া যেত না যে এই প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নিত।
আরও পড়ুন: নারী আসনের বিএনপির এক প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে ছাত্রদল নেত্রীর আপিল
তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশনকে ল্যাপস করা হয়েছে। বারবার করে বলা হচ্ছে, আরও শক্তিশালীভাবে নাকি মানবাধিকার কমিশন উত্থাপন করা হবে। পুলিশ সংস্কার অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। বলা হয়েছে আরও পুনর্বিবেচনা সাপেক্ষে এই সংসদে উত্থাপন করা হবে। সব কিছু্ই তো সংশোধনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নিয়তটা যদি সহি থাকত, ওয়েল ইনটেনশন যদি থাকত, এই অধ্যাদেশকে গ্রহণ করে পরবর্তীতে কিন্তু সংশোধন করা যেত।
সংসদ সদস্য বলেন, সরকারি দল এবং বিরোধীদল একটা আপেক্ষিক বিষয়। আমি আপনাদের আহ্বান জানাব, প্রজন্মের ভাষাকে অনুধাবনের চেষ্টা করুন, প্রজন্মের ভাষাকে পড়ার চেষ্টা করুন। প্রধানমন্ত্রীর সন্তান যেই প্রজন্মের, আমরাও সেই প্রজন্মের। আমাদেরকে ধারণ করার চেষ্টা করবেন। বিএনপির নয়, কেবল জামায়াতের নয়, কেবল এনসিপির নয়, বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ, বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা, বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্ন বাস্তবায়ন যেন আমরা করতে পারি।
তিনি বলেন, এই চেয়ার গণবিচ্ছিন্নতা তৈরি করে। এই সংসদে বসে, এসিরুমে বসে, এসি গাড়িতে বসে, মিনিস্ট্রির এসিতে বসে, বাসার মধ্যে ২৪ ঘণ্টা আনইন্টারাপ্টেড ইলেক্ট্রিসিটির মধ্য থেকে জনগণের সমস্যা বোঝা যায় না। এজন্য এই সংসদে যখন দাঁড়াই, আমরা জনগণের সমস্যা অনুধাবন করতে পারি না। আমরা এই সংসদে বসে যদি লোডশেডিং খুঁজি, এই সংসদে বসে লোডশেডিং পাওয়া যাবে না, এই সংসদে বসে জনগণের সমস্যা পাওয়া যাবে না। এই সংসদে যারা বসে আছি, বাংলাদেশের সবচেয়ে মানুষগুলোর মধ্যে আমরা।
আরও পড়ুন: জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি নির্মূল করতে হবে: মির্জা ফখরুল
আমাদের সবাইকে সমন্বিতভাবে ও ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রয়াস থাকতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আবার যদি বিভাজনের রাজনীতি যাই, আমরা জুলাইতে যাদেরকে পরাজিত করেছি, তারা পরাজিত হবে। সেজন্য সংসদে ন্যাশনাল এগ্রিমেন্টে যেতে হবে। পলিটিক্সে আমাদের এগ্রিমেন্ট-ডিসএগ্রিমেন্ট থাকবে, কিন্তু একটা রেডলাইন থাকতে হবে। আমরা যখন শুনতে পাই, একটা রাজনৈতিক দলকে নির্মূল করার আহ্বান সরকার দল থেকে আসে, সেই বাংলাদেশে আমরা ফিরতে চাই না। আমরা এখানে কনস্ট্রাক্টিভভাবে পলিসির জায়গা থেকে আর্গু করব, এগ্রি করব, ডিসএগ্রি করব। কিন্তু নির্মূলের রাজনীতি, বিনাশের রাজনীতি, দমনের রাজনীতি, পীড়নের রাজনীতি যদি আমরা আবার পরিচয় করাই, সেখান থেকে এই সংসদের কেউ বেনিফিটেড হবে না। এই বাংলাদেশকে যে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়ে গেছে, সেই অপশক্তি বেনিফিটেড হবে।