সংরক্ষিত নারী আসন
কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন, কনকচাঁপা, রিজিয়া পারভীন ও ন্যান্সি © টিডিসি সম্পাদিত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য বিএনপির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন দেশের তিনি জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী রুমানা ইসলাম কনকচাঁপা, বেবী নাজনীন ও রিজিয়া পারভীন। শনিবার (১১ এপ্রিল) রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে বেবী নাজনীন ও কনকচাঁপা মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন। আগের দিন শুক্রবার মনোনয়ন সংগ্রহ করেন রিজিয়া পারভীন।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, কনকচাঁপা সিরাজগঞ্জ-১ (কাজীপুর) আসনের জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। অন্যদিকে বেবী নাজনীন নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর ও কিশোরগঞ্জ) আসনের জন্য ফরম সংগ্রহ করেন। তিনি আগামীকাল রবিবার (১২ এপ্রিল) ফরম জমা দেবেন বলে জানা গেছে। অপরদিকে, রিজিয়া পারভীন তার নিজ জেলা কিশোরগঞ্জ থেকে সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য বিএনপির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। রাজনীতিতে নতুন হলেও তিনি সরাসরি মানুষের জন্য কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
এর আগে, দেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা সিরাজগঞ্জ-১ (কাজীপুর) আসন থেকে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনেও ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। আরেক প্রখ্যাত কন্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন উত্তরবঙ্গের নীলফামারী-৪ আসন থেকে সংরক্ষিত আসনের জন্য মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন। তিনি বর্তমানে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা এবং দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বেবী নাজনীন নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন। ওই আসনে বিএনপির প্রাথমিক প্রার্থী ছিলেন মো. আমজাদ হোসেন সরকার। কিন্তু আদালতের নির্দেশে তার প্রার্থিতা স্থগিত হয়ে যাওয়ার পর, বিএনপি একদম শেষ মুহূর্তে (২৫ ডিসেম্বর ২০১৮) বেবী নাজনীনকে ধানের শীষের চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে। তার জন্মস্থান সৈয়দপুর।
এদিকে, আগের দিন শুক্রবার (১০ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশায় দলীয় ফরম কিনেছেন বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী রিজিয়া পারভীন। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে তিনি তার নিজ জেলা কিশোরগঞ্জের সংরক্ষিত আসনের জন্য ফরম কেনেন। ফরম সংগ্রহের পর তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এবারই প্রথম তিনি সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য দলীয় মনোনয়ন চেয়েছেন। তবে বিএনপির রাজনীতির কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত হলেও এখনও পর্যন্ত মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেননি বলে জানা গেছে।
আরও পড়ুন: গুম হওয়া ছাত্রনেতা রাসেলের বোন লাবনীর বিএনপির মনোনয়ন সংগ্রহ
কনকচাঁপা মোট ৩ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন। ২০২৬ সালে তিনি আজীবন সম্মাননা লাভ করেন। বেবী নাজনীন ১৯৯৩ এবং ২০০৩ সালে মোট ২ বার শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। আর রিজিয়া পারভীন বাংলা চলচ্চিত্রে প্রায় ১৩০০ জনপ্রিয় প্লেব্যাক গান গাইলেও এখন পর্যন্ত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাননি। তবে তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস) পুরস্কারসহ অন্যান্য অনেক সম্মাননা পেয়েছেন। নাজমুন মুনিরা ন্যান্সি ২০১১ সালে ‘প্রজাপতি’ চলচ্চিত্রের গানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।
মনোনয়ন ক্রয়ের প্রতিক্রিয়ায় রুমানা ইসলাম কনকচাঁপা বলেন, দলে দীর্ঘদিনের নিষ্ঠা ও অবদানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে তিনি আশাবাদী।
অন্যদিকে বেবী নাজনীন বলেন, দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক আনুগত্য এবং দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বিবেচনায় তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার আশা রাখেন। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
এদিকে কণ্ঠশিল্পী রিজিয়া পারভীন নিজের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, মনোনয়ন না পেলেও আমি বিএনপির সঙ্গেই আছি। তিনি যোগ করে বলেন, দল সবসময়ই ত্যাগীদের মূল্যায়ন করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনীত হলে তিনি মূলত নারী অধিকার এবং সংস্কৃতি অঙ্গন নিয়ে কাজ করতে চান। তিনি বলেন, আমি যেহেতু একজন শিল্পী, সংস্কৃতি অঙ্গন নিয়ে কাজ করতে চাই এবং প্রথমবার মনোনয়ন পেলে আমার প্রধান কাজ হবে নারীদের নিয়ে কাজ করা।
আরও পড়ুন: বিএনপির মনোনয়ন ফরম কিনলেন খোন্দকার দেলোয়ার কন্যা ডা. লুনা
অতীতের স্মৃতি বর্ণনা করে আবেগপ্রবণ হয়ে রিজিয়া পারভীন স্মরণ করেন, ছোটবেলায় তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত থেকে পুরস্কার নিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ারও স্নেহধন্য ছিলেন।
মনোনয়ন ফরম নিতে এসে তোপের মুখে কনকচাঁপা
এদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য বিএনপির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে এসে দলটির অন্য নারী নেত্রীদের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়েন কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা। শনিবার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই ঘটনা ঘটে।
এদিন সকাল থেকেই মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ভিড় ছিল দলীয় কার্যালয়ে। এর মধ্যেই কনকচাঁপা মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে গেলে উপস্থিত ‘ত্যাগী ও আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়’ নারী নেত্রীদের একাংশ তার প্রতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থেকেও হঠাৎ করে মনোনয়নপ্রত্যাশী হওয়া সুবিধাবাদিতার শামিল।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত বগুড়া জেলা বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় মহিলা দলের নির্বাহী সদস্য সুরাইয়া জেরিন রনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা বিএনপির কে? তিনি কি দল করেছেন? যারা আন্দোলনে ছিল, ১৭ বছর আমরা দলের জন্য খেটেছি, তাাদের মূল্যায়ন কোথায়?’
তিনি আরও বলেন, বগুড়ার রাজপথে, ঢাকার রাজপথে ছিলাম। ১৭ বার জেলে গেছি। নারীদের মধ্যে সর্বোচ্চ মামলা খেয়েছি। কনকচাঁপা এতদিন কোথায় ছিলেন? আমাদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে কেন? আমরা সুবিধাবাদীদের দেখতে চাই না।
রনি প্রশ্ন তোলেন, কনকচাঁপা কয়টা মামলা খেয়েছে? কয়টা আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন? যারা রাজপথে লড়াই করেছেন, আমরা তাদেরই মনোনয়ন চাই।
এসময় উপস্থিত আরও কয়েকজন নেত্রীও একই ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের দাবি, দলে দীর্ঘদিন ধরে ত্যাগ স্বীকার করা নেত্রীদের উপেক্ষা করে হঠাৎ করে আগত ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেওয়া হলে তা দলীয় কাঠামো ও কর্মীদের মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে এসব প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও শেষ পর্যন্ত কনকচাঁপা তার মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি আশাবাদী।’
আরও পড়ুন: প্রথমদিনেই সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়ন ফরম বিক্রি ৫৬৮
এদিকে, জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনয়ন ইচ্ছুক প্রার্থীর সংখ্যা ছয়শো ছাড়িয়ে গেছে। দলের সহ-দফতর সম্পাদক তারিকুল ইসলাম তেনজিং বলেন, মনোনয়নপত্র এখনো কিনছেন নারী নেত্রীরা। এখন পর্যন্ত ছয়শোর ওপরে মনোনয়নপত্র বিক্রি হয়েছে। জমা পড়েছে শতাধিক। কালকে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। আশা করছি, যারা মনোনয়নপত্র নিয়েছেন তারা কালকেই জমা দেবেন।
বিএনপির মনোনয়ন ফরমের মূল্য ধরা হয়েছে ২ হাজার টাকা। ১২ এপ্রিল পর্যন্ত ফরম উঠানো এবং জমা দেয়া যাবে। জমা দেওয়ার সময়ে প্রার্থীদের ৫০ হাজার টাকা জামানত জমা দিতে হবে বলে জানান বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব (দফতরের দায়িত্বে) রুহুল কবির রিজভী।
গত বুধবার সকালে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। মনোনয়ন দাখিলের শেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ এপ্রিল। মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ২২ ও ২৩ এপ্রিল। বাছাই নিয়ে কোনো আপত্তি থাকলে আপিল করা যাবে ২৬ এপ্রিল, আর সেই আপিল নিষ্পত্তি করা হবে ২৭ ও ২৮ এপ্রিল। চূড়ান্ত প্রার্থীদের মাঝে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে ৩০ এপ্রিল। এরপর ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১২ মে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আসন বণ্টনে বিএনপি জোট ৩৬টি, জামায়াতে ইসলাম জোট ১৩টি ও স্বতন্ত্ররা মিলে পাবে একটি আসন।