বিএনপি ও জামায়াতের লোগো © টিডিসি সম্পাদিত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের শুরু থেকেই ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী নিয়ে অস্বস্তিতে ছিল বিএনপি। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ৭৮টি আসনে ধানের শীষ প্রতীকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন নেতারা। সমঝোতায় সামাল দিতে না পেরে এদের প্রত্যেককেই বহিষ্কার করেছিল বিএনপি। সেই সাথে এই ‘বিদ্রোহে’র জেরে বহিষ্কার হয়েছে আরও অনেক নেতাকর্মী, স্থগিত হয়েছে কয়েকটি সাংগঠনিক কমিটিও।
শেষমেশ নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে, বিদ্রোহী প্রার্থীদের মাত্র ৭ জন জিতে আসতে পেরেছেন। আর তাদের কারণে জটিল সমীকরণের ফলে ১১ দলের প্রার্থীদের কাছে হারতে হয়েছে ২১টি আসনে। আসনভিত্তিক বেসরকারি ফলাফল পর্যালোচনা করে এই চিত্র পাওয়া গেছে।
জিতেছেন যেসব বিদ্রোহী প্রার্থী
বিএনপির বিদ্রোহীরা সর্বোচ্চ চট্টগ্রাম বিভাগে তিনটি, ঢাকা বিভাগে দুটি, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে একটি করে আসন জিতেছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, কুমিল্লা-৭, চাঁদপুর-৪, ঢাকা বিভাগের টাঙ্গাইল-৩, কিশোরগঞ্জ-৫ এবং রংপুর বিভাগের দিনাজপুর-৫ ও ময়মনসিংহ বিভাগের ময়মনসিংহ-১ আসনে জয় পেয়েছেন বিদ্রোহীরা।
আলোচিত বিদ্রোহীদের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৪৭ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন রুমিন ফারহানা। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি জোটের জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের জুনায়েদ আল হাবিব পেয়েছেন ৮০ হাজার ৪৩৪ ভোট। কুমিল্লা-৭ আসনে বিদ্রোহী আতিকুল আলম শাওন জয়ী হয়েছেন ৯১ হাজার ৬৯০ ভোটে। বিপরীতে বিএনপির দলীয় রেদোয়ান আহমেদ পেয়েছেন ৪৮ হাজার ৫০৯ ভোট। ময়মনসিংহ বিভাগের কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল পেয়েছেন ৭৯ হাজার ২১০ ভোট। আর দলীয় প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদা ভোট পেয়েছেন ৬৬ হাজার ১১৮টি।
ময়মনসিংহ-১ আসনে জয়ী মোহাম্মদ সালমান ওমর হালুয়াঘাট উপজেলা শাখার বহিষ্কৃত যুগ্ম আহ্বায়ক। দলীয় প্রার্থী ছিলেন কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ। দুজনই ১ লাখের বেশি ভোট পেয়েছেন। ব্যবধান গড়ে দিয়েছে প্রায় ৭ হাজার ভোট।
‘বিদ্রোহ’ সামাল দিয়ে বিএনপি জোটের এমপি যারা
ধানের শীষ ও অন্যান্য প্রতীকে জোটের প্রার্থীরা বিদ্রোহ সামাল দিয়ে ৫০টি আসনে জিতে এসেছেন। এর মধ্যে আলোচিত প্রার্থীদের একজন পটুয়াখালী-৩ আসনের গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী নুরুল হক নুর। তিনি পেয়েছেন ৯৭ হাজার ৩২৩ এবং জোটের বিদ্রোহী হাসান মামুন পেয়েছেন ৮১ হাজার ৩৬১ ভোট। প্রায় ১৬ হাজার ভোটের ব্যবধানে তিনি জয় নিয়ে এসেছেন।
একইভাবে হবিগঞ্জ-১ আসনে বিদ্রোহী শেখ সুজাত মিয়ার বিপক্ষে জয়ী হয়েছেন বিএনপির রেজা কিবরিয়া। কুমিল্লা-২ আসনে দলীয় প্রার্থী সেলিম ভূঁইয়ার বিপক্ষে বিদ্রোহী এমএ মতিন সুবিধা করতে পারেননি। মানিকগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির জিন্নাহ কবীর পেয়েছেন ১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৭৬ ভোট। বিপরীতে বিদ্রোহী তোজাম্মেল হক পেয়েছেন ৭৭ হাজার ৮১৮টি। মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপিদলীয় আফরোজা খানম রিতার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বীতা গড়তে পারেননি বিদ্রোহী আতাউর রহমান। ভোটের হিসাবে দ্বিতীয় স্থানে আছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ সাঈদ নূর।
রাজশাহী-৫ আসনে বিএনপি সবশেষ জিতেছিল ২০০১ সালে। এবার দলীয় প্রার্থী নজরুল ইসলাম আসনটি পুনরুদ্ধার করেছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বীতা হয়েছে জামায়াতের প্রার্থীর সঙ্গে। নারায়ণগঞ্জের চারটি আসনেও বিদ্রোহীরা দলীয় প্রার্থীর বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে পারেননি। নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। নারায়ণগঞ্জ-২ আসনেও এই দুই দলের প্রার্থীদের লড়াই হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের জোটের প্রার্থীদের মধ্যে।
বরিশাল-১ আসনে বিএনপিদলীয় প্রার্থী কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন। বিদ্রোহী হিসেবে লড়েন কেন্দ্রের বহিষ্কৃত সদস্য আব্দুস সোবাহান। কিন্তু মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় স্বপন ও জামায়াত প্রার্থী কামরুল ইসলাম খানের মধ্যে। যদিও কামরুলের চেয়ে স্বপন প্রায় দ্বিগুণ ভোটে এগিয়ে।
বিদ্রোহী থাকা যেসব আসনে বিএনপির দলীয়রা জিতেছেন সেগুলো হলো- ময়মনসিংহ-৩, ৭, ৯, ১০, টাঙ্গাইল-৪ ও ৫, নোয়াখালী-২, কিশোরগঞ্জ-১, কুষ্টিয়া-১, নাটোর-৩, হবিগঞ্জ-৪, পিরোজপুর-২, নেত্রকোনা-৩, পঞ্চগড়-২, নাটোর-১, রাজবাড়ী-২, ঠাকুরগাঁও-২, দিনাজপুর-২, নওগাঁ-১, ৩, ৬, নড়াইল-১, বাগেরহাট-৩, ঝালকাঠি-১, টাঙ্গাইল-১, জামালপুর-৩, ময়মনসিংহ-৮, ১১, নেত্রকোনা-৩, মুন্সিগঞ্জ-১, ৩, ঢাকা-৭, ১৮, নরসিংদী-৫, গোপালগঞ্জ-২, মাদারীপুর-২, সুনামগঞ্জ-৩, ৪, মৌলভীবাজার-৪, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১, ৫, কুমিল্লা-৯ এবং পার্বত্য খাগড়াছড়ি।
যেসব আসনে বিদ্রোহের সুবিধা নিয়েছে জামায়াত
সারাদেশের ২১টি আসনে দলীয় আর বিদ্রোহী প্রার্থীর কাটাকাটিতে ভোটের ব্যবধান গড়ে এগিয়ে গেছেন জামায়াত জোটের প্রার্থীরা। এর মধ্যে সিলেট-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিল সবশেষ ১৯৯৬ সালে। ২০০১-এ জোটের হয়ে জামায়াত প্রার্থী দেয়। এবারের নির্বাচনে বিএনপির দলীয়র পাশাপাশি বিদ্রোহী প্রার্থীও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। জয়ী হয়েছেন জামায়াত জোটের খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ আবুল হাসান। দ্বিতীয় অবস্থানে বিএনপি জোটের জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের উবায়দুল্লাহ ফারুক। বিএনপির বিদ্রোহী ছিলেন মামুনুর রশীদ।
নীলফামারী-৪ আসনে বেসরকারিভাবে জয়ী হয়েছেন জামায়াতের আবদুল মুনতাকিম। ভোট পেয়েছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৬৫টি। বিএনপিদলীয় আবদুল গফুর সরকারের প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা- ৮১ হাজার ৫২৬টি। বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন রিয়াদ আরফান সরকার। বিদ্রোহী থাকা ময়মনসিংহ-২ আসনটিও বিএনপি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কাছে হারিয়েছে। দলীয় প্রার্থী ছিলেন মোতাহার হোসেন তালুকদার। ১৯৯৬ সালের পর এ আসনে বিএনপি জিতেছিল কেবল ২০০১ সালে।
আলোচিত আসনগুলোর মধ্যে নোয়াখালী-৬-এ জামায়াত জোটের এনসিপির প্রার্থী আবদুল হান্নান মাসউদ জয়ী হয়েছেন। এ ছাড়া, পাবনা-৩ ও ৪, রংপুর-৩, গাইবান্ধা-৫, ঝিনাইদহ-৪, যশোর-২ ও ৫, নড়াইল-২, বাগেরহাট-১, ২ ও ৪, সাতক্ষীরা-৩, শেরপুর-১, ঢাকা-১২, মাদারীপুর-১, চট্টগ্রাম-১৬ এবং ময়মনসিংহ-৬-এ জামায়াত বা তাদের জোটের প্রার্থীরা জিতেছেন। বিএনপি প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের কাছে সবচেয়ে আসন হারিয়েছে খুলনা বিভাগে। এখানে বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে ৮টি আসন হাতছাড়া হয়েছে তাদের।
এ ছাড়া ময়মনসিংহ-৬ আসনে বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতেরও বিদ্রোহী ছিল। আসনটিতে বিএনপির দলীয় প্রার্থী আখতারুল আলমের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন উপজেলা মহিলা দলের সাবেক সভাপতি আখতার সুলতানা। অপরদিকে জামায়াতের কামরুল হাসানের বিদ্রোহী হন জেলা শাখার বহিষ্কৃত আমির জসিম উদ্দিন। ৭৫ হাজার ৯৪৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন জামায়াতের কামরুল হাসান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির বিদ্রোহী আখতার সুলতানার প্রাপ্ত ভোট ৫২ হাজার ৬৬৯টি।