খুলে দেয়া হয়েছে জিয়া উদ্যান
কবর এলাকায় মানুষের ঢল © সংগৃহীত
দেড়দিন সর্বসাধারণের জন্য প্রবেশ নিষিদ্ধ বা বন্ধ থাকার পর বৃহস্পতিবার দুপুরে খুলে দেয়া হয়েছে শেরে বাংলা নগরে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজার এলাকা। খোলা পেয়ে মুক্ত পরিবেশে হাজার হাজার নেতাকর্মী ফুল নিয়ে, পুস্পস্তবক নিয়ে তাদের প্রিয় নেত্রী খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করছেন, কায়মনোবাক্যে দোয়া করছেন আল্লাহর দরবারে ‘পরপারে ভালো থাকেন’।
গতকাল বুধবার বিকালে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া সমাহিত করা হয় তার স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই।
ইংরেজি নতুন বছরের প্রথম দিনে সকাল থেকে বিজয় সরণির সড়ক মোহনায় নেতা-কর্মীরা ভিড় করে, ঢল নামে বিজয় সরণির সড়কে। সকাল ৯টার দিকে বিজয় সরণির সড়ক খুলে দেয়া হলেও সমাধিস্থলে প্রবেশ পথে নিরাপত্তা রক্ষীরা সাধারণ মানুষের প্রবেশ করতে দেয়নি। পরে বেলা ১২টার দিকে সমাধিস্থল সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেয়া হলে নেতা-কর্মীরা কবর জিয়ারতের সুযোগ পান।
সকালে নিরাপত্তা বলবৎ থাকার মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর কবর জিয়ারত করেন। এরপর নিরাপত্তা বেষ্টনীর সামনে দাঁড়িয়ে মোনাজাত করেছেন দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স।
কবর জিয়ারত করে বাবর সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের নেত্রী ছিলেন জিয়াউর রহমানের আদর্শকে উড্ডীন করে রাখার একজন নেত্রী। যিনি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মূর্ত প্রতীক হিসেবে পরিচিত। সেই নেত্রীর আদর্শ অনুসরণ করেছেন আমাদের নেতা তারেক রহমান।
তিনি বলেন, আপনারা সবাই আমাদের নেত্রীর জন্য দোয়া করবেন, আল্লাহ তায়ালা যেন তাকে বেহেস্তের সবচেয়ে ভালো জায়গায় স্থান দেন।
লুৎফুজ্জামান বাবর বলেন, সকালে বাসায় থাকতে ইচ্ছা করছিল না। নেত্রীর কবর জিয়ারত করতে এসেছি। দেশনেত্রী অন্ততকালে চলে গেছেন কিন্তু তার আদর্শ আমাদের পাথেয় হয়ে থাকবে। গণতন্ত্রের সেই দেখানো পথে বিএনপি চলবে, আমাদের নেতা তারেক রহমান সেই পথে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেবেন।
এদিকে, সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেয়ার পর সমাধি প্রাঙ্গণ নেতা-কর্মী-সমর্থকদের ঢল নামে। শিশু, স্কুল শিক্ষার্থী থেকে শুরু সব বয়সি নারী-পুরুষ আসছেন জিয়ার মাজার প্রাঙ্গণে।
ঠিক বেগম খালেদা জিয়াকে সেখানে কবর দেয়া হয়েছে তার সামনে নিবরে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন মানুষ, তারা দরুদ শরীফ পড়ছেন। কাউকে কাউকে কান্নায় ভেঙে পড়তেও দেখা গেছে।
কুড়িগ্রাম থেকে আসার যুব দলের কর্মীরা সুলতান মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশ যত দিন থাকবে ততদিন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে কেউ ভুলে যাবে না। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তাদের স্মরণ করবে এই কারণে যে তিনি গণতন্ত্রের পতাকাকে উড্ডীন করে রাখতে নিজের সব কিছুকে বিসর্জন দিয়েছেন শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে।
তিনি বলেন, তার মতো নেত্রী বলতে পারেন যে, আমার বিদেশে কোনো ঠিকানা নেই, আমাদের ঠিকানা বাংলাদেশ আর বাংলাদেশের মাটি। আমি কোনোভাবে বিদেশে যাবো’…সেই নেত্রীর জানাজায় অংশ নিয়েছি গতকাল বুধবার। অপেক্ষায় ছিলাম কবর জিয়ারতের। আজকে কবর জিয়ারতের সুযোগ পেয়েছি…শুকরিয়া জানাই আল্লাহর কাছে।
বিএনপির কর্মী বাড্ডার বাসিন্দা সাইফুল আলম বলেন, বিএনপি প্রতিষ্ঠাতার কবর জিয়ারত করতে কতবার যে নেত্রী এসেছে তার হিসাব বলতে পারবো না। আমি নিজে এসেছি, স্লোগান দিয়েছি নেত্রীর আগমনে। আজকে নেত্রীই নেই। আজকে তার কবর আমরা জিয়ারত করছি। এই কথা মনে হলে বুকটা ফেটে যায়…তারপরও মহান আল্লাহ রাব্বুল আ‘লামীন নেত্রীকে নিয়ে গেছেন। এভাবে সবাইকে চলে যেতে এটাই নিয়ম। দোয়া করি তিনি যেন অন্তত জগতে ভালো স্থানে থাকেন, বেহেশতে থাকেন।
নীলফামারীর আমিনুল ইসলাম বলেন, সেই ছোট বেলায় যখন আমি ছাত্রদল করেছি তখন থেকে এ নেত্রীকে দেখেছি, আমাদের নেতা শহীদ রাষ্ট্রপতির কবরে নেতা-কর্মীদের নিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসতে। আজকে তিনি নেই…আমরা বিএনপি এতিম হয়ে গেছি। তবে এটা দেখে সাহস পাই, যখন গতকাল নেত্রীর জানাজায় জনসমুদ্র দেখে যে, আমরা এতিম হলেও আমাদের নেত্রীর পথ ধরে জাতীয়তাবাদের পতাকা উড্ডীন রাখবেন দেশনায়ক তারেক রহমান।
সকাল থেকে বিজয় স্মরণীয় এলাকায় নেতা-কর্মীদের কবর জিয়ারত করেন। অনেককে কবরের এক পাশে দাঁড়িয়ে কোরআন তেলাওয়াত করতে দেয়া যায়।
সমাধিস্থলের চারদিকের প্রবেশ পথ বন্ধ থাকলেও ক্রিসেন্ট লেক দিয়ে নেতা-কর্মীদের আসার পথ উন্মুখ করেছে। সেনাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে।
গত মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। গতকাল বুধবার মানিক মিয়া এভিনিউতে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেই জানাজাতে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি এক পর্যায়ে স্মরণকালের সর্ববৃহৎ জনসমুদ্রে রূপ নেয়।