ফরিদ উদ্দিন রনি ও সাদিক কায়েম © ফাইল ছবি
লেখক ও সাংবাদিক ফরিদ উদ্দিন রনি বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) ও ছাত্রশিবিরের প্রকাশনা সম্পাদক আবু সাদিক কায়েমকে (সাদিক কায়েম) এখনই জাতীয় রাজনীতির জন্য এক্সপেরিমেন্ট করা উচিত। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে তৎকালীন ডাকসুর ভিপি আমানউল্লাহ আমানের উদাহরণ টেনে তিনি এই এক্সপেরিমেন্টের কথা বলেছেন। সম্প্রতি নিজের ফেসবুকের পেজে এক স্ট্যাটাসে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত লেখেন।
স্ট্যাটাসে ফরিদ উদ্দিন রনি বলেন, ১৯৯১ সালে নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা করার আগে বেগম জিয়া ডেকে পাঠালেন ডাকসুর রানিং ভিপি আমানউল্লাহ আমানকে। তখনো ডাকসুতে আমানউল্লাহর ভিপি পদে মেয়াদ ৬ মাস বাকি। বেগম জিয়া তাকে জাতীয় নির্বাচনের প্রিপারেশন নিতে বললেন। বাট আমানউল্লাহ ইতস্তত করলেন। ম্যাডাম, আমি জাতীয় রাজনীতির জন্য প্রস্তুত নই, এ টাইপের কিছু বলে বেগম জিয়াকে বুঝাতে চেয়েছিলেন তিনি এখনই পা মেলতে চান না জাতীয় রাজনীতিতে। তফশিল ঘোষণা হলো। ঢাকা-৩ আসনে আওয়ামী লীগের ঝানু রাজনীতিবিদ মোস্তফা মহসিন মন্টুর প্রতিপক্ষ করে বেগম জিয়া ধানের শীষের প্রার্থী ঘোষণা করলেন আমানউল্লাহকে।
তিনি আরও বলেন, মোস্তফা মহসিন মন্টু তখনকার সময়ে খুবই পরিচিত মুখ ঢাকা-৩ আসনের মানুষের কাছে। পূর্বের এমপি। আবার উনি ছিলেন ঢাকা জেলা মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার। যুবলীগ চেয়ারম্যান। এমনকি ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন। সর্বত্র ছিল তার নামডাক। ফলে, তার সঙ্গে ভোটে ফাইট করতে বেগম জিয়া ডাকসুর একজন তরুণ ছাত্রনেতাকে নমিনেশন দিয়ে মাঠে নামিয়ে দেওয়াটা ঠিক করলেন নাকি ভুল করলেন, এই নিয়ে নানান ধরনের আলাপ-আলোচনা চলতে থাকল লোকমুখে।
‘‘আমানউল্লাহকে সাহস ও উদ্দীপনা জোগাতে বেগম জিয়া নিজেই উপস্থিত হয়েছিলেন তার নির্বাচনী প্রচারণায়। ফেব্রুয়ারিতে ভোট হলো। বিপুল ভোটে আমানউল্লাহ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে গেলেন। তিনি শুধু জিতলেনই না, ৩১ হাজার ৭৯ ভোটের বিশাল ব্যবধানে আওয়ামী লীগের ঝানু রাজনীতিবিদ মোস্তফা মহসিন মন্টুকে হারানোর মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবনেরও পতন ঘটিয়ে দিলেন।’’
ফরিদ উদ্দিন রনি বলেন, জীবনে বহুবার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু রাজনীতিতে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেন নাই মন্টু। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায় তরুণ ছাত্রনেতা আমানউল্লাহর কাছে সেইবার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। সরকারের গঠনের পর বেগম জিয়া মিস করলেন না আমানউল্লাহর মতো তরুণ ক্যারিশম্যাটিক নেতার মেধার মূল্যায়ন করতে। তাকে অল্প বয়সেই বানিয়ে দিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী।
‘‘গল্পটা এই কারণে লিখলাম, বর্তমানে সিচুয়েশনে ৯১-এর আমানউল্লাহর সঙ্গে সাদিক কায়েমের কম্পেয়ার করা যায়। সাদিক কায়েম ডাকসুর রানিং ভিপি। ফেব্রুয়ারিতে ভোট হলে আরও ৭ মাস বাকি থাকবে তার ভিপি পদের দায়িত্ব। আমানউল্লাহর মতোই সাদিক ক্লিন ইমেজের ছাত্রনেতা। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের ফেইস আমানউল্লাহ, সাদিকও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ফেইস। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে যেসকল তরুণ সামনে এবং পেছনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, কলাকৌশল নির্ধারণ করেছেন, গণঅভ্যুত্থানের বিগ ফেইস হিসেবে সামনে এসেছেন, মোটামুটি প্রত্যেকেই কমবেশি বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন, একমাত্র সাদিক ব্যতীত। তার বিরুদ্ধে কোনো মেজর এলিগেশন বাজারে নেই।’’
তিনি আরও বলেন, ভিপি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ছাত্রদের কাছেও বেশ আস্থা অর্জন করতে পেরেছে সে। এই অল্প সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীবান্ধব বেশকিছু ইনিশিয়েটিভ বাস্তবায়ন করে ফেলেছে তার টিম। যেগুলো ভালোই সাড়া জাগিয়েছে। ফলে ডাকসু চাপিয়ে সাধারণ মানুষের কাছেও তার একটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়ে গেছে। এই অপরচুনিটি কাজে লাগিয়ে সাদিককে ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় নেতায় পরিণত করা যেতে পারে। জামায়াত তাকে এখনই জাতীয় রাজনীতিতে এক্সপেরিমেন্ট করা উচিত এই ইলেকশনে ভোটে দাঁড় করানোর মধ্য দিয়ে।
‘‘পরবর্তী ৫ বছর পর কী সিচুয়েশন দাঁড়ায় বলা যায় না। সেই পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কোথায় গিয়ে ঠেকে সেটাও বলা মুশকিল। সাদিকের ডাকসু থেকে বিদায়, শিবিরের দপ্তর সম্পাদক থেকে সেক্রেটারি জেনারেল হয়ে সভাপতি, তারপর বিদায় নিয়ে জামায়াতে সদস্য হিসেবে যোগ দেয়া, ততদিনে তার যে ক্রেজ জনমনে তৈরি হয়েছে ঐটা আর ধরে রাখতে পারে কিনা সন্দেহ আছে। তখন সাবেক শিবির নেতা মাসুদ, ইয়াছিন আরাফাতদের মতো এভারেজ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এই সময়ে কিছুটা কৌশল অবলম্বন করেও সাদিক জাতীয় রাজনীতিতে আসতে পারে। সরাসরি জামায়াতের প্রার্থী না হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়াবে, বাট সেখানে জামায়াত তাকে সমর্থন জানাবে।’’
সবশেষে ফরিদ উদ্দিন রনি বলেন, জামায়াতের সিনিয়র নেতারা বোধহয় ঝুঁকি নিতে চাইবে না ঠিকভাবে গাইডও করবে না তাকে। বাট আমি পার্সোনালি মনে করি সাদিক সাহস করে দাঁড়িয়ে গেলে এটা হবে তার জীবনে একটি সেরা সিদ্ধান্ত। অন্য তরুণ নেতাদের আগে সে জাতীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি আছে বলে আমি মনে করি।