দিওয়ালির ‘কার্বাইড গান’, বাজি ফেটে অন্ধ বহু শিশু-কিশোর

২৯ অক্টোবর ২০২৫, ১২:৩৪ PM , আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০২৫, ১২:৩৫ PM
বাজি ফেটে অন্ধ বহু শিশু-কিশোর

বাজি ফেটে অন্ধ বহু শিশু-কিশোর © সংগৃহীত

ভারতের মধ্য প্রদেশের রাজধানী ভোপালের এক হাসপাতালের বিছানায় বসে ছিল ১৫ বছর বয়সী আরিশ। চোখে কালো চশমা, যার পেছনে ঢাকা পড়ে গেছে বাঁ চোখের ভয়াবহ ক্ষত। আলো-ঝলমলে দিওয়ালির উৎসব উদ্‌যাপন করতে গিয়ে সপ্তাহখানেক আগে সে কিনেছিল এক নতুন ধরনের বাজি যেটি তার মুখের কাছে ফেটে গিয়ে কেড়ে নিয়েছে বাঁ চোখের দৃষ্টি। জরুরি অস্ত্রোপচার হয়েছে তার চোখে, কিন্তু চিকিৎসকরা এখনও নিশ্চিত নন, সে আদৌ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবে কি না।

আরিশ স্কুলে যায় না; সে টেলিভিশন সারাই করে পরিবারের উপার্জনে সহায়তা করে। তার বাবা পেশায় মালি। আরিশ বলছিল, ‌‌‘চোখটা গেলে এখন কাজে ফিরব কীভাবে, জানি না।’

যদিও ভারতে শিশু শ্রম নিষিদ্ধ তবুও লক্ষ লক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। ভারতীয় আইনে ১৪ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের অক্ষতিকর শিল্পে কাজ করার অনুমতি থাকলেও, বাস্তবে শিশু শ্রম এখনো ব্যাপক।

আরিশের মতো উত্তর ভারতের অন্তত পাঁচ রাজ্যে শত শত শিশু-কিশোর ‘কার্বাইড গান’ নামের নতুন এক ধরনের বাজির বিস্ফোরণে আহত হয়েছে, যাদের অনেকেই চোখে গুরুতর ক্ষত পেয়েছে। এই বাজিটির কথা এর আগে কেউ শোনেনি। দিওয়ালির আগে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, প্লাস্টিকের একটি পাইপে ক্যালসিয়াম কার্বাইড ভর্তি করে তৈরি করা হচ্ছে বাজি, যা গুলির মতো শব্দ ও আলোর ঝলকানি তৈরি করে।

কিন্তু সমস্যাটি হলো এই ঘরোয়া বাজিটি ঠিক কখন ফাটবে, তা নিশ্চিত নয়। অনেকে দেরিতে বিস্ফোরণ না হওয়ায় পাইপের ভেতর উঁকি দেওয়ার মুহূর্তেই ভয়াবহ বিস্ফোরণে চোখে আঘাত পেয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দিওয়ালির সময় কেবল ভোপালেই একশরও বেশি মানুষ এই বাজির আঘাতে আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ১৫ জনের চোখে অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। অন্য তিন জেলায়ও একশর বেশি আহতের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

বিহারের রাজধানী পাটনার রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অব অপথালমোলজির প্রধান ড. বিভূতি প্রসন্ন সিনহা জানান, ওই রাজ্যে একই ধরনের বিস্ফোরণে ১৭০ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৪০ জনের চোখে অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘অনেক ঘটনার খবর এখনও আমাদের জানা নেই, আহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।’

ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, উত্তর প্রদেশ এবং দিল্লিতেও একই ধরনের বিস্ফোরণের খবর এসেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে মধ্য প্রদেশসহ কয়েকটি রাজ্য ‘কার্বাইড গান’ বাজি হিসেবে ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে এবং কয়েকজন বিক্রেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ভোপালের হামিদিয়া হাসপাতালের চক্ষুরোগ বিভাগের প্রধান ডা. কবিতা কুমার জানান, হালকা থেকে শুরু করে গুরুতর পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের চোখের আঘাত নিয়ে রোগীরা আসছেন। তিনি বলেন, ‘যাদের কম আঘাত, তাদের মূলত চোখের পাতায় রাসায়নিক জ্বালাপোড়া হয়েছে। মাঝারি আঘাতের রোগীদের কর্নিয়ায় রাসায়নিক কণার ক্ষত তৈরি হয়েছে। আর গুরুতর আঘাতপ্রাপ্তদের কর্নিয়া মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সাময়িকভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দৃষ্টি ফিরে আসতে পারে, কিন্তু তাতে সময় লাগবে।’

হাসপাতালের আরেক চিকিৎসক ডা. অদিতি দুবে বলেন, ‘দিওয়ালির বাজিতে রাসায়নিক আঘাত এমন ঘটনা আমি আগে কখনও দেখিনি। তাই চিকিৎসার আগে আমাকে প্রথমে জানতে হয়েছে ‘কার্বাইড গান’ কী।’

অন্যদিকে, অনেক রোগী জানিয়েছেন, ইনস্টাগ্রাম রিলস ও ইউটিউব ভিডিও দেখে তারা এই বাজি কিনেছেন। কারণ এটি সহজলভ্য, তৈরি করা সহজ এবং দামও কম মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ রুপিতে পাওয়া যায়। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য ভিডিওতে দেখা গেছে, অল্পবয়সীরা নিজেরাই এই বাজি তৈরি ও পরীক্ষা করছে, অনেক ভিডিওতেই র‍্যাপ সংগীত ও আকর্ষণীয় হ্যাশট্যাগ (#usefulproject, #experimentvideo) ব্যবহার করা হয়েছে।

পাটনার ড. সিনহা জানান, তার এক রোগী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র, যিনি ইউটিউব ভিডিও দেখে নিজেই ‘কার্বাইড গান’ বানিয়ে বিস্ফোরণে একটি চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যালসিয়াম কার্বাইড জলের সংস্পর্শে এলেই দাহ্য ও ক্ষতিকারক অ্যাসিটাইলিন গ্যাস উৎপন্ন করে। এই রাসায়নিকটি ভারতে কড়া নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, কৃত্রিমভাবে ফল পাকানোর জন্য কৃষকেরা ব্যাপকভাবে এটি ব্যবহার করে। ক্যালসিয়াম কার্বাইডের উৎপাদন ও মজুত রাখার জন্য ১৯৮৭ সালের বিধি অনুযায়ী লাইসেন্স প্রয়োজন, যদিও এই নিয়ম ২০০ কিলোগ্রামের বেশি পরিমাণের জন্য প্রযোজ্য।

ভোপালের এক সরকারি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কেন্দ্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ থাকলেও ফল পাকানোর জন্য এখনো এই রাসায়নিকটি অবাধে ব্যবহৃত হচ্ছে।’

ভোপাল পুলিশ কমিশনার হরিনারায়নাচারি মিশ্র জানান, উত্তর ভারতে বিয়ের অনুষ্ঠানে কিংবা কৃষিজমিতে পশুপাখি তাড়াতে বহুদিন ধরেই এই কার্বাইড গান ব্যবহার হয়ে আসছে।

অল ইন্ডিয়া অপথালমোলজিক্যাল সোসাইটির সভাপতি ডা. পার্থ বিশ্বাস বলেন, ‘কার্বাইড গান’ অবিলম্বে সারাদেশে নিষিদ্ধ করা উচিত। এটা এখন জাতীয় স্তরের সমস্যা। দিওয়ালির দুর্ঘটনা ভেবে এর গুরুত্ব কমিয়ে দেখা যাবে না।’

তিনি সতর্ক করেন, ভবিষ্যতে ক্রিকেট জয় বা নববর্ষের মতো উদ্‌যাপনেও এই বাজির ব্যবহার দেখা যেতে পারে, যা স্থায়ী অন্ধত্ব ও পঙ্গুত্বের ঝুঁকি তৈরি করবে। ‘এই ঘরোয়া ‘কার্বাইড বোমা’ বা ‘কার্বাইড গান’ শরীরের বিভিন্ন অংশে ভয়াবহ ক্ষতি করতে পারে,’ বলেন ডা. বিশ্বাস। তিনি আরও দাবি করেন, এসব বাজি তৈরি ও বিক্রি বন্ধে দেশব্যাপী অভিযান চালানো এবং ক্যালসিয়াম কার্বাইডের উৎপাদন-বিক্রিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা প্রয়োজন।

ফিরে যাওয়া যাক ভোপালের হামিদিয়া হাসপাতালের ওয়ার্ডে। সাত বছরের আলজাইন মাকে জড়িয়ে বসে আছে, চোখে ব্যান্ডেজ। ইউটিউব ভিডিও দেখে কাকার কাছ থেকে বায়না করে কিনেছিল সেই ‘কার্বাইড গান’। বিস্ফোরণে এক চোখে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে সে, অপারেশনও হয়েছে।

আলজাইনের মা আফরিন বললেন, ‘ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব ভয় পাচ্ছি। একটাই কামনা ও যেন আবার দেখতে পায়।’

ব্র্যাক নিয়োগ দেবে সহকারী প্রধান শিক্ষক/প্রধান শিক্ষক, পদায়…
  • ১৫ মে ২০২৬
জঙ্গি সম্পৃক্ততা সন্দেহে দুর্গম টিলা থেকে চাকরিচ্যুত সেনা স…
  • ১৫ মে ২০২৬
হামে মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে নিউমোনিয়া, অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না…
  • ১৫ মে ২০২৬
হামে আরও ১২ শিশুর মৃত্যু
  • ১৫ মে ২০২৬
যশোরের চৌগাছায় ২১১ বোতল মাদক দুইজন আটক
  • ১৫ মে ২০২৬
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে বিভিন্ন গ্রেডে চাকরি, পদ ১৬, আবেদন…
  • ১৫ মে ২০২৬
×
ADMISSION
GOING ON
SPRING 2026
APPLY ONLINE
UP TO 100% SCHOLARSHIP
UNIVERSITY OF ASIA PACIFIC 🌐 www.uap.ac.bd
Last Date of Application:
21 June, 2026
📞
01789050383
01714088321
01768544208
01731681081