মসজিদের বদলে স্কুল-হাসপাতাল, বিশ্বের নতুন ‘চে গুয়েভারা’ কে এই ইব্রাহিম ত্রাওরে?

১১ অক্টোবর ২০২৫, ১২:২৫ PM , আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৫, ০১:১০ PM
ইব্রাহিম ত্রাওরে

ইব্রাহিম ত্রাওরে © সংগৃহীত

ইব্রাহিম ত্রাওরে মাত্র ৩৪ বছর বয়সেই আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোর শাসনক্ষমতা গ্রহণ করেন। ‘চে গুয়েভারা’র আদলে আলোড়ন তোলা তরুণ নেতা ইব্রাহিম ত্রাওরেকে দেখা হয় আফ্রিকার নতুন প্রজন্মের প্রতীক হিসেবে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির শোষণ থেকে মুক্তির দিশারি হিসেবে। প্রগতিশীল এই নেতার বাস্তবমুখী উন্নয়নই অগ্রাধিকার, জাতীয় স্বার্থ, স্বনির্ভরতা ও সাম্রাজ্যবাদীর বিরুদ্ধে অবস্থান তাকে কারিশম্যাটিক নেতৃত্বে পরিণত করেছে। নিজ দেশের বাইরে আফ্রিকার অন্যান্য দেশেও সমানভাবে জনপ্রিয় তিনি। 

ইব্রাহিম ত্রাওরে প্রথম আলোচনায় আসেন ২০২৩ সালে। ওই সময় রাশিয়া-আফ্রিকা শীর্ষ সম্মেলনে আফ্রিকার নেতাদের ‘সাম্রাজ্যবাদীদের কথায় নাচা পুতুলের মতো আচরণ বন্ধ করার’ বার্তা দিয়ে আফ্রিকার বাকি দেশগুলির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন বুরকিনা ফাসোর তরুণ নেতা।

সম্প্রতি বুরকিনা ফাসোয় ২০০টি মসজিদ তৈরি করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল সৌদি আরব। কিন্তু সৌদির দেওয়া সেই প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছেন ইব্রাহিম। মসজিদের পরিবর্তে দেশটিতে স্কুল-হাসপাতাল তৈরি এবং কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে এমন ব্যবসায় বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন।

ইব্রাহিম যুক্তি দিয়েছেন, বুরকিনা ফাসোয় ইতিমধ্যেই পর্যাপ্ত সংখ্যক মসজিদ রয়েছে, এর মধ্যে অনেকগুলি এখনও অব্যবহৃত। তিনি এমন সব প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন, যার ফলে সরাসরি উপকৃত হবেন বুরকিনাবাসীরা। তাঁর এই সিদ্ধান্তের পর সে দেশের জনগণের মধ্যে ইব্রাহিমকে নিয়ে চর্চা আরও জোরদার হয়েছে।

মসজিদের বদলে স্কুল-হাসপাতাল! ‘সাম্রাজ্যবাদীদের কথায় নাচা পুতুল’দের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া ইব্রাহিম হয়ে উঠেছেনে আফ্রিকার নতুন রক্ষাকর্তা হিসেবে। নিজের দেশ বুরকিনা ফাসো তো বটেই, আফ্রিকার অন্যান্য দেশেও ঈর্ষনীয় ভাবে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে ‘ক্যারিশম্যাটিক’ নেতা ইব্রাহিমের। এমনকি, তাঁর দিকে নজর রাখছে আমেরিকা, রাশিয়া, ফ্রান্সের মত দেশেরও।

১৯৮৮ সালে জন্ম নেওয়া ইব্রাহিম ত্রাওরের গায়ের রং চাপা। পেটানো চেহারা। উচ্চতা ছ’ফুটেরও একটু বেশি। পরনে সব সময় থাকে কমলা রঙের জংলাছাপ পোশাক। মাথায় টকটকে লাল রঙের টুপি। বয়স মাত্র ৩৭। এই বয়সেই আফ্রিকা কাঁপাচ্ছেন বুরকিনা ফাসোর সামরিক শাসক ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরে।

কয়েক দশক ধরে বুরকিনা ফাসো ছিল ফ্রান্সের উপনিবেশ। ১৯৬০ সালে ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হলেও প্রকৃত স্বাধীনতা অধরাই থেকে যায় সে দেশের বাসিন্দাদের জন্য।

আনুষ্ঠানিক ভাবে ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্ত হলেও ফ্রান্সের প্রভাব তার পরেও কমেনি সে দেশে। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট পল-হেনরি সান্দাওগো দামিবা পরিচিত ছিলেন ‘অনুগত’ নেতা হিসাবে। দেশের মানুষ চরম দারিদ্র এবং সঙ্কটের মুখে থাকলেও নাকি ফ্রান্সবিরোধী কোনও পদক্ষেপ করেননি তিনি।

এমনকি, বুরকিনা ফাসো পশ্চিম আফ্রিকার ‘সিএফএ ফ্রাঁ’ ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিল, যা ফরাসি কোষাগার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত মুদ্রা ছিল। ফরাসি ব্যাঙ্কগুলিতে বুরকিনা ফাসোর বিদেশি মুদ্রাভান্ডারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ থাকায় দেশের আর্থিক সম্পদ ফ্রান্সে পাচার করা হচ্ছিল বলে অভিযোগও উঠেছিল।

বুরকিনা ফাসোর ইউরেনিয়াম এবং সোনার খনিগুলির দখলও বহু দিন ছিল বিদেশি সংস্থাগুলির হাতে। খনন থেকে রফতানি— সবই নিজেদের হাতে রেখেছিল সংস্থাগুলি। ফলে সে দেশের মানুষের কোনও লাভ হয়নি। দীর্ঘ দিন ধরে পরিকাঠামো থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছিলেন বুরকিনা ফাসোর সাধারণ মানুষ। অভিযোগ উঠেছিল, বুরকিনা ফাসোর মানুষের জীবনযাপন উন্নত করার ক্ষেত্রে খুব কম আগ্রহ ছিল দামিবার। বরং তাঁর আগ্রহ বেশি ছিল ফরাসি স্বার্থকে জিইয়ে রেখে নিজের পকেট ভরানোয়।

এর পরেই একসময়ের নিরুপদ্রব বুরকিনা ফাসো অশান্ত হয়ে উঠতে শুরু করে। ২০১৫ সাল থেকে পরবর্তী কয়েক বছরে অসংখ্য সংঘর্ষে বহু প্রাণহানি ঘটে। অন্তত সাড়ে পাঁচ লক্ষ মানুষকে অন্যত্র সরিয়ে নেয় রাষ্ট্রপুঞ্জের শান্তিবাহিনী। এর পর সে দেশে সেনা অভ্যুত্থান হয়।

বুরকিনা ফাসোর অন্ধকার অধ্যায়ে আশার আলো জাগান সেনাকর্তা ইব্রাহিম। একজন তরুণ এবং প্রগতিশীল নেতা হিসাবে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয় তাঁর। ২০২২ সাল থেকে বুরকিনা ফাসোর অন্তর্বর্তিকালীন প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন ইব্রাহিম। ৩৭ বছর বয়সি ইব্রাহিম বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ রাষ্ট্রপ্রধান।

দেশের পাশাপাশি আফ্রিকার অন্যান্য জায়গাতেও সমান সমাদৃত তরুণ নেতা ইব্রাহিম। কিন্তু কেন এত জনপ্রিয়তা বুরকিন ফাসোর এই সেনাকর্তার? দেশকে পশ্চিমি সাম্রাজ্যবাদ এবং নব্য-উপনিবেশবাদের কবল থেকে মুক্ত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ইব্রাহিম। তাঁর বার্তা আফ্রিকা এবং তার বাইরেও নাকি প্রতিধ্বনিত হয়েছে। ইব্রাহিমের অনুরাগীরা তাঁকে বুরকিনা ফাসো তথা আফ্রিকার অন্যতম বিপ্লবী নেতা টমাস সাঙ্কারার যোগ্য উত্তরসূরি হিসাবেও দেখছেন।

ইব্রাহিমের প্রভাব রয়েছে বুরকিনা ফাসোর বাইরেও। এমনকি কেনিয়ার মতো দেশের রাজনীতিবিদদের মুখেও বার বার উঠে এসেছে তাঁর কথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত বিজয়ের ৮০তম বার্ষিকী উপলক্ষে রাশিয়ায় সম্প্রতি একটি স্মরণসভায় যোগও দিয়েছিলেন ইব্রাহিম।

২০২৩ সালে রাশিয়া-আফ্রিকা শীর্ষ সম্মেলনে আফ্রিকার নেতাদের ‘সাম্রাজ্যবাদীদের কথায় নাচা পুতুলের মতো আচরণ বন্ধ করার’ বার্তা দিয়েছিলেন ইব্রাহিম। সেই বার্তার মাধ্যমে আফ্রিকার বাকি দেশগুলির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন বুরকিনা ফাসোর তরুণ নেতা। রাশিয়ার সংবাদমাধ্যম ইব্রাহিমের সেই ভাষণ ব্যাপক ভাবে প্রচার করেছিল। এর পরেই হইচই পড়ে যায়। আফ্রিকার মানুষদের কাছে ইব্রাহিমের ভাবমূর্তিকে আরও দৃঢ় করে তুলেছিল তাঁর সেই ভাষণ।

২০২২ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্সকে ছেড়ে রাশিয়ার সঙ্গে একটি শক্তিশালী জোট করেন ইব্রাহিম। রুশ আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করার পরিবর্তে দেশে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন খনি সংস্থা তৈরিতে রাশিয়ার সাহায্য চান। এমনকি রুশ খনি সংস্থাকে অনুরোধ করেন দেশের মানুষকে কাজ শেখানোর বন্দোবস্ত করে দিতে

বুরকিনা ফাসোর খনিজ সম্পদ থেকে লাভবান হওয়া নিশ্চিত করার জন্য ইব্রাহিম ইতিমধ্যেই একটি স্বর্ণ শোধনাগার তৈরি করিয়েছেন সে দেশে। বুরকিনা ফাসোর ইতিহাসে প্রথম বারের মতো জাতীয় স্বর্ণভান্ডার তৈরি করেছেন তিনি। ইব্রাহিমের সরকার লন্ডনের একটি সংস্থার মালিকানাধীন দু’টি স্বর্ণখনিও নিজেদের দখলে নিয়েছে। আরও বিদেশি মালিকানাধীন খনি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে দেশটি। ফলে নিঃসন্দেহে ইব্রাহিমকেই এখন আফ্রিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা হিসাবে দেখছেন দেশের মানুষ। বুরকিনা ফাসোর জনগণের কাছে পরিত্রাতায় পরিণত হয়েছেন তিনি। সমাজমাধ্যমেও তাঁর সেই জনপ্রিয়তা ফুটে উঠেছে।

বুরকিনা ফাসোর জনগণের একাংশের মতে, ইব্রাহিম ক্ষমতায় আসার পর উন্নত হচ্ছে দেশটি। শিক্ষা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, রাস্তাঘাট এবং অন্যান্য পরিকাঠামো মজবুত করার দিকে নজর দিয়েছেন তিনি। ইব্রাহিম সমর্থকদের দাবি, ইতিমধ্যেই বুরকিনা ফাসোর বাসিন্দাদের জন্য ১,০০০টি আবাসন তৈরির একটি প্রকল্পে হাত দিয়েছেন তিনি। ২০৩০ সালের মধ্যে সে দেশের মানুষদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন প্রদানের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।

অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতার জন্যও প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ইব্রাহিম। আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডারের আর্থিক সহায়তা প্রত্যাখ্যান করে দেশীয় সম্পদের মাধ্যমে স্বনির্ভর হওয়ার কথা বলেছেন তিনি। অর্থনৈতিক বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসাবে কৃষি, স্থানীয় শিল্প এবং উন্নয়নকেই নাকি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন বুরকিনা ফাসোর তরুণ নেতা।

সম্প্রতি বুরকিনা ফাসোয় ২০০টি মসজিদ তৈরি করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল সৌদি আরব। কিন্তু সৌদির দেওয়া সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন ইব্রাহিম। মসজিদের পরিবর্তে দেশটিতে স্কুল-হাসপাতাল তৈরি এবং কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে এমন ব্যবসায় বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন।

ইব্রাহিম যুক্তি দিয়েছেন, বুরকিনা ফাসোয় ইতিমধ্যেই পর্যাপ্ত সংখ্যক মসজিদ রয়েছে, এর মধ্যে অনেকগুলি এখনও অব্যবহৃত। তিনি এমন সব প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন, যার ফলে সরাসরি উপকৃত হবেন বুরকিনাবাসীরা। তাঁর এই সিদ্ধান্তের পর সে দেশের জনগণের মধ্যে ইব্রাহিমকে নিয়ে চর্চা আরও জোরদার হয়েছে।

ইব্রাহিমের জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও পশ্চিমি শক্তিগুলি অবশ্য তাঁর নেতৃত্বের ধরন ‘কর্তৃত্ববাদী’ এবং ‘বিতর্কিত’ বলে তকমা দিয়েছে। পাশাপাশি, ১০ বছরের ইসলামপন্থী বিদ্রোহ দমন করার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতেও ব্যর্থ হওয়ার কালি লেগেছে ইব্রাহিমের উর্দিতে।

সংবাদমাধ্যম এবং তাঁর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণকারীদেরও দমন করার অভিযোগ উঠেছে ইব্রাহিমের সরকারের বিরুদ্ধে। অভিযোগ উঠেছে, সমালোচকদের যুদ্ধে পাঠিয়ে শাস্তি দিচ্ছেন বুরকিনা ফাসোর শাসক। অনেকে এ-ও দাবি তুলেছেন, দেশের স্বার্থের চেয়ে তাঁর এবং সেনার স্বার্থ সুরক্ষার জন্যই বুরকিনা ফাসোর সোনা ব্যবহার করছেন ইব্রাহিম।

দুপুরে মধ্যে ৪ জেলায় ৬০ কিমি বেগে ঝড়-বৃষ্টির আভাস
  • ১৫ মার্চ ২০২৬
ট্রেনে ঈদ যাত্রা : আজ বিক্রি হচ্ছে ২৫ মার্চের ফিরতি টিকিট
  • ১৫ মার্চ ২০২৬
শাহ পরীর দ্বীপের স্বপ্নের সড়ক এখন মৃত্যুকূপ
  • ১৫ মার্চ ২০২৬
ডেকে নিয়ে কিশোরকে ছুরিকাঘাত, হাসপাতালে মৃত্যু
  • ১৫ মার্চ ২০২৬
ফের ফেনীতে মধ্যরাতে মিলল অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ
  • ১৫ মার্চ ২০২৬
ইবির আবাসিক হল বন্ধ হচ্ছে আজ
  • ১৫ মার্চ ২০২৬
×
ADMISSION
GOING ON
SPRING 2026
APPLY ONLINE
UP TO 100% SCHOLARSHIP
UNIVERSITY OF ASIA PACIFIC 🌐 www.uap.ac.bd
Last Date of Application:
22 April, 2026
📞
01789050383
01714088321
01768544208
01731681081