বড় ভূমিকম্প হলে তাসের ঘরের মতো ভাঙবে দিল্লি-কলকাতা

২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০১:২০ PM , আপডেট: ২৫ আগস্ট ২০২৫, ০৫:১০ PM
বড় ভূমিকম্প হলে তাসের ঘরের মতো ভাঙবে দিল্লি-কলকাতা

বড় ভূমিকম্প হলে তাসের ঘরের মতো ভাঙবে দিল্লি-কলকাতা © সংগৃহীত

ভারতের ৫৯ শতাংশ এলাকাই ভূমিকম্প-প্রধান জোনের মধ্যে। কিন্তু সেখানে ভূমিকম্প সহ্য করতে পারে এমন বাড়ি খুব কম। তুরস্ক ও সিরিয়ার মতো অত শক্তিশালী ভূমিকম্পেরও দরকার নেই। রিখটার স্কেলে সাড়ে ছয় পরিমাপের ভূমিকম্প হলেই কলকাতার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধসে যাবে। সব বড় বড় বাড়িগুলি নিচের নরম মাটির ভিতরে তলিয়ে যাবে।

এটা আমার কথা নয়। ২০১১ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের টাকায় চার বছর ধরে সমীক্ষা চালাবার পর এই সিদ্ধান্তে এসেছিল আইআইটি খড়্গপুরের সমীক্ষক দল। সেই রিপোর্ট বলছে, বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে সল্ট লেক, রাজারহাট-নিউটাউন, কসবা, পার্ক স্ট্রিট, ডালহৌসি স্কোয়ার বা বিবাদী বাগ, বড়বাজার, বাগুইআটি এলাকা-সহ কলকাতার বিশাল অঞ্চল মাটির মধ্য়ে বসে যাবে।

সেই ২০১৫ সালে খড়্গপুর আইআইটির অধ্যাপক হিন্দুস্তান টাইমসে বিষয়টি বুঝিয়ে বলেছিলেন, ভূমিকম্প হলে কলকাতার নিচের নরম মাটির সঙ্গে জল মিশবে। তার ফলে বাড়িঘর নিচে ধসে যাবে।

পুরীর সমুদ্রে স্নান করতে গেলে পায়ের নিচ থেকে যেমন বালি সরে যায়, ঠিক তেমনই অবস্থা হবে। কলকাতার পায়ের নিচ থেকে নরম মাটি সরে যাবে এবং কলকাতা বসে যাবে নিচে। ৪৩৫ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে ৩৫০টি জায়গায় বোরওয়েল তৈরি করে, নানাভাবে পরীক্ষা করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল গবেষক দল।

তারপর আট বছর কেটে গেছে। এই ভয়াবহ ছবি সামনে আসার পরেও কি কোনো পরিবর্তন হয়েছে?  একের পর এক বহুতল বাড়ি তৈরি হচ্ছে, সল্টলেক ও রাজারহাট সহ বিপজ্জনক এলাকায় একের পর এক নির্মাণ হচ্ছে, সেখানে কি ভূমিকম্প-রোধক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে? মনে হয় না।

আরেকটি সমীক্ষার কথায় আসি। যে সমীক্ষা বলছে, কলকাতায় মাত্র সাত শতাংশ বাড়িতে ভূমিকম্প নিরোধক ব্যবস্থা ঠিকভাবে আছে। বড় ভূমিকম্প হলে ৩৪ শতাংশ বাড়ির মাঝারিমাপের ক্ষতি হবে, ২৬ শতাংশ বাড়ি ধসে যেতে পারে, ১৮ শতাংশ বাড়ির প্রভূত ক্ষতি হবে, ১৫ শতাংশ বাড়ির সামান্য ক্ষতি হবে। (ডব্লিউবিডিএমডি ডট গভডট ইন)।

কিন্তু তারপরেও সরকার বা সাধারণ মানুষের কোনো হেলদোল হয় না। তুরস্ক-সিরিয়ার ভূমিকম্পের খবর পড়ে তাদের আতঙ্ক হয়। তবে তা খুবই ক্ষণস্থায়ী। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, কলকাতার ৯০ শতাংশ মানুষ মনেই করেন না, কলকাতা ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার মধ্যে আছে। তারা নিজেদের ভূমিকম্পের হাত থেকে নিরাপদ মনে করে বসে আছেন।

আরও পড়ুন: দেশে সাত মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকায় তিন লাখ প্রাণহানির শঙ্কা

অথচ, কেন্দ্রীয় সরকার যে ভূমিকম্প জোন চিহ্নিত করেছে, তাতে কলকাতার কিছু এলাকা নিরাপদ দেখানো আছে। কিন্তু অনেক এলাকা পাঁচ নম্বর বা ভূমিকম্পের সর্বোচ্চ জোনে আছে, অনেক এলাকা চার নম্বর জোনে আছে। এইটুকু সচেতনতা যেখানে নেই, সেখানকার মানুষদের সম্পর্কে একটা কথাই বলতে হয়, আগ্নেয়গিরির শিখরে বসে পিকনিক করা ভালো, কিন্তু যেদিন অগ্নুৎপাত হবে, সেদিন পুরোটা ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই দয়া করে নীরোর মতো বেহালা না বাজিয়ে আগে থেকে সতর্ক হয়ে প্রয়োজনীয় বিধি মেনে বাড়ি করলে শহরটা বাঁচতে পারে। নাহলে কলকাতার অবস্থা সিরিয়া-তুরস্কের মতো হলে বলার কিছু নেই।

রাজধানী দিল্লির হাল
কলকাতার মতো অসচেতনতার লড়াইয়ে দিল্লিও পিছিয়ে নেই। ফারাক একটাই, দিল্লির মানুষ জানেন, তারা ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় মধ্য়ে আছেন। বিশেষ করে দিল্লির প্রতিবেশী শহর গুড়গাঁও, নয়ডার মতো শহরগুলি তো হাই রিস্ক এলাকায় আছে। তারপরেও প্রশাসন বা মানুষ কারোর কোনো চিন্তা নেই, হেলদোল নেই।

ডিস্ট্রিক্ট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি জানাচ্ছে, দিল্লি আছে ভূমিকম্পের চার নম্বর বা হাই রিস্ক জোনে। যে জোনে বড়সড় ভূমিকম্প হতে পারে। গত একবছরের মধ্যে দিল্লি অনেকবার কেঁপেছে। তবে কোনওটাই বড় ভূমিকম্প ছিল না। তাই শহরের ক্ষতি হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দিল্লিতে বড় ভূমিকম্প তো হতেই পারে, তার উপর হিমালয়ে ভূমিকম্প হলে, দিল্লিতে তার ব্য়াপক প্রভাব পড়তে পারে।

এরকম ভূমিকম্প হলে কি হবে? দিল্লির বাড়িগুলি কি ওই ভূমিকম্প সহ্য করে খাড়া থাকতে পারবে? এককথায় জবাব হলো, না, পারবে না। ২০১৯ সালে ইন্ডিয়া টুডে-রিপোর্ট বলছে, দিল্লির ৯০ শতাংশ বাড়িই প্রবল ভূমিকম্প সহ্য করতে পারবে না। সমানে বাড়ি তৈরি হচ্ছে, কিন্তু ভূমিকম্পের জন্য কোনো ব্যবস্থাই সেখানে নেয়া হয় না।

দিল্লিতে বিল্ডাররা মাস পাঁচেক বা খুব বেশি হলে ছয় মাসের মধ্যে একটি বাড়ি ভেঙে পাঁচতলা বাড়ি তৈরি করেন। তারা পুরসভাকে জরিমানা দিয়ে পুরো জমির উপর বাড়ি করেন। এক সেন্টিমিটার জায়গাও ছাড়েন না।  আর তারা এতটা দ্রুত বাড়ি তৈরির কাজ শেষ করেন যে, তাতে ভূমিকম্প রোধ করা দূরে থাক, কোনো কিছু রোধের ব্যবস্থাই থাকে না।

আর নিয়ম থাকলেই বা কী হবে। এই উপমহাদেশে তো নিয়ম ভাঙাটাই হলো নিয়ম। পুরনো দিল্লির অনেক বাড়ির আয়ু কার্যত শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু অত্যন্ত ঘিঞ্জি পুরনো দিল্লিতে সেই পুরনো বাড়িগুলো দিব্য়ি আছে। ভূমিকম্প হলে তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।

দিল্লির নতুন উপনগরী দ্বারকার সমস্যা অন্য। এখানে জলের মান খুব খারাপ। সেই জল দিয়ে বানানো বাড়ির আয়ু স্বাভাবিক বাড়ির অর্ধেক। দ্বারকাতে একের পর এক আবাসন রয়েছে। প্রচুর মানুষ বাস করছেন। সমস্য়া একটাই। তাদের বাড়ির আয়ু দ্রুত কমছে। একবার বড় ভূমিকম্পের মুখে পড়লে সেগুলির অবস্থা কী হবে কেউ জানে না।

তাহলে কী করা দরকার?
সিরিয়া-তুরস্কে ভূমিকম্পের পর একাধিক বিশেষজ্ঞ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাদের রায় দিয়েছেন। তারা যা বলেছেন, তার মোদ্দা কথা হলো, প্রথমে সমস্য়াটা বুঝতে হবে। ভূমিকম্প কতটা ক্ষতি করতে পারে তা নির্ধারণ করতে হবে, তারপর সরকারকে একটা নীতি নিতে হবে। সেই নীতি সরকারি ও বেসরকারি নির্মাণের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে চালু করতে হবে।

ভূমিকম্প এখন হচ্ছে না, ঠিক আছে। কিন্তু সিরিয়া-তুরস্কের মতো একবার হলে তখন পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। আরো অনেক বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে। কোটি কোটি মানুষের জীবনসংশয় হবে।

সরকারি তথ্য বলছে, ভারতের ৫৯ শতাংশ এলাকা ভূমিকম্প-প্রধান এলাকার মধ্যে আছে। ফলে সাধু সাবধান। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রতিটি দেশে পড়ছে। এতদিন প্রকৃতির উপর অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছে মানুষ। এবার প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নিতে চলেছে। 

তাই ভয়ংকর বন্যা হচ্ছে, দাবানলের গ্রাসে চলে যাচ্ছে বনভূমি, ভূমিকম্পের ভয়াল রূপ আমরা দেখছি। পাহাড়ে ধস নামছে অহরহ। এগুলো স্বাভাবিক ঘটনা, কিন্তু অস্বাভাবিক রূপ নিচ্ছে। এখনো যদি সচেতনতা না আসে, তাহলে যে কোনো দিন গুঁড়িয়ে যাবে, ধসে যাবে আমাদের এই সাধের দিল্লি, কলকাতা-সহ ভারতের বহু শহর। [সূত্র: ডয়চে ভেলে বাংলা]

ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্থগিত করল ইতালি
  • ১৪ এপ্রিল ২০২৬
মাদক ও মানবপাচার নির্মূলে দেশব্যাপী বিশেষ অভিযানের ঘোষণা স্…
  • ১৪ এপ্রিল ২০২৬
হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ২৪ ঘণ্টায় নয়জনের মৃত্যু
  • ১৪ এপ্রিল ২০২৬
বেসরকারি স্কুলে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ কেন দিচ্ছে সরকার?
  • ১৪ এপ্রিল ২০২৬
এক্সিকিউটিভ নিয়োগ দিবে হোন্ডা, আবেদন শেষ ২৪ এপ্রিল
  • ১৪ এপ্রিল ২০২৬
করোনার ভ্যাকসিনের কারণে ওয়ার্নের মৃত্যু—দাবি ছেলের
  • ১৪ এপ্রিল ২০২৬