ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান © সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া দ্বিপাক্ষিক চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতের ওপর আরোপিত সমস্ত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। একই সঙ্গে কাতারের সেন্ট্রাল ব্যাংকে জব্দ বা আটকে থাকা ইরানের মোট ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের মধ্যে প্রথম ধাপে ৬০০ কোটি (৬ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার তেহরানকে ফেরত দেওয়া হচ্ছে বলেও নিশ্চিত করেছেন তিনি।
আজ সোমবার (২৯ জুন, ২০২৬) ইরানের পবিত্র কোম শহর সফরকালে ধর্মীয় নেতা গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ শোবেইরি জানজানির সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের সাক্ষাৎ শেষে পেজেশকিয়ান এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। ইরানের আধাসরকারি বার্তা সংস্থা ‘মেহের নিউজ’ এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া সাম্প্রতিক এই সমঝোতাকে ইরানের অবরুদ্ধ জনগণের জন্য একটি ‘বড় ভূরাজনৈতিক বিজয়’ আখ্যা দিয়ে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, “কাতারে ইরানের মোট ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার আটকে রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ৬০০ কোটি ডলার দ্রুতই ছাড় করা হচ্ছে এবং বাকি অর্থ ফেরত আনার আইনি প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।” তিনি স্পষ্ট করেন যে, এই অর্থ ছাড় ও জ্বালানি খাতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনা এবং পরবর্তীতে ইসলামাবাদে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারকেরই একটি মূল অংশ।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও যুদ্ধের সময় ইরানের জনগণের দৃঢ় অবস্থান এবং সর্বোচ্চ ত্যাগের ভূয়সী প্রশংসা করেন প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের সময় দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতা, মন্ত্রী, সামরিক কমান্ডার, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এমনকি স্কুলশিক্ষার্থীদের নির্মমভাবে হত্যার পরও সাধারণ জনগণ, সশস্ত্র বাহিনী ও সরকার অভূতপূর্ব ঐক্য বজায় রেখে দেশকে রক্ষা করেছে।’
তিনি দাবি করেন, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব তাদের সর্বশক্তি দিয়ে ইরানকে অভ্যন্তরীণভাবে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছিল এবং নজিরবিহীন অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে দেশটিকে সম্পূর্ণরূপে ভেঙে ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু জনগণের ইস্পাতকঠিন প্রতিরোধ এবং ঈশ্বরের সহায়তায় শত্রুদের সেই পরিকল্পনা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের জবাবে মাসুদ পেজেশকিয়ান আবারও দৃঢ়তার সঙ্গে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, ইরান কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না। তিনি বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পূর্ণ আশ্বস্ত করছি যে, আমাদের পারমাণবিক কার্যক্রম কেবলই দেশের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন এবং শান্তিপূর্ণ বেসামরিক নীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।’
ইরানি প্রেসিডেন্ট আরও দাবি করেন, যুদ্ধের মাঠের বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রই তাদের প্রধান মিত্র ইসরায়েলকে এই যুদ্ধবিরতি ও শান্তি চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য করেছে। তবে ইসরায়েলের বর্তমান প্রশাসন এবং কিছু কট্টরপন্থী বিরোধী গোষ্ঠী এখনো পর্দার আড়াল থেকে এই চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের বিরোধিতা ও ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে দেশে ইতিমধ্যে ব্যাপক পুনর্গঠন কার্যক্রম ও অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু হয়েছে জানিয়ে পেজেশকিয়ান বলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবে এবং বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জনগণের জন্য খাদ্য ভর্তুকির পাশাপাশি বিশেষ ঋণসুবিধা বাড়ানোর মতো একাধিক কল্যাণমুখী ও সহায়তামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে সরকার।