বিসিএস স্বপ্নের পেছনে নৈতিকতা নেই, আছে অর্থবিত্ত আর ক্ষমতা

২৪ মার্চ ২০২১, ০৯:৫৩ AM
অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন

অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন © ফাইল ফটো

কিছুদিন আগে পত্রিকায় একটা রিপোর্ট এবং তার একটা ছবি দেখলাম। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান লাইব্রেরির বারান্দায় ছাত্র-ছাত্রীরা অতিরিক্ত টেবিল বিছিয়ে পড়াশুনা করছে। ছবিটির পার্সপেক্টিভ না জানা থাকলে যে কেউ দেখে ভাববে, আহারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা পড়াশুনার জন্য এত পাগল! লাইব্রেরির ভেতরে পড়ার স্থান পায়নি বলে ফিরে আসেনি।

পড়ার জন্য আমাদের ছাত্ররা কত কষ্ট করে। তবে পুরো গল্পটা বুঝতে হলে একটু সার্জারি করলেই বোঝা যাবে যে তারা আসলে জ্ঞানের খোঁজে নয়, তারা যায় চাকরির খোঁজে। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে থাকে টেক্সট বই, সহায়ক বই, জার্নাল, ম্যাগাজিন ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা লাইব্রেরিতে যায় চলতি ক্লাসের রেফারেন্সড বই এবং সহায়ক বই উঠাতে এবং/বা পড়তে। কেউ কেউ দেশ বিদেশের সাপ্তাহিক কিংবা মাসিক বা সাময়িকী এবং দৈনিক পত্রিকা পড়তেও যেতে পারে।

গবেষকরা বিভিন্ন জার্নাল খুঁজতে এবং আর্টিকেল পড়তে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের লাইব্রেরি এখন হয়ে উঠছে ব্যতিক্রম। একটু খোঁজ নিলেই জানা যাবে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা লাইব্রেরিতে এখন মূলত যায় বিসিএস বা অন্যান্য চাকরির জন্য পড়তে। কেউ কেউ ভাবতে পারেন, তারা তো লাইব্রেরিতেই যাচ্ছে, সেখানে তো বইই পড়ছে, পড়ুক না। ক্ষতি কি? প্রশ্নটা আপাত নিরীহ মনে হলেও এর সুদূর প্রসারী ক্ষতি অপূরণীয়। এইটা নিয়ে আলাপে একটু পরে আসছি।

শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন পাবলিক লাইব্রেরিতেও একই ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয় যখন খোলা ছিল তখন প্রতিদিন আমার কন্যাদ্বয়কে তাদের স্কুলে নামিয়ে দিয়ে সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যে কার্জন হলে যেতাম। যাওয়ার পথে প্রায়ই পাবলিক লাইব্রেরির গেটে বিশাল লম্বা লাইন দেখতাম। প্রথমে বুঝতে না পারলেও পরে জানতে পারি, এরাও বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি নিতেই ওখানে যায়।

কারা এবং কেমন ছাত্ররা এই লাইনে তা জানার জন্য দু’য়েকবার গাড়ি থেকে নেমে ওদের পাশ দিয়ে হেঁটেছি। অধিকাংশের হাতে দেখেছি, চিকন একটি চটি বইয়ের মত বই আরেকটি খাতা মুড়িয়ে একটা পাইপের মত বানিয়ে লাইনে দাঁড়ানো। এদের চাহনীতে বুদ্ধিদীপ্তের তেমন কোন ছাপ নেই। ড্রেস এবং শারীরিক ভাষাতেও না। দেখে মনে হয়, আশাহত নিস্তেজ কিছু মানুষ।

ছাত্র-ছাত্রীরা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই তারা স্বপ্ন দেখে, বিসিএস চাকরির। আবার সেটা বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার না। বিসিএস প্রশাসন বা পুলিশ কিংবা বিসিএস ট্যাক্স। একটা উদাহরণ দেই। বলুনতো ‘engineering university’ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং করা কারো স্বপ্নের চাকরি কি? নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, পিডিবিতে চাকরি পাওয়া- হতে পারে অনেকগুলো অপশনের মধ্যে একটি। এটা সরকারি। একজন ইঞ্জিনিয়ারের কাছে শুনলাম পিডিবিতে ছয় বছর চাকরি করছে, যার বেসিক স্যালারি চাকরির মেয়াদের কারণে ইতিমধ্যেই বেড়ে গেছে, অথচ সে নাকি এবার বিসিএস দিচ্ছে। কারণ সে পুলিশ বা এডমিন হতে চায়।

তাকে বলা হয়েছিল, ‘তুমি এখন বিসিএসে ঢুকলে তো তোমার স্যালারি আবার ২২ হাজার টাকা বেসিক হয়ে যাবে!’ সে নাকি তখন হেসে বলেছিল, ‘বিসিএসে স্যালারি লাগে নাকি!’ আমার পরিচিত সেই ইঞ্জিনিয়ার আরো জানায়, উনি নাকি খুবই ধার্মিক। তাহলে সমস্যা দুটো। ধর্ম এবং বিষয়ের পারফেক্ট চাকুরী কোনটিই ঘুষ দুর্নীতি আর ক্ষমতার মোহকে থামাতে পারেনি। এ জন্য সে যতটা দায়ী তার চেয়ে বেশি দায়ী এই সমাজ এবং এই সিস্টেম।

পুরো দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সকল ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে প্রায় একটাই স্বপ্ন। বিসিএস দিয়ে বিসিএস প্রশাসন, পুলিশ বা ট্যাক্স কর্মকর্তা হওয়া। সমস্যা হলো এই স্বপ্নের পেছনে কোন নীতি নৈতিকতার বালাই নেই। এই স্বপ্নের পেছনের ড্রাইভিং ফোর্স হলো, অর্থবিত্ত আর ক্ষমতা। জ্ঞান, দেশসেবা, মানুষের সেবা এইসব কোন কিছুই এর পেছনে কাজ করে না। বছরে মোট কতজন বিসিএস প্রশাসন, পুলিশ বা ট্যাক্স-এ চাকরি পেতে পারে? ৫০০ জন? অথচ এর জন্য কি বিপুল পরিমান প্রাইস জাতিকে ব্যয় করতে হয়।

লাখ লাখ ছাত্র-ছাত্রী আসল পড়া ছেড়ে গাইড আর বিসিএসের প্রস্তুতি নেয়। যে পদার্থবিজ্ঞান পড়ছে, তার মনোযোগটা পদার্থবিজ্ঞান শেখায় থাকে না। সেটা শেখা তার স্বপ্নের অংশ না। একই কথা বলা চলে অন্যান্য প্রায় সকল সাবজেক্টের ক্ষেত্রে। গোটা জাতিকে এক অলীক আসার পেছনে ধাবিত করা হচ্ছে। চাকরিটা যেখানে জ্যাকপট বা লটারিতে রূপান্তরিত, সেখানে গোটা ছাত্র সমাজকে এরকম একদিকে প্রবাহিত করে আমরা একটা পঙ্গু জেনারেশন তৈরি করছি, যা সুস্থ্য স্বাভাবিক সমাজের লক্ষণ না।

এ থেকে মুক্ত না হতে পারলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে একটা সম্পূর্ণ প্যারালাইজড জাতিতে পরিণত হবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

(ফেসবুক থেকে নেওয়া)

অনির্দিষ্টকালের বন্ধ সিলেটে সব পেট্রোল পাম্প
  • ০২ এপ্রিল ২০২৬
সংসদ থেকে ওয়াক-আউট, যা বললেন বিরোধীদলীয় নেতা
  • ০২ এপ্রিল ২০২৬
স্বামীর কাছে যাওয়ার আগের দিন ঝুলন্ত অবস্থায় মিলল গৃহবধূর লাশ
  • ০২ এপ্রিল ২০২৬
ব্যক্তি উদ্যোগে মহাসড়ক থেকে ময়লার স্তুপ অপসারণ
  • ০২ এপ্রিল ২০২৬
জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারি অফিস সূচি পরিবর্তনের বিজ্ঞপ্তিটি ভু…
  • ০২ এপ্রিল ২০২৬
দেশের ৯ জেলায় ৬০ কিমি বেগে ঝড়-বৃষ্টির আভাস
  • ০২ এপ্রিল ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence