মেজর কাজী ইমতিয়াজ কবীর © টিডিসি সম্পাদিত
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের নিরাপত্তা, দুর্যোগ মোকাবিলা, শান্তিরক্ষা মিশন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আস্থার প্রতীক। কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রেও সেনাবাহিনীর অবদান দীর্ঘদিনের, বিস্তৃত এবং সুদূরপ্রসারী। দেশের নানা প্রান্তে সেনাবাহিনী-পরিচালিত স্কুল, কলেজ, ক্যাডেট কলেজ, বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং চিকিৎসা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে সামরিক পরিবারের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক বেসামরিক পরিবারের সন্তানও শিক্ষা নিচ্ছে। তাই আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ধারাবাহিক ও বহুমাত্রিক অবদান নতুনভাবে তুলে ধরা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান ভিত্তি। ভালো শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলের নিশ্চয়তা দেয় না; এটি একজন মানুষকে দায়িত্বশীল, আত্মবিশ্বাসী, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং কর্মক্ষম করে তোলে। সেনাবাহিনী-পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচিত শক্তি এখানেই। একাডেমিক শিক্ষার সঙ্গে সেখানে সময়ানুবর্তিতা, দায়িত্ববোধ, নেতৃত্ব, দলগত কাজ, নৈতিকতা এবং দেশপ্রেমের চর্চা হয়। শ্রেণিকক্ষের পাঠ, খেলাধুলা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, বিজ্ঞানচর্চা এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতা মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের পরিবেশ তৈরি করা হয়। ফলে তারা শুধু একটি পরীক্ষার জন্য নয়, ভবিষ্যৎ জীবন ও কর্মক্ষেত্রের জন্যও প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ পায়।
২০২৬ সাল সেনাবাহিনী-পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষভাবে স্মরণীয়। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ ২০২৬-এ আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্কুল বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে। জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ একই বিভাগে জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের অধ্যক্ষ শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধানের স্বীকৃতি পেয়েছেন। একই আয়োজনে ১০৯টি বিষয়ে মোট ২৬১টি পুরস্কারের মধ্যে ৪৫টি অর্জন করেছেন সেনাবাহিনী-পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা। জাতীয় পর্যায়ের এই স্বীকৃতি এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা, ব্যবস্থাপনা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের মানের একটি শক্তিশালী পরিচয় বহন করে।
২০২৬ সালের এসএসসি ফলও সেই ধারাবাহিকতার আরেকটি উজ্জ্বল প্রমাণ। সেনাবাহিনী-পরিচালিত ৩৯টি বাংলা মাধ্যম এবং ২৬টি ইংরেজি মাধ্যম প্রতিষ্ঠান থেকে মোট ১০ হাজার ৬৬ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ৯ হাজার ৯৯২ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬ হাজার ২০৪ জন। গড় পাসের হার ৯৯ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হার ৬২ দশমিক ০৯ শতাংশ। এত বড় সংখ্যক শিক্ষার্থীর মধ্যে এমন ফলাফল নিয়মিত পাঠদান, অভিজ্ঞ শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের পরিশ্রম, অভিভাবকের সহযোগিতা এবং সুসংগঠিত শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সম্মিলিত সাফল্যের কথাই বলে।
ক্যাডেট কলেজগুলোর ফলাফলও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় দেশের ১২টি ক্যাডেট কলেজ থেকে ৬১৮ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে সবাই উত্তীর্ণ হয়েছে। তাদের মধ্যে ৬০৭ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। আরও বিস্ময়কর রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের ধারাবাহিকতা। ২০১০ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টানা ১৭ বছর প্রতিষ্ঠানটির এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রত্যেক শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। এই ১৭ বছরে মোট ৮৩২ জন পরীক্ষার্থী এই কৃতিত্ব অর্জন করেছে। ২০২৬ সালেও ৪৯ জন পরীক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে একই মান ধরে রাখার এমন উদাহরণ দেশের শিক্ষা অঙ্গনে সত্যিই বিরল।
এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে একটি দীর্ঘ প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ও কলেজ, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড স্কুল ও কলেজ এবং ক্যাডেট কলেজ সফলতার সাথে বহু বছর ধরে শিক্ষা দিয়ে আসছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিজস্ব প্রকাশনায় ২০২৫ সালে এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে সামরিক ও বেসামরিক পরিবারের শিক্ষার্থীর অনুপাত প্রায় ৪০ ও ৬০। অর্থাৎ এই শিক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশের সুবিধাভোগী সাধারণ নাগরিক। এ কারণেই সেনাবাহিনী-পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল সেনানিবাসের ভেতরের প্রতিষ্ঠান নয়; এগুলো দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় শক্তি হলো ব্যবস্থাপনা। পরিকল্পনা, দায়িত্ব বণ্টন, সময়ানুবর্তিতা, নিয়মিত তদারকি এবং ফলাফল মূল্যায়নের সংস্কৃতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনাতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। একটি ভালো স্কুল শুধু সুন্দর ভবনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। দরকার দক্ষ শিক্ষক, কার্যকর প্রশাসন, নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ। সেনাবাহিনী-পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো এই বিষয়গুলোকে সমন্বিতভাবে ধরে রাখার চেষ্টা করে। দীর্ঘদিন ধরে অর্জিত অভিভাবকদের আস্থাও এই সুসংগঠিত ব্যবস্থাপনারই ফল।
সহশিক্ষা কার্যক্রমও এই শিক্ষা সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খেলাধুলা, বিতর্ক, কুইজ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিজ্ঞান মেলা, স্কাউটিং, রোবটিক্স এবং সামাজিক সেবামূলক কার্যক্রম একজন শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। শ্রেণিকক্ষের বাইরে সে দলগতভাবে কাজ করতে শেখে, নেতৃত্ব দিতে শেখে, পরাজয় থেকে ঘুরে দাঁড়াতে শেখে এবং নিজের প্রতিভা আবিষ্কারের সুযোগ পায়। একজন ভালো শিক্ষার্থী শুধু ভালো ফল করে না; সে দায়িত্বশীল মানুষ হওয়ার পথও শেখে। ক্যাডেট কলেজগুলোর আবাসিক শিক্ষা, শৃঙ্খলা, খেলাধুলা ও নেতৃত্বচর্চা এই সমন্বিত শিক্ষার একটি পরিচিত উদাহরণ।
অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষায় ‘প্রয়াস’ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মানবিক উদ্যোগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ২০০৫ সালে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য ছোট পরিসরে যে উদ্যোগের শুরু, তা এখন একটি বিস্তৃত বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। অটিজম, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি এখানে বিভিন্ন ধরনের থেরাপি, ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কার্যক্রম রয়েছে। প্রয়াস ইনস্টিটিউট অব স্পেশাল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ বিশেষ শিক্ষা খাতে ভবিষ্যৎ পেশাজীবী তৈরিতেও কাজ করছে।
এই অগ্রযাত্রার একটি বিশেষ মাইলফলক এসেছে ২০২৬ সালে। ‘প্রত্যাশা একীভূত মাধ্যমিক বিদ্যালয়’-এর প্রথম ব্যাচ হিসেবে এ বছর মানবিক বিভাগ থেকে চারজন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। প্রথম ব্যাচেই তারা শতভাগ পাসসহ অত্যন্ত সন্তোষজনক ফলাফল অর্জন করেছে। সংখ্যাটি ছোট হলেও এর তাৎপর্য বড়। কারণ এর মাধ্যমে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের মূলধারার শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা, মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত এগিয়ে নেওয়া এবং জাতীয় পাবলিক পরীক্ষায় সফল করার একটি বাস্তব উদাহরণ তৈরি হয়েছে। শিক্ষা যে সত্যিকার অর্থে সবার জন্য হতে পারে, প্রত্যাশার এই প্রথম ব্যাচ সেই আশারই প্রতীক।
উচ্চশিক্ষার পরিসরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বা এমআইএসটি প্রকৌশল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষা এবং গবেষণায় পরিচিত প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস বা বিইউপি সামরিক ও বেসামরিক শিক্ষার্থীদের জন্য বহুমাত্রিক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ তৈরি করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি এবং বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি প্রকৌশল ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনবল তৈরি করছে।
উচ্চশিক্ষার এই পরিসরে সাম্প্রতিক অর্জনও শিক্ষার মান ও সম্ভাবনাকে দৃশ্যমান করছে। ২০২৬ সালে কানাডায় অনুষ্ঠিত MATE ROV International Underwater Robot Competition-এ এমআইএসটির শিক্ষার্থীদের দল MIST MAVIROV চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমন সাফল্য দেখায়, শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা যখন গবেষণা, নকশা, দলগত কাজ ও বাস্তব প্রকৌশল সমস্যার সমাধানের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরাও বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতা করতে পারে। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু ডিগ্রি দেওয়া নয়; নতুন জ্ঞান তৈরি করা, উদ্ভাবন করা এবং দেশের সমস্যার কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করাও এর অংশ। এমআইএসটি, বিইউপি এবং সেনাবাহিনী-পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ও উদ্ভাবনমুখী পরিবেশ তরুণদের সেই পথেই এগিয়ে নিচ্ছে। বিজ্ঞান, প্রকৌশল, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা অধ্যয়ন, ব্যবসা ও চিকিৎসার মতো নানা ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানগুলো যে দক্ষতা তৈরি করছে, তার সুফল শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতি, শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় যুক্ত হচ্ছে।
এই শিক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি সুন্দর দিক হলো সামরিক ও বেসামরিক পরিবারের সন্তানদের একই পরিসরে বেড়ে ওঠা। একই শ্রেণিকক্ষে তারা পড়ে, একই মাঠে খেলাধুলা করে, একই বিতর্ক বা বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। এতে ছোটবেলা থেকেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা এবং সামাজিক সংযোগ গড়ে ওঠে। নারী শিক্ষার ক্ষেত্রেও সেনাবাহিনী-পরিচালিত স্কুল, কলেজ ও গার্লস ক্যাডেট কলেজগুলো গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীরা একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি নেতৃত্ব, খেলাধুলা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও জনসেবামূলক কাজে অংশ নিচ্ছে। এই সমন্বিত পরিবেশ তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং ভবিষ্যতের নানা পেশায় এগিয়ে যাওয়ার ভিত্তি তৈরি করে। একটি ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় পরিচয় শেষ পর্যন্ত তার প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের কাজের মধ্যে ফুটে ওঠে। সেনাবাহিনী-পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষার্থীরা দেশে ও বিদেশে চিকিৎসা, প্রকৌশল, প্রশাসন, শিক্ষা, গবেষণা, ব্যবসা এবং অন্যান্য পেশায় অবদান রেখে চলেছেন। তাদের সাফল্যও এই দীর্ঘ শিক্ষা-যাত্রারই বহমান প্রতিফলন।
ব্যবসায় শিক্ষা ও ব্যবস্থাপনায় আর্মি ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করছে। সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠান ব্যবসায় শিক্ষা, ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব এবং উদ্যোক্তা দক্ষতার বিকাশে কাজ করছে। বর্তমান কর্মবাজারে শুধু ডিগ্রি নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যোগাযোগ, দল পরিচালনা এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানের দক্ষতাও প্রয়োজন। এই প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আর্মি আইবিএগুলো নতুন প্রজন্মের ব্যবস্থাপক ও পেশাজীবী তৈরিতে অবদান রাখছে।
চিকিৎসা শিক্ষায় সেনাবাহিনীর অবদান বিস্তৃত। আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজের পাশাপাশি আর্মি মেডিকেল কলেজগুলো চিকিৎসক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখছে। একই সঙ্গে আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল ইনস্টিটিউট বা এএফএমআই সামরিক চিকিৎসক, ডেন্টাল কর্মকর্তা, নার্সিং কর্মকর্তা ও প্যারামেডিকদের বিভিন্ন পেশাগত প্রশিক্ষণ দেয় এবং স্নাতকোত্তর, মাস্টার্স ও ডিপ্লোমা পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে। আর্মড ফোর্সেস ইনস্টিটিউট অব প্যাথলজি বা এএফআইপি প্যাথলজি, ল্যাবরেটরি মেডিসিন, রোগনির্ণয়, প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় বিশেষ ভ‚মিকা রাখছে। সামরিক সদস্যদের পাশাপাশি বেসামরিক চিকিৎসক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরাও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও একাডেমিক কার্যক্রমের মাধ্যমে এই জ্ঞানভিত্তিক পরিবেশ থেকে উপকৃত হচ্ছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে এই শিক্ষা পরিসর আরও প্রসারিত হয়েছে। ২৩ আগস্ট ২০২৬ মিলিটারি কলেজিয়েট স্কুল ফরিদপুর এবং সেনা পাবলিক স্কুল ও কলেজ রাজবাড়ীর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে। রাজবাড়ীর কালুখালীর মতো এলাকায় আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন স্থানীয় শিক্ষার্থীদের সামনে নতুন সুযোগ খুলে দিয়েছে। এর আগে ৩ আগস্ট জলসিঁড়িতে আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইনস্টিটিউটের উদ্বোধন করা হয়। একই সঙ্গে বরিশাল, সাভার, বগুড়া, সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও যশোরে আরও সাতটি একই ধরনের প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ভিত্তিপ্রস্তর উন্মোচিত হয়েছে। আধুনিক ক্যামব্রিজ কারিকুলামের সঙ্গে নৈতিক ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার সমন্বয় এই নতুন উদ্যোগকে স্বতন্ত্র মাত্রা দিয়েছে।
দেশের দূরবর্তী ও পার্বত্য এলাকাতেও শিক্ষার প্রসারে সেনাবাহিনী বিভিন্ন সময়ে সহায়তা দিয়ে এসেছে। কোথাও বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, কোথাও বই ও শিক্ষা উপকরণ, কোথাও শিক্ষক সহায়তা বা শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুর্গম এলাকার একটি শিশুর কাছে একটি বিদ্যালয়, একটি বই কিংবা একজন নিবেদিত শিক্ষক অনেক বড় সুযোগ। সেখানে সেনাবাহিনীর সাংগঠনিক সক্ষমতা যখন শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে কাজে লাগে, তখন তার প্রভাব একটি প্রতিষ্ঠানের সীমানা ছাড়িয়ে পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাক্ষরতা এখন শুধু পড়তে ও লিখতে জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমান সময়ে তথ্য বুঝতে পারা, প্রযুক্তি ব্যবহার করা, নতুন দক্ষতা শেখা, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে সমাজে ভ‚মিকা রাখাও শিক্ষার অংশ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, রোবটিক্স, ডেটা সায়েন্স এবং দ্রুত বদলে যাওয়া কর্মজগতের সঙ্গে তাল মেলাতে নতুন প্রজন্মকে বহুমাত্রিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। সেনাবাহিনী-পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শৃঙ্খলার সঙ্গে প্রযুক্তি, গবেষণা, উদ্ভাবন ও নৈতিকতার সমন্বয় সেই প্রস্তুতিকে শক্তিশালী করছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদানকে শুধু স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে দেশসেরা হওয়ার স্বীকৃতি, ২০২৬ সালের এসএসসিতে ৯৯ দশমিক ২৬ শতাংশ পাস, ৬ হাজারের বেশি জিপিএ-৫, রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের টানা ১৭ বছরের শতভাগ জিপিএ-৫, প্রত্যাশার প্রথম ব্যাচের শতভাগ সাফল্য, বিশেষ শিক্ষায় প্রয়াসের অগ্রযাত্রা এবং প্রকৌশল, ব্যবসা ও চিকিৎসা উচ্চশিক্ষার বিস্তার-সবকিছু মিলিয়ে এটি মানুষ গড়ার এক দীর্ঘ ধারাবাহিকতা।
এই ধারাবাহিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তৈরি হওয়া আস্থা। অভিভাবকরা এখানে সন্তানের শিক্ষা, নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও চরিত্র গঠনের একটি সমন্বিত পরিবেশ দেখেন, যা প্রতিষ্ঠানের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাকে আরও দৃঢ় করেছে।
একটি দেশের সীমান্ত তার ভৌগোলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। আর শিক্ষা তার ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। শিক্ষিত, দক্ষ, নৈতিক এবং দায়িত্বশীল নাগরিকই একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ। সেই সম্পদ তৈরিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যে দীর্ঘদিন ধরে অবদান রেখে চলেছে, তা শুধু একটি প্রাতিষ্ঠানিক অর্জন নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি নীরব, ধারাবাহিক এবং গৌরবময় অঙ্গীকার।
লেখক: মেজর কাজী ইমতিয়াজ কবীর, এসজিপি, ইঞ্জিনিয়ার্স
জিএসও-২ (এআরএসটিসি), (র্যাংকিং এন্ড কোলাবোরেশন সেল) ও অতিরিক্ত পরিচালক (কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স) আইকিউএসি-এমআইএসটি