বিশ্ব পরিবেশ স্বাস্থ্য দিবস: বিজ্ঞানকে পাশে নিয়েই নিরাপদ সমাজ ও ভবিষ্যৎ

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫০ PM
ড. মো. শিবলুর রাহমান

ড. মো. শিবলুর রাহমান © টিডিসি সম্পাদিত

আমরা যখন সুস্থ থাকার কথা ভাবি, তখন সাধারণত ডাক্তার, হাসপাতাল বা ওষুধের কথা চিন্তা করি। কিন্তু খুব কম মানুষই ভাবি, আমাদের সুস্থতার শুরু আসলে ঘর এবং ঘরের বাইরে থেকেই। আমরা যে বাতাসে শ্বাস নিই, যে পানি পান করি, যে খাবার খাই এবং যে পরিবেশে বসবাস করি, সেগুলোই আমাদের স্বাস্থ্যের প্রথম ভিত্তি।

একটি গ্রামের কথা ভাবুন। সেখানে নলকূপের পানি যদি আর্সেনিকমুক্ত না হয়, তাহলে মানুষ ধীরে ধীরে বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে। একটি শহরের কথা ভাবুন। সেখানে যদি ধোঁয়া, ধুলাবালি আর বায়ুদূষণ বাড়তে থাকে, তাহলে শিশুদের হাঁপানি, বয়স্কদের হৃদরোগ এবং ফুসফুসজনিত রোগ বেড়ে যায়। আবার কোনো এলাকায় যদি নিয়মিত জলাবদ্ধতা হয়, তাহলে মশার বংশবিস্তার বাড়ে, বাড়ে ডেঙ্গুর ঝুঁকি। অর্থাৎ পরিবেশের সমস্যা শেষ পর্যন্ত মানুষের স্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পৃথিবীতে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ এমন পরিবেশগত কারণে অসুস্থ হয় বা মৃত্যুবরণ করে, যেগুলোর অনেকগুলোই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

আর এই বিষয়গুলোকে সামনে আনতেই প্রতি বছর ২৬ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব পরিবেশ স্বাস্থ্য দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য হলো, “Environmental Health: Standing with Science to Protect Communities” বা “পরিবেশ স্বাস্থ্য: জনগণকে সুরক্ষায় বিজ্ঞানের পাশে দাঁড়ানো”। এই প্রতিপাদ্যের মূল বার্তা খুবই সরল কিন্তু গভীর অর্থবহ। মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন রক্ষার জন্য আমাদের বিজ্ঞানের ওপর আস্থা রাখতে হবে এবং গবেষণা ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

কয়েক দশক আগেও মানুষ ভালোভাবে জানত না যে বাতাসের অদৃশ্য ক্ষুদ্র ধূলিকণা কিভাবে মানুষের এবং ফুসফুসের কত বড় রকমের ক্ষতি করতে পারে। আজ বিজ্ঞান আমাদের বলছে, দূষিত বায়ু শুধু শ্বাসকষ্টই নয়, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি করে। একইভাবে একসময় নিরাপদ পানির গুরুত্ব শুধু ডায়রিয়া প্রতিরোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ মনে করা হতো। এখন গবেষণা দেখিয়েছে, দূষিত পানি অসংখ্য সংক্রামক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের কারণ হতে পারে। গবেষণা দেখিয়েছে, স্বচ্ছ পানি মানেই নিরাপদ পানি নয়, স্বচ্ছ নলকূপের পানিতেও থাকতে পারে আর্সেনিকের মত বিভিন্ন রকমের ক্ষতিকর ভারি ধাতু। অর্থাৎ বিজ্ঞান আমাদের ভয় দেখায় না, বরং বিপদ চিহ্নিত করে নিরাপদ পথ দেখায়।

এই কারণেই এবারের প্রতিপাদ্যে "Standing with Science" কথাটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। যখন কোনো এলাকায় পানিদূষণ বাড়ে, তখন বিজ্ঞানীরা পানি পরীক্ষা করেন। যখন বায়ুদূষণ বাড়ে, তখন পর্যবেক্ষণ যন্ত্র দিয়ে তার মাত্রা নির্ণয় করা হয়। যখন কোনো নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দেয়, তখন গবেষকরা তার কারণ খুঁজে বের করেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই নীতিনির্ধারকরা সিদ্ধান্ত নেন এবং পরিবেশ স্বাস্থ্য পেশাজীবীরা বাস্তবে সেগুলো প্রয়োগ করেন।

আজকের বিশ্বে বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। জলবায়ু পরিবর্তন, ক্রমবর্ধমান নগরায়ন, বায়ুদূষণ, প্লাস্টিক দূষণ এবং খাদ্য নিরাপত্তার মতো চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। এসব সমস্যার সমাধান আবেগ, ধারণা বা গুজবের মাধ্যমে সম্ভব নয়। প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য, গবেষণা এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণ। বিশ্ব পরিবেশ স্বাস্থ্য দিবস শুধু একটি দিবস পালন নয়, বরং নিজেদের জীবন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার একটি সুযোগ। পরিবেশের স্বাস্থ্য সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি হলে মানুষ বুঝতে পারে—বর্জ্য যেখানে-সেখানে ফেলা, খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো, দূষিত পানি ব্যবহার বা বিষাক্ত পদার্থের অসতর্ক ব্যবহার শেষ পর্যন্ত নিজের ঘরেই অসুস্থতা ফিরিয়ে আনে। আবার একই সঙ্গে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদেরও মনে রাখতে হবে, পরিষ্কার বাতাস, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যকর খাদ্য ও দূষণমুক্ত পরিবেশ কোনো বিলাসিতা নয়—এগুলো মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ। পরিবেশকে সুস্থ রাখার অর্থ শুধু নদী, গাছ কিংবা প্রকৃতিকে বাঁচানো নয়; এর অর্থ আমাদের সন্তানদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ, পরিবারের সুস্থতা এবং একটি মানবিক সমাজকে সুরক্ষিত রাখা।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ভ্রান্ত তথ্যও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপ্রমাণিত স্বাস্থ্যপরামর্শ, কখনো পরিবেশ নিয়ে ভুল ধারণা মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে। বিশ্ব পরিবেশ স্বাস্থ্য দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের প্রশ্নে অনুমান নয়, সত্য ও প্রমাণকেই অনুসরণ করতে হবে। তাই, জনসচেতনতা ছাড়া পরিবেশ স্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্ভব নয়। কারণ একজন সচেতন নাগরিকই জানেন কেন বিশুদ্ধ পানি জরুরি, কেন বায়ুদূষণ কমাতে হবে, কেন গুজবের বদলে বৈজ্ঞানিক তথ্যকে বিশ্বাস করতে হবে। তাই বিশ্ব পরিবেশ স্বাস্থ্য দিবস আমাদের শুধু একটি দিনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় না; এটি আমাদের শেখায় যে সুস্থ মানুষ, নিরাপদ সমাজ এবং টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে পরিবেশ স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

এবারের প্রতিপাদ্য শুধু বিজ্ঞানীদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। আমরা প্রত্যেকে যখন পরিবেশ ও স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি, যখন ভুয়া তথ্যের বদলে নির্ভরযোগ্য তথ্যকে গুরুত্ব দিই, তখন আমরাও গবেষণা ও বিজ্ঞানের পাশে দাঁড়াই। একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি দেশ তখনই নিরাপদ হয়, যখন তার নাগরিকরা তথ্য ও প্রমাণভিত্তিক চিন্তাকে মূল্য দেয়।

বিশ্ব পরিবেশ স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬ আমাদের নতুন করে উপলব্ধি করায় যে পরিবেশ স্বাস্থ্য শুধুমাত্র একটি পেশাগত বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই এবারের দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক, বিজ্ঞানকে অবিশ্বাস নয়, সম্মান করব; গুজব নয়, প্রমাণকে অনুসরণ করব; এবং একটি সুস্থ, নিরাপদ ও টেকসই সমাজ গঠনে বিজ্ঞানের পাশে দাঁড়াব। কারণ শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞান যখন মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তখনই মানুষ নিজেকে এবং তার ভবিষ্যৎকে আরও ভালোভাবে রক্ষা করতে পারে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং পরিচালক, ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তর, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: [email protected]

ট্যাগ: মতামত
তিন দিন লড়াই শেষে না ফেরার দেশে রুয়েট শিক্ষার্থী রাফিদ
  • ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পাচার হওয়া সম্পদ শনাক্ত করে দ্রুত ফ্রিজ করা হবে: গভর্নর
  • ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাবিপ্রবির স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সবুজ স্বপ্ন’র প্রথম প্রতিষ্ঠ…
  • ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হত্যা মামলায় সাংবাদিক সৌরভকে আসামি করায় প্রতিবাদ, মামলা প্র…
  • ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এআই ও সাইবার নিরাপত্তায় নাঈমুলের পথচলা, যুক্তরাষ্ট্রে গড়ছেন…
  • ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভিসি ইস্যুতে কাল প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক সেন্ট্রাল ইউনিভার্সি…
  • ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬