সনদ থেকে সক্ষমতায়: কারিগরি শিক্ষার সংস্কার-ভাবনা

ফলাফল, সনদের মান ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে কয়েকটি নীতিগত বিবেচনা

 

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:১১ PM , আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:১২ PM
এনায়েত এইচ জাকারিয়া

এনায়েত এইচ জাকারিয়া © টিডিসি সম্পাদিত

একই দেশে কারিগরি শিক্ষার দুটি দরজা, কিন্তু দুই দরজা পেরিয়েই অনেক তরুণ পৌঁছান একই জায়গায়— বেকারত্বে। প্রথম দরজাটি এসএসসি পাস শিক্ষার্থীদের জন্য— পলিটেকনিকে চার বছরের ডিপ্লোমা, যেখান থেকে বেরিয়ে টেকনিশিয়ান বা মাঝারি স্তরের দক্ষ পেশাজীবী হওয়ার কথা। দ্বিতীয়টি তাদের জন্য, যাদের পড়াশোনা থেমে গেছে এসএসসির আগেই— সংসারের চাপে, দারিদ্র্যে কিংবা মাঝপথে ঝরে পড়ে। কাজ নেই, হাতে সনদ নেই, নির্দিষ্ট কোনো দক্ষতাও নেই — এমন বেকার তরুণদের জন্যই স্বল্পমেয়াদি বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ।

এই দুই দরজাকে শক্তিশালী করতে একের পর এক বড় প্রকল্প এসেছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় STEP প্রকল্প পলিটেকনিকের মানোন্নয়ন ও স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণে কাজ করেছে; সেই ধারাবাহিকতায় এখন চলছে ASSET। পাশাপাশি এডিবির সহায়তায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন SEIP শিল্প খাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে লাখো তরুণকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। অথচ প্রশ্নটা রয়ে গেছে আগের জায়গায়— প্রশিক্ষণ শেষে হাতে যে সনদ আসে, শ্রমবাজার কি সেটিকে দক্ষতা হিসেবে গ্রহণ করে? ডিপ্লোমাধারী অনেকে কাজ খুঁজে ফেরেন, স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ নেওয়া অনেকে ফিরে যান আগের অনিশ্চিত জীবনে।

এই লেখার মূল প্রস্তাব সরল: বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষার সংকট অর্থের নয়, অবকাঠামোরও নয়। এটি জবাবদিহির সংকট। গত দেড় দশকে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে, ভবন উঠেছে, প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু প্রকল্প কী ফল দিল, সনদ কতটা বিশ্বাসযোগ্য, আর নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো নিজেরা কতটা দায়বদ্ধ, এই তিন প্রশ্নের কোনোটিরই সন্তোষজনক উত্তর নেই। আর এর মূল্য দিচ্ছেন সেই তরুণেরা, যাঁরা কারিগরি শিক্ষাকে ভবিষ্যৎ গড়ার পথ ভেবে বেছে নিয়েছিলেন।

নির্ভরযোগ্য তথ্যভিত্তির প্রয়োজন

সংকটের প্রথম লক্ষণ তথ্যেই। মোট শিক্ষার্থীর কত শতাংশ কারিগরি শিক্ষায় পড়ে, এই মৌলিক প্রশ্নেরও একক উত্তর নেই। বাংলাদেশ পোস্টে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে হারটি প্রায় ১৪ শতাংশ, ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে ১৬ শতাংশ, আবার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে প্রায় ২০ শতাংশ। যে খাত নিজের শিক্ষার্থীর সংখ্যাই নিশ্চিত করে বলতে পারে না, সে খাত প্রশিক্ষণার্থীদের কর্মসংস্থানের সঠিক হিসাব দেবে, এমন ভরসা করা কঠিন।

অথচ বাস্তবতা উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ১৫–২৪ বছর বয়সী তরুণদের ২৭.৮ শতাংশ কাজ, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ কোনোটিতেই ছিলেন না। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাবে ২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া ১১ লাখ ৩০ হাজার কর্মীর ৭৪ শতাংশই ছিলেন আধা-দক্ষ বা অদক্ষ। আইওএমের এক হিসাবে একজন বাংলাদেশি প্রবাসী মাসে গড়ে প্রায় ২০৩ ডলার পাঠান, একজন ফিলিপিনো পাঠান ৫৬৪ ডলারের বেশি। এই ব্যবধান শ্রমের নয়, দক্ষতার, আর দক্ষতার সেই ঘাটতির উৎস আমাদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা।

এর সঙ্গে আছে সামাজিক মর্যাদার সংকট। এখনো অনেক পরিবারে কারিগরি শিক্ষাকে দেখা হয় ‘যার আর কোনো উপায় নেই’, তার পথ হিসেবে। ভালো ফল করা শিক্ষার্থীকে পাঠানো হয় সাধারণ শিক্ষায়, আর কারিগরিতে আসেন মূলত তাঁরা, যাঁদের সামনে বিকল্প কম। অথচ এই ধারণা বদলানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় প্রচারণা নয়, ফলাফল। যেদিন কারিগরি শিক্ষা শেষ করা তরুণেরা নিশ্চিতভাবে ভালো আয়ের কাজ পাবেন, সেদিন অভিভাবকেরা নিজেরাই সন্তানকে এই পথে পাঠাবেন। আর সেই ফলাফলের নিশ্চয়তা দিতে পারে কেবল একটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা।

প্রকল্প মূল্যায়ন: আউটপুট থেকে আউটকামে

দক্ষতা খাতের বড় বিনিয়োগ এসেছে প্রকল্পের মাধ্যমে। কিন্তু প্রকল্পের সাফল্য মাপা হয় আউটপুট দিয়ে, অর্থাৎ কতজন প্রশিক্ষণ নিলেন। আউটকাম, অর্থাৎ কতজন টেকসই কাজ পেলেন আর আয় কতটা বাড়ল, তার হিসাব হয় দুর্বলভাবে, অথবা হয়ই না।

বিশ্বব্যাংকের STEP প্রকল্প (২০১০–২০১৯) এই খাতের সফলতম উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত। স্বাধীন মূল্যায়নে এটি “হাইলি স্যাটিসফ্যাক্টরি” রেটিং পেয়েছে। প্রকল্পভুক্ত ডিপ্লোমা কোর্সে পাসের হার ৫০ থেকে ৮৬.৫ শতাংশে উঠেছে। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের স্বাধীন মূল্যায়ন শাখা আইইজি নিজেই স্বীকার করেছে, পাসের হার দিয়ে প্রশিক্ষণের মান মাপা যথেষ্ট কিনা তা স্পষ্ট নয়। মেধার ভিত্তিতে বাছাই করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ফল আগে থেকেই ভালো হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। আর যে সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য প্রকল্পের বড় অংশ বরাদ্দ, তাঁদের কর্মসংস্থানের আলাদা তথ্য সংগ্রহই করা হয়নি।

এডিবি-সহায়িত SEIP কর্মসূচির চিত্র আরও শিক্ষণীয়। এখানে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান অর্থ পেত প্রশিক্ষণার্থীদের চাকরি পাওয়ার ভিত্তিতে। কাগজে এটি ছিল আদর্শ ফলাফলভিত্তিক মডেল। সরকারি মূল্যায়নে ৬৮ শতাংশ প্রশিক্ষণার্থীকে কর্মরত দেখানো হয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে জার্নাল অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে প্রকাশিত একটি গবেষণা বলছে, মূল্যায়নের নকশা দুর্বল ছিল, আর নিয়মিত চাকরিতে থাকা প্রশিক্ষণার্থীর প্রকৃত হার সম্ভবত ৫০ শতাংশের অনেক নিচে। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ, এই পুরস্কার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠানগুলোকে চাকরির সংখ্যা জালিয়াতি করে বাড়িয়ে দেখাতে প্রলুব্ধ করেছে। শিক্ষাটি পরিষ্কার: যে প্রতিষ্ঠান প্রশিক্ষণ দেয়, অর্থ পায় এবং নিজের ফলাফল নিজেই জানায়, সেখানে স্বাধীন যাচাই না থাকলে ফলাফলভিত্তিক মডেল সংখ্যা বানানোর যন্ত্রে পরিণত হয়।

অর্জনের স্থায়িত্ব ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা

STEP প্রকল্পকালে প্রকল্পভুক্ত প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক পদের শূন্যতা ২৫ থেকে ৩ শতাংশে নেমে এসেছিল। সাত বছর পর, চলতি বছরের জুনে যুগান্তরের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, কারিগরি প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষক ও অধ্যক্ষের প্রায় অর্ধেক পদ শূন্য, আর হাতে-কলমে শিক্ষার প্রয়োজনীয় উপকরণও নেই। প্রকল্পের অর্থে যে অর্জন এসেছিল, রাজস্ব বাজেটে তা ধরে রাখার কোনো কাঠামো তৈরি হয়নি। এটিই আমাদের প্রকল্পনির্ভর উন্নয়নের মৌলিক দুর্বলতা: প্রকল্প শেষ, অর্জনও শেষ।

এই চক্র এখন ঘুরছে ASSET প্রকল্পে। প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলারের এই বিশ্বব্যাংক-সহায়িত প্রকল্পে ১০ লাখের বেশি তরুণকে প্রশিক্ষণের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল। প্রকল্পের দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী মেয়াদ ২০২১ থেকে ২০২৬, বাজেট প্রায় ৪,৩০০ কোটি টাকা। প্রকল্পের শেষ বছরের মাত্র ছয় মাসে ২ লাখ ২৫ হাজারের বেশি মানুষের প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে বলে দাপ্তরিক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। কিন্তু তাঁদের কতজন কাজ পেয়েছেন, সে তথ্য প্রকাশ্যে নেই। মেয়াদ শেষের আগে বরাদ্দ খরচের চাপে সংখ্যা বাড়ানোর প্রবণতা আমাদের প্রকল্প সংস্কৃতিতে নতুন নয়।

আরও গুরুতর হলো প্রকল্পটি ঘিরে ওঠা অভিযোগ। দৈনিক ভোরের সময়ের ১২ সেপ্টেম্বরের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিষ্ঠান মালিকদের বরাতে দাবি করা হয়েছে, এন্টারপ্রাইজভিত্তিক প্রশিক্ষণের একটি ব্যাচে প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও প্রকৃত খরচ হয় প্রায় ৬ হাজার টাকা। কেনাকাটায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ অগ্রিম কমিশন, একই মালিকের একাধিক প্রতিষ্ঠানকে প্যাকেজ এবং সক্ষমতাহীন কেন্দ্রকে টাকার বিনিময়ে অনুমোদনের অভিযোগও তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত দাপ্তরিক চিঠি অনুযায়ী, জাতীয় পরিচয়পত্র নকল প্রমাণিত হওয়ায় একটি অংশীদার প্রতিষ্ঠানের চুক্তি বাতিল করা হয়েছিল। অথচ পরে একই প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৯২ লাখ টাকা স্থানান্তরের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযুক্তদের বক্তব্য এখনো প্রকাশিত হয়নি, অভিযোগগুলো তদন্তসাপেক্ষ। কিন্তু প্রশ্নটি ব্যক্তির চেয়ে বড়: যে প্রকল্পে এমন অভিযোগ ওঠে, তার অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আসলে কতটা কার্যকর?

সনদ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা

একজন তরুণের কাছে কারিগরি শিক্ষার সবচেয়ে বড় পুঁজি তাঁর সনদ। দেশে বা বিদেশে নিয়োগকর্তা সেই সনদ দেখেই আস্থা রাখেন। অথচ ২০২৪ সালে জাল সনদ চক্রে স্ত্রীর গ্রেপ্তারের পর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যানকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ডেইলি পোস্টের একটি প্রতিবেদনে অভিযোগ এসেছে, বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও শিক্ষকদের নিয়ে প্রায় ৫০ জনের একটি চক্র জাল সনদ বিক্রি করত। টানা তিন বছর কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি না করায় সম্প্রতি ৮৬টি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বোর্ড। শিক্ষার্থী ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠান কীভাবে টিকে থাকে, সেই প্রশ্নও উত্তরহীন।

সনদের বিশ্বাসযোগ্যতার আরেকটি দুর্বল জায়গা মূল্যায়ন ব্যবস্থা। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি অনুযায়ী সব প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে সনদপ্রাপ্ত প্রশিক্ষক ও মূল্যায়নকারী থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাজারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মাত্র ২৬ থেকে ৩০ দিনের অনলাইন ও তিন দিনের সরাসরি ওরিয়েন্টেশনের পর অ্যাসেসর হওয়ার মূল্যায়নে বসার সুযোগের বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। এত সংক্ষিপ্ত প্রস্তুতিতে তৈরি মূল্যায়নকারী কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে দক্ষতা যাচাই করতে পারেন, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় আরেকটি সমস্যা স্পষ্ট। অধিকাংশ অ্যাসেসর কোনো না কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত প্রশিক্ষক। নিয়ম অনুযায়ী তাঁরা নিজ প্রতিষ্ঠানে মূল্যায়ন করেন না, কিন্তু প্রকল্প ও RPL কর্মসূচিতে চাহিদা বাড়ায় ঘন ঘন অন্য প্রতিষ্ঠানে মূল্যায়নে যান। ফলে নিজ প্রতিষ্ঠানের ক্লাস ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ব্যাহত হয়। যিনি অন্যের দক্ষতা যাচাইয়ে ব্যস্ত, তাঁর নিজের শিক্ষার্থীরা প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত হন। মূল্যায়নকালে অনিয়মের অভিযোগও মাঠে শোনা যায়। দুর্বল মূল্যায়ন মানে দুর্বল সনদ, আর দুর্বল সনদ মানে তরুণের হাতে এমন একটি কাগজ, যার দাম নিয়োগকর্তার কাছে ক্রমেই কমছে।

নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সক্ষমতা ও সমন্বয়

আইএলওর একটি মূল্যায়ন অনুযায়ী, দক্ষতা খাতে ২৪টি মন্ত্রণালয় ও বহু সংস্থা বিচ্ছিন্নভাবে জড়িত, আর তাদের মধ্যে সমন্বয়ের সামগ্রিক অভাব রয়েছে। এই বিশৃঙ্খলা দূর করতেই ২০১৮ সালে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) গঠিত হয়। কিন্তু সাত বছর পরও NSDA ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এখতিয়ার নিয়ে দ্বৈততা কাটেনি। চলতি বছরের এপ্রিলে NSDA নির্বাহী কমিটি বোর্ডের আইন সংশোধনের নির্দেশ ‘পুনর্ব্যক্ত’ করেছে বলে বাসস জানিয়েছে, যার অর্থ আগের নির্দেশ কার্যকর হয়নি। ১৯ সেপ্টেম্বর NSDA গভর্নিং বডির সভায় প্রধানমন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন, সমন্বয়ের অভাবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রশিক্ষণ ও সনদ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।

সমস্যা শুধু আইনের নয়, জনবলেরও। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, NSDA-তে কর্মরতদের বড় অংশের কারিগরি শিক্ষা বা শিল্পখাতে কাজের অভিজ্ঞতা নেই। ফলে দক্ষতা খাতের শীর্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটিও চলছে আমলাতান্ত্রিক ধাঁচে, ফাইল আর আনুষ্ঠানিকতার ভেতর দিয়ে। প্রতিষ্ঠানের অ্যাক্রেডিটেশনের পরিদর্শনে কর্মকর্তাদের একাংশের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। যে সংস্থা মান যাচাই করবে, সে নিজে যদি মানসম্পন্ন জনবল আর জবাবদিহির কাঠামো ছাড়া চলে, তবে পুরো ব্যবস্থার গোড়াতেই গলদ থেকে যায়।

একই প্রশ্ন প্রযোজ্য প্রকল্পে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও। কোন প্রতিষ্ঠান অংশীদার হবে বা স্বীকৃতি পাবে, তা নির্ধারিত হয় মূলত পরিদর্শকের সুপারিশে। সেই সুপারিশ ঘুষ, রাজনৈতিক প্রভাব বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে পক্ষপাতদুষ্ট হলে সক্ষম প্রতিষ্ঠান বাদ পড়ে, আর অযোগ্য প্রতিষ্ঠান জনগণের অর্থ পায়। ভোরের সময়ের প্রতিবেদনে সক্ষমতাহীন কেন্দ্রকে টাকার বিনিময়ে অনুমোদনের যে অভিযোগ এসেছে, তা এই ঝুঁকিরই ইঙ্গিত দেয়।

প্রশিক্ষকের সক্ষমতা ও শ্রেণিকক্ষের মান

শিক্ষামন্ত্রী স্বীকার করেছেন, গত ১৫ বছরে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষক সংকট তীব্র হয়েছে। কিন্তু সমস্যা শুধু সংখ্যার নয়, সক্ষমতারও। অনেক প্রশিক্ষকের তাত্ত্বিক জ্ঞান থাকলেও শিল্পকারখানায় হাতে-কলমে কাজের অভিজ্ঞতা সীমিত, আর নিয়মিত ব্যবহারিক দক্ষতা হালনাগাদের সুযোগও কম। যিনি নিজে আধুনিক যন্ত্রে কাজ করেননি, তিনি শিক্ষার্থীকে সেই যন্ত্রে দক্ষ করবেন কীভাবে? দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের একটি প্রতিবেদনে শিক্ষার্থী ও নিয়োগকর্তারা এর বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন: চার বছরের ডিপ্লোমা শেষে কারখানায় গিয়ে অনেক তরুণ দেখেন, প্রতিষ্ঠানে যে যন্ত্রে তাঁরা হাত পাকিয়েছেন, তা বহু আগেই বাতিল; সেখানে চলে সিএনসি মেশিন। কাজের উপযোগী হতে তাঁদের আরও তিন থেকে ছয় মাস নতুন করে প্রশিক্ষণ নিতে হয়। শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে সেতু হিসেবে রাখা ১৬ সপ্তাহের বাধ্যতামূলক ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্টও প্রায়ই উদ্দেশ্য পূরণ করে না; অনেক শিক্ষার্থী সীমিত ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা নিয়েই তা শেষ করেন।

চলমান উদ্যোগ: সম্ভাবনা ও পূর্বশর্ত

সরকার এ খাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্মার্ট স্কিল ব্যাংক ডাটাবেজ, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ডিজিটাল সনদ এবং ৭ হাজার ৫০০ দেশি ও ১ হাজার বিদেশি প্রশিক্ষক নিয়োগের ঘোষণা এসেছে। নির্মাণাধীন ৩২৯টি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের কাজ দুই বছরে শেষ হওয়ার কথা বলে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সব প্রশিক্ষণকে একটি সমন্বিত কাঠামোয় আনার নির্দেশ দিয়েছেন।

এসব উদ্যোগ স্বাগত জানানোর মতো। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, জবাবদিহির কাঠামো ছাড়া নতুন ভবন আর নতুন প্রকল্প পুরোনো সমস্যারই পুনরাবৃত্তি ঘটায়। জাল সনদের অভিজ্ঞতা মনে রাখলে ডিজিটাল স্কিল ব্যাংক তখনই কাজে আসবে, যখন তথ্য প্রবেশের প্রতিটি ধাপ স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য হবে। ৩২৯টি নতুন প্রতিষ্ঠানে দক্ষ প্রশিক্ষক না থাকলে সেগুলোও আরেকটি নিষ্ক্রিয় প্রতিষ্ঠানের তালিকায় যোগ হবে। সংস্কারের কেন্দ্রে তাই অবকাঠামো নয়, জবাবদিহি থাকা দরকার।

সামনের সম্ভাবনা

সংকট যত গভীরই হোক, সম্ভাবনাও কম নয়। জাপান, ইউরোপ ও উপসাগরীয় দেশে কেয়ারগিভিং, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি ও আইটি সেবার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। আইএলওর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্লাম্বিং বা বৈদ্যুতিক কাজের মতো অপ্রচলিত পেশায় নারীরা সামাজিক বাধার মুখে পড়লেও এসব পেশায় বড় চাহিদা রয়েছে। অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করা লাখো দক্ষ কিন্তু সনদহীন কর্মীর জন্য পূর্ব অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি (RPL) বড় সুযোগ; STEP-এর মূল্যায়নে দেখা গেছে, এতে সনদপ্রাপ্তদের মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থান ও আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থাৎ সঠিক নকশা আর সৎ বাস্তবায়ন থাকলে ফল আসে। প্রয়োজন সেই সাফল্যকে ব্যতিক্রম থেকে নিয়মে পরিণত করা।

নীতিগত সুপারিশ

প্রথমত, ASSET-এর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে দুর্নীতি দমন কমিশন ও আইএমইডির মাধ্যমে, আর অর্থদাতা বিশ্বব্যাংকের সততা তদারকি ব্যবস্থাকেও যুক্ত করতে হবে। তথ্য প্রকাশকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, প্রতিটি দক্ষতা প্রকল্পের কর্মসংস্থানের তথ্য স্বাধীন তৃতীয় পক্ষ দিয়ে ছয় মাস ও এক বছর পর যাচাই করে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। STEP, SEIP ও ASSET-এর সমাপনী নিরীক্ষা সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে উপস্থাপন করতে হবে।

তৃতীয়ত, NSDA-কে কারিগরি শিক্ষা ও শিল্প অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জনবল দিয়ে সাজাতে হবে, আর এর কর্মকর্তাদের স্বয়ংক্রিয় জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। পরিদর্শন প্রতিবেদন অনলাইনে প্রকাশ, তৃতীয় পক্ষ দিয়ে দৈবচয়নের ভিত্তিতে পুনর্যাচাই এবং পরিদর্শক দলে নিয়মিত রোটেশন চালু করতে হবে। সময়সীমা বেঁধে বোর্ডের আইন সংশোধন করে দুই প্রতিষ্ঠানের এখতিয়ার লিখিতভাবে ভাগ করতে হবে।

চতুর্থত, প্রকল্প ও অ্যাক্রেডিটেশনে প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। বাছাইয়ের মানদণ্ড ও নম্বর আগেই প্রকাশ করতে হবে, আর প্রতিটি পরিদর্শকের সুপারিশ তৃতীয় পক্ষ দিয়ে যাচাই করতে হবে। ঘুষ, রাজনৈতিক প্রভাব বা স্বার্থের সংঘাতে পক্ষপাতদুষ্ট সুপারিশ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট পরিদর্শক ও প্রতিষ্ঠান উভয়ের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। পুরো বাছাই-প্রক্রিয়া ডিজিটাল ও নিরীক্ষাযোগ্য রাখতে হবে।

পঞ্চমত, NSDA-র অধীনে পেশাদার অ্যাসেসরদের একটি জাতীয় পুল গড়ে তুলতে হবে। প্রশিক্ষকদের বাইরে মূল্যায়নে যাওয়ার মাসিক সীমা, প্রতিষ্ঠানপ্রধানের পূর্বানুমতি এবং কে কোথায় মূল্যায়ন করছেন তার প্রকাশ্য অনলাইন রোস্টার চালু করতে হবে।

ষষ্ঠত, প্রশিক্ষকদের হাতে-কলমে দক্ষতা বাড়াতে নির্দিষ্ট সময় পরপর শিল্পকারখানায় সংযুক্তি ও ব্যবহারিক দক্ষতার সনদায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে, আর পদোন্নতির সঙ্গে সেই দক্ষতাকে যুক্ত করতে হবে।

সপ্তমত, শিক্ষক পদ ও যন্ত্রপাতির জন্য রাজস্ব বাজেটে স্থায়ী বরাদ্দ রাখতে হবে, যাতে প্রকল্প শেষে অর্জন হারিয়ে না যায়। নিষ্ক্রিয় প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বাতিল করতে হবে, আর প্রকল্পের অর্থ যেসব অ্যাসোসিয়েশন ও ইন্ডাস্ট্রি স্কিলস কাউন্সিলের (ISC) মাধ্যমে যায়, সেগুলোর স্বাধীন অডিট বাধ্যতামূলক করতে হবে।

অষ্টমত, প্রতিটি পলিটেকনিকের সঙ্গে স্থানীয় শিল্পের বাধ্যতামূলক অ্যাপ্রেন্টিসশিপ চুক্তি, পাঠ্যক্রম প্রণয়নে শিল্পখাতের অংশগ্রহণ এবং উদীয়মান খাতে আন্তর্জাতিক মানের সনদ নিশ্চিত করতে হবে।

উপসংহার: তরুণদের আস্থা ফেরানোই মূল লক্ষ্য

বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর আধিক্য ২০৩০ সালের পর থেকে কমতে শুরু করবে বলে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন। হাতে সময় মাত্র কয়েক বছর। এই সময়ে যে তরুণ কারিগরি শিক্ষা বেছে নিচ্ছেন, তাঁর তিনটি প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকে দিতে হবে। আমি যে প্রশিক্ষণ নিচ্ছি, তা কি বাজারের উপযোগী? আমার সনদ কি দেশে-বিদেশে বিশ্বাসযোগ্য? আর যাঁরা এই ব্যবস্থা চালাচ্ছেন, তাঁরা কি কারও কাছে জবাবদিহি করেন?

প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা দিয়ে প্রকল্পের সাফল্য মাপা যায়। কিন্তু দেশের সাফল্য মাপা হয় তরুণের হাতে কাজ আর পকেটে আয় দিয়ে। যে প্রশিক্ষক নিজে হাতে-কলমে দক্ষ নন, তিনি দক্ষ কর্মী গড়তে পারেন না; আর যে নিয়ন্ত্রক নিজে জবাবদিহির বাইরে, তিনি অন্যকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারেন না। কারিগরি শিক্ষার সংস্কার তাই শুরু করতে হবে ওপর থেকে, জবাবদিহি দিয়ে।

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও জননীতি বিশ্লেষক

ট্যাগ: মতামত
রাজধানীতে ২০ ককটেল ও পেট্রোল বোমা উদ্ধার, ঘিরে রেখেছে এসআরবি
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মিরসরাইয়ে স্টিল কারখানায় দুর্ঘটনা, চীনা নাগরিকসহ চার শ্রমিক…
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হারলেও দলের পারফরম্যান্সে ‘খুশি’, শেখাই লক্ষ্য বাংলাদেশ কোচ…
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নতুন দায়িত্ব পেলেন সারজিস
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সিন্ডিকেট সদস্য হলেন জাবি অধ্যাপক ন…
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘বিভীষিকাময়’, সরকারের আত্মমূল্যায়ন জরু…
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬