জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় গ্রন্থাগারের ভূমিকা

০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:৫৩ PM
এম এ মতিন

এম এ মতিন © টিডিসি ফটো

আজ ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ‘জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস’। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে, ‘জ্ঞানেই মুক্তি, আগামীর ভিত্তি’। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের আলোকে দেশের সকল  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলো একযোগে দিবসটি উদযাপন করছে। যেকোনো জাতির মেধা-মনন, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক, বাহক ও লালনকারী হিসেবে গ্রন্থাগার গুরুত্বপূর্ণ  ভুমিকা পালন করে। এই দিবস পালনের মাধ্যমে বাংলাদেশের সকল স্তরের জনগণ, ছাত্র-শিক্ষক,গবেষক সবাই বইপড়ার গুরুত্ব অনুধাবন এবং  নিজেদের পাঠাভ্যাস বৃদ্ধি করে স্ব স্ব ক্ষেত্রে উন্নততর ফলাফল অর্জন করবেন এবং সার্বিকভাবে জীবনমানের উন্নতি  ঘটাবেন – এই প্রত্যাশাকে সামনে রেখেই জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালনের সূত্রপাত। 

তথ্য সভ্যতা ও উন্নয়নের প্রধানতম চালিকা শক্তি। তথ্যের উপর ভিত্তি করেই মানব সভ্যতা, জ্ঞান ও বিজ্ঞান ক্রমাগত এগিয়ে চলছে। যে জাতি যত বেশী তথ্য ব্যবহার করে – সে জাতি তত বেশী উন্নত ও সভ্য। যেমন – যে জাতি যত বেশী বিদ্যুৎ ব্যবহার করে সে জাতি তত বেশী উন্নত। অনুরূপভাবে এখন মনে করা হয়,  যে জাতি যত বেশী ইন্টারনেট ব্যবহার করে সে জাতি তত বেশী অগ্রসর। ইন্টারনেট ব্যবহারের আর এক ধাপ এগিয়ে বিশ্বের অগ্রসরমান দেশগুলো এখন ৫ম শিল্পবিপ্লব (ইন্ডাস্ট্রি-৫) বাস্তবায়নের কাজে ব্যস্ত। সমাজের সকল স্তরের সকল সদস্য (বেশির ভাগ) যখন প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্য আদানপ্রদান করে সমাজ তথা রাস্ট্র পরিচালনা করতে সক্ষম হবেন তখনই এ সমাজকে বলা হবে ‘জ্ঞানভিত্তিক সমাজ’। বলা দরকার, পৃথিবীর সকল উন্নত দেশেই রয়েছে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে গ্রন্থাগার বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। 

এ কথা সত্য যে, তথ্যের বাহন হচ্ছে পুস্তক, সাময়িকী, দলিলপত্রাদি ও বর্তমানকার ডিজিটাল পাঠসামগ্রী। আর এ সবকিছুর আধার হচ্ছে গ্রন্থাগার। গ্রন্থাগারের কাজ হচ্ছে – প্রয়োজনভিত্তিক তথ্য নির্বাচন ও বাছাই, তথ্য সংগ্রহ, তথ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও পাঠকের চাহিদা মোতাবেক তা বিতরণ।   তথ্য ব্যবস্থাপনার এ সকল কাজ করার জন্যে রয়েছে বিভিন্ন শ্রেণির গ্রন্থাগার। যেমন – শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগার,  গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্যে বিশেষায়িত গ্রন্থাগার, সকল শ্রেণীর মানুষের জন্যে ব্যবহারযোগ্য গণগ্রন্থাগার এবং জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্যে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত জাতীয় গ্রন্থাগার। বিশ্বের সকল দেশেই এই একই রকম গ্রন্থাগারের অস্থিত্ব লক্ষ্য করা যায়।  বলা প্রয়োজন, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্যে উল্লেখিত সকল প্রকার গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা, এগুলোর সুষ্ঠু পরিচালনা ও সর্বোত্তম সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। 

গ্রন্থাগারের আবশ্যকতা, এগুলোর যথাযথ ব্যবস্থাপনা, ছাত্র-শিক্ষক-গবেষক ও সাধারণ জনগণকে তাদের ঈপ্সিত তথ্য ও সেবা প্রদানের কার্যকারিতা পর্যালোচনা ও এগুলোর ফলাফল ভিত্তিক মূল্যায়নই জাতীয় গ্রন্থাগার দিবসের মূল প্রতিপাদ্য। জাতীয় গ্রন্থাগার দিবসে গ্রন্থাগার ব্যবহারকারী, গ্রন্থাগারকর্মী, প্রতিষ্ঠান প্রধান, পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দেশের গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক পর্যালোচনাপূর্বক  জাতীয় উন্নয়নে বিভিন্ন শ্রেণির গ্রন্থাগারের অবদান, সফলতা ব্যর্থতা নিরূপণ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারন করবেন – মূলত এই প্রত্যাশাকে সামনে রেখে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। 

অতএব প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, বাংলাদেশের গ্রন্থাগার ও এর ব্যবস্থাপনার সর্বশেষ অবস্থা কী? প্রথমেই আসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারের প্রসঙ্গ। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বাংলাদেশের ৮২,৫৬৬ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গ্রন্থাগার রয়েছে এবং এগুলোর ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছাত্র-শিক্ষক মিলে দুই কোটির বেশী (২,১০,২৯,০৯৯), ( ব্যানবেইস-২০২৩)।  এ ছাড়াও এগুলোতে বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন যাদের অনেকেই গ্রন্থাগার ব্যবহার করে থাকেন।  অভিজ্ঞতা ও জরীপে দেখা যায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধিকাংশ  ছাত্র-ছাত্রীরা জানেই না যে তাদের বিদ্যালয়ে একটি গ্রন্থাগার আছে এবং সেখানে বসে বই পড়া যায় কিংবা সেখান থেকে ধার  করে বই বাড়ি নিয়ে পড়া যায়। অতএব আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় উন্নয়ন সহযোগী বিশ্ব ব্যাং ও ইউনিসেফ এর জরীপ ও গবেষণায় বলা হয়েছে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার মান আশানুরূপ নয়। ভারত ও শ্রীলঙ্কার ৩য় শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীরা যা জানে বাংলাদেশের ৫ম শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীরা তা জানে না।  তবে এ কথাও সত্য যে, কিছু অগ্রসরমান শহুরে বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা গ্রন্থাগার ও এর সেবার সাথে ভালোই পরিচিত। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের অবস্থা প্রাথমিকের চেয়ে ভাল। কিন্তু  এগুলোর অবকাঠামো ও সংগ্রহ ছাত্র-ছাত্রীদের চাহিদার তুলনায় নিতান্ত অপ্রতুল। একইভাবে কলেজ গ্রন্থাগারগুলোর অবস্থা আর একটু ভাল হলেও প্র্য়োজনের তুলনায় আশানুরূপ নয়। এর পরে আসে বিশ্ববিদ্যালয়য় গ্রন্থাগার।  সরকারী বেসরকারী প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রন্থাগার বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী প্রাপ্তির পূর্বশর্ত। তাই বাধ্য হয়েই উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনমাফিক গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করতেই হয়। অন্তত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) পরিদর্শন প্রয়োজনীয়তা মেটানোর জন্যে। প্রশ্ন উঠতেই পারে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারগুলো কি ছাত্র-শিক্ষক-গবেষকদের তথ্য চাহিদা যথাযথভাবে পূরণ করতে পারছে? আর বৈশ্বিক মানদন্ড অনুসারে  এগুলো কতটুকু মানসম্মত? গ্রন্থাগার ও তথ্য ব্যবহারের বর্তমান মানদণ্ড হচ্ছে বৈশ্বিক জ্ঞান সূচক, বৈশ্বিক অর্থনীতি সূচক এবং বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের বৈশ্বিক র‍্যাংকিং। এতদসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এগুলোর কোনটিতেই বাংলাদেশ সন্মানজনক স্থানে নেই। গেল  বছরের বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকের (গ্লোবাল নলেজ ইনডেক্সের) তালিকা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম নলেজ ফাউন্ডেশন (এমবিআরএফ)। এ তালিকায় বিশ্বের ১৫৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২০তম।  টাইমস হায়ার এডুকেশনের বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয় সূচক-২০২৪ মতে, বিশ্বের প্রথম ৮০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। এ তালিকায় ভারতের ২৪টি ও পাকিস্তানের ৮টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ইউ এন ডি পি’র মানব উন্নয়ন সূচকে (২০২৪) অনুসারে বিশ্বের ১৯৩ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান ১২৯। অর্থনীতি সূচকে ১৩৩ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১১৬ তম অবস্থানে আছে। বৈশ্বিক উদ্ভাবনী সূচকে ১৩৩ দেশের মধ্যে ১০৬তম (২০২৪)। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি অর্গানাইজেশনের উদ্ভাবন সূচক-২০২৩ মতে, ১৩২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১০৫তম, যা ভারত ও পাকিস্তানের পেছনে।  জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি অর্গানাইজেশনের উদ্ভাবন সূচক-২০২৩ মতে, ১৩২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১০৫তম, যা ভারত ও পাকিস্তানের পেছনে। সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশন নেটওয়ার্কের মূল্যায়ন রিপোর্ট-২০২৩ মতে, এসডিজি অর্জনে ১৬৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১০১তম। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ভালো সড়কের তালিকায় ১৩৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১১৩তম। এডির সায়েন্টিফিক ইনডেক্স-২০২৩ মতে, বিশ্বসেরা বিজ্ঞানী ও গবেষকদের ১৩,৫২,০৫৯ জনের তালিকায় বাংলাদেশের ৯,২৬২ জনের নাম রয়েছে। এফএও’র ‘স্ট্যাটাস অব উইমেন ইন অ্যাগ্রিকালচার সিস্টেম-২০২৩’ মতে, কৃষিতে নারীর ভূমিকা (২০১৯ সালে) বাংলাদেশে ৪৫.৩%, যা বৈশ্বিক গড় প্রায় ৪০%। তবে, ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন ব্যবহার এবং জমির মালিকানায় বাংলাদেশের নারীরা ব্যাপক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। বিশ্ব ব্যাংকের ‘অ্যাটলাস অব সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস-২০২৩’ শীর্ষক প্রতিবেদন মতে,স্বাস্থ্যসম্মত খাবার কিনতে পারেন না, এমন মানুষের দেশের তালিকায় বাংলাদেশ ষষ্ঠ। বাংলাদেশে এখন ১২.১০ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসম্মত খাবার কেনার সামর্থ্য নেই (দৈনিক ইনকিলাব। ২ নভেম্বর ২০২৩)।

শিক্ষার বৈশ্বিক মান অর্জন করতে হলে বিদ্যালয় পর্যায় থেকে  প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সংগ্রহ নিশ্চিত করে ছাত্র-ছাত্রীদের গ্রন্থাগার ব্যবহারে উদবুদ্ধ করতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখতে হবে। গুণগত শিক্ষা অর্জন তবেই সম্ভব হবে। আগেই বলেছি, আমাদের জন্সংখ্যার প্রায় এক চতুর্তাংশ শিক্ষায়তন গ্রন্থাগারের অধীন। সুরাং একে অবহেলা করা আত্মঘাতী। 

বাংলাদেশের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান যেগুলো গবেষণার সাথে সংশ্লিষ্ট সেগুলোর বিশেষ গ্রন্থাগারসমূহ অবকাঠামো, সংগ্রহ, জনবল ও সেবা প্রদানের দিক থেকে অগ্রগামী। - এক কথা সত্য। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। 

গণগ্রন্থাগারের অস্তিত্ব বাংলাদেশে প্রাচীন কাল থেকেই বিদ্যমান। এগুলোর প্রতিষ্ঠাতা স্থানীয় বিদ্যুতসাহী ধনাঢ্য  জমিদার ব্যক্তি। উদাহরণ হিসাবে ঊডবার্ণ পাবলিক লাইব্রেরী, বগুড়া  (১৮৫৪), যশোর ইন্সটিটিউট পাবলিক লাইব্রেরী, যশোর ১৮৫৪), বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরী, বরিশাল (১৮৫৪), রাজা রাম মোহন রায় পাবলিক লাইব্রেরী, ঢাকা (১৮৭১), নর্থব্রুক হল লাইব্রেরী, ঢাকা (১৮৮২), ইত্যাদি নাম বলা যেতে পারে। সাধারণ মানুষকে তথ্য ও জ্ঞান প্রদানে এ সকল গ্রন্থাগারের ভূমিকা স্মরণীয় এবং ঐতিহাসিক। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর জেলায় জেলায় সরকার গণগ্রন্থাগার চালু করে। প্রতি থানা/উপজেলায় গণগ্রন্থাগার স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে বলে জানা যায়। 

সবশেষে আসে জাতীয় গ্রন্থাগার ও জাতীয় আর্কাইভ এর কথা। বিশ্বের ছোট বড় সকল দেশেই জাতীয় গ্রন্থাগার ও জাতীয় আর্কাইভস এর অস্তিত্ব বিদ্যমান। বাংলাদেশেও স্বাধীনতার পর সরকার জাতীয় গ্রন্থাগার ও জাতীয় আর্কাইভ স্থাপন করে। এর উদ্দেশ্য হল – জাতীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষার স্বার্থে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ব্যবহারের জন্যে দেশ থেকে প্রকাশিত ও দেশ সম্পর্কে বিদেশে প্রকাশিত সকল প্রকাশনার কপি সংগ্রহ করা। আর জাতীয় আরকাইভের কাজ হচ্ছে ইতিহাস ঐতিহ্য ও গবেষণা সম্বলিত শ্রেণিকৃত পুরণো (২৫ বছরের বেশী) প্রকাশনা ও দলিলাদি সংগ্রহ করা। শের-ই- বাংলা নগরস্থ আগার গাও এ সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে অবস্থিত জাতীয় আর্কাইভস এবং গ্রন্থাগার নামীয় প্রতিষ্ঠান এই কাজ করছে। 

উপরের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশে সকল প্রকার গ্রন্থাগারের অস্তিতে বিদ্যমান। বৈশ্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এর বিকল্প নেই। কিন্তু মানের দিক থেকে আমাদের অবস্থান কোথায় তা নির্ধারনের সময় এসেছে। জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস তাই দাবী করে। আমরা আমাদের গ্রন্থাগার ব্যবস্থা কীভাবে মূল্যায়ন করতে পারি? পুস্তক পাঠ, ইন্টারনেটে তথ্য অনুসন্ধান ও ব্যবহার যে কারও জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধির সহায়ক। জ্ঞান বৃদ্ধি না হলে  পুস্তক পাঠ, গ্রন্থাগার ব্যবহার, ইন্টারনেট সার্চিং সবই নিরর্থক। তবে জ্ঞানের যে উন্নতি বা প্রবৃদ্ধি ঘটছে তা কিভাবে বুঝা যায়? এর বৈশ্বিক পদ্ধতি হচ্ছে-  জ্ঞান সূচকে কোন দেশ বা জাতির স্থান কোথায়? 

চলতি বছরের বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকের (গ্লোবাল নলেজ ইনডেক্সের) তালিকা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম নলেজ ফাউন্ডেশন (এমবিআরএফ)। এ তালিকায় বিশ্বের ১৫৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২০তম। 

প্রযুক্তিগত ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ আর জ্ঞান অর্থনীতির সূচকে ভালো পারফরম্যান্স করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু গবেষণা, উন্নয়ন ও উদ্ভাবনে ধারাবাহিকভাবে খারাপ করে চলেছে। এই সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিচে বাংলাদেশ। আর টানা চতুর্থবারের মতো এই তালিকায় শীর্ষে আছে সুইজারল্যান্ড।
উচ্চশিক্ষায় প্রতি বছর বিভিন্ন সংস্থা  যে বৈশ্বিক র‍্যাংকিং করে তাতে প্রথম ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। 

আমাদের করণীয়
স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট ইকোনমি, স্মার্ট গভর্নমেন্ট ও স্মার্ট সোসাইটি,স্মার্ট বাংলাদেশ তথা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে শিক্ষার  সর্বস্তরে পড়াশুনার মান আমাদের বাড়াতেই হবে সেই সাথে প্রযুক্তির ব্যবহার। পড়াশুনার মান তখনই বৃদ্ধি পাবে যখন ছাত্রছাত্রীরা নির্দিষ্ট পাঠ্য পুস্তকের পাশাপাশি গ্রন্থাগারে গিয়ে বিষয়সংশ্লিষ্ট পুস্তকের অতিরিক্ত রেফারেন্স বই পড়ে নিজেদের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। সেই সাথে অন লাইনে শিক্ষক প্রদত্ত ওয়েবসাইট (একাধিক হতে পারে) ঘাটাঘাটি করে নিজের জ্ঞানস্তরকে সমৃদ্ধ করবে। অপ্রিয় হলেও আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে আমাদের ছেলেমেয়েরা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে উচ্চ জিপিএ অর্জন করার পরও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ভর্তি পরীক্ষায় একই পাঠক্রমের উপর করা প্রশ্নপত্রের উত্তরে খারাপ ফলাফল করছেন। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে – আমাদের ছাত্রছাত্রীরা গ্রন্থাগারে পড়াশুনা, রেফেরেন্স বই পড়া, ওয়েবসাইট সার্চ করে পড়াশুনা তো দূরের কথা – নিজেদের পাঠ্যপুস্তকও সঠিকভাবে পড়ে আয়ত্ত করেন নাই। তারা গাইড বা নোট পড়ে পাশ করেছেন। এ অবস্থায় জাতীয় গ্রন্থাগার দিবসে আমাদের পরামর্শ  হচ্ছে – ছাত্রছাত্রীদের পাঠ্যপুস্তক ও গ্রন্থাগারভিত্তিক পড়াশুনায় মনোনিবেশ করানো – শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে পড়াশুনার সম্পর্ক দৃঢ়তর করা এবং স্মার্টফোন কে অর্থবহ কাজে লাগানো। প্রতিটি স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসায় অনুমোদনের শর্তানুযায়ী যথানিয়মে গ্রন্থাগার পরিচালনা এবং সরকারী নির্দেশ মোতাবেক এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা। এ ছাড়া সরকার নির্দেশিত লক্ষ্যভিত্তিক শিক্ষা(ওবিই) বাস্তবায়নের জন্যে ছাত্রছাত্রীদের গ্রন্থাগারের প্রতি উৎসাহিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সর্বস্তরে লক্ষ্যভিত্তিক গুণগত শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্যে অগ্রাধিকারভিত্তিতে নিন্মোল্লেখিত বিষয়গুলো সরকার বিবেচনা করতে পারেনঃ    

-শিক্ষাখাতে ব্যয় বৃদ্ধি করা। জিডিপি’র ২.৫% - ৩.০০% করা যায় কিনা,  (চলতি অর্থবছরে  শিক্ষাখাতে ব্যয় জিডিপি’র ১.৮৩%); এবং বার্ষিক বাজেটের ১৬-১৮% করা। ইউনিসেফ এর মতে জিডিপি’র ৬% এবং বাৎসরিক বাজেটের ২০% শিক্ষা খাতে খরচ করা উচিৎ। 
-স্কুল কলেজ মাদ্রাসা পর্যায়ের গ্রন্থাগার পরিচালনার পরিবীক্ষণ পদ্ধতি নিবিঢ়তর করা; এমপিও’ভুক্তির সময়ে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে লিখিত নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে যে তারা যথানিয়মে গ্রন্থাগার পরিচালনা করবেন। সেই সাথে প্রতিটি গ্রন্থাগারে ইন্টারনেট সুবিধাসংবলিত কম্পিউটার সরবরাহ করা। 
-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা কার্যক্রম বৃদ্ধির জন্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা; বৈশ্বিক র‍্যাংকিং এ যথাস্থানে (উচ্চস্থান) অধিষ্ঠিত হওয়ার লক্ষ্যে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের নিয়ে টার্মস অব রেফারেন্স সহ একটি সেল তৈরি করা এবং এর কার্যক্রম পরিবীক্ষণ করা; 
-লক্ষ্যভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম (ওবিই) বাস্তবায়নের মাধ্যমে গুণগত শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে সর্বাত্নক ব্যবস্থা গ্রহণ করা;
-সর্বোপরি সমাজের বিদ্যোৎসাহী ধনাঢ্য ব্যক্তিদের গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় সম্পৃক্ত করার কার্যক্রম গ্রহণ করা।

‘জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস ২০২৬’ সফল হোক।

লেখকঃ উপদেষ্টা, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগ ও প্রক্টর, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

ট্যাগ: মতামত
মাকে লাইফ ইন্সুরেন্স দিয়ে বলেছিল মুগ্ধ— ‘আমি কখনো মারা গেলে…
  • ২২ মার্চ ২০২৬
‘সালামি হিসেবে আট আনা পেলেই আমরা অনেক খুশি হয়ে যেতাম’
  • ২১ মার্চ ২০২৬
দাবি আদায়ে ঈদের দিনেই মাঠে নামলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ
  • ২১ মার্চ ২০২৬
ক্যাম্পাসে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের ঈদ উপহার দিলো যবিপ্রবির …
  • ২১ মার্চ ২০২৬
হবিগঞ্জে ঈদের দিনে কাবাডি ম্যাচ ঘিরে আ.লীগ-বিএনপি মিলন মেলা
  • ২১ মার্চ ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন বন্ধে ব্রিকসের ‘জোরালো ভূমিকা’ চায় ত…
  • ২১ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence