উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস.এম আবদুল আওয়াল © টিডিসি সম্পাদিত
আমরা পৃথিবীর বুকে একমাত্র জাতি, যারা ভাষার অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করেছি এবং সেই আন্দোলনে সালাম, রফিক, জব্বার ও বরকতের মতো তরুণরা জীবন উৎসর্গ করেছেন। ভাষার জন্য এমন আত্মত্যাগ মানব ইতিহাসে বিরল। এই আত্মত্যাগ আমাদের কেবল গর্বের ইতিহাস নয়, বরং আমাদের নৈতিক দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয়। বাংলাদেশের ভেতরেই এমন অনেক জাতিগোষ্ঠী রয়েছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে সাঁওতালদের মতো আদিবাসী সম্প্রদায় যারা বাংলা ভাষা ব্যবহার করে না। ভাষা আন্দোলনের চেতনা আমাদের এই বার্তাই দেয় যে, শুধু নিজের মাতৃভাষা নয়, দেশের সব জাতিগোষ্ঠীর ভাষা সংরক্ষণ ও সম্মান করাও আমাদের দায়িত্ব।
বাঙালি এমন এক জাতি, যাদের অধিকার আদায়ের জন্য সবসময় আন্দোলনের পথে নামতে হয়েছে। ভাষা আন্দোলন ছিল তেমনই একটি ঐতিহাসিক সংগ্রাম, যা পরবর্তীতে মহান মুক্তিযুদ্ধের জন্য বাঙালিকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে। তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার বৈষম্য ভাষার প্রশ্নেই সবচেয়ে প্রকটভাবে প্রকাশ পায়। একুশের সেই প্রতিবাদ থেকে শুরু করে ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এবং সর্বশেষ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান সব আন্দোলনই একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। এগুলো একটি ধারাবাহিক ইতিহাস, যেখানে ভাষা আন্দোলন ছিল ভিত্তিপ্রস্তর।
আমরা বাংলা ভাষা পেয়েছি বলেই আজ নিজেদের কথা এত স্বাচ্ছন্দ্যে প্রকাশ করতে পারছি। মনের অনুভূতি, প্রতিবাদ, ভালোবাসা কিংবা ক্ষোভ সবকিছুই আমরা বাংলায় বলতে পারি বলেই আত্মপরিচয়ের জায়গায় নিজেদের এতটা নিরাপদ ও কম্ফোর্টেবল মনে হয়। বর্তমান প্রজন্ম ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েছে বলেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস পাচ্ছে এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে।
তবে বর্তমান সময়ে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে আমাদের সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বাংলা ভাষার ভেতরে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অন্য ভাষার শব্দের আগ্রাসন ঘটছে, যার ফলে ভাষার নিজস্ব সৌন্দর্য ও স্বকীয়তা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। যারা ভাষাকে হৃদয়ে ধারণ করে, তারাই দেশের প্রয়োজনে অকালে জীবন দিতে দ্বিধা করে না এই সত্য ইতিহাসে বারবার প্রমাণিত হয়েছে।
একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা ভোরবেলা শহীদ মিনারে খালি পায়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাই, গাই ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। এরপর আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নানা আয়োজন করা হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আজকাল এসব অনুষ্ঠানেও অনেক সময় হিন্দি বা অন্যান্য ভাষার গান বাজানো হয়, যা একুশের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
শহীদদের স্মরণে প্রতিদিন শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া সম্ভব নয়। তার পরিবর্তে পাঠ্যপুস্তকে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস আরও গভীরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, যাতে শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই এর তাৎপর্য বুঝতে পারে। বর্তমানে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রার্থীর কথা বলার ধরন লক্ষ্য করে নম্বর দেওয়া হয়। অথচ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের ভাষাগত ভিন্নতা স্বাভাবিক রাজশাহীর ভাষা আর চট্টগ্রামের ভাষা এক নয়। এ ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগে ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হলে সবাই সমান সুযোগ পাবে। তাহলেই হয়তো ২১ ফেব্রুয়ারি শুধু একটি দিবসের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের সব মানুষের জন্য এক আশীর্বাদ হয়ে উঠবে।