একুশের চেতনা থেকে রাষ্ট্রচেতনার উত্তরণ

২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:৩৬ PM
 প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম

প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম © টিডিসি সম্পাদিত

২০২৬ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। আজ থেকে ঠিক ৭৪ বছর আগে ঢাকার রাজপথে যে রক্তস্রোত বয়ে গিয়েছিল, তা কেবল একটি ভাষার অধিকার আদায়ের লড়াই ছিল না, বরং ছিল একটি জাতির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার মহাকাব্যিক সূচনা। একুশ মানেই বাঙালির অস্তিত্বের শেকড়, একুশ মানেই মাথানত না করার চিরন্তন প্রেরণা। ১৯৫২ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোতে যে আন্দোলনের বীজ বপন করা হয়েছিল, তা কেবল বর্ণমালা রক্ষার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা বিকশিত হয়ে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা এই দীর্ঘ পথপরিক্রমা বিশ্লেষণ করি, তখন স্পষ্ট দেখা যায় যে, বাঙালির রাষ্ট্রচেতনার প্রতিটি স্তর একুশের মহান আত্মত্যাগের কাছে ঋণী। এটি কোনো অলঙ্কারিক উক্তি নয়, বরং ইতিহাসের এক অমোঘ সত্য যে, আমাদের ভাষাই আমাদের স্বাধীনতার সোপান নির্মাণ করেছিল।   

২.
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান সম্পূর্ণ ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও কেবল ধর্মের ভিত্তিতে তাদের একটি রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৪ শতাংশ ছিল বাংলাভাষী, অথচ রাষ্ট্রশক্তির নিয়ন্ত্রণ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই শাসকগোষ্ঠী বাঙালির সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত পরিচয়ের ওপর আঘাত হানতে শুরু করে। ১৯৪৮ সালের শুরুতেই ডাকটিকিট, পোস্টকার্ড এবং ট্রেনের টিকিট থেকে বাংলা ভাষা বাদ দেওয়া হয়। এটি ছিল বাঙালি জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক চরম অবমাননা।

রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে বেছে নেওয়ার পেছনে শাসকগোষ্ঠীর মূল উদ্দেশ্য ছিল পূর্ববঙ্গের জনগণকে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঢাকা সফর ছিল এই বঞ্চনার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। তিনি কার্জন হলে ঘোষণা করেছিলেন, “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’’ এই ঘোষণার মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষাগত অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়েছিল। ভাষা এখানে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না; এটি ছিল শিক্ষা, সাহিত্য, ইতিহাস এবং সামগ্রিক জীবনবোধের বাহক। ফলে জিন্নাহর এই অগণতান্ত্রিক অবস্থান দ্রুত রাজনৈতিক প্রতিরোধে রূপ নেয়।   

৩.
ভাষা আন্দোলন কোনো আকস্মিক বিস্ফোরণ ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘ চার বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং সংগঠিত প্রতিরোধের ফসল। ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ পালিত রাষ্ট্রভাষা দিবসের হরতাল ছিল ভাষা আন্দোলনের প্রথম মাইলফলক। ছাত্র সমাজ, বুদ্ধিজীবী এবং রাজনৈতিক কর্মীরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের বাইরে রাজপথের কঠোর সংগ্রাম ছাড়া অধিকার আদায় সম্ভব নয়। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে আন্দোলনের গতিপথ ছিল বন্ধুর। কখনো আন্দোলনের তীব্রতা কমেছে, কখনো আবার তা নতুন শক্তিতে জ্বলে উঠেছে। এই সময়েই গঠিত হয় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’, যা আন্দোলনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রদান করে। ১৯৫২ সালের শুরুতেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ২৭শে জানুয়ারি পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন পল্টনের জনসভায় জিন্নাহর বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করলে ছাত্র সমাজ ফুঁসে ওঠে। ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয় এবং ২১শে ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী হরতালের ডাক দেওয়া হয়। এই প্রস্তুতির মুখে সরকার ২০শে ফেব্রুয়ারি বিকেলে ১৪৪ ধারা জারি করে সব ধরণের মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে। এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত দমনমূলক কৌশল। কিন্তু ততদিনে আন্দোলনের শিখা বাংলার প্রতিটি ঘরে পৌঁছে গিয়েছিল। ২১শে ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক আমতলায় ছাত্রসভার সিদ্ধান্ত ছিল আন্দোলনের ভাগ্যনির্ধারক মুহূর্ত।   

১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই ১৪৪ ধারা ভঙ্গের প্রশ্নে ছাত্র সমাজের মধ্যে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছিল। রাজনৈতিক নেতাদের অনেকেই রক্তক্ষয় এড়াতে ১৪৪ ধারা না ভাঙার পক্ষে মত দেন। তবে ছাত্রনেতা আব্দুল মতিন এবং মোহাম্মদ তোয়াহা আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করেন। আব্দুল মতিন প্রস্তাব করেছিলেন যে, গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় ১৪৪ ধারা ভাঙা জরুরি। ছাত্রদের সাধারণ সভায় সিদ্ধান্ত হয়—দশজন দশজন করে সুশৃঙ্খল মিছিল বের করা হবে। এটি ছিল একটি অভিনব ‘সত্যাগ্রহ’ বা কৌশলী নাগরিক অবাধ্যতা। মিছিলটি যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের হোস্টেল প্রাঙ্গণের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন পুলিশ কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই গুলিবর্ষণ শুরু করে। রাজপথ রঞ্জিত হয় তরুণ প্রাণের রক্তে। পুলিশের গুলিতে ঘটনাস্থলেই বা হাসপাতালে মারা যান আবুল বরকত, রফিক উদ্দিন আহমেদ এবং আব্দুল জব্বার। এই হত্যাকাণ্ড বাঙালি জাতির মনে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। যে ভাষা ছিল মায়ের বুলি, তার জন্য প্রাণ দেওয়ার এই নজির পৃথিবীতে বিরল। ২১শে ফেব্রুয়ারির এই আত্মদান আন্দোলনকে কেবল ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং তা একটি সর্বজনীন গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তর করে।   

২১শে ফেব্রুয়ারির সংবাদ দাবানলের মতো সারা শহরে ছড়িয়ে পড়লে পরদিন ২২শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। গায়েবানা জানাজায় হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। সেক্রেটারিয়েটের কর্মচারী থেকে শুরু করে সাধারণ রিকশাচালক—সবাই রাজপথে নেমে আসেন। ছাত্রনেতা অলি আহাদ এবং অন্যান্য সংগঠকদের নেতৃত্বে শোক মিছিল বের হলে পুলিশ ও সেনাবাহিনী পুনরায় গুলি চালায়। এদিন শহীদ হন শফিউর রহমান, আব্দুস সালাম এবং কিশোর অহিউল্লাহ। ২২শে ফেব্রুয়ারির ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে, ভাষা আন্দোলন আর কেবল রাষ্ট্রভাষা স্বীকৃতির লড়াই নেই; এটি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সামগ্রিক শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে এক সামাজিক বিদ্রোহে পরিণত হয়েছে। ১৪৪ ধারা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। রাজপথের প্রতিটি মোড়ে মানুষ সমবেত হতে শুরু করে এবং “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’’ স্লোগানে ঢাকা প্রকম্পিত হয়। এই গণজাগরণই শাসকগোষ্ঠীকে প্রথমবারের মতো বাঙালির শক্তির কাছে মাথানত করতে বাধ্য করে।   

২১শে ও ২২শে ফেব্রুয়ারির হত্যাকাণ্ডের পর শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য ছাত্ররা অত্যন্ত ত্বরিত সিদ্ধান্তে ২৩শে ফেব্রুয়ারি বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের হোস্টেল প্রাঙ্গণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কাজ শুরু করে। পুরান ঢাকার পিয়ারু সর্দারের সহায়তায় সিমেন্ট ও বালু সংগ্রহ করে সারা রাত জেগে ১০ ফুট উঁচু এই মিনারটি তৈরি করা হয়। এটিই ছিল ইতিহাসের প্রথম শহীদ মিনার। ২৪শে ফেব্রুয়ারি সকালে শহীদ শফিউরের পিতা এটি অনানুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। তবে ২৬শে ফেব্রুয়ারি পুলিশ মিনারটি গুঁড়িয়ে দেয়।   পরবর্তীতে ১৯৫৭ সালে শিল্পী হামিদুর রহমান এবং ভাস্কর নোভেরা আহমেদের নকশায় আধুনিক ও স্থায়ী শহীদ মিনারের কাজ শুরু হয়। এর স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত গভীর দর্শন বহন করে। মাঝখানের বড় স্তম্ভটি জননীকে নির্দেশ করে এবং পার্শ্ববর্তী ছোট স্তম্ভগুলো তাঁর শহীদ সন্তানদের প্রতীক, যারা মায়ের ভাষা রক্ষার জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এই মিনারটি পুনরায় ধ্বংস করে দেয় এবং সেখানে ‘মসজিদ’ লিখে দেয়। এটি ছিল বাঙালির জাতীয় সত্তাকে মুছে ফেলার একটি ঘৃণ্য প্রচেষ্টা। কিন্তু স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে মূল নকশার অনুপ্রেরণায় এটি পুনরায় নির্মিত হয়, যা আজ বাঙালির অদম্য সাহসের কেন্দ্রবিন্দু।   

৪.
ভাষা আন্দোলন কেবল একটি ভাষাগত অধিকারের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল বাঙালির নবজাগরণের সূচনা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্ব অনুযায়ী, ভাষা হলো জাতিসত্তার মৌল উপাদান। যখন কোনো জাতির ভাষার ওপর আঘাত আসে, তখন তার অস্তিত্বের সংকট তৈরি হয়। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালিরা বুঝতে পেরেছিল যে, পাকিস্তানি রাষ্ট্রে তাদের মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষিত নয়। এই আন্দোলন দ্বিজাতিতত্ত্বের (ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র) অসারতা প্রমাণ করে দেয় এবং একটি নতুন ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর জন্ম দেয়। এই চেতনার উত্তরণই পরবর্তীকালে ১৯৬৬ সালের ছয় দফা দাবি এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে রসদ জুগিয়েছিল। একুশের চেতনা বাঙালিকে শিখিয়েছিল কীভাবে রাজপথে লড়াই করে অধিকার ছিনিয়ে আনতে হয়। ১৯৫২-এর রক্তদানই ১৯৭১-এর সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মানসিক প্রস্তুতি তৈরি করেছিল। ভাষা আন্দোলন তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ‘ভূমিকা-অধ্যায়’। তাত্ত্বিকভাবে বিচার করলে দেখা যায়, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় লাভের আকাঙ্ক্ষাই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় রূপ নেয়। একুশের রাতের সেই “দশজনের মিছিল’’ কৌশলই শেষ পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ মানুষের মরণজয়ী যুদ্ধে পরিণত হয়।   

১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ছিল বাঙালির জন্য এক অনন্য গৌরবের দিন। এদিন ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই মহান স্বীকৃতির পেছনে রয়েছে কানাডা প্রবাসী দুই বাঙালি—রফিকুল ইসলাম এবং আব্দুস সালামের অসামান্য অবদান। তারা ১৯৯৮ সালে জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনানকে চিঠি লিখে বিশ্বের বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলো রক্ষার জন্য ২১শে ফেব্রুয়ারিকে একটি আন্তর্জাতিক দিবস করার প্রস্তাব দেন। রফিকুল ইসলাম ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, যার দৃষ্টি ছিল প্রখর এবং মননে ছিল স্বদেশের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। তাদের প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষকে এই উদ্যোগে শামিল করে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি হস্তক্ষেপে এবং দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতায় প্রস্তাবটি ইউনেস্কোতে গৃহীত হয়। ১৮৮টি দেশ এই প্রস্তাবকে সমর্থন জানায় এবং কোনো দেশ এর বিরোধিতা করেনি। আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি সারা বিশ্বের প্রায় সাত হাজার ভাষার মর্যাদা ও বৈচিত্র্য রক্ষার প্রতীক হিসেবে উদযাপিত হয়।   
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা দেখতে পাই যে, বাংলা ভাষা পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ ভাষায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বে মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহারের দিক থেকে বাংলার স্থান ৫ম বা ৬ষ্ঠ। প্রায় ৩০ কোটি মানুষ আজ বাংলায় কথা বলে। সাহিত্য, সংগীত, গবেষণা এবং ইন্টারনেটে বাংলার ব্যবহার ক্রমবর্ধমান। বিশেষ করে লন্ডন এবং নিউইয়র্কের মতো আন্তর্জাতিক শহরগুলোতে বাংলা আজ একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ভাষা। লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকায় প্রায় ১১ শতাংশ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। তবে ২০২৬ সালের এই প্রেক্ষাপটে আমাদের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষে এবং বিশ্বায়নের যুগে বাংলাকে আরও বেশি আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষা ও বিজ্ঞান গবেষণায় বাংলার ব্যবহার আরও বৃদ্ধি করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) সাথে বাংলার সঠিক সমন্বয় ঘটানোই এখনকার বড় দায়িত্ব। একুশের চেতনা আমাদের শুধু পেছনের দিকে তাকাতে শেখায় না, বরং সামনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার সাহস জোগায়। ভাষার শুদ্ধতা রক্ষা এবং বিশ্ব দরবারে বাংলার মর্যাদা সমুন্নত রাখাই হোক আমাদের বর্তমানের শপথ।

৫.
একুশ কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি আমাদের যাপিত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একুশের রাতে নগ্নপদে শহীদ মিনারে যাওয়ার যে ‘প্রভাতফেরি’, তা বাঙালির এক অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি কেবল একটি সুর নয়, এটি একটি জাতীয় চেতনা। একুশ আমাদের শিখিয়েছে যে, সাংস্কৃতিক দাসত্ব থেকে মুক্তি না পেলে রাজনৈতিক মুক্তি অর্থহীন। বর্তমানের তরুণ প্রজন্মের কাছে একুশ এক নতুন রূপে ধরা দিয়েছে। এটি এখন কেবল শোকের দিন নয়, বরং সৃজনশীলতার দিবস। একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে আয়োজিত ‘অমর একুশে বইমেলা’ বাঙালির মননশীলতার এক বিরাট ক্ষেত্র তৈরি করেছে। তবে কেবল আবেগ দিয়ে নয়, যুক্তি ও মেধা দিয়ে বাংলাকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা মানে কেবল স্লোগান দেওয়া নয়, বরং নিজের ভাষাকে জানা এবং শুদ্ধ চর্চা করা। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, একুশের চেতনা যেন কেবল একদিনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং তা যেন আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়।  

৭৪তম একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমাদের গভীর উপলব্ধি হলো—ভাষা আন্দোলন কেবল একটি অতীত স্মৃতি নয়, এটি একটি নিরন্তর পথপ্রদর্শক। একুশের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতি প্রথমবার ‘মা’, ‘মাটি’ এবং ‘মানুষ’-এর অধিকারের সপক্ষে গর্জে উঠেছিল। যে রাষ্ট্রচেতনার উত্তরণ ১৯৫২ সালে শুরু হয়েছিল, তা আজ একটি পূর্ণাঙ্গ জাতিরাষ্ট্রের রূপ নিয়েছে। একুশ আমাদের শিখিয়েছে যে, আত্মত্যাগ ছাড়া কোনো বড় অর্জন সম্ভব নয়। ‘‘আমাদের ভাষা, আমাদের স্বাধীনতা’’—এই শ্লোগানটি আমাদের ইতিহাসের এক অখণ্ড সত্তা। ভাষার মর্যাদা রক্ষা করার অর্থ হলো নিজের অস্তিত্বকে রক্ষা করা। আর চিন্তার স্বাধীনতা রক্ষা করার অর্থ হলো স্বাধীনতার ভিত্তি মজবুত করা। ২০২৬ সালের এই দিনে আমাদের শপথ হোক—শহীদদের রক্তস্নাত এই বাংলাকে একটি আধুনিক, সমৃদ্ধ ও ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতি সুরক্ষিত থাকবে। একুশ আমাদের ধ্রুবতারা, একুশই আমাদের ভবিষ্যতের দিশারী। শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা আমাদের এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখব—স্বগৌরবে, স্বমহিমায়।

লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান, থিয়েটার এন্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ট্যাগ: মতামত
রাত জেগে নফল ইবাদতের পর ফজর না পড়ার ক্ষতি
  • ১৭ মার্চ ২০২৬
কনটেন্ট ক্রিয়েটর রাকিব খুন: তদন্তে বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ…
  • ১৭ মার্চ ২০২৬
২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের আইসিইউ চালুর আশ্…
  • ১৭ মার্চ ২০২৬
সকালের মধ্যেই ৮ জেলায় ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের শঙ্কা, নদীবন্দরে সত…
  • ১৭ মার্চ ২০২৬
সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ফ্রি ওয়াই-ফাই সেবার উদ্বোধন করলেন প্রধা…
  • ১৭ মার্চ ২০২৬
হাম রোগে শিশুর মৃত্যু, মহাখালী সংক্রামক হাসপাতালে ভাঙচুর
  • ১৭ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence