দেশে দেশে জেন-জি বিক্ষোভ: নেপাল কেন বাংলাদেশ হতে চায় না

১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:৩০ AM
নেপালে জেন-জি বিক্ষোভ/ ইয়াসির সিলমী

নেপালে জেন-জি বিক্ষোভ/ ইয়াসির সিলমী © টিডিসি সম্পাদিত

সম্প্রতি নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সেদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কারকি বলেছেন, ‘নেপালকে কোনোভাবেই বাংলাদেশ হতে দেওয়া হবে না’। তাঁর এই মন্তব্য এ অঞ্চলের রাজনীতি ও গণতন্ত্র নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কথাটি শুনতে প্রথমে বাংলাদেশবিরোধী কিংবা অবজ্ঞাসূচক মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরে গেলে বোঝা যায়, এটি আসলে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন এবং একই সঙ্গে নেপালের জন্য একটি সতর্কবার্তা।

এই বাস্তবতায় কারকির বক্তব্যে বাংলাদেশ একটি নেতিবাচক উদাহরণ হিসেবে উঠে আসা নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর। কিন্তু প্রশ্ন হলো—তিনি কি বাংলাদেশকে অবজ্ঞা করেছেন, নাকি আমরা নিজেরাই এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছি, যেখানে অন্য দেশ আমাদের দেখে সতর্ক হতে বাধ্য হচ্ছে?

দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপাল—এই তিন দেশই প্রায় কাছাকাছি সময় গণ-আন্দোলনের মুখে সরকার পরিবর্তনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। এখানে জনরোষ, অর্থনৈতিক সংকট, শাসনব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতা, দুর্নীতি, দুঃশাসন ইত্যাদি বিষয়গুলো সরকার পতনের নেপথ্যে কাজ করেছে। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এই তিন দেশের পথচলা একরকম হয়নি। এখানেই সুশীলা কারকির মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

শ্রীলঙ্কা, চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পরও কঠিন সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে ফিরছে। নেপাল এখনো সেই পরীক্ষার মধ্যেই আছে—অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর চাপ, তরুণদের ক্ষোভ, রাজপথের উত্তাপ মিলিয়ে চাপে থাকলেও নির্বাচনের পথেই আছে। আর বাংলাদেশ? এখানেই কারকির বক্তব্য সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তোলে।

বাংলাদেশ বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচন নিয়ে চলে আসা নানা অনিশ্চয়তা, জুলাই সনদ নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের আয়োজনে রাজনৈতিক দলগুলোর অনৈক্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, মব কালচার এবং কথায় কথায় আন্দোলনের এক জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকার ও জনগণ—দু’পক্ষই যেন ক্লান্ত, কিন্তু সমাধানের পথ নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারছে না। এমন প্রেক্ষিতে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে যে উৎকণ্ঠা, তা শুধু সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বড় সুযোগ। প্রশ্ন হলো, আমরা সে সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারবো কি না? উত্তর সময়ের হাতেই তোলা থাকলো।

এদিকে সুশীলা কারকি নেপালের অন্তর্বর্তী সরকারকে তিনি একটি ‘আকস্মিক ঝড়’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। ঝড় আসে, সবকিছু ওলটপালট করে দেয়, কিন্তু ঝড়ের কাজ শেষ হলে স্থিতি ফেরানোই আসল চ্যালেঞ্জ। কারকির আক্ষেপ—ঝড়ের মধ্যে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার পর এখনই সরে দাঁড়াতে বলা হচ্ছে, প্রতিদিন হুমকি দেওয়া হচ্ছে, অপমান করা হচ্ছে।

অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো তাৎক্ষণিক আবেগের বিষয় নয়। আন্দোলনের উত্তাপ কেটে গেলে সামনে আসে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি ও নির্বাচন—যেগুলো সামলাতে প্রয়োজন ধৈর্য, সময় ও রাজনৈতিক সংযম। বাংলাদেশে ঠিক এই জায়গাতেই সংকট ঘনীভূত হয়েছে।

কারকির বক্তব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ল দিক হলো, তরুণ প্রজন্মের প্রসঙ্গ। জেন-জিদের প্রতিদিনের দাবিদাওয়া, ‘আজ ছাড়ো, কাল ছাড়ো’ ধরনের স্লোগান—এসবের ভেতর দিয়ে তিনি একধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতার চিত্র তুলে ধরেন। রাজনীতি যে কেবল আবেগ দিয়ে নয়, ধৈর্য ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোয়—এই সত্যটিই যেন ভুলে যাচ্ছে সবাই।

এই চিত্র বাংলাদেশের জন্যও অচেনা নয়। তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও প্রতিবাদ গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু সেই প্রতিবাদ যদি দিকনির্দেশনাহীন, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা ‘সব ভাঙো’ মানসিকতায় রূপ নেয়, তবে তা রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেয় না; বরং আরও দুর্বল করে। একইভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ ছাড়া কোনো অন্তর্বর্তী সরকারই কার্যকর হতে পারে না।

কারকি যখন বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ চাই না’, তখন সেটিকে সরলভাবে বাংলাদেশকে অবজ্ঞা বলা সহজ। কিন্তু বাস্তবে তিনি বলতে চেয়েছেন, তিনি নেপালকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা, লাগাতার আন্দোলন, নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থাহীনতার পথে ঠেলে দিতে চান না। এই ‘বাংলাদেশ’ এখানে একটি প্রতীকি অর্থে ব্যবহৃত একটি দেশ, যেখানে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও স্থিতিশীলতা আসেনি।

আমি মনে করি, নেপালের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য আমাদের জন্য বিবেকের আয়নার সামনে দাঁড়ানোর এক উপলক্ষ। এতে আত্মসমালোচনার সুযোগ আছে, নিজেদের ভুলত্রুটি শুধরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি আছে। কারকির মন্তব্য এটাও প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংকট শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়; বহিঃবিশ্ব, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোও তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সুশীলা কারকি যখন বাংলাদেশের উদাহরণ টানেন, তখন সেটি আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কারণ একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কেবল তার অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এর প্রভাব পড়ে বিনিয়োগ, কূটনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তায়।

তাই কারকির বক্তব্যে আমরা কি ক্ষুব্ধ হব, নাকি আত্মসমালোচনার সুযোগ হিসেবে নেব? বাস্তবতা হলো, কোনো দেশই অন্য দেশের মতো হতে চায় না, যদি সেই ‘মতো হওয়া’ মানে হয় অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। একই সঙ্গে এটাও সত্য, বাংলাদেশ একসময় দক্ষিণ এশিয়ায় উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতির উদাহরণ ছিল। আজ সেই দেশের নাম যদি সতর্কবার্তা হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে দায় আমাদেরই নিতে হবে।

সুশীলা কারকির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি নির্বাচনকে রাজনৈতিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের একমাত্র পথ হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ ভালোই ভালোই নির্বাচন দিয়ে দায়িত্ব ছেড়ে দিতে চান। বাংলাদেশে যেখানে নির্বাচন নিয়ে ঐকমত্যে আসতে ঢের সময় লেগেছে, সেখানে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর এই অবস্থান আমাদের জন্য শিক্ষা হতে পারে।

আমরা কি পারব আবার ঘুরে দাঁড়াতে? আমরা কি পারব নির্বাচনকে সংঘাত নয়, সমাধানের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে? নাকি প্রতিবেশী দেশের নেতাদের মুখে বারবার শুনতে হবে, ‘আমরা বাংলাদেশ হতে চাই না।’

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই বলে দেবে আমাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং সবচেয়ে বড় কথা—সম্মিলিতভাবে সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা কতটুকু। কারণ অন্যের মুখে সতর্কবার্তা হয়ে ওঠার চেয়ে নিজেদের পথ নিজেরা ঠিক করাই একটি জাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের ইতিহাস হতাশার নয়। এই দেশ বহু সংকট মোকাবিলা করে বারেবারে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐক্য, প্রজ্ঞা, সহনশীলতা ও একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনী প্রক্রিয়া। সেইসাথে প্রয়োজন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের আন্তরিকতা, নিরপেক্ষতা ও দায়বদ্ধতা। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যদি অংশগ্রহণমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হয়, তবে বাংলাদেশ আবারও প্রমাণ করতে পারবে—সে কোনো দেশের জন্য সতর্কবার্তা নয়, বরং গণতন্ত্রের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

লেখক: শিক্ষক, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।

তিন প্যাকেটজাত খাদ্যে অতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ, বিক্রি ও বিপণন…
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
স্ত্রীর উদ্দ্যেশে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে পুলিশ সদস্যের আত্মহত্যা
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনাল দেখতে মাঠে থাকবেন স্পেনের প্রধা…
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ডেইরি খামারিদের ৪০০ বস্তা গোখাদ্য বিতরণ
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
টেক্সট ও স্ক্রোল করার সময় বুড়ো আঙুলের ব্যথা কমাবেন যেভাবে
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
বিশ্বকাপ ফাইনালে গ্যালারিতে থাকবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence