বেগম খালেদা জিয়া © টিডিসি সম্পাদিত
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম কেবল ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে যুক্ত নয়, বরং সময়ের সংকটে গণতন্ত্রের পক্ষ হয়ে দাঁড়ানোর সাহসী প্রতীক। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই এক নাম। দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি ক্ষমতায় যেমন ছিলেন, তেমনি ক্ষমতার বাইরে থেকেও গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও জনগণের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষায় আপসহীন অবস্থান নিয়েছেন। এই ধারাবাহিক সংগ্রামই তাঁকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আগমন কোনো পরিকল্পিত ক্ষমতার অভিযাত্রা ছিল না। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮১ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের সময়ে। সামরিক শাসন, গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ ও ভিন্নমত দমনের প্রেক্ষাপটে রাজনীতির ময়দানে তাঁর এই প্রবেশ ছিল সাহসী সিদ্ধান্ত। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিজেকে একজন দৃঢ়চেতা ও গণমানুষের নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব ছিল আপসহীন ও ধারাবাহিক। রাজপথের আন্দোলন, দলীয় সংগঠন শক্তিশালী করা এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। গ্রেপ্তার, গৃহবন্দিত্ব ও রাজনৈতিক নিপীড়ন সত্ত্বেও তিনি আন্দোলন থেকে কখনো সরে আসেননি। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসনের পতন ঘটলে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সেই অধ্যায়ে তাঁর ভূমিকা এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
১৯৯১ সালে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়া শুধু একটি রাজনৈতিক নজিরই স্থাপন করেননি, বরং সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন। রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থার অবসান ও সংসদীয় পদ্ধতির কার্যকর প্রয়োগ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে সুদৃঢ় করে। পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় তাঁর ভূমিকা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।
ক্ষমতার বাইরে থাকাকালীন সময়েই বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক চরিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নির্বাচন, সংসদ, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা প্রশ্নে তিনি বরাবরই কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। দীর্ঘ সময় কারাবরণ, শারীরিক অসুস্থতা ও রাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে যাননি। তাঁর সমর্থকদের মতে, এই অনমনীয় অবস্থানই তাঁকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জনপ্রিয় ও আপসহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিত করেছে।
পুরুষপ্রধান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব শুধু দলীয় রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি নারী নেতৃত্বের একটি শক্ত প্রতীক। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তারকারী নারী রাজনীতিবিদদের একজন। তাঁর রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও সংগ্রামী ভূমিকা বাংলাদেশের অসংখ্য নারীকে রাজনীতিতে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করেছে।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়; মানুষের বিশেষত রাজনীতিবিদদের ভুল-ত্রুটি থাকবে - এটাই স্বাভাবিক। তবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম, সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বিরোধী রাজনীতিতে আপসহীন অবস্থানের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি এমন এক রাজনৈতিক চরিত্র, যাঁর জীবন ও নেতৃত্ব বাংলাদেশের গণতন্ত্রের উত্থান-পতনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
রাজনীতির করুণ ইতিহাসে দেখা যায় তাকে ষড়যন্ত্রকারীরা দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে চিত্রিত করার প্রয়াস চালিয়েছে। অথচ দুর্নীতি ও অপরাধের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় কঠোর অবস্থানে ছিলেন। এমনকি তার এ অবস্থানের কারণে সরকারে থাকা অবস্থায় তার অনেক কাছের লোকের সাথেও সম্পর্ক মলিন হয়েছে বলে শোনা যায়। একটি সূত্রে জানা যায়, "চার দলীয় জোট সরকারের আমলে তৎকালীন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী জামায়াত নেতা মুজাহিদ সাহেব এক এতিমখানা পরিচালককে ফোন দিয়ে ঐদিন দুপুরে বাচ্চাদের খাবারের মেন্যু জানতে চাইলে বলেন- ইলিশ মাছ, সবজি, ডাল ইত্যাদি। মন্ত্রী মহোদয় ফোন রেখে সোজা এতিমখানায় চলে যান এবং সোজ গিয়ে রান্না ঘরে প্রবেশ করেন। পাতিল উল্টিয়ে দেখেন ইলিশ নয় পঁচা সিলভার কার্প মাছ রান্না হচ্ছে এবং ভ্যাপসা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বাবুর্চির সাথে আলাদা করে কথা বলে জানলেন এরকম পঁচা-বাসি খাবার রান্না হয় এবং কাবারে রং আনার জন্য ইট ভেজানো পানি ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয়। সব শুনে মুজাহিদ সাহেব পরিচালক কে শোকজ করেন। সেখান থেকে ফেরার পথে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া উনাকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করেন যে, এতিমখানায় কী হয়েছে? তিনি ঘটনা বললে বেগম জিয়া উনাকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর অফিসে আসতে বলেন। মুজাহিদ সাহেব ওখানে যাওয়ার পর বলেন যে, সে পরিচালক ফোন করে বলেছে সে বিএনপি করে এজন্য তাকে সরানোর চেষ্টা হচ্ছে। মুজাহিদ সাহেব থেকে সব শোনে বেগম জিয়া বললেন- কি ব্যবস্থা নিয়েছেন? উনি বললেন, শোকজ করেছি। বেগম জিয়া বললেন - ভুল করেছেন, এই নেন বলে একটা খাম এগিয়ে দিলেন এবং বললেন, আপনি রাস্তায় থাকতেই আদেশ রেডি করিয়েছি, বহিষ্কার করেন। আপনি স্বাক্ষর করে পাঠিয়ে দেন এবং প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেন।" এ একটি ঘটনার দিকে খেয়াল করলেও সহজে অনুমেয় যে, বেগম জিয়া শুধু আন্দোলন -সংগ্রামে আপসহীন ছিলেন না বরং দুর্নীতির বিরুদ্ধে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায়ও সোচ্চার ছিলেন।
ফ্যাসিবাদের নানা জেল, জুলুম, মানসিক নির্যাতনের যাঁতাকলে জর্জরিত অবস্থায় জুলাই'২৪ এর ছাত্র-গণ অভ্যুত্থান এর মধ্য দিয়ে জনতার মাখে ফিরে এলেও ছিলেন শারীরিকভাবে অনেক অনেক অসুস্থ। এমতাবস্থায় গতকাল ৩০ ডিসেম্বর ভোরবেলায় এ অদম্য সাহস, সময়ের প্রয়োজনে গৃহিণী থেকে রাজপথের আপসহীন নেত্রী বনে যাওয়া বেগম জিয়া এ পৃথিবীকে চির বিদায় জানান। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আল্লাহ মরহুমাকে ভুল -ত্রুটি ক্ষমা করে ভাল কাজগুলোর ওসিলায় জান্নাতবাসী হিসেবে কবুল করুন - এ কামনা করি এবং শোক সন্তপ্ত পরিবার ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।
গণতন্ত্র কোনো স্থায়ী অর্জন নয়; এটি প্রতিনিয়ত রক্ষা করতে হয়। বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন সেই সত্যই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে তাঁর আপসহীন অবস্থান তাঁকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অধিষ্ঠিত করেছে। চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনে তার উপস্থিতির যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ হওয়ার নয়। তার সংগ্রামী, বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন অনাগত বাংলাদেশপন্থী রাজনৈতিক কর্মী ও মুক্তিকামীদের জন্য অন্যায় ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এবং ন্যায় ও গণ মানুষের আপসহীনতায় অনন্য অনুপ্রেরণার উৎস ও অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
বিদায়! আপসহীন দেশনেত্রীর বিদায়!
লেখক: শিক্ষক, সংগঠক ও এক্টিভিস্ট