‘দ্বিতীয়বার পিতৃহারা হলাম’ শিক্ষাগুরু যতীন সরকারকে নিয়ে স্মৃতিচারণ

১৮ আগস্ট ২০২৫, ০৭:১৪ PM , আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০২৫, ১০:১০ PM
অধ্যাপক যতীন সরকারের সঙ্গে লেখক

অধ্যাপক যতীন সরকারের সঙ্গে লেখক © ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

২০০৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারির ভোর। প্রচণ্ড শীতের কুয়াশা ভেদ করে বাগেরহাট থেকে ময়মনসিংহ যাচ্ছি। কিছুক্ষণ আগে বাবার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে রওনা হয়েছি। আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টকর যাত্রা ছিল সেটি। রাস্তা শেষ হতে চায় না। নানা স্মৃতি বুক বিদীর্ণ করে আমাকে অশ্রুসিক্ত করে রেখেছে। আপনজনদের বারবার ফোন আসছে—এখন কোথায় আছি, কতদূর আছি। বাবার নিথর দেহ শুধু আমার জন্য অপেক্ষা করছে। নয় ঘণ্টার অসহনীয় যাত্রা শেষে যখন বাসায় পৌঁছলাম তখন বাবার দেহ ঘিরে অগণিত শুভানুধ্যায়ীর ভিড়। মৃদু হাসি মাখা বাবার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে যখন কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছি, তখন যতীন স্যার (অধ্যাপক যতীন সরকার) পরম মমতায় ‘রাজীব, বাবা…’ বলে আমার মাথায় হাত রাখলেন। তখনো স্যারের পরিবারের সাথে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি। কিন্তু পরিচয়ের প্রথম দিন থেকেই স্যারকে পরমাত্মীয় হিসেবে পেয়েছি।

১৯৯৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারির বিকেল। সেদিন প্রথম যতীন স্যারকে দেখার সৌভাগ্য হয় আমার। আমি তখন ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র। দৈনিক সংবাদে ব্যাকরণ বিষয়ে আমার একটি লেখা পড়ে খুশি হয়েছিলেন স্যার। আমার এক শিক্ষকের মাধ্যমে খবর পাঠিয়েছিলেন তাঁর সাথে দেখা করতে। সেই সুবাদে বাবা আমাকে নিয়ে যান স্যারের বাসায়। প্রায় চার ঘণ্টা কীভাবে কেটে গেল জানি না। সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ধর্ম, দর্শন বিষয়ে নানা কথা শুনতে শুনতে সম্মোহিত হয়ে পড়লাম। তখন জানতাম না এ সম্মোহনের ঘোর কোনোদিন কাটবে না। বছরের পর বছর পেরিয়ে স্যারের সাথে পরিচয়ের তিন দশক কেটে গেছে। শ্রেণিকক্ষে তিনি আমার শিক্ষক ছিলেন না, তবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক ছিলেন তিনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁর কথা শুনে কখনো বা তাঁর সাথে কথা বলে শেখার চেষ্টা করেছি। আমার মনে জ্ঞানতৃষ্ণা, যুক্তিবাদিতা, মুক্তচিন্তা বিজ্ঞানমনস্কতা ও মানবিকতার বীজ বপন করেছিলেন তিনি। এ বীজ থেকে যদি কোনো বৃক্ষ তৈরি না হয় সে ব্যর্থতা একান্তই আমার। শুধু আমার প্রাণে নয়, কয়েকটি প্রজন্মের অগণিত শিক্ষার্থী ও অনুরাগীর প্রাণে তিনি জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে হয়ে উঠেছিলেন অনন্য বাতিঘর। দেশে ও বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে সেই বাতিঘরের দ্যুতি।

২০২৫ সালের ১৩ আগস্টের বিকেল। সতেরো বছর আগের মতোই আরেক অসহনীয় ব্যথাতুর যাত্রা আমার। এবারও গন্তব্য ময়মনসিংহ। কী কাকতালীয়! লক্ষ্মীপুর থেকে ছুটে যাচ্ছি যতীন স্যারকে শেষবারের মতো দেখতে। গাড়ি যেন চলছে না। আবারও অন্তহীন যাত্রা। ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে স্যারের মৃত্যু সংবাদ। ফেসবুকে, ইউটিউবে শত শত ছবি আর ভিডিও। অগণিত ভক্ত-অনুরাগী পরিবেষ্টিত হয়ে আছে স্যারের প্রাণহীন দেহ। তীব্র বেদনায় বুকটা হাহাকার করে উঠল। সতেরো বছর আগের মতোই বারবার ফোন আসছে—আর কতক্ষণ লাগবে আমার পৌঁছাতে। স্যারের দেহ ততক্ষণে ময়মনসিংহ থেকে নেত্রকোনায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। আবার নয় ঘণ্টার রক্তাক্ত যাত্রা শেষে আমি পৌঁছে যাই নেত্রকোনার তীর্থস্থান ‘বানপ্রস্থে’। সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। স্বজনদের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে বাতাস, ফুলে ফুলে ঢেকে গেছে স্যারের দেহ। প্রচণ্ড কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। কিন্তু সতেরো বছর আগের মতো আমার মাথায় হাত রাখার মতো সেদিন কেউ ছিলেন না। সেই স্মৃতি বারবার ফিরে এসেছে। দ্বিতীয় বারের মতো পিতৃহারা হয়েছি আমি। দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক জগৎ হারিয়েছে একজন অতুলনীয় অভিভাবককে।

রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করে স্যার বারবার আমাদেরকে শিখিয়েছেন─‘সত্য যে কঠিন,/কঠিনেরে ভালোবাসিলাম,/সে কখনো করে না বঞ্চনা’। সত্যভাষী ও স্পষ্টবাদী স্যার বলতেন─‘মনেরে আজ কহ যে,/ভালো মন্দ যাহাই আসুক/সত্যরে লও সহজে।’ 

আজ ১৮ আগস্ট স্যারের নব্বইতম জন্মদিন। শারীরিকভাবে স্যার আমাদের মধ্যে নেই─এই কঠিন নির্মম সত্যটিকে কীভাবে সহজে গ্রহণ করব? স্যার আমাদেরকে কত কিছু শিখিয়েছেন। একবার যদি তাঁর না থাকার মতো কঠিন সত্যকে সহজে গ্রহণ করার শিক্ষাটুকু আমাদেরকে দিয়ে যেতেন!

স্যারের কাছে পুত্র ও শিষ্যের আসন লাভ করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। প্রতিবছর ১৮ আগস্ট এই শিক্ষাগুরুর সান্নিধ্য পেতে ছুটে যেতাম, না যেতে পারলে ফোনে কথা বলতাম। বরাবরই আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করতেন। আমি বিশ্বাস করি না, আমার মাথার উপর থেকে স্যার তাঁর উদার হাতটুকু সরিয়ে নিয়েছেন। তাঁর আশীর্বাদের স্পর্শ আমি প্রতিনিয়ত অনুভব করি। স্যারের নব্বইতম জন্মদিনে আমার সকৃতজ্ঞ প্রণতি।

রাজীব সরকার: লেখক ও প্রাবন্ধিক, জেলা প্রশাসক, লক্ষ্মীপুর

ফাইনালের আগে বড় দুঃসংবাদ দিলেন মার্তিনেজ
  • ১৮ জুলাই ২০২৬
বরগুনায় ইসমাইল শাহ’র মাজারে ফের অগ্নিসংযোগের অভিযোগ
  • ১৮ জুলাই ২০২৬
যশোরের এইচআইভি সংকেত: নীরবতার নয়, সচেতনতার সময়
  • ১৮ জুলাই ২০২৬
এইচএসসিতে আজ কেউ বহিষ্কার হয়নি
  • ১৮ জুলাই ২০২৬
বিয়ের গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিহত ২, কনে আইসিইউতে, বর-সহ ১২ …
  • ১৮ জুলাই ২০২৬
যে ৫ জেলায় স্বল্পমেয়াদী বন্যার শঙ্কা, কী বলছে আবহাওয়ার পূর্…
  • ১৮ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence