কেন প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ায় ছিলেন ফসলের সুষম বণ্টন চাওয়া কবি?

১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০২:৪৬ PM
কবি আল মাহমুদ ও আলমগীর শাহরিয়ার

কবি আল মাহমুদ ও আলমগীর শাহরিয়ার

কবি আল মাহমুদকে আমি প্রথম দেখি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন পাঠাগার সিলেটের কেমুসাসে। একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে সেদিন পাঠাগারে পড়তে গেছি। অডিটোরিয়ামে চোখ পড়ার পর কাউকে বলতে শুনলাম, ঢাকা থেকে আল মাহমুদ এসেছেন। শুনে একটু কৌতূহল হলাম। একটু ভালো করে দেখবার জন্য আমি বেশ কয়েকবার অনুষ্ঠান স্থলে উঁকিঝুঁকি দিলাম এবং অনুষ্ঠান শেষে বেশ কাছ থেকে কবিকে দেখলাম, শুনলাম। দেশের কোন প্রধান কবিকে সেই আমার প্রথম দেখা। ইতোমধ্যে আমার কবির আত্মজীবনী ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ পড়া হয়ে গেছে। এই মুগ্ধতা আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই। তবে দেশের একজন প্রধান কবিকে কাছে পেয়ে বেশ কৌতূহল ছিলো— সেটাও অস্বীকার করার কোন জো নেই।

বিবিসি বাংলা বছর কয়েক আগে কবি আল মাহমুদকে প্রশ্ন করেছিল, আপনার বিরুদ্ধে অনেকেই অভিযোগ তুলেন আপনি নাকি যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের রাজনীতিতে আস্থা রাখেন, পৃষ্ঠপোষকতা পান? অনুষ্ঠানটি সেই সন্ধ্যায় আমি শুনছিলাম। বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম, জামায়াতের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্ক বা কোন ধরনের যোগসাজশ সাক্ষাৎকারে তিনি অস্বীকার করেছিলেন।

আমরা দেখতাম শামসুর রাহমান যখন বেঁচেছিলেন তখন সাবেক কমরেড অধ্যুষিত দেশের একটি প্রধান দৈনিক শামসুর রাহমানকে যে কভারেজ দিত আল মাহমুদকে অতোটা দিত না এবং তাদের দু’জনের মধ্যে গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকার পরও একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা জিইয়ে রাখত।— কে প্রধান? আল মাহমুদ না শামসুর রাহমান? কিন্তু আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম শামসুর রাহমান মারা যাওয়ার পর আল মাহমুদের উপর তাদের মনোযোগ বেড়ে গেল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখলাম তাদের অখণ্ড মনোযোগ এই কবিকে ঘিরে এবং তিনি তাদের ফুল পেজ কভারেজ পাওয়া শুরু করলেন। এমনকি তাদের প্রকাশনা থেকে বের হলো তাঁর বইও।

আল মাহমুদ রাজনৈতিকভাবে আদর্শচ্যুত ছিলেন বলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর ছুঁড়তে দেখা গেছে সবসময়। স্বাধীনতা উত্তর বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে ঘোর সরকার বিরোধী পত্রিকা হিসেবে খ্যাত ‘গণকন্ঠ’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে কলকাতায় নির্বাসনে থাকা আল মাহমুদ। বঙ্গবন্ধু সরকার উৎখাতে এই পত্রিকার একটা বড় ভূমিকা ছিল। অথচ ৭৫ সালেই বঙ্গবন্ধু তাঁর অসীম রাজনৈতিক উদারতার পরিচয় দিয়ে কবিকে শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহপরিচালক পদে নিয়োগ দেন।

বই হাতে কবি আল মাহমুদ

 

উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর তিনি এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হয়েছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক আনুগত্য নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় আনুগত্য তাঁর শিল্পচর্চায়। সে আনুগত্য আমৃত্যু তাঁর নিরঙ্কুশ ছিল। এমনকি দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পাবার পরও। তাঁর কাব্যপ্রতিভা, লেখক সত্তা নিয়ে কারোর কোন সংশয় নেই। ১৯৬৮ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে ‘লোক লোকান্তর’ ও ‘কালের কলস’ কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।

বিএনপি’র শাসনামলে জামায়াতের রমরমা অর্থনৈতিক অবস্থায় চরম অর্থকষ্টে থাকা আল মাহমুদ তাদের আর্থিক সহযোগিতা নিয়েছেন। জামায়াত-শিবিরের অনেক অনুষ্ঠানে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। তাদের মিডিয়ায় তাঁর সরব উপস্থিতি দেখা গেছে। অথচ তাঁর লেখা ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ পড়লে দেখি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোড়াইল গ্রামে জন্ম নেওয়া মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ কৈশোরেই বাম রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েন। শুধু কবি হবেন বলে ঢাকা শহরে ফুল আঁকা একটি টিনের ট্রাঙ্ক হাতে নিঃস্ব অবস্থায় এসেছিলেন।

লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য নাগরিক জীবনে মোহান্ধ কবি লিখেছিলেন, ‘যদি পায়ে পড়ে কহড়, তবুও ছেড়ো না শহর।’ প্রশ্ন ওঠে কৈশোরেই প্রগতিশীল রাজনীতির দীক্ষা নেওয়া কবি স্বাধীনতা উত্তর সময়ে প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ায় আশ্রয় নিলেন কেন? উচ্চশিক্ষা নিতে না পারা কবিকে নাগরিক জীবনে পদে পদে কতিপয় ফাঁপা জাত্যভিমানে ভরা উচ্চশিক্ষিতদের অবহেলার শিকার হতে হয়েছে, বঞ্চিত হয়েছেন তাঁর প্রাপ্য সম্মান থেকে, তাঁর সহজাত প্রতিভা, সৃজন ও সৃষ্টিশীলতাকে পাশ ঠেলে গ্রাম্য কবি বলে নিগৃহ ও অবহেলার শিকারও হয়েছেন জীবনভর— এসব কী তাকে প্ররোচিত করেছিল সুযোগসন্ধানী প্রতিক্রিয়াশীলদের সহানুভূতি ও সম্মান নিতে? এ নিয়ে সহজে কোন উপসংহারে পৌঁছানো যাবে না। নিশ্চয়ই আরও আলোচনা ও বিতর্ক হবে।

কিন্তু আমি অবাক হই ভেবে যখন দেখি ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় আল মাহমুদ লিখেছেন,
‘ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক!
শুয়োর মুখো ট্রাক আসবে
দুয়োর বেঁধে রাখ।
কেন বাঁধবো দোর জানালা
তুলবো কেন খিল?
আসাদ গেছে মিছিল নিয়ে
ফিরবে সে মিছিল।
ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক!
ট্রাকের মুখে আগুন দিতে মতিয়ুরকে ডাক।
কোথায় পাবো মতিয়ুরকে ঘুমিয়ে আছে সে !
তোরাই তবে সোনামানিক আগুন জ্বেলে দে...’

এ কবিতা আজও মানুষের মুখে মুখে ফিরে। তারও আগে বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা কবিতা শহীদ বেদীতে আজও উচ্চারিত হয় সম্ভ্রমে,

‘ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ
দুপুর বেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায় ?
বরকতের রক্ত।
হাজার যুগের সূর্যতাপে
জ্বলবে এমন লাল যে,
সেই লোহিতেই লাল হয়েছে
কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে !”

আর মাকে নিয়ে লেখা কবিতা—

‘আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে
হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে।
নদীর কাছে গিয়েছিলাম, আছে তোমার কাছে?
-হাত দিও না আমার শরীর ভরা বোয়াল মাছে।
বললো কেঁদে তিতাস নদী হরিণবেড়ের বাঁকে
শাদা পালক বকরা যেথায় পাখ ছাড়িয়ে থাকে।...’

বিপ্লবী রাজনীতিতে বিশ্বাসী কবি লিখেছিলেন, ‘শ্রমিক সাম্যের মন্ত্রে কিরাতের উঠিয়াছে হাত/ হিয়েনসাঙের দেশে শান্তি নামে দেখো প্রিয়তমা/, এশিয়ায় যারা আনে কর্মজীবী সাম্যের দাওয়াত/ তাদের পোশাকে এসো এঁটে দিই বীরের তকোমা/আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন।...’

বিস্ময় লাগে ‘সোনালি কাবিন’, ‘পানকৌড়ির রক্ত’— লেখা আল মাহমুদ এক সময় আশ্রয় নিয়েছিলেন জামায়াতের ছায়ায়। মৃত্যু তাঁর রাজনৈতিক ভুল ভ্রান্তি থেকে তাকে মুক্তি দিক। তিনি জামায়াতের সংশ্রবে থেকেও অস্বীকার করেছেন তাদের। এ কথা মনে হলে আমি তাঁর প্রতি কোন বিদ্বেষ পুষে রাখতে পারি না। কারণ বাংলা ভাষায় তাঁর সৃষ্টি অতুলনীয়। তাই রাজনৈতিক বিভাজন ও বিতর্কের বাইরে দুই বাংলায় একজন কবি ও লেখক হিসেবে আল মাহমুদ সমান জনপ্রিয়।

আলমগীর শাহরিয়ার একজন কবি ও গবেষক।

গননা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভোট কেন্দ্র পাহাড়া দিতে নেতাকর্মীদ…
  • ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
যুবলীগের চার নেতা গ্রেপ্তার
  • ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
মহিলাদের প্রচারে বাঁধা, সংঘর্ষে জামায়াতের ৬ কর্মী আহত
  • ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি নির্বাহী কমিটির সদস্য বহ…
  • ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
গবেষণার পাশাপাশি কারুকার্যেও সৃজনশীলতার ছাপ রেখে চলেছে শিক্…
  • ২৫ জানুয়ারি ২০২৬
জামায়াত নেতার বক্তব্যের প্রতিবাদে কুশপুত্তলিকা দাহ ও ঢাবি প…
  • ২৫ জানুয়ারি ২০২৬