ডাকসু নির্বাচন
জালাল আহমদ
দীর্ঘ ২৮ বছর স্থবির থাকার পর উচ্চ আদালতের রায়ের ফলে অনেকটা আইনী বাধ্যবাধকতার কারণে অচল ডাকসু সচল হতে শুরু করেছে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দফায় দফায় ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতাদের সাথে বৈঠকে বসেছে। প্রথম বৈঠক হয় গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর। তখন নিয়মিত শিক্ষার্থীরাই ভোটার হবে— এ বিষয়ে কেউ দ্বিমত করেনি। কখনো কখনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর কাছ থেকে লিখিত মতামতও চেয়েছে। ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল সংগঠন কিন্তু পরিবেশ পরিষদে নাই এমন সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের পক্ষ থেকেও ডাকসুর গঠনতন্ত্র এবং নির্বাচনী আচরণবিধি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ নামক সংগঠন ২০১৮ সালে আলোচিত কোটা সংস্কার আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে রাজপথে দাবি আদায়ে সংগ্রাম করেছে, রক্ত ঝরিয়েছে। বহু নেতা মামলা, হামলা, জেল, জুলুম, নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এখনো মামলরা গ্লানি বহন করে চলছে। ইতোমধ্যে সংগঠনের শীর্ষ নেতারা ডাকসু নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। গত ২৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত ঢাকা সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেটের সভায় অধিকাংশ ছাত্র সংগঠনগুলোর মতামতকে উপেক্ষা করে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে; তা ঢাবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, মূলত কোন বিশেষ সংগঠনকে সুবিধা দেয়ার জন্যই নেয়া হয়েছে।
এতদিন পরিবেশ পরিষদের বৈঠকে নিয়মিত শিক্ষার্থীরা ভোটার এবং প্রার্থী হবে— এ বিষয়ে সব সংগঠন একমত ছিল। কিন্তু গত ২১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত পরিবেশ পরিষদের বৈঠকে একটি সংগঠনের শীর্ষনেতা জানালেন, ‘ভোটার এবং প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি বয়সের ফ্রেমে বাঁধানোর জন্য, যেমনটা তাদের সংগঠনে’ আছে। তখন উপস্থিত সাংবাদিকেরা জানতে চাইলেন হঠাৎ আপনার মতের পরিবর্তন কেন? উত্তরে ঐ ছাত্রনেতা জানালেন, ‘পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে। এজন্য আমি বিষয়টি তুলে ধরেছি।’ কিন্তু কোন দেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে তা ওই নেতা জানায়নি। এক সপ্তাহ পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় তার হুবহু সিদ্ধান্তই উঠে এসেছে।
২০১৮ সালের ১৭ জানুয়ারি উচ্চ আদালতের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ৬ মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন করার আদেশ দিলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন কাদের স্বার্থে সেই নির্বাচনটা ৬ মাসের মধ্যে করে নাই, তা রাজনীতি সচেতন যে কোন শিক্ষার্থীই জানে। সেটা বোঝার জন্য লন্ডন থেকে ব্যারিস্টারী পাস করতে হয় না, অক্সফোর্ড থেকে পিএইচডি করতে হয় না কিংবা গবেষণার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য ডাকসু নির্বাচনের প্রধান বাধা দুটি। (১) ভোটার এবং প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে বয়সের সময়সীমা নির্ধারণ এবং (২) হলে হলে ভোটকেন্দ্র ।
(ক) বয়সের ফ্রেমে বাঁধা ডাকসুর নেতৃত্ব: ১. এবারই প্রথম বয়সের ফ্রেমে বাঁধানো হল ডাকসুর ভোটার এবং প্রার্থী হওয়ার সময়সীমা। এই বয়সসীমা অতীতে থাকলে ১৯৮৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারির ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগের সুলতান মনসুর ডাকসুর ভোটার পর্যন্ত হতে পারতেন না, ভিপি হওয়া তো দূরের কথা। কারণ সুলতান মনসুরের জন্ম ১৯৫৬ সালে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলায়। ১৯৮৯ সালে ডাকসুর নির্বাচনের সময় তার বয়স ৩৩। ২. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘকালীন ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক স্যারের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং প্রচেষ্টার ফলে সেশনজট কিছুটা কমে এসেছিল।ডাকসু নির্বাচনে ভোটার এবং প্রার্থী হওয়ার ৩০ বছর নির্ধারণ করার ফলে সেই সেশনজট আবার ফিরে আসবে। কারণ অনেকে ডাকসুর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য ইয়ার লস দিবেন। ৩. এমফিলের শিক্ষার্থীরা হলে সিট ধরে রাখার ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল গুলোতে আবাসন সংকট দেখা দিবে। ৪. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে যারা অনার্স, মাস্টার্স এবং এমফিল করছেন এমন শিক্ষার্থী, যাদের বয়সসীম তফসিল ঘোষণার দিন পর্যন্ত ৩০ বছর অতিক্রম করবে না, তারাই ডাকসু নির্বাচনে ভোটার এবং প্রার্থী হতে পারবেন। এই নিয়ম আগে থাকলে মাহমুদুর রহমান মান্না কখনো ডাকসুর পর পর দুইবার ভিপি হতে পারতেন না এবং ডাঃ মুশতাক হোসেন কখনো ডাকসুর জিএস হতে পারতেন না।কারণ মাহমুদুর রহমান মান্না চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭২-১৯৭৩ সালের জিএস ছিলেন। তিনি পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের জাদরেল নেতা ওবায়দুল কাদেরকে পরাজিত করে পর পর দুইবার ভিপি নির্বাচিত হন জাসদ ছাত্রলীগের মনোনয়নে। অপর দিকে ডাঃ মুশতাক হোসেন মেডিকেলের ছাত্র ছিলেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগে ভর্তি হয়ে ১৯৮৯ সালে ডাকসুর জিএস নির্বাচিত হন।
৫. যেসব ছাত্র সরকারি-বেসরকারি কিংবা দেশে-বিদেশে চাকরিরত, তারা ডাকসুর ভোটার হতে পারবেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ পেটের তাগিদে কিংবা পকেট খরচ চালানোর জন্য পার্টটাইম কিংবা ফুলটাইম চাকরি করে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এসব বেকার যুবককে বেকার ভাতা দিবে কিনা?কোন শিক্ষার্থী আদৌ কোন চাকরি করে কি করে না,তা কিভাবে জানবে? কোন শিক্ষার্থী যদি তথ্য গোপন রাখে তার শাস্তি কী হবে তা অস্পষ্ট। ডাকসুর ভোটার এবং প্রার্থীর বয়সসীমা ৩০ হবে কি-না কিংবা এমফিলের শিক্ষার্থীরা ভোটার এবং প্রার্থী হতে পারবে কিনা সে বিষয়ে ‘হা/ না’ গণভোট নেওয়া হোক।
(খ) হলে অনিয়মই নিয়ম: প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন হলের সংখ্যা ১৯ টি।২/১ টি হল ছাড়া বাকি হলগুলোতে কোন নিয়ম মোতাবেক ছাত্রদের রুম বরাদ্দ দেওয়া হয় না। কোন কোন হলের নিয়ন্ত্রণ একেবারে ক্ষমতাসীন সংগঠন ছাত্রলীগের হাতে। এসব হলে অনিয়মই নিয়ম, অন্যায়ই ন্যায়, দুর্নীতিই মূলনীতি। এসব হলগুলোতে ছাত্রলীগের কথার বাইরে যাওয়ার সাহস ছাত্রদের তো দূরের কথা, স্বয়ং হল প্রশাসনের পর্যন্ত নাই। হল প্রশাসন রুম বরাদ্দ দিলেও ছাত্রলীগ হল থেকে মেরে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে বের করে দেয়। তার ভুক্তভোগী আমি নিজেই। একটি ঘটনার উদাহরণ দিচ্ছি— দীর্ঘদিন হল প্রশাসনের কাছে আবেদন করে ধর্ণা দেওয়ার পরেও হলে আবাসিক রুম বরাদ্দ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কাছে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে একটা সিট বরাদ্দ পাওয়ার জন্য আবেদন করি। আমি তখন একটি জাতীয় পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি। সেই সুবাদে ভিসি স্যার আমাকে চিনতেন। আমার আবেদন দেখে তিনি তা মঞ্জুর করে মুহসীন হলের প্রভোস্টকে রেফার করলেন। হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের প্রশাসন আমাকে হলের ৪৫৮ নাম্বার রুমটি বরাদ্দ দিয়ে বলেন, ‘রুমে উঠার চেষ্টা করেন। বাধা এলে আপনি কিভাবে মোকাবিলা করবেন সেটা আপনার বিষয়।’ আমি বললাম, ‘আমি যদি বাধার সম্মুখীন হই, তাহলে সেটা আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মোকাবিলা করবো।’ আমি হলের আবাসিক কার্ড নিয়ে ঐ রুমে গেলাম। রুমে ঢুকে দেখি, ওই রুমটি অবৈধ এবং অনৈতিকভাবে দখল করে আছে গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক ছাত্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনিক কালের কণ্ঠের সাবেক প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম। সাংবাদিক হিসেবে রফিক ভাইয়ের নাম আমি এর আগেও শুনেছি। কিন্তু বাস্তবে তার চেহারা দেখিনি। ওইদিন তার সাথে প্রথমবার দেখা হল। রফিক ভাই আমার পরিচয় জানতে চাইলে আমি আমার পরিচয় দিলাম। তিনি বললেন, ‘তোমার সাহস তো কম না। তুমি আমার দখলে থাকা রুম বরাদ্দ নিয়েছ।’ আমি বললাম, এই রুম কারো নামে বরাদ্দ না থাকায় প্রশাসন আমাকে এই রুম বরাদ্দ দিয়েছে। আমার এক প্রশ্নের জবাবে তিনি নিজেই স্বীকার করলেন যে, ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পরেও হলের রুম জোরপূর্বক দখলে রাখাটা নীতি -নৈতিকতার পর্যায়ে পড়ে না। তিনি বললেন, ‘এই হলের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সানী (মেহেদী হাসান সানী) আমার এলাকার ছোট ভাই। আমি তাকে বলে দিচ্ছি তোমাকে অন্য একটা রুমে সিট দেওয়ার জন্য। তুমি রাতে সানীর সাথে দেখা কর।’
তখন আমি চিন্তা করলাম যে, ঠিক আছে কোন প্রকার মাথা গোঁজার জন্য একটা সিট পেলেই যথেষ্ট। রাতে সানী ভাইয়ের সাথে তার রুমে দেখা করতে গেলাম। আমাকে দেখে সানী ভাই রেগে আগুন। আঙুল উঁচিয়ে বললেন, ‘তোমার কত সাহস? তুমি রফিক ভাইয়ের রুমে ঢুকেছ। আমি বললাম, ‘হল প্রশাসন যেহেতু আমাকে ওই রুম বরাদ্দ দিয়েছে, তাই ঐ রুমে উঠার জন্য গেছি। তিনি বললেন, ‘আজ রাতেই হল থেকে বের হয়ে যাবি। কাল থেকে তোকে যেন এই হলে আর না দেখি। দেখলে তোর খবর আছে।’ আমি বলেছি, ঠিক আছে। আপনি কীভাবে আমাকে হল থেকে বের করে দেন দেখি। তারপর আমি রফিক ভাইকে কল করে জানালাম, ‘আপনি হয় আপনার রুমে আমাকে সাথে রাখেন; না হয় অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করে দেন। অন্যথায় আমি আদালতে আমার হলের সিট ফিরে পাওয়ার জন্য রিট করব।’ এরপর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মরত অন্যান্য সাংবাদিকদের কাছ থেকে আমার সম্পর্কে তথ্য নিলেন। সবাই জানালেন, সে তো আপোষহীন। তাই সে রিট করলে আপনার মান-সম্মান থাকবে না। তাই তার জন্য আপনি একটা সিটের ব্যবস্থা করে ফেলেন। রাত প্রায় ১২ টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মরত সাংবাদিক মীর আরশাদুল হক মোবাইলে কল করে ঘটনার বিস্তারিত জানতে চাইলেন।আমি বিস্তারিত বিবরণ দিলাম।তিনি বললেন, ‘কাল সকালে তুমি বিজয় একাত্তর হলে আমার রুমে এসো। তোমার সাথে আরো আলাপ আছে। পরদিন সকালে বিজয় একাত্তর হলে উনার রুমে গিয়ে দেখি, উনি ঘুমাচ্ছেন। তিনি ঘুম থেকে উঠা পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করলাম। ঘুম থেকে উঠার পর তাকে সবকিছু বুঝিয়ে বললে, তিনি ঘটনার সমাধানের আশ্বাস দিলেন। আমি বললাম, আপনি সমাধান করতে পারলে তো ভালো কথা।অন্যথায় আমাকে আইনী লড়াইয়ে দিকে যেতে হবে। এই বলে আমি চলে এসেছি। আরশাদুল ভাইয়ের সাথে রফিক ভাইয়ের কি কথা হয়েছে তা আমি জানি না।
তবে কিছুক্ষণ পর রফিক ভাই তারেক আল হাসান নির্ঝর নামে মুহসীন হলের এক ছাত্রের মোবাইল নাম্বার দিলেন। আমাকে তার সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। আমি মোবাইলের সূত্র ধরে হলের গেইটে নির্ঝরের সাথে পরিচিত হলাম। তিনি আমাকে তার দখলে থাকা ৩৫১ নং রুমে নিয়ে গেলেন। রুমে ঢুকে দেখলাম ৩ জনের রুমে গাদাগাদি করে ৫ জন আছেন। তবে এই রুমটি আমার আগের রুম ১০১৯ এর চেয়ে কিছুটা ভালো। তাই আমি এই রুমে থাকতে রাজি হলাম। ঐ রুমটি নির্ঝরের নামে বরাদ্দকৃত নয়। সেও দখল করে রুমটির জমিদার বনে গেছে। ঐ রুমে কে থাকবে আর কে থাকবে না সেটা নির্ভর করে নির্ঝরের মনের ইচ্ছার উপর। তাই তার কলেজ পড়ুয়া ছোট ভাই সীমান্তকে রুমে রাখার জন্য আমাকে বের করে নীলনকশা তৈরি করতে লাগলেন।একজনকে অন্য রুমে পাঠিয়ে তার ছোটভাইকে থাকার ব্যবস্থা করলেন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের মাঝখানে নির্ঝর বললেন, সামনে ৪৬২ নং রুমটি ফাঁকা হবে। ঐ রুমের বাসিন্দা হল ছেড়ে দিবে। ৪৬২ নং রুমটি অবৈধভাবে দখল করে আছে ছাত্রলীগের তৎকালীন সোহাগ- জাকির কমিটির এক সহ- সভাপতি। ঐ নেতা নিয়মিত রুমে থাকে না। রুমে থাকে তার এক আত্নীয়। হল প্রশাসন নির্ঝরের কথা মত আমার আবাসিক রুম পরিবর্তন করে দিলেন। আমার ৪৫৮ নং রুমটি নির্ঝরের নামে বরাদ্দ দিয়েছে হল প্রশাসন। যদিও ঐ রুমে নির্ঝর থাকে না। থাকে রফিক ভাই। আমাকে বরাদ্দ দিলেন ৪৬২ নং রুমটি। বরাদ্দ পাওয়ার পর ঐ রুমে উঠার জন্য কয়েকবার চেষ্টা করেছি। ছাত্রলীগের ঐ কেন্দ্রীয় নেতার দখলে রুমে উঠতে পারেনি।ঐ নেতাকে মোবাইলে কল করে প্রস্তাব দিলাম, ‘হয় আপনি রুমটি ছেড়ে দেন, না হয় আমাকে অন্য একটি রুমে থাকার ব্যবস্থা করে দেন।’ ঐ নেতা কোনটাই করলেন না। নির্ঝর এবং হল ছাত্রলীগের একটি অংশ আমাকে হল থেকে বের করে দেওয়ার উঠে পড়ে লাগলেন।
২০১৮ সালের ১৭ জানুয়ারি উচ্চ আদালতের রায়ের ফলে তখন ডাকসু নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। এরই মধ্যে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৭ তারিখ থেকে ঢাবির বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু করলে আমি একজন সাংবাদিক হিসেবে ঐ আন্দোলন সংবাদ সংগ্রহ করে রিপোর্ট করতাম। পাশাপাশি আমি আমার বন্ধুদের অনুরোধে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে আমার ফেসবুক আইডি থেকে নিয়মিত কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিভিন্ন নিউজ এবং পোস্ট শেয়ার দিতাম। এই তো পেয়ে গেল হল থেকে বের করে দেওয়ার অজুহাত। আমি গত বছরের ১ মার্চ যমুনা টিভিতে ডাকসু নিয়ে এক সাক্ষাৎকার প্রদান করি, যা ২ মার্চ টিভিতে সম্প্রচার করা হয়। ছাত্রলীগের কিছু নেতা মনে করেছে আমি হয়ত ডাকসু নির্বাচন করতে পারি। তাই ছাত্রলীগের একটি অংশ নির্ঝরকে ব্যবহার করে আমাকে রুম থেকে বারবার চলে যাওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। ৪ মার্চ দিবাগত রাত ১১ টা ৫৫ আমাকে নির্ঝর আমাকে জিজ্ঞেস করে আমি কেন রুম ছাড়ছি না। আমি বলি আমাকে রুম বরাদ্দ দিয়েছে হল প্রশাসন। হল প্রশাসন বললেই আমি রুম থেকে বের হয়ে যাব। এই রুম তোমার নামে বরাদ্দকৃত নয়। তাই তোমার কথায় বের হতে পারি না। এটা বলার পর সে আমাকে শার্টের কলার ধরে মারতে শুরু করে। রুমে উপস্থিত ফরহাদ ভাইসহ কয়েকজন নির্ঝরকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে। আমি রুম থেকে বের হয়ে ৪০৭ নং রুমে গিয়ে এক বড় ভাইয়ের কাছে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়ার জন্য গিয়েছিলাম।
কিন্তু দুর্ভগ্য সে রুমে বড় ভাই ছিল না। মোবাইলে কল করে জানতে পারলাম যে, তিনি এক জরুরি কাজে ব্যস্ত আছে। তিনি বললেন, ‘তুমি রাতে আমার রুমে থাক। আমি আসছি।’ কিছুক্ষণ পর সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে এসে হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সানী এবং হলে তার আশ্রয়ে থাকা বড় ভাই রফিকুল ইসলাম আমাকে শাসাতে থাকে। আমি ডাকসুর নির্বাচন নিয়ে কেন টিভিতে সাক্ষাৎকার দিলাম এবং কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে কেন নিয়মিত পোস্ট শেয়ার করি ইত্যাদি জিজ্ঞেস করলেন এবং বললেন আজ রাতেই হল থেকে বের হয়ে যেতে হবে। রাত প্রায় ৩টায় আমাকে আমার তোষক, বালিশ, বই-পুস্তকসহ হল থেকে বের করে দেওয়া হয়। তল্পিতল্পাসহ হল থেকে জোরপূর্বক বের করে দেওয়ার ছবি ফেসবুকে পোস্ট দিলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠে। এ যুগে ফেসবুক ছাড়া বাকস্বাধীনতার আর কোন জায়গা নাই।
আমি পুরান ঢাকায় আমার এলাকার এক ছোট ভাইয়ের বাসায় আশ্রয় নিলাম। সারারাত নির্ঘুম থাকায় আমার চোখ তখন জ্বলছে। ছোট ভাইয়ের বাসায় কিছুুুক্ষণ রেস্ট নেওয়ার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করতে আসি। চিকিৎসা শেষে ক্যাম্পসে এসেছি ক্লাস করতে। কিন্তু ঐদিন ক্লাস হয়নি। ক্লাস না হওয়ায় ডিপার্টমেন্টে গিয়ে একটু রেস্ট চিন্তা করলাম যে, হাইকোর্টে গিয়ে উকিলদের সাথে পরামর্শ করে হলের বৈধ সিট ফিরে পাওয়ার জন্য এবং হামলাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য উচ্চ আদালতে রিট করব। কিন্তু যখনই হাইকোর্টের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম, তখনই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর গোলাম রব্বানী স্যার কল করে ঘটনার বিস্তারিত জানতে চাইলেন। আমি বিস্তারিত বর্ণনা করে বললাম, ‘স্যার, আমি আমার হলের বৈধ সিট ফিরে পাওয়ার জন্য এবং হামলাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য হাইকোর্টে গিয়ে রিট শাখায় একটি রিট করব।কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর জানান যে, ‘হাইকোর্টে গিয়ে রিট করার দরকার নেই।আমার কাছে লিখিত অভিযোগ দাও। আমি ব্যবস্থা নিব’। উনার কথামত লিখিত অভিযোগ দিলাম। উনি সেটা তদন্ত করার জন্য মুহসীন হলের প্রভোস্টকে রেফার করলেন। প্রভোস্ট স্যার হলের আবাসিক শিক্ষক ইফতেখার স্যারসহ আরো কয়েকজনকে নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করলেন। তদন্ত কমিটি সাক্ষীসহ তদন্ত করলেন। কিন্তু তদন্ত রিপোর্টের খবর নেই। গত ডিসেম্বর মাসে ইফতেখার স্যারকে তদন্ত রিপোর্টের কথা জিজ্ঞেস করলে উনি জানান যে, তদন্ত রিপোর্ট উনি প্রভোস্ট স্যারকে জমা দিয়েছেন। প্রভোস্ট স্যারকে জিজ্ঞেস করলে বলে, হল অফিসের কর্মকর্তা জাকির সাহেবের কাছ থেকে নাও। জাকির ভাইয়ের কাছে গেলে তিনি জানালেন, এই বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। এভাবে একজন আরেকজন উপর দায় চাপায়। শুধু আমি নয়, আমার মত এ রকম শত শত হলের বৈধ শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হল ছাড়া হয়ে গেছে। বিশেষ করে ২০১৮ সালের ৩০ জুনের পর কোটা সংস্কার আন্দোলনের সাথে জড়িত শত শত বৈধ শিক্ষার্থীকে হল ত্যাগে বাধ্য করে ছাত্রলীগ। এসব হলছাড়া শিক্ষার্থীদের পক্ষে আমি গত বছরের ৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রক্টর, রেজিস্ট্রার সহ সকল হলের প্রভোস্টের কাছে ৩ টি দাবিতে উকিল নোটিশ পাঠায়ে উকিল নোটিশেে উল্লেখিত ৩ টি দাবি হলঃ— ১. বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল হল থেকে অবৈধ, বহিরাগত এবং মেয়াদোত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদেরকে বের করে দিতে হবে। ২. হলের সকল বৈধ আবাসিক শিক্ষার্থীদের কে তাদের নিজ নিজ সিট ফেরত দিতে হবে। ৩. সকল হামলাকারীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
গত বছরের ১৮ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি সেই নোটিশ জবাবে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে অবগত। ঘটনার তদন্তের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আজ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা নেয়নি। কারণ সন্ত্রাসী এবং মাস্তানদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং হল প্রশাসন অসহায়। ২০১৮ সালের ২১ মে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়, ‘ঢাবির হাজী মুহম্মদ হলে অছাত্রদের দাপটে কোণঠাসা ছাত্ররা। হলের কক্ষে চলে মাদক সেবন, খাবারের নিম্নমান কিন্তু দাম উচ্চমূল্য।’ ঢাবি টাইমস' নামে আরেকটি অনলাইন পত্রিকায় বলা হয়, ‘‘তীব্র আবাসন সংকটের মধ্যেও ঢাবির মুহসীন হলে ছাত্রনেতাদের বিলাসী জীবন।’’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থীবান্ধব অধ্যাপক রুশাদ ফরিদী ২০১৮ সালের ২৫ জুলাই ‘দৈনিক প্রথম আলো’তে 'একটা সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে’ শিরোনামে একটি কলাম লিখেছিলেন। যেখানে বলা হয়, ‘চারজনের একটি কক্ষে১৫/২০ জন কষ্ট করে থাকে। ছাত্রাবাসগুলোর ৬১ ভাগ সিট অছাত্রদের দখলে।’ আমি তার এই লেখাটি পড়ে খুশি হয়েছি যে অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ করার জন্য আমার মত লোক এখনো আরো আছে। প্রতিবাদের মিছিলে আমি একা নই।
শুধুমাত্র হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল নয়,পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে একই বেহাল দশা। বিভিন্ন পত্রিকা এবং টেলিভিশনের রিপোর্টে ঢাবির বিভিন্ন হলে অবৈধ এবং বহিরাগত ছাত্র থাকার সংবাদ প্রকাশিত হলেও বিশ্ববিদ্যালয় এবং হল প্রশাসন কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়নি।যেমন ২০১৮ সালের ১৬ জুলাই দৈনিক ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ পত্রিকার শেষ পৃষ্ঠার ১ম তিন কলামজুড়ে শিরোনাম ‘ক্যাম্পাসে হলে হলে বহিরাগত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবাসন সংকটে ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা।’ একই বছরের ২০ জুলাই দৈনিক কালের কণ্ঠের শিরোনাম ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক হল: বহিরাগতরা কক্ষে, শিক্ষার্থীরা কষ্টে। ক্যাম্পাসে যত অপকর্ম, অনিয়ম, অন্যায়, দুর্নীতি হয়, তার বেশির ভাগই করে এসব অছাত্ররা। এসব রাজনৈতিক বড় ভাইয়েরা নিজেরা অপকর্ম করে এবং জুনিয়রদেরকে অপর্কম শিখায়। ঢাবির বিভিন্ন হল থেকে বহিরাগতদেরকে তাড়াতে গিয়ে হল প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। তার সর্বশেষ উদাহরণ কবি জসীমউদদীন হলের প্রভোস্ট রহমত উল্লাহ স্যার। যেসব কারণে ভোটকেন্দ্র হলে না করে একাডেমিক ভবনে করা উচিতঃ
১. হলের নিয়ন্ত্রণ প্রশাসনের হাতে নেই।সম্পূর্ণ ছাত্রলীগের হাতে। ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণ করার মত ক্ষমতা, সাহস, শক্তি এবং সদিচ্ছা— কোনটাই প্রশাসনের নেই।
২.সর্বশেষ নব্বইয়ের ডাকসুর নির্বাচনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল গুলোতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন গুলোর সহবস্থান ছিল, যা বর্তমানে নেই।
৩. হলে বৈধ শিক্ষার্থীর চেয়ে অবৈধ, বহিরাগত এবং অছাত্রদের সংখ্যা বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে বহিরাগত এবং অছাত্রদের তাড়াতে কবি জসিমউদদীন হলের প্রভোস্ট উল্টো বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন।
৪. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশীর শিক্ষার্থীরাই চায় একাডেমিক ভবনে ভোটকেন্দ্র হোক।
৫. ক্যাম্পাসের ক্রিয়াশীল বেশিরভাগ ছাত্রসংগঠনই চায় হলের পরিবর্তে একাডেমিক ভবনে ভোটকেন্দ্র হোক।
৬. ১৯৭৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ডাকসুর নির্বাচনে যে নজিরবিহীন ভোট ডাকাতি হয়েছিল, এবারের ডাকসুর নির্বাচনে তার পুনরাবৃত্তি সেটা কেউ চায় না।এ ক্ষেত্রে একাডেমিক ভবনে ভোটকেন্দ্র হলে মিডিয়ার নজরদারির কারণে ভোট ডাকাতি সম্ভব হবে না।
ডাকসু নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র হলের ভিতরে হবে নাকি একাডেমিক ভবনে হবে সেটা নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মতামতের উপর ছেড়ে দেয়া উচিত।নিয়মিত শিক্ষার্থীরা হল এবং একাডেমিক ভবনের মধ্যে, যেখানে ভোট দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে সেখানেই গণভোটের মাধ্যমে তাদের মতামত দিবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের খসড়া ভোটার তালিকা ইতিমধ্যে তৈরি করা হয়েছে। তাই নিয়মিত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হা/না গণভোটের মাধ্যমে ডাকসুর ভোটকেন্দ্র সমস্যার সমাধান করা হোক।
লেখকঃ ছাত্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সাংবাদিক এবং কলামিস্ট।