ডাকসু নির্বাচন: বঞ্চনা ও প্রত্যাশা

০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৭:২৯ PM
আলমগীর শাহরিয়ার

আলমগীর শাহরিয়ার

প্রায় তিন দশক বঞ্চনার পর অবশেষে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ১১ মার্চ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশবাসী গভীর আগ্রহ নিয়ে এ নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে।

নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচার বিরোধী ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে দেশব্যাপী আন্দোলন হয়। বরাবরের মত ঐতিহ্যের পথ ধরে এ আন্দোলনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে এদেশের সাহসী ছাত্র সমাজ। অথচ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় খোদ সেই ছাত্র সমাজকেই গণতন্ত্রের সুফল চর্চা থেকে বঞ্চিত করা হয়। যে বঞ্চনার শিকার হতে হয়নি সামরিক শাসনামলেও। ফলে, দেশও বঞ্চিত হল পরিশীলিত নেতৃত্ব তৈরির ধারাবাহিকতা থেকে। অথচ একটি দেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জাতির সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠসহ অন্যান্য সকল বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজে নিয়মিত এই ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনের কোন বিকল্প ছিল না।

বেশ ক’বছর ধরেই রাজনীতি ও পার্লামেন্টে ব্যবসায়ী ও আমলাদের আধিক্য ও আধিপত্য বাড়ছে। প্রায়শই সমালোচনার পাশাপাশি সিভিল সোসাইটিকে এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা যায়। বলা হয়, ব্যবসায়ীরা জনগণের হৃদস্পন্দন না বুঝলেও নিজেদের ব্যবসায়ীক স্বার্থ বুদ্ধি ভালোই বুঝেন। রাজনীতিতে আসেন ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তি কাজে লাগিয়ে কিভাবে ব্যবসার আরও প্রসার ঘটানো যায়। পুঁজিবাদী সমাজে রাজনীতি তাই এক শ্রেণির জন্য জনসেবা নয়, পুঁজি বৃদ্ধির মোক্ষম হাতিয়ার।

বিকশিত গণতন্ত্র ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতি চর্চার জন্য তাই দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজন সময়ের দাবি। সুষ্ঠু গণতন্ত্র চর্চা, একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক মান বৃদ্ধি, সমাজ ও রাজনীতিতে পরমত সহিষ্ণুতা বৃদ্ধির জন্যেও এই নির্বাচন জরুরি। সদ্য সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ দেশে শিক্ষার মান না বাড়িয়ে রাতারাতি পাবলিক পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভের সংখ্যা বাড়ানো ও লাগামহীন প্রশ্নফাঁস নিয়ে নানাসময় তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হলেও স্কুল পর্যায়ে স্টুডেন্ট ক্যাবিনেট নির্বাচন চালু তাঁর আমলের সাফল্যমুকুটে নিশ্চয় একটি উজ্জ্বল পালক হয়ে থাকবে।

একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই যেন দুর্ভাগ্য ও সমালোচনার কালো মেঘ তাঁর পিছু ছাড়ছে না। তাঁর আমলেই কোটা সংস্কার আন্দোলন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথমবারের মত উপাচার্যের বাসভবনে আগুন, ভাংচুর ও সপরিবারে তাঁর উপর হামলা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস- তাঁর ভাবমূর্তিকে ম্লান করেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ ২৮ বছর কেউ কথা না রাখলেও তাঁর আমলেই বহুল প্রতীক্ষিত ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সকল উদ্বেগ ও সংশয় কাটিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল ব্যতীত সকল ছাত্র সংগঠনের সহাবস্থান নিশ্চিত করে নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ইতিহাসে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বন্ধ্যাত্ব কাটিয়ে ইতিহাসে বাঁক বদলের এই হাতছানি তাঁর সামনে রয়েছে।

ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে একাই অনশনে বসেছিলেন এই শিক্ষার্থী

 

বিশ্ববিদ্যালয় একটি দেশে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও নতুন জ্ঞান তৈরির কারখানা। একই সঙ্গে একটি প্রগতিশীল ধ্যান ধারণা চর্চা ও অগ্রসর সমাজ বিনির্মাণে অগ্রপথিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সে বোধ ও সৃজনশীল মনন তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। রাজনীতি, দলাদলি, নিজেদের কোন্দল, অযোগ্যদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ— এসব সংকটের জন্ম দিচ্ছে। প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদ তাঁর ‘জলপাই রঙের অন্ধকার’ বইয়ে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এক লেখায় বলেছিলেন, ‘‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মনে হয় বিশাল হাসপাতালের মত, যে হাসপাতাল নিজেই শোচনীয়ভাবে রুগ্ন; অন্যের চিকিৎসা কী করবে, তার নিজেরই দরকার গভীর চিকিৎসা। অসংখ্য তার রোগ, অনেক রোগ স্পষ্ট, অনেক রোগ প্রচ্ছন্ন।’’

স্পষ্ট ও প্রচ্ছন্ন এসব রোগের জরুরী চিকিৎসা দরকার। না হলে উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নিগ্ধ সুন্দর সবুজ ধ্বংস করে উর্ধ্বমুখী ভবনের পর ভবন হবে, জেলায় জেলায়ও বিশ্ববিদ্যালয় হবে কিন্তু এর মান উর্ধ্বগামী না হয়ে দিনদিন নিম্নগামীই হবে। ফলে জাতি হিসেবে আমরা এসব প্রতিষ্ঠানের সুফল ভোগ করতে পারব না। সমাজে বিক্ষুব্ধ বেকার, হতাশ, কর্মবিমুখ প্রজন্ম তৈরি হবে। যা সমাজে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতার জন্ম দিতে পারে।

গভীর হতাশার সঙ্গে আমরা লক্ষ্য করি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় শিক্ষকেরা তাদের অনুগত রাজনৈতিক দলের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ইশতেহার প্রণয়নে যুক্ত থাকেন কিন্তু নিজেদের প্রতিষ্ঠান এনালগ ও মান্ধাতার আমলের সিস্টেমের গলদে পড়ে হাবুডুবু খায়; তা তাদের নজরে আসে না। অথবা সচেতনভাবে উপেক্ষা করে চলেন। প্রথম বর্ষে ভর্তিচ্ছু একটি ছেলে-মেয়ে হল, টিএসসি, রেজিস্টার ভবন, নিজ বিভাগে- প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হতে থাকে। কিন্তু তাদের দুর্ভোগ নিয়ে কথা বলবার কেউ নেই।

পর্যাপ্ত ক্লাস রুম নেই, গবেষণার জন্য যথেষ্ট বরাদ্দ নেই, উন্নত মানসম্পন্ন কোন প্রকাশনা নেই, ধুঁকে ধুঁকে শেষ হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের রুগ্ন প্রকাশনা- দেখবার কেউ নেই। উন্নত আধুনিক লাইব্রেরি নেই, নামে মাত্র লাইব্রেরি আছে কিন্তু সংকটের শেষ নেই, চর দখলের মত লড়াই করে শিক্ষার্থীদের একটু বসার জায়গা পেতে লাইব্রেরির প্রবেশমুখে দীর্ঘসারির শেষ নেই। বই ব্যবহারে প্রাচীন পদ্ধতির কোন পরিবর্তন নেই, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশে নিয়মিত সাংস্কৃতিক কোন কর্মকাণ্ড নেই। এরকম অজস্র ‘নেই’ আর ‘নেই’-ই এখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের করুণ নিয়তি। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে- সেইসব নেইগুলোও যেন দেখবার কেউ নেই। ডাকসু নেতৃত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা এমন অসংখ্য জঞ্জাল পরিষ্কারে এগিয়ে আসবে। বঞ্চিত ছাত্র সমাজের পক্ষে কথা বলবে। তাদের ন্যায্য দাবি দাওয়া উত্থাপন করবে। আদায় করবে।

নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারি, সিনেট, সিন্ডিকেট, ডীন- নির্বাচন হয়; কিন্তু যে শিক্ষার্থীদের ঘিরে এ সকল আয়োজন তাদেরই নির্বাচন হয় না। এটা অন্যায়। এই অন্যায় থেকে ১১ মার্চ একটি সুষ্ঠু সুন্দর নির্বাচন আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের মুক্তি দিক।

লেখকঃ কবি ও গবেষক।

আর্জেন্টিনার ম্যাচের নতুন সূচিতে পরিবর্তন
  • ৩১ মার্চ ২০২৬
এনসিপির প্রবাসী সংকট ব্যবস্থাপনা সেল গঠন
  • ৩১ মার্চ ২০২৬
আরব দেশগুলোর কাছে ইরান যুদ্ধের খরচ চাইবেন ট্রাম্প 
  • ৩১ মার্চ ২০২৬
এইচএসসির ফরম ফিলাপ করতে না দেওয়ায় ২৪ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা…
  • ৩১ মার্চ ২০২৬
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা উন্নয়নে এমআইইউ-সিপিএএ’র যৌথ সেমিনার অনু…
  • ৩১ মার্চ ২০২৬
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সাপ্তাহিক ছুটি তিন দিন ও অনলাইন ক্লাসসহ ৮ প…
  • ৩১ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence