প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম © টিডিসি সম্পাদিত
বাংলা মাসের ইতিহাস বাঙালি জাতিসত্তা, কৃষিজীবন ও ঋতুভিত্তিক সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বাংলা সনের শিকড় প্রাচীন ভারতীয় সৌর পঞ্জিকায় নিহিত থাকলেও এর আধুনিক রূপটি গড়ে ওঠে মুঘল আমলে। বিশেষ করে সম্রাট আকবরের শাসনামলে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে হিজরি চান্দ্রবর্ষ ও ভারতীয় সৌর গণনার সমন্বয়ে যে নতুন সন চালু করা হয়, তা-ই পরবর্তীকালে বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিতি লাভ করে। বাংলা বছরের ১২টি মাস হলো-বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র। এই মাসগুলোর নাম মূলত প্রাচীন নক্ষত্রপুঞ্জ ও ঋতুচক্রভিত্তিক সংস্কৃত নাম থেকে এসেছে। যেমন- বৈশাখ এসেছে বিশাখা নক্ষত্র থেকে। জ্যৈষ্ঠ এসেছে জ্যেষ্ঠা থেকে। আষাঢ় এসেছে আষাঢ়া থেকে। শ্রাবণ এসেছে শ্রবণা থেকে। ভাদ্র এসেছে ভাদ্রপদ থেকে। অর্থাৎ বাংলা মাসের নাম শুধু সময়ের পরিমাপ নয়, বরং আকাশ, ঋতু, কৃষি ও লোকজ জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত এক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য। বাংলার কৃষিনির্ভর সমাজে এই মাসগুলোর ছিল বাস্তব জীবনঘনিষ্ঠ গুরুত্ব। বৈশাখ নতুন বছরের সূচনা, আষাঢ়-শ্রাবণ বর্ষা ও ধানরোপণের সময়, অগ্রহায়ণ নবান্নের আনন্দ, আর ফাল্গুন-চৈত্র বসন্ত ও ঋতুপরিবর্তনের রূপমাধুর্য বহন করে। তাই বাংলা মাস শুধু ক্যালেন্ডারের কাঠামো নয়; এটি বাংলার মাটি, ফসল, নদী, উৎসব ও লোকস্মৃতির ভাষা। মুঘল আমলে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য ফসল কাটার সময়কে কেন্দ্র করে বাংলা সনের ব্যবহার আরও সুসংহত হয়। ফলে বাংলা মাসের সঙ্গে কৃষকের জীবনযাত্রা, বাজার, হালখাতা, মেলা ও সামাজিক উৎসবের সম্পর্ক গভীরতর হয়ে ওঠে। এই ঐতিহ্য আজও পহেলা বৈশাখ, নবান্ন, পৌষসংক্রান্তি ও চৈত্রসংক্রান্তির মতো উৎসবে জীবন্ত রয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলা মাসের ইতিহাস কেবল একটি পঞ্জিকার ইতিহাস নয়; এটি বাঙালির সভ্যতা, ঋতুবোধ, কৃষি-অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের ইতিহাস।
পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ বাঙালির জাতীয় জীবনের অন্যতম বৃহৎ ও অসাম্প্রদায়িক উৎসব। আগেই বলা হয়েছে, ঐতিহাসিকভাবে মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে কৃষি ও খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে এই সনের প্রবর্তন হলেও এটি কালক্রমে বাঙালির আত্মপরিচয় ও জাতীয়তাবাদের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বাংলা সনের প্রবর্তক হিসেবে সম্রাট আকবরের নামই বেশির ভাগ গবেষক উল্লেখ করেছেন। তবে বাংলা সনের প্রবর্তক হিসেবে কেউ কেউ রাজা শশাঙ্ক কিংবা সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের কথাও বলেছেন। অধিকাংশ গবেষক বাংলা সনের প্রবর্তক হিসেবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আকবরের সংশ্লিষ্টতার কথা বলেছেন। সিংহাসন আরোহণের ২৫ দিন পর ২৮শে রবিউসসানী (১১ই মার্চ) তারিখে অর্থাৎ ইরানী নববর্ষের (নওরোজ) প্রথম দিনে ভুবন আলোককারী নতুন বর্ষের (তারিখ-ই-ইলাহি) শুরু হয়। সুশাসন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও বহুমাত্রিক অগ্রগামী ভাবনার জন্য ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে সম্রাট আকবর স্মরণীয় হয়ে আছেন। একটি নতুন সহস্রাব্দকে সামনে রেখে তিনি ভারতীয় সন সংস্কারের পরিকল্পনা করেছিলেন বলে আবুল ফজল আইন-ই-আকবরিতে উল্লেখ করেছেন। তিনি হিজরি চান্দ্র সনের পরিবর্তে ভারতবর্ষের বছর-মাস গণনাকে সহজ করার মানসে নতুন সনের প্রবর্তনের কথা ভেবেছেন। আকবরের নির্দেশে তার অমাত্য জ্যোতির্বিজ্ঞানী পণ্ডিত ফতেউল্লাহ সিরাজী বিজ্ঞানভিত্তিক ইলাহি সন উদ্ভাবন করেন। রাজ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বছর-মাস গণনার অভিন্ন রীতি প্রবর্তনের জন্য আকবর পঞ্জিকা সংস্কার ও নতুন সন প্রবর্তন করেন। বিশ্বখ্যাত চিন্তাবিদ অমর্ত্য সেনও প্রকাশ করেছেন অভিন্ন মত।
বর্তমান সময়ে এই উৎসবের উদযাপন পদ্ধতি এবং নামকরণ নিয়ে তীব্র সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পহেলা বৈশাখের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল 'মঙ্গল শোভাযাত্রা', যা ২০১৬ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক 'ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ' বা বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পায়। তবে গত কয়েক বছর ধরে একটি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে 'মঙ্গল' শব্দটি নিয়ে আপত্তি তোলা হয়। তাদের মতে, এই শব্দটিতে নির্দিষ্ট ধর্মীয় ছাপ রয়েছে যা ইসলামি ঐতিহ্যের সাথে সাংঘর্ষিক। এই চাপের মুখে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এর নাম পরিবর্তন করে 'আনন্দ শোভাযাত্রা' রাখে। ২০২৬ সালে বিএনপি দায়িত্বে আসার পর এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে একটি মধ্যপন্থা অবলম্বন করে। সংস্কৃতি মন্ত্রী ঘোষণা করেন যে, এই শোভাযাত্রার নতুন নাম হবে 'বৈশাখী শোভাযাত্রা’। যুক্তি দেন যে, পহেলা বৈশাখ মূলত সাধারণ মানুষ ও কৃষকের উৎসব, এবং নামকরণের বিতর্ক উৎসবের আমেজকে ম্লান করে দিচ্ছে। তাই বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখতে এই নিরপেক্ষ নামকরণ করা হয়েছে। এই পরিবর্তনটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ল্যান্ডস্কেপে এক বড় ধরনের শিফট বা রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়। একদিকে কিছু মানুষ একে 'ঐতিহ্যের মূল সুর থেকে বিচ্যুতি' হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে সরকার একে দেখছে 'জনগণমুখী ও অংশগ্রহণমূলক' ব্যবস্থা হিসেবে। এগুলোকে বিশেষ মোড়ক দিয়ে বাতিল করা সংস্কৃতির জন্য বৈষম্যমূলক। প্রকৃতপক্ষে, ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মপালনের সঙ্গে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের দ্বান্দ্বিক কোনো সম্পর্ক নেই।
সম্প্রীতির নববর্ষের সূত্রে বলতে হয়, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বাংলাদেশের জাতীয় চেতনার এক উজ্জ্বল ভিত্তি। বহুধর্ম, বহুসংস্কৃতি ও বহুজাতিক ঐতিহ্যের এই দেশে যুগ যুগ ধরে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, সুফি-বাউল এবং আদিবাসীসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান ও মানবিক বন্ধনের মধ্য দিয়ে একটি সমন্বিত সমাজ নির্মাণ করে আসছে। সাম্প্রতিক সময়েও এই ঐতিহ্য নতুনভাবে গুরুত্ব পেয়েছে, যেখানে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং নাগরিক সমাজ সবাই মিলেই শান্তি, সহনশীলতা ও পারস্পরিক আস্থার পরিবেশকে আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয়ে কাজ করছে। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সম্প্রীতির এই চিত্র আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও প্রশংসিত। ধর্মীয় উৎসব, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং সামাজিক সহমর্মিতার মাধ্যমে দেশের নানা প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরের আনন্দ ও অনুভূতির অংশীদার হচ্ছে। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়, সুফি-বাউল, আদিবাসী এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার আজ জাতীয় ঐক্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নতুন মর্যাদা লাভ সম্ভব হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি’র ঘোষিত “বাংলাদেশ ফার্স্ট” নীতি জাতীয় সংহতি ও নাগরিক সমঅধিকারের ধারণাকে আরও সুদৃঢ় করেছে। এই নীতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান, সকলেই বাংলাদেশের সমমর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক; রাষ্ট্রের উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও অগ্রগতির যাত্রায় সবাই সমান অংশীদার। বিএনপি’র ইশতেহারেও জোর দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোনো নাগরিককে তার ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে ভিন্নভাবে দেখা হবে না; বরং বৈচিত্র্যের মধ্যেই জাতীয় শক্তির উৎস নিহিত। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তাই সম্প্রীতির এই শক্ত ভিতের ওপরই আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে-যেখানে ভিন্নতা বিভাজনের নয়, বরং ঐক্যের সৌন্দর্য হয়ে জাতির অগ্রযাত্রাকে বেগবান করবে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর বিএনপি সরকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় বেশ কিছু তড়িৎ ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে: ১. ধর্মীয় নেতাদের আর্থিক নিরাপত্তা: সরকার মসজিদ, মন্দির এবং বৌদ্ধ মঠের প্রায় ১৬,৯৯২ জন ধর্মীয় নেতার (ইমাম, মোয়াজ্জিন, পুরোহিত) জন্য মাসিক সম্মানী বা অনারারিয়াম চালু করেছে। ২. আইনশৃঙ্খলা কমিটিতে অংশগ্রহণ: প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা কমিটিতে সকল ধর্মের একজন করে প্রতিনিধি রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হলে দ্রুত স্থানীয়ভাবে সমাধান করা যায়। ৩. ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন: অতীতে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য এই বিশেষ কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ৪. সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন: সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল ও হামলার বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে সরকার। বিএনপি’র এই পদক্ষেপগুলো নির্দেশ করে যে, তারা কেবল মৌখিক আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে ধর্মীয় নেতাদের একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে চায়। সরকারের উদ্দেশ্য হলো ধর্মীয় মূল্যবোধকে উগ্রবাদের বিপরীতে সহনশীলতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যখন পহেলা বৈশাখ নিয়ে বিতর্ক চলছে, সুদূর আমেরিকায় তখন এটি এক নতুন মর্যাদায় আসীন হয়েছে। ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের রাজধানী অ্যালবেনি এবং আইকনিক টাইমস স্কয়ারে অভূতপূর্ব আয়োজনে বাংলা নববর্ষ পালিত হয়েছে এবং হচ্ছে। ২২ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে নিউ ইয়র্ক স্টেট সিনেট সর্বসম্মতিক্রমে পহেলা বৈশাখকে 'বাংলা নববর্ষ' হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করে। এই স্বীকৃতির প্রক্রিয়াটি হঠাৎ কোনো ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল প্রবাসী বাঙালিদের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক লবিংয়ের চূড়ান্ত ফসল। সিনেটর লুইস আর. সেপুলভেদা এবং অন্যান্য আইনপ্রণেতারা এই রেজোলিউশনের মাধ্যমে স্বীকার করে নেন যে, বাংলা কেবল একটি আঞ্চলিক ভাষা নয়, বরং এটি বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম ভাষা এবং নিউ ইয়র্কের অর্থনীতিতে এর ব্যবহারকারীদের বিশাল অবদান রয়েছে। নিউ ইয়র্ক স্টেট সিনেট বাঙালির পরিচয়কে কেবল 'শ্রমিক' বা 'অভিবাসী' হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে একে উচ্চস্তরের 'ইন্টেলেকচুয়াল ক্যাপিটাল' বা মেধা সম্পদ হিসেবে আমেরিকানদের সামনে উপস্থাপন করেছে। মুক্তধারা ফাউন্ডেশন এবং এনআরবি ওয়ার্ল্ড ওয়াইড-এর উদ্যোগে টাইমস স্কয়ারে 'সহস্র কণ্ঠে বর্ষবরণ' অনুষ্ঠানটি এখন বৈশ্বিক বাঙালির মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের ১১ এপ্রিল টাইমস স্কয়ারে এবং ১২ এপ্রিল জ্যাকসন হাইটসে এই উৎসব উদযাপিত হলো। নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান কোয়ামে মামদানি এবং ম্যানহাটন বরো প্রেসিডেন্ট ব্র্যাড হোয়েলম্যান-সিগাল এই অনুষ্ঠানকে নিউ ইয়র্কের বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে, পহেলা বৈশাখ এখন আর কেবল ঢাকার রমনার বটমূলে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২০৯টি এবং পরবর্তীতে আরো ২টি মোট ২১১টি আসনে জয়লাভ করে। বিএনপি’র ইশতেহারে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পাশাপাশি একটি ভিশনারি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সম্প্রীতি অপরিহার্য।
বাংলা ১৪৩৩ সনের এই নবপ্রভাতে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং পহেলা বৈশাখের উদযাপন এক ঐতিহাসিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিএনপি’র ৩১ দফা এবং ইশতেহারে বর্ণিত সম্প্রীতির রূপরেখাটি কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক চুক্তির খসড়া। নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কয়ার থেকে শুরু করে ঢাকার রমনার বটমূল পর্যন্ত বাঙালির জয়গান প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ কেবল সমতলের মানুষের উৎসব নয়, বরং এটি পাহাড় ও সমতলের সব জাতিসত্তার এক মহামিলনের দিনে পরিণত হয়েছে। একদিকে যেমন বাঙালি জাতি বৈশাখী শোভাযাত্রা ও পান্তা-ইলিশের মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির আবহে পালন করে এই উৎসব। বাঙালি সংস্কৃতিতে পহেলা বৈশাখ হলো অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক সমাজ ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় নববর্ষ উদযাপন মূলত এক অসাম্প্রদায়িক মহামিলনের মহোৎসব। সমতলে নতুন পোশাক পরিধান, বড়দের সালাম ও মিষ্টিমুখের মাধ্যমে যেমন শুভ সূচনা হয়, গ্রামে-গঞ্জে লোকজ খেলা যেমন, হা-ডু-ডু, লাঠিখেলা ইত্যাদিসহ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলিখেলার মতো লোকজ খেলা এই উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তোলে। এছাড়া জারিগান, লেটো, ঘাটু, সারিগান ও বিভিন্নরকম আঞ্চলিক গান- এককথায় উৎসব-আনন্দে মেতে উঠে-শুধু পহেলা বৈশাখের দিনটিতেই নয়, বরং পুরো বৈশাখ মাসব্যাপী। অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহ 'বৈসাবি'র মাধ্যমে নিজস্ব স্বকীয়তায় নতুন বছরকে বরণ করে; যেখানে ত্রিপুরাদের ঘর সাজানো ও গড়িয়া নাচ, মারমাদের আনন্দময় জলকেলি এবং চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী 'পাচন' রান্না ও ফুল বিজুর মাধ্যমে গঙ্গা দেবীর পূজা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এছাড়া তঞ্চঙ্গ্যাদের বিশু উৎসবের ঘিলা খেলা কিংবা সাঁওতালদের শাল ফুল দিয়ে দেবতাকে বরণ করার বাহা উৎসব- সবই ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে এক পরম ভ্রাতৃত্বের জয়গান গায়, যা এই জনপদের মানুষের আত্মিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির অনন্য প্রতিফলন।
বর্তমান সরকারের ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির উন্নয়ন সার্থক করতে হলে বাংলাদেশকে তার বৈচিত্র্যকে বোঝা নয়, বরং শক্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। বিএনপি সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিহিংসার রাজনীতির বিপরীতে একটি টেকসই ও সম্প্রীতিমূলক সমাজ বিনির্মাণ করা। ১৪৩৩ সনের এই নববর্ষ হোক বিভাজনমুক্ত, বৈষম্যহীন এবং সত্যিকারের সম্প্রীতির এক নতুন শুভ সূচনা।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সাবেক চেয়ারম্যান, থিয়েটার এন্ড পরফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়