সার্ভেইলেন্সের ম্যান্ডেট আসলে কার?

১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৩ AM
ফাইজ় তাইয়েব আহমেদ

ফাইজ় তাইয়েব আহমেদ © সংগৃহীত

বাংলাদেশের এজেন্সি গুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়- আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী ও সাহায্যকারী বাহিনী। বাস্তবে বহু এজেন্সি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে লিগাল ম্যান্ডেট প্রাপ্ত নয়, কিন্তু তাদের সংস্থাগত কার্যক্রমে, খরচে এবং আচার-আচরণ তারা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা পালন করেন। অন্যদিকে শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী তাদের নিজ নিজ ডোমেইনকে ছাপিয়ে এক্সট্রা লিগ্যাল ম্যান্ডেটেড ডোমেইন হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করেন, এতে করে বড়ো ধরনের ওভারল্যাপ তৈরি হয়।

যে প্রতিষ্ঠানের যা করার কথা তা, না করে ভিন্ন ডোমেইনের দায়িত্ব পালন করায় দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতা বিন্যাস, দায়িত্ব বিন্যাস সম্পর্কিত কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট লেগেই থাকে। এ সমস্যা বাজেট বরাদ্দে গিয়ে ঠেকেছে। এসব কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান বিগত ওয়ান-ইলেভেনের পর থেকে দুর্বলতর থেকে দুর্বলতম হয়েছে। নজরদারি প্রযুক্তি সংগ্রহ ও ব্যবহার পর্যালোচনার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি কমিটি গঠন করেছিল। কোনো অজানা কারণে আমাকে আহ্বায়ক হিসেবে রাখা হয়। 

ফলে এজেন্সি গুলোর সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করার একটি সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আমি আমাদের এজেন্সি গুলোর অধিকাংশ কর্মকর্তাদেরকে অত্যন্ত নিবেদিত, কাজের প্রতি আন্তরিক এবং কো-অপারেটিভ পেয়েছি। কিন্তু প্রযুক্তিগত জ্ঞান তৈরি, কারিগরি সক্ষমতা তৈরি সহ ট্রেনিং, বিভিন্ন ধরনের টুলস কেনার পেছনে বিনিয়োগের স্বল্পতা দেখেছি, ফলে তারা প্রতিষ্ঠানগত ভাবে এম্পাওয়ার্ড নন। হ্যাঁ, জিয়াউলন আহসান ও ডিজিএফআই, ডিজি, ডিবি প্রধানের মতো ব্যক্তিগতভাবে কিছু কর্মকর্তাকে আওয়ামী লীগ এম্পাওয়ার করেছিল। পাশাপাশি আমি সিআইডিকে কারিগরিভাবে অত্যন্ত দুর্বল ও নাজুক অবস্থায় দেখেছি। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত এঅ্যাক্সেসে স্বচ্ছতায় বড়ো ধরনের কমপ্লায়েন্স-এর অভাব দেখতে পেয়েছি। 

আরও পড়ুন: শুধু পাঠ্যপুস্তকে লেখা বাকি, এক দফার ঘোষক তারেক রহমান: আসিফ

নজরদারি প্রযুক্তির সংগ্রহ এবং ব্যবহারের ম্যান্ডেটমেন্ডেইট আছে মূলত চার ধরনের প্রতিষ্ঠানের। ৯৯৯ ও পুলিশ এলআইসি (ল’ফুল ইন্টারসেপশন সেন্টার) টিম, সিআইডি(ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট), এসবি (স্পেশাল ব্রাঞ্চ), এনএসআই (জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা)। বাকিরা এই সংস্থাগুলোর লিখিত ম্যান্ডেট নিয়ে সাহায্যকারী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন। কিন্তু এই চার ধরনের প্রতিষ্ঠানকে ছাপিয়ে আওয়ামী লীগ আমলে দেশের নজরদারি প্রযুক্তি সবচেয়ে বেশি এক্সেস পেয়েছে এবং অ্যাবিউজ করে অন্য ৪ প্রতিষ্ঠান। ডিবি, ডিজিএফআই, এনটিএমসি এবং র‍্যাব।

বাস্তবে এনটিএমসি'র কোনো আইনি ভিত্তিই নাই। এটা আইন শৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবেই ম্যান্ডেট প্রাপ্ত না। পরবর্তীতে একটি নোটিশে প্ল্যাটফর্‌ম হিসেবে স্বীকৃত যা নিজে থেকে কোনও সার্ভেইল্যান্স কল করতে পারার কথা না, যদিও বাস্তবে দেখা গেছে জিয়াউল আহসান নিজে সোয়া লক্ষ সার্ভেইল্যান্স রেকর্ড শুধুমাত্র নিজের ক্যাপাসিটিতে করেছে, স্টোর করেছে। সর্বমোট ১৮টি এজেন্সি এক্টিভ ও প্যাসিভ সার্ভেইলেন্স এক্সেস পেয়েছে যা সারা বিশ্বের মধ্যে নজিরবিহীন। 

১। নাগরিকের প্রাণ রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত, পুলিশ হেডকোয়ার্টার এবং ৯৯৯ ট্রিপল নাইন ইমার্জেন্সি হেল্প টিম। 

২। জিডি এবং এফআইআর (মামলা)'র বিপরীতে, আদালতে এভিডেন্সিয়াল প্রুফ বা তথ্য প্রমাণ/ দলিল দস্তাবেজ উপস্থাপনের জন্য মেন্ডেট প্রাপ্ত সংস্থা, এটা মূলত সিআইডি, এখানে ওভারল্যাপ আছে সিআইডি পিআইবি বিভিন্ন স্তরের মেট্রোপলিটন পুলিশ, রেঞ্জ/বিভাগ/জেলা/উপজেলা পর্যন্ত দায়িত্ব বণ্টনের বিভিন্ন স্টেজ, বাংলাদেশ পুলিশের হেডকোয়ার্টারে ল'ফুল ইন্টারসেপ্ট টিম।

দরকার ছিল একটি সেন্ট্রাল ল'ফুল ইন্টারসেপ্ট সেল যারা রোল বেজড, টাইম বেজড এক্সেস এবং স্কোপ বেজড অ্যাসাইনমেন্ট পালনে অ্যাসাইনমেন্ট ডিস্ট্রিবিউশন করবে, এ সংক্রান্ত গোপনীয়তা রক্ষা করবে, লগ রাখবে, কেস এসকালেকশন করবে, এবং এইসবে নিয়োজিত সকল সদস্য গুলোর রেজিস্ট্রেশন থাকবে, বিশেষ হিউম্যান রাইটস/এবিউজ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানের ট্রেনিং দিবে, এরা যখন তখন পরিবর্তিত হবেন না, কে কোন কেস কখন কাজ করেছেন তার সকল এক্সেস অগ থাকবে। এদের বিশেষ ধরনের ট্রেনিং থাকবে, এবং থাকবে গোপনীয়তা সংরক্ষণের জন্য নন-ডিসক্লাসার অ্যাগ্রিমেন্ট। 

৩। জন নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনে মেন্ডেটেড সংস্থা হচ্ছে- স্পেশাল ব্রাঞ্চ অফ পুলিশ বা এসবি।

৪। রাষ্ট্র নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনে মেন্ডেট প্রাপ্ত সংস্থা ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স বা এনএসআই। কিন্তু বাংলাদেশে দেখবেন, এসবি এবং এনএসআই এর কাজ করে ফেলছে ডিজিএফআই। সবাই সব করে। একে শ্রমঘন্টার অপচয়, অন্যদিকে বাজেটের। ফলে অপরাধ ঘটে যাবার পরে সম্মিলিত ইফিসিয়েন্সি পুওর। ডিজিএফআই মিলিটারি সরকারগুলোর আশীর্বাদপুষ্ট, এবং রাজনৈতিক সরকার গুলো এটিকে বন্ধ না করে প্রমোট করে গেছে। আওয়ামী সরকারের সময়ে তারা সব এজেন্সি ছাপিয়ে অনন্য সুযোগ-সুবিধা এবং বাজেট ভোগ করেছে। বাজেটের একটা বড়ো অংশ সোর্স-মানি হিসাবে ব্যয় হয়, যার জন্য পাবলিক প্রক্রিয়ারমেন্ট বা বিপিপিএ'র নিয়মাবলি মানতে হয় না। ফলে এখানে এজেন্সির ইচ্ছামাফিক খরচের একটা অবাধ এবং অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা তৈরি হয়, যেটা আমরা এনটিএমসি ডিজি এবং সাবেক ডিজিএফআই ডিজিদের বেশুমার খরচের মধ্যে দেখেছি। 

দরকার ছিল সব ডিফেন্স এজেন্সির সমন্বয়ে একটি সক্ষম ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (ডিআইএ)। বাংলাদেশে আর্মি ইন্টেলিজেন্স, নেভি ইন্টেলিজেন্স, এয়ার ফোর্স ইন্টেলিজেন্স- এ তিনটি রয়েছে, পাশাপাশি রয়েছে জয়েন্ট ইন্টেলিজেন্স। এইটাই জয়েন্টালি ডিআইএ হয়ে ওঠার কথা। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি জয়েন্ট ইন্টেলিজেন্স কেউও ছাপিয়ে গেছে ডিজিএফআই। ফলে একদিকে এসবি এবং এনএসআই ক্ষমতা খর্ব হয়েছে, অন্যদিকে আর্মি/নেভি/এয়ার ফোর্স সহ জয়েন্ট ইন্টেলিজেন্স এর কাজে ওভারল্যাপিং এসেছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগত দুর্বল হয়েছে। অর্থাৎ সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং মিলিটারি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন- দুই সাইডই ডোমেইন নলেজ এবং ইন্সটিটিউশনাল ক্যাপাসিটি হারিয়েছে।  

বাস্তবে শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীর এজেন্সি হয়ে ডিজিএফআই সিভিলিয়ান অ্যাফেয়ার্স ডিল করতে পারে না এবং সিভিল সার্ভেইলেন্সও করতে পারে না, তার লিগ্যাল মেন্ডেট নাই। যদি করে থাকে তাহলে এক্সট্রা, যদি পেরে থাকে, তাইলে তা এক্সট্রা লিগ্যাল/জুডিশিয়াল স্কোপ ডিফাইন করে নেওয়া- যেটা আদতে শুরতেই বেআইনি ছিল।

লেখক: সাবেক প্রধান উপদেষ্টার আইসিটি বিষয়ক বিশেষ সহকারী

জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভা সন্ধ্যায়
  • ১৮ এপ্রিল ২০২৬
সরকারের দুই মাস পূর্তিতে সংবাদ সম্মেলন আজ
  • ১৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ পরীক্ষা শুরু
  • ১৮ এপ্রিল ২০২৬
সোমবার ফের বৈঠকে বসছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান
  • ১৮ এপ্রিল ২০২৬
ঢাকায় বৃষ্টির আভাস, কমতে পারে দিনের তাপমাত্রা
  • ১৮ এপ্রিল ২০২৬
কয়লা কেলেঙ্কারির অভিযোগে তদন্ত, পদত্যাগ করলেন শ্রীলঙ্কার জ্…
  • ১৮ এপ্রিল ২০২৬