দেশের শিক্ষাব্যবস্থা মেধাবিকাশ নয়, মেধা বিনাশের সহায়ক

১৫ জানুয়ারি ২০১৯, ১০:২৮ PM
কাজী তাহমিনা

কাজী তাহমিনা

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত অনিয়ম আর অভিযোগ নিয়ে মাঝেমাঝেই নানা খবরের লিংক শেয়ার হয়, ভাইরাল হয় আর অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেন, এইসব অনিয়ম দেখে।  আর আমি বিস্মিত হই এই ভেবে যে, মানুষজন এইসব দেখে এখনো বিস্মিত হয়!

আমি তো দেখেছি, শুনেছি এবং বহু আগেই বুঝে গেছি, আজকাল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হতে গেলে সিংহভাগ ক্ষেত্রে আপনার বেশ কয়েকটি গুণ থাকতেই হবে। (স্বচ্ছতার ভিত্তিতে যোগ্যতর শিক্ষক নিয়োগ এখনো কিছু হয়, তবে তা শতকরা দশ/বিশ ভাগ অবশ্যই নাকি আরেকটু বেশি, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছেনা)।

এখন মূল বিষয়ে আসি।  পড়াতে আপনি পারেন, কি না পারেন, পড়ানো আপনার ভালোবাসা কিনা (প্যাশন না ফ্যাশন?), শিক্ষার্থীরা নিয়মিত দুইবেলা আপনার মুণ্ডপাত করে কি না করে, একঘেয়ে একটানা ফ্লোর কিংবা সিলিং এর দিকে তাকিয়ে এবং ছাত্রছাত্রীদের চোখের দিকে না তাকিয়ে মুখস্থ লেকচার দেন কি না দেন, কপি করা স্লাইড আর বিদেশী বই থেকে কাজ চালিয়ে দেন কি না দেন, আপনার নিজস্বতা, সৃজনশীলতা শূণ্য হোক কি না হোক, ছাত্রছাত্রী প্রশ্ন করলে ভ্যাবাচেকা খেয়ে মেজাজ হারান কি না হারান, সুন্দরী ছাত্রী কিংবা হ্যান্ডসাম ছাত্রের দিকে চেয়ে, আর মফস্বল বা গ্রাম থেকে আসা ছাত্রছাত্রীদের দিকে অবজ্ঞা আর অবহেলার দৃষ্টি দিয়ে লেকচারের অর্ধেক সময় পার করেন কি না করেন, আপনার ড্রাইভার আর বুয়া কত ঝামেলাবাজ সে গল্প করেন কি না করেন, মুখ চিনে আপনি নাম্বার দেন কি না দেন, শিক্ষক রাজনীতি, দলাদলি, তৈলমর্দন, পুষ্পস্তবক, পূষ্পমাল্যে নেতা শিক্ষক বরণ ইত্যাদিতে সময়, মেধা, সশ্রম দিতে গিয়ে ক্লাসের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পান কিনা, উদ্ভট, বেখাপ্পা উচ্চারণে ইংরেজি, বাংলা বলেন কিনা, আধাআধি জোড়াতালি গল্পেসল্পে ক্লাসের সময় কাটিয়ে দেন কিনা - সেইসব অনেক পরের কথা।

কিন্তু, আপনার জনসংযোগ সংক্রান্ত গুণাবলী, এই মানে বিভাগীয় শিক্ষকদের পায়ে পায়ে ঘোরা, হুজুর হুজুর করা; তাদের জন্মদিন, বিবাহদিন, বিচ্ছেদ দিবসসহ, তাদের কন্যা পুত্রের নানাবিধ দিবসে শুভেচ্ছা, উপহারাদি প্রদান; তাদেরকে নানা সময়ে অসময়ে সত্য-মিথ্যা প্রশংসা সূচক স্তুতি করা; এমনকি দু'একটি ক্ষেত্রে বিশেষ বন্ধু বনে যাওয়া; শিক্ষকরা লাল, নীল, বেগুনী হলে নিজেরা শতগুণ আনুগত্যধারী লাল,নীল, বেগুনী হওয়া; মাঝেমাঝে তাদের বাসায় গ্রাম থেকে আগত কলাটা, মুলাটা, ইলিশের মাথাটা দিয়ে আসা; তাদের কথায়, আলোচনায় সদাসর্বদা একমত পোষণ করা ইত্যাদি বিশেষ গুণ যদি প্রখর হয়- আর তার সাথে কিঞ্চিত পড়াশোনা যদি আপনার থাকে, তবেই পাবলিকের শিক্ষক হওয়ার দৌড়ে আপনি এগিয়ে থাকতে পারেন!

অথবা, আপনার বাবা, মা, দাদা,চাচা, খালু, বেয়াই, তালুই, শ্বশুর, ভাসুর, প্রেমিক, জামাই, প্রেমপ্রার্থী, বন্ধু-বান্ধবী ইত্যাদি কেউ যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাবশালী শিক্ষকদের একজন হয়ে থাকেন, সেইসাথে আপনি কিঞ্চিত মগজধারী হয়ে থাকেন; তাহলে ঘষে মেজে চেঁছে ছুলে, অন্য আরো ধারালো মগজের অনেককে পেছনে ফেলে, শিক্ষক হওয়ার দৌড়ে আপনি আগুয়ান হয়ে যাবেন।

আপনার যদি আনুগত্য মেনে নেওয়ার আপোষহীন ক্ষমতা থাকে, তা সে দলীয় হোক, কি ব্যক্তির আনুগত্য হোক-আপনি যদি বিবেকটাকে কোমায় পাঠিয়ে দিয়ে, নীরব নুন খাওয়া দর্শক হতে পারেন- তাহলে শিক্ষক হওয়ার দৌড়ে আপনি এগিয়ে গেলেন অনেকদূর।

আর যদি, আপনি এতোটাই চৌকস হন, যে, ফলাফল, মেধা,পরিশ্রমের মিশেলের সাথে সাথে তৈলমর্দনেও প্রথম হতে পারেন,তাহলে তো কথাই নাই! এবং উপরিউক্ত সকল গুণাবলী যদি একসাথে আপনার মধ্যে উপস্থিত থাকে- আপনিই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ!

এই কথা আমার মত চুনোপুঁটি যদি, দশ বছর আগে বুঝে ফেলতে পারে, জ্ঞানীগুণীদের বুঝতে এতো সময় লাগে? এই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা মেধাবিকাশ নয়, মেধা বিনাশের সহায়ক, কিছু কিছু ক্ষেত্রে জীবন বিনাশেরও নিয়ামক - মেনে নিন।  মানিয়ে নিন।

লেখক : ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির শিক্ষিকা।  সাবেক শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

গননা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভোট কেন্দ্র পাহাড়া দিতে নেতাকর্মীদ…
  • ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
যুবলীগের চার নেতা গ্রেপ্তার
  • ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
মহিলাদের প্রচারে বাঁধা, সংঘর্ষে জামায়াতের ৬ কর্মী আহত
  • ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি নির্বাহী কমিটির সদস্য বহ…
  • ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
গবেষণার পাশাপাশি কারুকার্যেও সৃজনশীলতার ছাপ রেখে চলেছে শিক্…
  • ২৫ জানুয়ারি ২০২৬
জামায়াত নেতার বক্তব্যের প্রতিবাদে কুশপুত্তলিকা দাহ ও ঢাবি প…
  • ২৫ জানুয়ারি ২০২৬