এবার অন্তত ডাকসু নির্বাচন হোক

১৫ জানুয়ারি ২০১৯, ১০:২০ AM
তৌহিদুর রহমান

তৌহিদুর রহমান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন নিয়ে কত কথা, কত আলোচনা। এভাবে কেটে গেছে ২৮টি বছর। নির্বাচন হতে হতেও হয় না। আজ প্রতিশ্রুতি দিলে কাল ভঙ্গ হয়। পরের দিন আবার ডাকসু নির্বাচনের দাবি ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে। ডাকসু নির্বাচন নিয়ে এমন পরিস্থিতিই চলে আসছে দীর্ঘদিন। বর্তমান ভিসি অধ্যাপক আখতারুজ্জামান দায়িত্বে আসার পর অনেকেই কিন্তু আবারও আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন ডাকসু নির্বাচন নিয়ে। যদিও তা এখনও প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। তবে ভোটার তালিকা তৈরির কাজ শেষ করায় ডাকসু নির্বাচন করতে আপাতদৃষ্টিতে এখন আর কোনো বাধা নেই বলা চলে।

সর্বশেষ গত ৬ জানুয়ারি ডাকসু নির্বাচনের বিষয়ে হাইকোর্টের দেওয়া স্থগিতাদেশ আপিল বিভাগে বাতিল হয়েছে। ফলে চলতি বছরের মার্চ মাসে ডাকসু নির্বাচন করার যে পরিকল্পনা করছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, তাতে কোনো বাধা থাকল না। একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট ডাকসু নির্বাচন বিষয়ে দেওয়া রায়ে ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়। রায় স্থগিত চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ লিভ টু আপিল করলে গত ১ অক্টোবর চেম্বার বিচারপতি হাইকোর্টের রায় স্থগিত করে আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠায়। সেখানে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সব বাধা কেটে গেল।

গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচন সামনে থাকায় ডাকসু নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা হতে পারে দাবি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আবেদন জানিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এমন ‘অজুহাত’ দাঁড় করানো কিন্তু নতুন কিছু নয়। এর আগে যখনই ডাকসু নির্বাচনের দাবি উঠেছে, তখনই নানা ধরনের ব্যাপার সামনে এনে ডাকসু নির্বাচন না করার জন্য যুক্তি দেখিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এসব যুক্তির মধ্যে অনুকূল পরিবেশ না থাকা, বিচ্ছৃঙ্খলার শঙ্কা, অছাত্রদের ক্যাম্পাসে অবস্থান, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। তবে যেসব যুক্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ডাকসু নির্বাচন করেনি তার কোনোটাই এখন আর নেই বলা চলে। এরপরও কি ডাকসু নির্বাচনের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ উদাসীনতা দেখাবেন?

ডাকসু নির্বাচন নিয়ে এবার ভালো সম্ভাবনা তৈরি হলেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে ক্রমেই। বিশেষত ভোটার তালিকা নিয়ে জটিলতা বাড়ছেই। গত বছর প্রকাশিত তালিকায় স্থান পেয়েছেন শুধু নিয়মিত শিক্ষার্থীরা। কিন্তু ডাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী অনিয়মিত শিক্ষার্থীদেরও ভোটার তালিকায় স্থান পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কিছুটা বিপাকে রয়েছেন বলেই মনে হয়। এজন্য অবশ্য করণীয় ঠিক করতে কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এতে জটিলতা অবসান হবে বলেই আশা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে এবার অন্তত নিরাশ হতে চাই না।

আপিল বিভাগের আদেশকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরেই ডাকসু নির্বাচনের খবর গণমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। মূলত ডাকসু নির্বাচনের কোনো বাধা না থাকার বিষয়টিকেই খবরে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একটি বিষয় পরিষ্কার দেশের সবাই ডাকসু নির্বাচন চান। ফলে আশাবাদী হওয়ার মতো খবর সামনে এলেই তারা একটু নড়েচড়ে বসেন। এবার বোধহয় ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে। অবশ্য এভাবেই চলছে, গত ২৮ বছর ধরে। এবার পরিস্থিতি একটু ভিন্ন হওয়ায় মানুষের আশাটাও তাই অনেক বেশি।

ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে ২০১৭ সালের নভেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্ধ্যাকালীন মাস্টার্সের ছাত্র ওয়ালিদ আশরাফ অনশন শুরু করেন আবারও জোরালো হতে থাকে নির্বাচনের দাবি। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান ডাকসু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওয়ালিদের অনশন ভাঙান। তারও কয়েক মাস পর গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে গণমাধ্যমে খবর আসে। আরও কয়েক মাস পর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের তথ্য হালনাগাদ করা হয় এবং পরে ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়। এরপর আবারও জটিলতা। তবে আশার কথা হলো- আপিল বিভাগের আদেশে এ মুহূর্তে ডাকসু নির্বাচন নিয়ে অন্তুত কোনো জটিলতা নেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সামনে।

গত কয়েক দিনে গণমাধ্যমের খবর বলছে, ডাকসু নির্বাচন নিয়ে বেশ সরগরম ক্যাম্পাস। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক গঠিত কমিটি এখন ডাকসুর গঠনতন্ত্র নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে ব্যস্ত। এজন্য বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে যেসব জটিলতা নিরসন হয়ে যাচ্ছে ব্যাপারটা কিন্তু ততটা স্বচ্ছ নয়। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলো কোনো সমস্যা না দেখলেও বিরোধী সংগঠনগুলো কিছু অভিযোগ তুলে ধরেছেন। যার মধ্যে ছাত্রদলসহ কিছু ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসে সহাবস্থান তৈরির দাবি জানিয়েছেন।

সহাবস্থান তৈরির বিষয়টি অবশ্য বর্তমান সরকারের আগের দুই মেয়াদেই বেশ আলোচিত হয়েছে। ছাত্রদলসহ কয়েকটি সংগঠন এ নিয়ে বেশ সরব থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা প্রায়ই নানা যুক্তিতে এড়িয়ে গেছেন। এবারও সে ধরনের কিছু ব্যাপারই সামনে আসছে। এ বিষয়টির যুক্তিপূর্ণ সমাধান না হলে ডাকসু নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হবে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে। অবশ্য বয়স নিয়ে যে ধরনের অভিযোগ আসে, সেগুলো সমাধানের দায় রয়েছে ছাত্র সংগঠনগুলোরও। এজন্য তাদের দায়িত্ব নিয়েই সমস্যাগুলোর সমাধান করা উচিত।

কারা ডাকসু নির্বাচনের ভোটার হবেন, তা নিয়েও বিভিন্ন মহল থেকে নানা মত ও দাবি আসছে। একটি পক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ভোটার করার পক্ষে। কেউবা আবার এমফিল, পিএইচডির শিক্ষার্থীদেরও ভোটার করার দাবি জানাচ্ছেন। তবে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো- ডাকসু নির্বাচন গত ২৮ বছর অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে এ সময়ে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করেছেন তারা ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাননি। সে ক্ষেত্রে তাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার দাবি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করি। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যুক্তিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবেন বলেই আশা।

অবশ্য নির্বাচনের বিষয়ে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের কাছে মতামত চেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তারা দু’একদিনের মধ্যে তাদের বক্তব্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানাবেন। এতে সংকট সমাধানে বেশ কিছু উপায় সামনে আসবে। সেগুলো ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করবে বলেই আশা। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও এ প্রক্রিয়ায় কোনোভাবে সম্পৃক্ত করা যায় কি না, সে বিষয়টিও বিবেচনা করা জরুরি। কারণ ছাত্র সংগঠন কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের সংযোগ অনেক কম থাকে, এটাই কিন্তু স্বাভাবিক।

অনেক দিন পর ডাকসু নির্বাচন নিয়ে বেশ আশাবাদী হওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও কয়েক মাসের মধ্যেই নির্বাচন করার সম্ভাব্যতার কথা বলেছেন। পরিস্থিতিও অনুকূলেই বলা চলে। সে কারণে ডাকসু নির্বাচনটা অনুষ্ঠিত হোক এটাই এখন সবার চাওয়া। এ নির্বাচনটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক হোক কিংবা বর্তমান, সব শিক্ষার্থীরই প্রাণের দাবিও বটে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সবার দাবির কথা বিবেচনা করে ডাকসু নির্বাচনের আয়োজন করুক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে কথা বলার সবচেয়ে কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হতো ডাকসু। অতীতে এ প্রতিষ্ঠানটির গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করতেও দেখা গেছে। তবে দীর্ঘদিন এ নির্বাচন না হওয়া দুঃখজনক। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সমিতির নির্বাচন, রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচন, অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, কর্মকর্তা-কর্মচারী সমিতিসহ সব নির্বাচনই নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। কিন্তু হাজার শিক্ষার্থীর গণতান্ত্রিক অধিকারের নির্বাচন হচ্ছে দীর্ঘদিন! শিক্ষার্থীদের অধিকারের কথা ভেবেই এবার অন্তত এ নির্বাচনটা অনুষ্ঠিত হোক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ হাজার শিক্ষার্থী এর প্রাণশক্তি। এখন শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অধিকারগুলো যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদেরটা বন্ধ থাকবে কেন? কিন্তু বাস্তবতা হলো শিক্ষার্থীরা ২৮ বছর ধরেই বঞ্চিত, তাদের অধিকার আজ ভূলুণ্ঠিত বলা চলে। হল, ক্লাস, পরীক্ষা আর অনিচ্ছা সত্ত্বে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার মধ্যে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন সীমাবদ্ধ। এর মাধ্যমে কোনো পক্ষ বাড়তি সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে কি না, সে ধরনের প্রশ্ন তোলাও এখন অবান্তর নয় বলে মনে করি।

গত ২৮ বছরে কয়েকজন উপাচার্য ডাকসু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা পূরণ করেননি। তবে বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান সে ধারা থেকে বেরিয়ে আসবেন বলেই আশা। তিনি যদি সঠিক পন্থায় ও সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিকভাবে ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ নিতে পারেন- সেটা হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বড় পাওয়া। এক্ষেত্রে তার নামও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে বেশ স্মরণীয় হয়ে থাকবে সন্দেহ নেই। এ বিষয়টি আমলে নিয়ে হলেও বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান ডাকসু নির্বাচনের সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন, সে প্রত্যাশাই থাকল।

গণমাধ্যমকর্মী
touhiddu.rahman1@gmail.com

একুশে পদকপ্রাপ্ত অভিনেতা আতাউর রহমান আর নেই
  • ১২ মে ২০২৬
সারাদেশের ভূমি মালিকদের জরুরি নির্দেশনা দিল সরকার
  • ১২ মে ২০২৬
ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় লেবাননে ২ বাংলাদেশি নিহত
  • ১২ মে ২০২৬
বাবা-মা বাহিরে, মাদ্রাসাছাত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
  • ১২ মে ২০২৬
রাজধানীসহ ১০ জেলায় ঝড়বৃষ্টির পূর্বাভাস
  • ১২ মে ২০২৬
গলায় লিচুর বিচি আটকে শিশুর মৃত্যু
  • ১২ মে ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
SUMMER 2026
Application Deadline Wednesday, May 13, 2026
Apply Now

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9