© টিডিসি ফটো
বাংলাদেশের প্রথম দিকের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। আর এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরতন্ত্র বিরোধী আন্দোলনে ছাত্র সংসদ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। দেশের অন্যতম রাজনৈতিক নেতারা তাদের ছাত্রজীবন থেকেই নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন। সেই সংগঠনগুলো হলো ডাকসু, রাকসু, চাকসু। যে সংগঠনকে বলা হয় নেতৃত্ব তৈরির সূতিকাগার। কারণ ছাত্র সংসদে সাধারণ ছাত্রদের নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমেই একজন ছাত্র হয়ে ওঠতে পারেন তুখোড় নেতা। তখন তিনি দেশের জন্যও নেতা বনে যেতে পারেন যার উদাহরণ আমাদের মাঝে এখনও বিদ্যমান।
তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো এখন বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ কার্যকর নেই। নতুন প্রতিষ্ঠিত হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও একই অবস্থা। এতে বাংলাদেশ হারাচ্ছে মেধাবি কর্মঠ ছাত্রনেতা। যার কারণে দেশের রাজনীতিতে মেধাবী শিক্ষার্থী আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। ফরে দেশের সার্বিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি গত ২৭ বছর ধরে ছাত্র সংসদের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী জানেই না যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ছাত্র সংসদ’ নামে কোন সংগঠন আছে। এটা এক প্রকার তারুণ্যকে গলা টিপে হত্যা করার মত। যে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করার জন্য ছাত্র সংসদ মূখ্য ভুমিকা পালন করেছিল, সেই গণতন্ত্র আসার পর থেকে ছাত্র সংসদের কার্যক্রম বন্ধ; তার মানে হল তখন থেকেই তারুণ্যের অগ্রগতি থমকে আছে। কারণ একটি দেশ কোন পথে চলছে বা চলবে তা নির্ভর করে সে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেমন তার উপর।
আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজকে আটকে রাখার মানে দেশকে, দেশের অগ্রগতিকে, তারুণ্যকে আটকে রাখা। এসবই কর্তাব্যক্তিরা জানেন তারপরও ছাত্র সংসদ থমকে আছে যা বর্তমান তরুণ সমাজের কাছে বিস্ময়কর এবং হতাশার। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলোকে এ বিষয়ে বারবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তাহলে আমরা ধরে নেব এদেশ তারুণ্যের জাগরণকে চায় না। চায় না সমাজ থেকে সকল অসংগতি, বৈষম্য, বিভেদ দূর হয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা হোক। যার জন্য আমাদেরকে প্রতিনিয়ত দেখতে হচ্ছে শিশু ধর্ষণের মত অমানবিক ঘটনা, বাড়ছে অসচেতনতা, নেই জীবনের নিরাপত্তা, আইনের যথাযথ প্রয়োগও প্রশ্নবিদ্ধ। এসব ঘটনার জন্য সাধারণ নাগরিকের অসচেতনতা, দায়িত্ববোধের অভাবেও জড়িত।
আর এই অভাব তৈরি হয়েছে এদেশের তারুণ্যকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য, ছাত্র সংসদকে বন্ধ করে দেওয়ার জন্য। একমাত্র তরুণরাই পারে সমাজের সকল অসংগতিকে চিরতরে নির্মূল করে আদর্শ সমাজ উপহার দিতে। কিন্তু সেটার জন্য একটা মঞ্চ দরকার আর সেই মঞ্চ হল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ। একটু খেয়াল করলে দেখতে পাই নব্বইয়ের দশকে স্বৈরতন্ত্র নিপাত যাওয়ার পর থেকে ছাত্র সমাজ আর কোন আন্দোলন চোখে দেখেনি। হয়ত প্রয়োজন পড়েনি কিন্ত কোন ভূমিকাও দেখা যায়নি, এখনো যাচ্ছেনা। যদি দেখা যেত তাহলে আমরা দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হতাম না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেও বেকারত্বের অভিশাপে আত্মহত্যা করতাম না। আজ আমাদের মা-বোন, শিশুরা ধর্ষিতা হতেন না। এসবই এখন হচ্ছে কারণ ছাত্র সংসদ বন্ধ করে রাখার মাধ্যমে আমাদের তরুণ সমাজের মেরুদণ্ড ভেঙে পঙ্গু করে রাখা হয়েছে। আমাদের তরুণদের নিজেদের অধিকার চাওয়ার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হল ছাত্র সংসদ। যেখান থেকে আমরা আমাদের অধিকার, পাওনা আদায় করে নিতে পারতাম। যেখান থেকে জনসচেতনতা ছড়িয়ে পড়ত সারাদেশে সকল পেশার, সকল মতের মানুষের মধ্যে। আমরা জনগণকে করতে পারতাম অধিকার সচেতন। মানুষ হয়ে উঠত প্রতিবাদী। যেমন করে হতে পেরেছিল ভাষা আন্দোলনে, মুক্তিযুদ্ধে ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ অবদান রাখতে পারতো শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে। আজ বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ও শিক্ষার গুনগত মান নিশ্চিত হচ্ছে না। নেই শিক্ষক-ছাত্রের মধ্যে সমন্বয় যার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বমানের শিক্ষা নিশ্চিত হতে পারছে না। শিক্ষার্থীদের মধ্যে চলছে অসুস্থ রাজনীতির চর্চা। বিশ্ববিদ্যালয় সংগঠনগুলোর মধ্যে নেই কোন ঐক্য যার কারণে শিক্ষার্থীরা এক প্লাটফর্মে মিলিত হতে পারছে না।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ বন্ধ রাখার মানে একটি জাতির শক্তিকে স্তব্ধ করে রাখা এবং এদেশের তারুণ্যকে ধ্বংস করার নামান্তর। জাতিকে নেতৃত্ব শূন্য করার অশুভ পায়তারা। দেশে বর্তমানে বেশকিছু নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে সেগুলোতে ছাত্র সংসদ গঠিত হওয়া এখন সময়ের অন্যতম দাবি। সেই সাথে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্র সংসদ প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ গঠন করা যেতে পারে যাতে করে দেশ গঠনের জন্য ছাত্র অবস্থায় আমরা যোগ্য নেতৃত্ব পেতে পারি।দেশ এগিয়ে যাবে দূর্বার গতিতে। কোন অশুভ শক্তি আমাদের স্বাধীনতায় হানা দিতে পারবে না। দেশ কখনো নেতৃত্ব শূন্য হবে না। কোন অযোগ্য মানুষ নেতা হতে পারবে না কারণ তখন জাতির সামনে মজুদ থাকবে একঝাঁক মেধাবী কর্মঠ তরুণ যারা দেশকে অগ্রযাত্রার মহারথে আরোহণ করানোর জন্য প্রস্তুত থাকবে। পথ হারাবে না আমার সোনার বাংলা। দরকার হলে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য কর্তৃক জরুরি অধ্যাদেশ জারি করে হলেও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠা জরুরী হয়ে পড়েছে। আমরা সাধারণ ছাত্ররা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে উদাত্ত আহ্বান জানাই যেন অতিসত্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ কার্যক্রম চালু করা হয়।
সর্বোপরি, বাংলাদেশকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যেতে তারুণ্যের বিকল্প চিন্তা করা যায়না। আর যোগ্য নেতৃত্ব সম্পন্ন তারুণ তৈরি হবে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ থেকে। যেখান থেকে আমরা নেতৃত্বের গুনাবলী অর্জন করে দেশের জন্য কাজ করতে পারব। তাই বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের অন্যতম দাবি। বলা যায় বর্তমান ছাত্র সমাজের প্রাণের দাবী হল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ।