যদি প্রশ্ন করা হয় স্বাধীনতার আগে বা পরে বাঙ্গালির গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রাম বা আন্দোলন কোন গুলো? সবাই হয়তো মুখস্থই বলবে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের স্বাধীনতা অর্জন কিংবা নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং অন্যান্য। তখন সবারই জানার ইচ্ছা হতে পারে এসব আন্দোলনের চালিকাশক্তিই বা কি ছিল কিংবা এত বড় ও গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনগুলোর নেতৃত্বই বা কারা ছিল?
ইতিহাস বলে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে বা পরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বেশীরভাগ আন্দোলনই শুরু হয়েছিল এদেশের ছাত্র সমাজের হাত ধরে। আর ছাত্র সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে সবার আগে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার প্রতিষ্ঠান হচ্ছে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় আন্দোলনের সূতিকাগার। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) হচ্ছে নেতা তৈরীর সূতিকাগার।
জাতীয় মুক্তি ও স্বাধিকার আন্দোলনে বাঙ্গালিকে যারা যুগ যুগ ধরে নেতৃত্ব দিয়েছে তারা বেশির ভাগই উঠে এসেছে ডাকসু থেকে। চলুন দেখে আসি ডাকসু র শুরুর দিকে ইতিহাস -
১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ১৯২৪ সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। প্রথমে এর নাম ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাসু)। তখন শিক্ষার্থীদের এক টাকা চাঁদা দিয়ে এর সদস্য হতে হতো। আর এভাবেই যাত্রা শুরু হয় দেশের স্বাধিকার, ভাষার সংগ্রাম ও স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম সূতিকাগার ডাকসুর।শুরুর দিকে অরাজনৈতিক কার্যকলাপ পরিচালনার উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি পায়। সে সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি হল- ঢাকা হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ও জগন্নাথ হল থেকে একজন করে শিক্ষক ও ছাত্র প্রতিনিধি এবং উপাচার্য মনোনীত একজন শিক্ষক দিয়ে সংসদ গঠিত হত। ১৯২৪-২৫ সালে প্রথম ডাকসুর ভিপি মনোনীত করা হয়। সে বছর ডাকসুর প্রথম ভিপি ও জিএস হিসেবে মনোনীত হন মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ও যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত।
১৯৫৩ সালে গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে নাম পরিবর্তন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) রাখা হয়। সে বছরই (১৯৫৩ সালে) বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ডাকসুর প্রথম নিবার্চন অনুষ্ঠিত হয়। এস এ বারী ও জুলমত আলী খান হচ্ছে ডাকসুর প্রথম নির্বাচিত ভিপি ও জিএস। এরপর অনেকটা নিয়মিতই ছিল ডাকসু নির্বাচন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ডাকসু গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয় যা ছিল ডাকসুর নেতৃবৃন্দের অন্যতম সাহসী ও বলিষ্ঠ উদ্যোগ।
স্বাধীন দেশে প্রথম ডাকসু নির্বাচন হয় ১৯৭২ সালে। সেবার ডাকসুর ভিপি হিসেবে নির্বাচিত হন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন থেকে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং জিএস নির্বাচিত হন মাহবুবুর জামান। এরপর আরো পাঁচবার ডাকসু নির্বাচন হয়। তবে সর্বশেষ ডাকসুর নির্বাচন হয় নব্বইয়ের দশকে। ১৯৯০ সালের ৬ জুন ডাকসু ও ১৮টি আবাসিক হল সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
হতাশার কথা হচ্ছে যেখানে ডাকসুকে বলা হচ্ছে এদেশের দ্বিতীয় সংসদ, নেতৃত্ব বা নেতা তৈরীর সূতিকাগার সেখানে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাত্র সাত বারই হয় ডাকসু নির্বাচন। আর সর্বশেষ নির্বাচন যেটা ছিল নব্বইয়ের দশকে। এরপর দীর্ঘ ২৮ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠনসহ বিভিন্ন সংগঠনের নিয়মিত নির্বাচন হলেও ডাকসু নির্বাচন দেয়া হয়নি কোনো এক অজানা কারণে। তখন থেকেই নীরব ঐতিহ্যের সাক্ষী ডাকসু ভবন এবং কার্যত অচল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ।
আশার কথা হচ্ছে গত বছরের ১৭ জানুয়ারি ছয় মাসের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন করার জন্য রায় দেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। সেই রায় অমান্য করায় গত ১৭ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে আদালত অবমাননার আবেদন করেন আইনজীবী মনজিল মোরশেদ। এরপরই নড়ে চড়ে বসেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কর্তৃপক্ষ ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন দিতে হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে গত ১ অক্টোবর চেম্বার আদালতে লিভ টু আপিল করে। আদালত হাইকোর্টের রায়ে চেম্বার বিচারপতির দেওয়া স্থগিতাদেশ তুলে নিয়েছেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের করা আবেদনের শুনানি ৩০ মার্চ পর্যন্ত মুলতবি (স্ট্যান্ডওভার) রেখেছেন। সুতরাং ডাকসু নির্বাচনে আর আইনগত বাধা থাকছে না।
এরই মধ্যে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর সভাপতি-সম্পাদকদের সঙ্গে নিয়ে মতবিনিময় করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ৩১ অক্টোবর শিক্ষার্থীদের হলভিত্তিক ডাটাবেজও প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। যা শিক্ষার্থীদের ডাকসু নির্বাচনের আশা দেখাচ্ছে। আর সবকিছু ঠিক থাকলে এ বছর মার্চে ডাকসু নির্বাচনের আইনগত আর বাধাও নেই। তাহলে হচ্ছে কী সেই কাঙ্ক্ষিত ডাকসু নির্বাচন?