ইতিহাস সৃষ্টি করতে যাচ্ছে তুর্কি সিরিজ ‘দিরিলিস আরতুগ্রুল’

সালাউদ্দিন কামরান
সালাউদ্দিন কামরান  © টিডিসি ফটো

‘উসমানীয় সাম্রাজ্যের’ প্রতিষ্ঠাতা উসমানের পিতা আরতুগ্রুল গাজীর সত্য ইতিহাস অবলম্বনে নির্মিত ‘দিরিলিস আরতুগ্রুল’ এখন পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ড্রামা সিরিজ। শুধু তুরস্কেই নয়, সারা বিশ্বে এটার জনপ্রিয়তা এখন সবার শীর্ষে।

তুর্কি, বাংলা, হিন্দি এবং উর্দুসহ আরো ২৫টি ভাষায় নির্মিত এই ড্রামা সিরিজ। এই সিরিজে রয়েছে ১৫০টি পর্ব, ৫টি সিজন।এই সিরিজে আরতুগ্রুল চরিত্রে অভিনয় করেন তুরস্কের জনপ্রিয় অভিনেতা ‘এনজিন আলতান দোজায়তান’ এবং সেলজুক রাজকন্যা আরতুগ্রুলের স্ত্রী হালিমা সুলতানার চরিত্রে অভিনয় করেন ‘ইসরা বিলগিস’।

এই সিরিজ নির্মানের প্রথম পরিকল্পনাকারী হচ্ছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেব এরদোয়ান। এই সিরিজের শুধু শুটিং দেখার জন্য ২২টি দেশের প্রতিনিধিরা এসেছে। এই সিরিজের জন্য ৪৫টি ঘোড়া সার্বক্ষনিক থাকতো। প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শক এই সিরিজের শুটিং দেখতে আসতো। এরদোয়ান নিজেই এই সিরিজ পরিদর্শন করতে এসেছিলেন।

এই সিরিজ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা কম হয়নি। এই সিরিজ নিয়ে অনেকের অনেক মন্তব্য। বাংলাদেশে দিন দিন এর জনপ্রিয়তা বেড়েই চলছে। বিভিন্ন গেঞ্জি কোম্পানিগুলো ‘কায়ি’ চিহ্ন দিয়ে গেঞ্জি তৈরি করছে। এই সিরিজের নাম দিয়ে বাংলাদেশের ফেসবুকে অনেক পেজ, গ্রুপ তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের তরুণরা দিন দিন এই সিরিজের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন পত্রিকাগুলোতে নিউজ চাপানো হচ্ছে। তুর্কিদের রীতিনীতি-কথাবার্তা তরুণরা কপি করছে। তাদের মত করে বুকে হাত দিচ্ছে।

যাই হোক, আমি মনে করি এই সিরিজটার পেছনে এরদোয়ানের একটা শক্ত পরিকল্পনা ছিল। ২০০১ সালের পর থেকে ইসলাম ধর্মকে কিছু গোষ্ঠী জঙ্গি বলে মনে করে। পৃথিবীর যেখানেই কিছু ঘটে সেখানেই মুসলমানদের দায়ী করা হচ্ছে।ইউরোপীয়ানদের চোখে পাঞ্জাবী পায়জামা মানেই উগ্র। এটা ইউরোপীয়ানদের মন মগজে জায়োনিস্টরা ডুকিয়ে দিয়েছে।

২০০১ সালে আমেরিকা থেকে এটাও ঘোষণা হয়েছে যে, ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক মোহাম্মদ (সা.) ছিলেন মূল জঙ্গি। ইন্ডিয়া থেকে শুরু করে ইউরোপ আমেরিকায় তারা যেভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটাচ্ছে, বিভিন্ন মুভির মাধ্যমে মুসলমানদের উগ্রভাবে প্রকাশ করছে। এমনই এক সময়ে এরদোয়ান হাজির হয়েছে ‘দিরিলিস আরতুগ্রুল’ সিরিজ নিয়ে।এই সিরিজে নাইট-টেম্পলারদের (খ্রিস্টানদের) সকল চক্রান্ত তুলে ধরেছেন।

তৎকালীন সময়ে তারা যে কতটা বর্বর ছিল, তা এই সিরিজে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তাদের পাহাড় সমান ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকদের আকাশ সমান চক্রান্ত আরতুগ্রুল গাজী একাই যেভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন, তাও এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আল্লাহর ওপর আস্থা রেখে যে মুসলিমরা জিহাদে ঝাপিয়ে পড়েছে, কোরানের ওপর তাদের অটল বিশ্বাস, ন্যায় বিচার, অমুসলিমদেরব প্রতি নম্র ব্যবহার, ইসলামি আদর্শ চর্চা ইত্যাদি সব কিছুই এই সিরিজে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

সিরিজটি নিয়ে আমেরিকায় প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে, সিরিজটি একটি নীরব এটম বোমা। কাস্মীরে এই সিরিজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ এই সিরিজের মাধ্যমে নাকি কাস্মীরীরা জিহাদী হয়ে উঠবে। এই সিরিজটি দেখে আমেরিকার এক দম্পতি ইসলাম গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি গিনেস বুকে এই সিরিজটির নাম উঠেছে।

এই সিরিজটির পেছনে এরদোয়ান আরেকটা পরিকল্পনা হলো- তরুণদের সুস্থ সংস্কৃতির দিকে ধাবিত করা। অশ্লীলতা থেকে দূরে সরানো। একটি জাতির তরুণ প্রজন্মকে অশ্লীলতা থেকে সরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন সংস্কৃতিতে পরিবর্তন। কারণ, একটি জাতিকে সাংস্কৃতিকভাবে পঙ্গু করে দিতে পারলেই সে জাতি চিরস্থায়ী ভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করে।

আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল, নায়ক-নায়িকাদের ইসলামের প্রতি ধাবিত করা এবং পর্দার ভেতরে আবদ্ধ করা। আপনি তুর্কিদের অন্য মুভিগুলো দেখে থাকবেন, সেগুলোতে নায়ক-নায়িকারা কতটা অশ্লীল বুঝতে পারবেন। তাই এই সিরিজ দিয়ে তাদের পর্দার ভেতরে আবদ্ধ করা হয়েছে।

এই সিরিজটি আপনি কেন দেখবেন?

আপনি যদি অধিক মুভি খোর হয়ে থাকেন তাহলে এই সিরিজটি আপনার জন্য। এই সিরিজটি একবার দেখা শুরু করলে শেষ করা পর্যন্ত আপনি শান্তি পাবেন না। এটা একটা ওষুধের মতো, একবার খেলেই ছাড়তে পারবেন না। এই সিরিজটি দেখলে পৃথিবীর আর অন্য কোনো মুভি আপনার কাছে ভালো লাগবে না। এই সিরিজটি দেখার সময়, আপনি কখনো কাঁদবেন কখনো আনন্দে হাসবেন। কায়িদের কোনো সদস্য মারা গেলে মনে হবে আপনার পরিবারের কেউ মারা গেছে।

পরামর্শ

১) এই সিরিজ দেখে এটাকে হালাল বলে প্রচার করবেন না।
২) আপনি যদি একজন লেখক হন তাহলে এই সিরিজটি দেখবেন না। কারণ, এই সিরিজ আপনার অনেক সময় অপচয় করবে। আপনার লেখালেখির অভ্যাস থেকে আপনাকে সরিয়ে নিবে।

৩) এনজিন আলতানকে ‘আরতুগ্রুল’ বলে প্রচার করবেন না। কারণ, যে আরতুগ্রুল গাজী আপনি সিরিজে দেখছেন সে হচ্ছে অভিনেতা। আসল আরতুগ্রুলের ছবি প্রচার করুন।

৪) এই সুস্থ সংস্কৃতিটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিন।হিন্দি মুভি থেকে মানুষকে আস্তে আস্তে সরিয়ে আনতে হবে এই মুভির মাধ্যমে।
৫) এই সিরিজ নিয়ে বিতর্কে জড়াবেন না।

সর্বশেষ একটি কথাই বলবো, এই সিরিজটি ইতিহাস সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। অশ্লীল মুভিগুলো বাদ দিয়ে এই সিরিজটি প্রচার করুন। দিরিলিস পৌঁছে যাক প্রত্যেকটি ঘরে ঘরে।

লেখক: শিক্ষার্থী, তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ