প্রথম মানুষ হজরত আদম (আ.) এর ভাষা কী ছিল?

০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৩১ PM
প্রথম মানুষ হজরত আদম (আ.) এর ভাষা কী ছিল?

প্রথম মানুষ হজরত আদম (আ.) এর ভাষা কী ছিল? © টিডিসি ফটো

মানুষকে আল্লাহ সকল সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদাপূর্ণ করেছেন। মানুষের রয়েছে বিবেকবোধ, স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি, বুদ্ধিমত্তা, চিন্তা ও সৃজনশীল ক্ষমতা। মানুষকে এই অনন্য বৈশিষ্ট্য দান করে তাকে পৃথিবীতে আল্লাহ খিলাফতের দায়িত্ব প্রদান করেছেন। 

মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর ইবাদত করবে, তাওহিদের বাণী সকল মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে, আল্লাহর আদেশ নিষেধ মান্য করতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবে, আখেরাতের জীবন নিয়ে সতর্ক করবে এবং আল্লাহর দ্বীন ইসলামকে পৃথিবীতে বাস্তবায়নের কাজ করবে। মহান এ দায়িত্ব পালনের জন্য আল্লাহ মানুষকে জ্ঞানার্জন, শিক্ষাদানের যোগ্যতা দান করেছেন। মনের ভাব প্রকাশের নানা উপায় তথা বিভিন্ন ভাষা প্রদান করেছেন।

প্রথম মানুষ হজরত আদম (আ.)  কে সৃষ্টির পরই তাকে ভাব প্রকাশের ক্ষমতা দান করেছেন। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তাকে মনের ভাব প্রকাশ করতে শিখিয়েছেন। (সুরা আর রাহমান ৩-৪)। আদম (আ.)  ছিলেন প্রথম মানুষ, আল্লাহ তাকে ভাব প্রকাশের জন্য যাবতীয় শব্দ ভান্ডার শিক্ষা দিয়েছেন। প্রতিটি বিষয়ের পরিচয় শিক্ষা দিয়েছেন একই সাথে অন্যের সামনে উপস্থাপনের দক্ষতা প্রদান করেছেন। 

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আর আল্লাহ তাআলা আদম (আ.)  কে প্রতিটি বস্তুর নাম শিখালেন। অত:পর সে সকল বস্তুসমূহকে ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করে বললেন, আমাকে তোমরা এগুলোর নাম বলে দাও যদি তোমরা সত্যবাদী হও। (সুরা আল বাকারা: ৩১) প্রথম মানুষ হজরত আদম (আ.)  কোন ভাষায় তার ভাব প্রকাশ করতেন তথা আদম (আ.) এর ভাষা কি ছিল তা নিয়ে তাফসিরকারকগণ ও বিশ্লেষকগণ বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে বিভিন্ন মতামত প্রদান করেছেন।

আদম (আ.) এর ভাষা ছিল আরবি

সুরা আলা বাকারায় আল্লাহ আদম (আ.)  কে সকল ব¯র‘ নাম শিক্ষা দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন এবং আদম (আ.)  সে সমস্ত জ্ঞানকে ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করতে সমর্থ হয়েছিলেন। এখানে প্রতিটি বস্তুর পরিচয় কোন ভাষায় আদম (আ.)  অবগত হয়েছিলেন এবং হজরত আদম (আ.)  তর সঙ্গিনী হজরত হাওয়া (আ.)  এর সাথে কোন ভাষায় ভাব প্রকাশ করতেন এর বিশ্লেষণে তাফসিরকারগণের কেউ কেউ মতামত প্রদান করেছেন আদম (আ.)  এর ভাষা ছিল আরবি। 

তিনি আরবি ভাষায় সকল জিনিসের পরিচয় অবগত হয়েছিলেন। ফেরেশতাদের সাথে তিনি আরবিতে কথোপকথন করেছেন। ইমাম জালালুদ্দিন আস সুয়ুতি তার কিতাবে ইবনে আসাকির ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত একটি আছার উল্লেখ করে বলেন, ‘জান্নাতে আদম (আ.)  এর ভাষা ছিল আরবি। তিনি আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা অতিক্রম করলে আল্লাহ তাঁর নিকট থেকে আরবি ভাষাকে ছিনিয়ে নেন, ফলে তিনি সুরিয়ানি ভাষায় কথা বলতে থাকেন। 

অত:পর আদম (আ.)  তওবা করলে আল্লাহ তওবা কবুল করেন এবং তাকে আরবি ভাষা পুনরায় ফিরিয়ে দেন।’ (দুররুল মানছুর, খন্ড-১, পৃষ্ঠা- ৩০৯) এ বর্ণনার আলোকে বুঝা যায় ফেরেশতাদের সাথে আদম (আ.)  আরবি ভাষায় কথা বলতেন এবং এটিই তার মূল ভাষা। সাময়িক সময়ের জন্য তিনি সুরিয়ানি ভাষায় কথা বলেছেন।  

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (স.) বলেছেন, ‘তোমরা তিনটি কারণে আরবদের ভালোবাসো, আমি আরবি ভাষী, জান্নাতিদের ভাষা আরবি’ (মিশকাত/৬০০৬, মুসতাদরাক/৬৯৯৯)। এ হাদিসের আলোকে অনেকেই যুক্তি দেন আদম (আ.)  যেহেতু জান্নাতে অবস্থান করেছিলেন সুতরাং তার ভাষা আরবি হওয়ায় স্বাভাবিক। কিন্তু  ইবনুল জাওযি, আলবানি সহ কতিপয় মুহাদ্দিস হাদিসটির সনদের বিশুদ্ধতা নিয়ে আপত্তি করেছেন।

আদম (আ.) এর ভাষা ছিল সুুরিয়ানি

আদম (আ.)  প্রথম যে ভাষায় কথা বলতেন তা হলো সুরিায়ানি বা সিরিয়াক ভাষা। সহিহ ইবনে হিব্বান গ্রন্থে সংকলিত একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘আবু যার (রা.) রাসুল (স.) কে নবিদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলেন, রাসুল (স.) বললেন, নবিগণ হলেন এক লক্ষ চব্বিশ হাজার, আবু যার (রা.) রাসুলের সংখ্যা জানতে চাইলে রাসুল (স.) বললেন তিনশত ত্রিশ। এরপর রাসুল (স.) বলেন প্রথম নবি হলেন আদম (আ.) । চারজন নবি ছিলেন সিরিয়াক; আদম (আ.), শিস (আ.), নুহ (আ.) এবং ইদরিস (আ.)। চারজন নবি আরবীয়; হুদ (আ.), সালেহ (আ.), শুয়াইব (আ.) এবং তোমার নবি মুহাম্মদ (স.)। (সহিহ ইবনে হিব্বান, ৩৬১, মুসনাদে আহমাদ, ৫/১৭৮-১৭৯)। কিন্তু ইবনে কাছির তার আল বিদায়া গ্রন্থে এবং পরবর্তীতে যুগের বিভিন্ন হাদিস বিশারদগণ হাদিসটির সনদের বিশুদ্ধতা নিয়ে আপত্তি করেছেন।

আল্লামা বদরুদ্দিন আল আইনি তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘আদম (আ.) সিরিয়াক ভাষায় কথা বলতেন। তার বংশধরদের মধ্যে নবি ও অন্যান্যরাও এ ভাষায় কথা বলতেন। যেমন, ইবরাহিম (আ.) এর ভাষা সিরিয়াক ছিল যা ইউফ্রেটিস পার হওয়ার পর নমরুদের বাহিনী থেকে রক্ষার জন্য আল্লাহ তার ভাষাকে হিব্রুতে পরিবর্তন করে দেন।’ (উমদাতুল কারি শারহু সহিহুল বুখারি, খÐ-১,২, পৃষ্ঠা-৫২)

আদম (আ.) সকল ভাষা জানতেন

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আয়াতটিতে আল্লাহ তাআলা আদম (আ.) কে সকল বস্তুর নাম শিখিয়েছেন বলতে সকল ভাষার শব্দ ভাÐার শিক্ষা দান করেছিলেন। ইমাম আবু মুহাম্মাদ আল হুসাইন আল বাগাবী প্রসিদ্ধ মুফাসসির ইবনে আব্বাস (রা.), মুজাহিদ,কাতাদাহ ও ইবনে জুবায়েরের বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা আদম (আ.) কে সকল জিনিসের নাম শিক্ষা দিলেন এমনকি বড়ো ও ছোট পাত্রের নাম পর্যন্ত। 

ইমাম বাগাবী আরো উল্লেখ করেছেন, ‘আল্লাহ আদমকে সকল নাম শিক্ষা দ্বারা আদম (আ.) কে সকল ভাষা শিক্ষা দান করেছিলেন। আদম (আ.)  সকল ভাষা জানতেন। এবং তার থেকেই তার সন্তানরা সকল ভাষা শিক্ষা লাভ করেছেন। তার সন্তানরা বিভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানে ছড়িয়ে যাওয়ায় তাদের মধ্যে ভাষার বৈচিত্র সৃষ্টি হয়েছিল।’ (মাআলিমুত তানযিল ফি তাফসিরীল কুরআন, পৃষ্ঠা- ৮০)
ইমাম কুরতুবি (র.) তার আল জামি লিল আহকামিল কুরআন গ্রন্থে সুরা বাকারা: ৩১ নম্বর আয়াতের তাফসির করতে গিয়ে বেশ কিছু বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। ইবনে আব্বাস বলেন, আল্লাহ আদমকে সমস্ত নাম শিখিয়েছিলেন। 

আসিম ইবনে কুলাইব, হাসান বিন আলির মুক্ত দাস সাদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস এর সাথে বসা ছিলাম তখন তিনি একটি পাত্র এবং একটি চাবুকের নামের উল্লেখ করলেন। ইবনে খুযাইদ মিনদাদ এর বর্ণনায় এসেছে, এ আয়াতটি প্রমাণ করে যে ভাষা ঐশ্বরিকভাবে অবতীর্ণ এবং আল্লাহ আদম (আ.)  কে তা সম্পূর্ণরূপে ও বিস্তারিতভাবে শিখিয়েছিলেন। শায়বান কাতাদাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি তাকে তার সৃষ্টির নাম শিখিয়েছেন, যে নামগুলো তিনি ফেরেশতাদের শেখাননি। 

তিনি প্রতিটি বস্তুর নামকরণ করেছেন এবং প্রতিটি বস্তুর উপকারিতা তার প্রকারভেদ অনুযায়ী শিক্ষা দিয়েছেন। কাব আল আহবার থেকে বর্ণিত, আরবি ও সিরিয় লিপি ও সকল ভাষার সকল গ্রন্থের প্রবর্তক ছিলেন হজর আদম (আ.)। তবে অন্যান্য সনদে বর্ণিত হয়েছে, প্রথমে আরবি কথা বলেন জিবরাইল (আ.) যিনি  নুহ (আ.) এর নিকট পৌঁছে দেন। এছাড়া কিছু বর্ণনায় প্রথম আরবি ভাষার ব্যক্তি হিসেবে হজরত ইসমাইল (আ.) এর নাম পাওয়া যায়। ইমাম কুরতুবি বলেন, সঠিক মত হলো সকল ভাষায় কথা বলা প্রথম মানুষ হলেন আদম (আ.)।

আদম (আ.) এর ভাষা ছিল ইশারা ভাষা

ইসলামিক তথ্যসূত্রের বাইরে আধুনিক ভাষা বিজ্ঞানীদের অনেকেই মনে করেন, পৃথিবীর প্রথম মানুষের কোনো কথ্য ভাষা ছিলো না, বরং মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করত এবং ক্রমান্বয়ে মানুষের ব্যবহৃত শব্দের বিবর্তনেই ভাষার উৎপত্তি ঘটেছে। অধ্যাপক মাইকেল করবালিস ’ফ্রম হ্যান্ড টু মাউথ, দ্যা অরিজিনস অব ল্যাংগুয়েজ’ গ্রন্থে মানুষের ভাষা হাত ও মুখের অঙ্গভঙ্গি বা ইশারা থেকে ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। 

অন্যদিকে, ভাষাবিদ ড. তাহিয়া আব্দুল আজিজ ইসমাইল তার ‘ক্ল্যাসিকাল অ্যারাবিক এজ দ্যা এনথেস্টর অফ ইন্ডো ইউরোপিয়ান ল্যাংগুয়েজেস এন্ড অরিজিন অব স্পিচ’ গ্রন্থে দীর্ঘ গবেষণা ও ভাষাতাত্বিক প্রমাণাদির মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন আরবি ভাষাই হলো প্রথম ভাষা যা থেকে সকল ইন্দো ইউরোপিয়ান ভাষার উৎপত্তি ঘটেছে। 

ইবনে হাজম ‘আল ইহকাম ফি উসলুল আহকাম’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, মানুষ সহজাত ভাবে ভাষা শেখেনি বরং আল্লাহই মানুষকে ভাষা শিক্ষা প্রদান করেছেন। আপনা আপনি কারো পক্ষে ভাষা আয়ত্ত করা সম্ভবপর নয়। প্রথম মানুষ আদম (আ.) এর ভাষা কী ছিল তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। আল্লাহ তাকে যে ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন তা সকল ভাষার উৎস। হতে পারে সে ভাষাটি বর্তমানে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, অথবা তাকে চিহ্নিত করা সম্ভবপর নয়। তিনি যে ভাষা জানতেন তার শব্দ ভান্ডারে অগণিত সমার্থক শব্দাবলি ছিল বলে তার সন্তানরা এর বিভিন্ন ব্যবহার করতে গিয়ে পরবর্তীতে বিভিন্ন ভাষার উৎপত্তি ঘটেছে।

সুতরাং, আল্লাহ তাআলা আদম (আ.) কে ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ভাষা শিক্ষা দিয়েছিলেন এটি অনস্বীকার্য। কিন্তু সেটি কোন ভাষা ছিল তা নিয়ে কুরআন ও সহিহ হাদিসে সুস্পষ্ট বক্তব্য না থাকায় মুসলিম বিশ্লেষক ও গবেষকদের মাঝে মতভেদ লক্ষণীয়। ফলে, এর বিস্তারিত জ্ঞান আল্লাহর উপর সোপর্দ করাই শ্রেয়।
 
লেখক: শিক্ষক ও ইসলামি আলোচক

শুধু অ্যাটেনডেন্সের জন্যই ক্লাসে আসেন মাভাবিপ্রবির ৭১ শতাংশ…
  • ০২ নভেম্বর ২০২৬
‘আগেই ভালো ছিলাম’ পক্ষের মানুষদের জন্য কিছু কথা
  • ০২ নভেম্বর ২০২৬
কেন শুধু দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদের এইচএসসি পরীক্ষা, জ…
  • ০২ নভেম্বর ২০২৬
৪৪তম বিসিএস: প্রবেশপত্র টেম্পারিং করে নিষেধাজ্ঞার মুখে প্রা…
  • ০২ নভেম্বর ২০২৬
স্বতন্ত্র এবতেদায়ি মাদ্রাসার দুই মাসের চেক ছাড়
  • ০২ নভেম্বর ২০২৬
সহকারী জজের পদ ২৫০টি, প্রিলি পাস মাত্র ৩৪৩ প্রার্থী
  • ০২ নভেম্বর ২০২৬