সরকারি চাকরির অন্ধ মোহ: মেধার একমুখী স্রোত যে সংকট তৈরি করছে

২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৪৬ PM
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের লোগো ও  ইয়াসির সিলমী

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের লোগো ও  ইয়াসির সিলমী © টিডিসি সম্পাদিত

বর্তমান বাংলাদেশে তরুণদের একটি বিশাল অংশের ধ্যান-জ্ঞান ও সাধনার একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে বিসিএস তথা সরকারি চাকরি। ক্লাসরুম থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি কিংবা আড্ডা ও খাওয়ার টেবিল সর্বত্রই ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন ও প্রস্তুতির মহড়া। এ আকাঙ্খা শুধু মেধাবি বা শীর্ষ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীদের নয়, এটা ছড়িয়ে পড়েছে মাঝারি মানের শিক্ষার্থীদের মানসপটেও। সরকারি চাকরির প্রতি এই প্রবল ঝোঁক যেমন ব্যক্তিপর্যায়ে নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষা থেকে তৈরি, তেমনি এটি আমাদের জাতীয় উন্নয়ন ও মেধার সুষম বণ্টনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকারি চাকরির প্রতি এই তীব্র আকর্ষণের হার বুঝতে হলে আমাদের কিছু পরিসংখ্যানের দিকে তাকাতে হবে। সাম্প্রতিক বিসিএস পরীক্ষাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিটি বিসিএস-এ গড়ে সাড়ে ৩ লাখ থেকে ৪ লাখ প্রার্থী আবেদন করছেন। অথচ পদসংখ্যা থাকে মাত্র ২ হাজার থেকে ৩ হাজার। অর্থাৎ, সাফল্যের হার ১ শতাংশেরও কম। বাকি ৯৯ শতাংশ তরুণ তাদের জীবনের সবচেয়ে উৎপাদনশীল সময়গুলোর কয়েক বছর এই একটি মাত্র পরীক্ষার পেছনে ব্যয় করে হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছেন। এ ধরনের তরুণরা চাকরিতে প্রবেশের সময় অতিক্রম করলে হতাশাগ্রস্ত হয়ে যান।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং শ্রমশক্তির তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট কর্মক্ষম জনশক্তির (প্রায় ৭ কোটির বেশি) মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ সরকারি বা আধা-সরকারি খাতে নিয়োজিত। বাকি ৯৫ শতাংশ মানুষই কাজ করেন বেসরকারি কিংবা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে বেসরকারি খাতের অবদান ৮০ শতাংশের বেশি। অথচ দেশের শীর্ষ মেধাবীদের প্রথম পছন্দ সেই ৫ শতাংশের সরকারি খাত। সর্বশেষ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১৫ এপ্রিল সংসদ বলেছেন, সরকার পাঁচ লক্ষ কর্মচারী নিয়োগের পরিকল্পনা করছে। সরকারের প্রধানের এই ঘোষণা সরকারি চাকুরি প্রত্যাশীদের এই মিছিলকে নিঃসন্দেহে আরও দীর্ঘায়িত করবে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এক বক্তৃতায় সরকারি চাকরি পেতে বিসিএস পরীক্ষা নিয়ে তরুণদের অতিউৎসাহকে একটি 'সামাজিক ব্যাধি' হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। এমনকি এই প্রবণতা দূর করতে ভবিষ্যতে বিসিএস কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন বলেও মত দিয়েছেন তিনি।

আমাদের তরুণরা প্রথম বর্ষ থেকে চাকরির পড়াশোনা করতে গিয়ে একাডেমিক জ্ঞান অর্জন থেকে অনেক দূরে চলে যান। প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষার ভাইভা বোর্ডে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষায় অনেকে নিজের স্নাতকের বিষয়ের মৌলিক প্রশ্নের উত্তরও ঠিকঠাক দিতে পারেন না। তার মতে, তরুণদের সবচেয়ে প্রোডাক্টিভ একটা সময় বিসিএস খেয়ে ফেলছে। এই ডিজিজ থেকে তাদের বের হতে হবে।

নিরাপত্তা বনাম সৃজনশীলতা: বিসিএস কেন মহীরুহ?

তরুণ প্রজন্মের এই একমুখী স্রোতের জন্য শুধু তাদের মানসিকতাকে দোষারোপ করা বাস্তবসম্মত নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি চাকরির বেতন কাঠামো ও সামাজিক মর্যাদায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। স্থায়িত্ব, আবাসন সুবিধা, সুদমুক্ত গাড়ির লোন, র্অবসরকালীন পেনশন এবং ক্ষমতার একটা প্রচ্ছন্ন স্বাদসহ আরও নানা সুবিধা সরকারি চাকরিকে তরুণদের কাছে ‘সোনার হরিণ’ করে তুলেছে। অন্যদিকে, বেসরকারি খাতে চাকরির অনিশ্চয়তা, কাজের অতিরিক্ত চাপ এবং তুলনামূলক কম বেতন ও সুযোগ-সুবিধা মেধাবীদের এই খাত থেকে বিমুখ করছে। এর পেছনে রয়েছে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সুযোগ-সুবিধার বিশাল ও দৃশ্যমান পার্থক্য।

প্রথমত, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যে কোনো মুহূর্তে ছাঁটাই হওয়ার ভয় থাকে, বিশেষ করে করোনা মহামারি বা সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্দার সময় আমরা বেসরকারি খাতের চরম অনিশ্চয়তা দেখেছি। বিপরীতে, সরকারি চাকরিতে ছাঁটাই হওয়ার ঝুঁকি প্রায় শূন্য।

দ্বিতীয়ত, সরকারি চাকরিতে রয়েছে আর্থিক সুবিধা ও অবসরকালীন নিরাপত্তার হাতছনি। ২০১৫ সালের নতুন পে-স্কেলের পর সরকারি চাকরিতে বেতন-ভাতা আকর্ষণীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর সঙ্গে আছে চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা, সহজ শর্তে গৃহনির্মাণ ঋণ এবং সবচেয়ে বড় আকর্ষণ—পেনশন। জীবনের শেষ বয়সে আর্থিক নিরাপত্তার এই গ্যারান্টি বেসরকারি খাতে প্রায় নেই বললেই চলে। হাতেগোনা কয়েকটি বহুজাতিক বা শীর্ষস্থানীয় দেশীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেশিরভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রভিডেন্ট ফান্ড বা গ্রাচ্যুইটির সঠিক বাস্তবায়ন নেই। এদিকে সরকার নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পথে আছে। যা কার্যকর হলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়বে প্রায় দ্বিগুণ।

তৃতীয়ত, আমাদের সমাজব্যবস্থায় একজন সফল উদ্যোক্তা বা বেসরকারি ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার চেয়ে একজন এন্ট্রি-লেভেলের সরকারি কর্মকর্তাকে সামাজিকভাবে (এমনকি বিয়ের বাজারেও) বেশি মূল্যায়ন করা হয়। এই সামাজিক চাপ তরুণদের বাধ্য করে বিসিএস-এর গোলকধাঁধায় প্রবেশ করতে। এছাড়া ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া তীব্র আকাঙ্খাও তরুণদের সরকারি চাকরির প্রতি আসক্তি বাড়িয়েছে। বিশেষত প্রশাসন, পুলিশ ও ট্যাক্স ক্যাডার চাহিদার শীর্ষে। এমনকি অনেকেই এসব ক্যাডার পাওয়ার জন্য অন্য সরকারি চাকরিতে থাকলেও বয়স থাকা পর্যন্ত পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন।  

মেধার অপচয় এবং অভ্যন্তরীণ ‘ব্রেইন ড্রেইন’

সবচেয়ে বড় শঙ্কার জায়গাটি হলো মেধার অসম বণ্টন। একটি রাষ্ট্রের সুষম আর্থসামাজিক ভারসাম্য ও সমৃদ্ধির জন্য সব সেক্টরে মেধাবীদের প্রয়োজন। যখন দেশের শ্রেষ্ঠ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা একজন ইঞ্জিনিয়ার নিজের ফিল্ডে কাজ না করে পুলিশ বা কাস্টমস ক্যাডার হওয়ার জন্য মুখস্থ বিদ্যায় জোর দেন, তখন রাষ্ট্র হারায় একজন দক্ষ কারিগর। যখন একজন চিকিৎসক বা কৃষিবিদ তার গবেষণাগার ছেড়ে দিয়ে প্রশাসনে যোগ দেন, তখন সেটি কেবল ওই ব্যক্তির ক্যারিয়ারের পরিবর্তন নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের জন্য এক ধরনের অভ্যন্তরীণ মেধা পাচার বা ইন্টারনাল ব্রেইন ড্রেইন।

বেসরকারি খাত, গবেষণা, উদ্ভাবন, সাহিত্য, শিল্পকলা, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মতো ক্ষেত্রগুলোতে আজ মেধাবীদের আকাল দেখা দিচ্ছে। কারণ, এই খাতগুলোতে টিকে থাকার জন্য যে পরিমাণ সংগ্রাম করতে হয়, তার তুলনায় প্রাপ্তি অনেক কম।

সবাই যদি নিরাপদ রুটিনমাফিক চাকরির খোঁজে ছোটেন, তবে বিশ্বমানের স্টার্টআপ তৈরি করবে কে? প্রযুক্তি বিপ্লবে নেতৃত্ব দেবে কে? বিজ্ঞানের ছাত্ররা যখন ল্যাব ছেড়ে ইতিহাসের সাল-তারিখ মুখস্থ করতে ব্যস্ত হয়, তখন দেশের মৌলিক গবেষণার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। যে দেশে মেধাবীদের চূড়ান্ত লক্ষ্য কেবলই একটি নিরাপদ মাসিক বেতন ও পেনশনের চেক, সে দেশে নতুন ইলন মাস্ক, মার্ক জাকারবার্গ কিংবা অমর্ত্য সেন তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য মেধাবীদের উপস্থিতি সব সেক্টরে অপরিহার্য। শিল্পায়ন, গবেষণা, সৃজনশীল মাধ্যম, প্রযুক্তি এবং উদ্যোক্তা—এই প্রতিটি খাতেই যদি মেধাবীরা না থাকেন, তবে রাষ্ট্র একসময় মেধার বন্ধ্যাত্বে ভুগবে। বেসরকারি খাত একটি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। সেখানে যদি মেধাবী নেতৃত্বের অভাব থাকে, তবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে পড়ব।

ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতির জন্য করণীয়

দেশের অর্থনীতিকে যদি আমরা উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে যেতে চাই, তবে এই ব্যবস্থার আশু সংস্কার প্রয়োজন। মেধার স্রোতকে বহুমুখী করতে হলে রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে হবে।

বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য শক্তিশালী শ্রম আইন বাস্তবায়ন করতে হবে। চাকরির নিরাপত্তা, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা এবং উপযুক্ত বেতন কাঠামো নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে। কেননা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের সুবিধা বৃদ্ধির ব্যাপারে কিছুটা উদাসীন। কেউ বাস্তব সমস্যা থেকে, আবার কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কর্মীবান্ধব হয় না। তাই সরকারকে প্রথমেই বেসরকারি খাতে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে, তবেই চাপ প্রয়োগ করে কর্মীদের সুবিধা নিশ্চিত করতে পারবে।

এছাড়া সরকার যে সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করেছে, সেটিকে বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য আরও লাভজনক, আস্থাশীল ও বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে শেষ বয়সের নিরাপত্তার জন্য শুধু সরকারি চাকরির ওপর নির্ভর করতে না হয়।

পাশাপাশি যারা স্টার্টআপ বা নিজস্ব ব্যবসা শুরু করতে চান, তাদের জন্য জামানতবিহীন ব্যাংক ঋণ ও ট্যাক্স হলিডে নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণায় বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হবে, যাতে গবেষকরা দেশে বসেই বিশ্বমানের কাজ করতে পারেন।

সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হল সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। সমাজ, পরিবার এবং গণমাধ্যমকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। একজন কৃষক, একজন ফ্রিল্যান্সার বা একজন বেসরকারি চাকরিজীবীর অবদান যে রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে কোনো অংশে কম নয়, এই বোধটি জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে।

 সরকারি চাকরি অবশ্যই সম্মানজনক এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সৎ ও মেধাবী আমলা অপরিহার্য। কিন্তু একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেবল আমলাতন্ত্র দিয়ে বিনির্মাণ করা যায় না। রাষ্ট্রের সমৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন বহুমুখী মেধার। কারখানার চাকা ঘোরানো থেকে শুরু করে মহাকাশ গবেষণা—সব জায়গাতেই আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পদচারণা থাকতে হবে।

সরকারি ও বেসরকারি খাতের বৈষম্য কমিয়ে এনে সব পেশায় সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই আমরা এই সরকারি চাকরির মোহ থেকে তরুণ প্রজন্মকে বের করে আনতে পারি। যেদিন আমাদের মেধাবীরা শুধু নিরাপত্তার পেছনে না ছুটে নিজস্ব সৃজনশীলতা ও প্যাশন অনুযায়ী পেশা বেছে নিতে পারবে এবং রাষ্ট্র তাদের সেই পছন্দের পেশায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও সুবিধা দেবে, ঠিক সেদিনই বাংলাদেশ একটি প্রকৃত অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমৃদ্ধির পথে পা বাড়াবে।

 ইয়াসির সিলমী

লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

বিনিয়োগ ও দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বাড়াতে চায় বাংলাদেশ-জাপান
  • ২৯ এপ্রিল ২০২৬
শিক্ষামন্ত্রীর নতুন পিএস ফারহান ইসতিয়াক
  • ২৯ এপ্রিল ২০২৬
বিএনপিসহ মেয়াদোত্তীর্ণ সকল অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনে বেহাল দশা
  • ২৯ এপ্রিল ২০২৬
৯ মাসে ওয়ালটনের মুনাফা ৬৪২.৯৪ কোটি টাকা; পরিচালন নগদ প্রবাহ…
  • ২৯ এপ্রিল ২০২৬
তামিম নির্বাচিত হয়নি, নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছে: সাকিব
  • ২৯ এপ্রিল ২০২৬
বজ্রপাতের বিকট শব্দে হাসপাতালে ভর্তি ১১ ছাত্রী
  • ২৯ এপ্রিল ২০২৬