মোফাজ্জল হোসেন © টিডিসি সম্পাদিত
মাত্র ১৩ বছর বয়সেই ঢাকার নগর এলাকায় বসবাসকারী তানু (ছদ্মনাম) নামের এক কিশোরীকে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো হয় একটি ভুয়া জন্ম সনদের মাধ্যমে, যেখানে তাকে প্রাপ্তবয়স্ক দেখানো হয়েছিল। এখন তার বয়স ১৭। ইতিমধ্যেই সে এক সন্তানের জননী। এখন দীর্ঘ শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের ফলে ট্রমা, মাদকের ওপর নির্ভরশীলতা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছে শিশুটি। পরিবারের দাবি, তার জন্মসনদ তিনবার ভিন্ন ভিন্ন ভুয়া তথ্য দিয়ে নিবন্ধিত করা হয়েছিল, যা অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিয়ে নিশ্চিত করার জন্য করা হয়েছিল। এখন পরিবার এ সিদ্ধান্তের জন্য গভীর অনুশোচনাবোধ করছেন।
বাংলাদেশে বাল্যবিয়ে ও যৌন নির্যাতনের অন্যতম চালক হলো ভুয়া জন্ম নিবন্ধন। হাতে লেখা বা ছাপানো সনদ সহজেই জাল করা সম্ভব, আবার অনেক ভুয়া নিবন্ধন কখনোই সরকারি অনলাইন ডাটাবেইসে পাওয়া যায় না। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পরিবার বা দালালচক্র অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে দেয়, যা তাদের সারা জীবনের শোষণ ও নির্যাতনের ঝুঁকিতে ঠেলে দেয়।
বাংলাদেশে আইন অনুযায়ী, মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর। জন্ম নিবন্ধন জাল করা জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন এবং বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-এর আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু দুর্বল তদারকি, দুর্নীতি এবং স্থানীয় প্রশাসন ও নিবন্ধন অফিসগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। এর ফলে প্রতিবছর হাজার হাজার অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের বিয়ে ভুয়া কাগজপত্রের আড়ালে হয়ে যাচ্ছে।
এই গুরুতর সমস্যাটি সমাধানে ঢাকা আহছানিয়া মিশন কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে তদারকি জোরদার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য অ্যাডভোকেসি চালাচ্ছে। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা পর্যায়ে যেখানে ভুয়া নিবন্ধন বেশি ঘটে, সেখানে ডিজিটাল যাচাই-বাছাই ও ক্রস-চেকিং প্রক্রিয়া আরও কড়াকড়ি করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শিশু যৌন শোষণ প্রতিরোধে বর্তমানে আহছানিয়া মিশন “Enhancing Protection of Child Sex Trafficking Survivors in Bangladesh Project” শীর্ষক একটি ১৫ মাসব্যাপী প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ঢাকায় এবং যশোরে। প্রকল্পটি The Freedom Fund এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের JTIP Office দ্বারা সহায়তাপ্রাপ্ত। প্রকল্পের আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য দেওয়া হচ্ছে—আপদকালীন আশ্রয় ও পরামর্শ সেবা, মাদক নিরাময় কেন্দ্রের রেফারেল, পরিবার পুনঃএকীকরণে সহায়তা, কমিউনিটি-ভিত্তিক সুরক্ষা কমিটি, স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সরকারি সংস্থার সঙ্গে অ্যাডভোকেসি আলোচনা। এ প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি ৫৯০ জন ১৭ বছরের নিচে শিশু প্রতিরোধ, সুরক্ষা ও পুনর্বাসন সেবার আওতায় আসবে।
মূলত, জন্ম নিবন্ধন ব্যবস্থার ফাঁকফোকর বন্ধ করতে হলে সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে অনলাইন যাচাই বাধ্যতামূলক করা, স্থানীয় নিবন্ধন কর্মকর্তাদের ওপর নজরদারি জোরদার করা, জালিয়াতির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও শিশু সুরক্ষা সংস্থাগুলোর সমন্বয় বৃদ্ধি। এসব সংস্কার ছাড়া ভুয়া জন্ম নিবন্ধন শিশু বিয়ে ও শোষণের নীরব ইন্ধন জোগাতে থাকবে।
লেখক: মোফাজ্জল হোসেন, উন্নয়নকর্মী।