প্রয়াণের পাঁচ দশকে আরও প্রাসঙ্গিক কাজী নজরুল

২৬ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৮ PM , আপডেট: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০১ AM
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম © সংগৃহীত

কবি নজরুলের বয়স তখন এক বছর। সেই বছর ‘কবিজীবনী’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবির জীবন ও তাঁর সৃষ্টির সম্পর্ক নিয়ে প্রবন্ধটিতে গভীর এক ভাবনা তুলে ধরেছিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘কোনো ক্ষণজন্মা ব্যক্তি কাব্যে এবং জীবনের কর্মে উভয়তেই নিজের প্রতিভা বিকাশ করিতে পারেন; কাব্য ও কর্ম উভয়ই তাঁহার এক প্রতিভার ফল। তাঁহাদের কাব্যকে তাঁহাদের জীবনের সহিত একত্র করিয়া দেখিলে তাহার অর্থ বিস্তৃততর, ভাব নিবিড়তর হইয়া উঠে।’

বহু বছর পর কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সৃজন যেন রবীন্দ্রনাথের সেই ধারণাটিরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছিল। নজরুলের কবিতা শুধু কল্পনার জগৎ থেকে উঠে আসেনি বরং তাঁর জীবনসংগ্রাম, বিশ্বাস, বিদ্রোহ, প্রেম, বেদনা ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা বারবার সৃষ্টিতে রূপ পেয়েছে। আবার কবিতায় যে আকাঙ্ক্ষা ও আদর্শ উচ্চারণ করেছেন বাস্তব জীবনেও তার জন্য দাঁড়িয়েছেন নজরুল। আরও পরে কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, ‘কবিতা ও জীবন একই জিনিসের দুই রকম উৎসারণ।’

নজরুলের ক্ষেত্রে এই কথাটিও যেন নতুন ব্যাখ্যা পায়। তাঁর জীবন থেকে যেমন কবিতা উৎসারিত হয়েছে তেমনি কবিতায় উচ্চারিত বিশ্বাস ও আকাঙ্ক্ষাকেও তিনি ধারণ করেছেন বাস্তব জীবনেও। সময়ের সঙ্গে সমাজের মত ও পথের বিভাজন যত বিস্তৃত হয়েছে, নজরুলকে গ্রহণের পরিসরও তত বহুমাত্রিক হয়েছে।

‘সওগাত’ পত্রিকায় ১৯১৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্প ‘বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী’। এরপর ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি ‘বিদ্রোহী’। একই বছর প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতাগ্রন্থ, গল্পগ্রন্থ ও প্রবন্ধগ্রন্থ। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বাংলা সাহিত্যে নিজের স্বতন্ত্র জায়গা করে নেন তিনি।

বিদ্রোহ, সাম্য, মানবতা, ধর্মীয় সম্প্রীতি কিংবা প্রেমের মতো বিভিন্ন অনুভূতি ও আকাঙ্ক্ষার ভাষায় আজও এই বদ্বীপের ভিন্ন মতের মানুষ নিজেদের খুঁজে পান নজরুলের সৃষ্টিতে। ফলে আজ ১২ ভাদ্র তাঁর প্রয়াণের পাঁচ দশক পূর্ণ হলেও তাঁর প্রাসঙ্গিকতা ফুরোয়নি।

নজরুলের কাব্যচর্চার বিকাশ ঘটে এমন এক উত্তাল সময়ে, যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত, রুশবিপ্লব, অসহযোগ আন্দোলন, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড, শ্রমিক অসন্তোষ ও সাম্প্রদায়িক সংঘাতে উপমহাদেশের সমাজ-রাজনীতি টালমাটাল। সেই সময়ের অস্থিরতা, ক্ষোভ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা যেন তাঁর কণ্ঠে এসে ভাষা পেল।

‘সওগাত’ পত্রিকায় ১৯১৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্প ‘বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী’। এরপর ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি ‘বিদ্রোহী’। একই বছর প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতাগ্রন্থ, গল্পগ্রন্থ ও প্রবন্ধগ্রন্থ। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বাংলা সাহিত্যে নিজের স্বতন্ত্র জায়গা করে নেন তিনি। কিন্তু নজরুলের বিদ্রোহ কেবল কবিতার পঙ্‌ক্তিতে আটকে থাকেনি। নিজের সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় ব্রিটিশবিরোধী লেখা প্রকাশের কারণে ঔপনিবেশিক সরকারের রোষানলে পড়েন তিনি।

‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা প্রকাশের পর পত্রিকাটি বাজেয়াপ্ত হয় এবং গ্রেপ্তারও হন নজরুল। এই জায়গাতেই নজরুলের জীবন ও সৃজনের সেই অন্তমিল আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর যে সার্বজনীন আকাঙ্ক্ষা তাঁর কবিতায় পাওয়া যায়, নিজের জীবনেও তারই প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তাই আজকের বাংলাদেশে অন্যায়, বৈষম্য কিংবা নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা খুঁজতে গেলে তরুণদের সামনে এখনও ফিরে আসেন তিনি।

আরও পড়ুন: নাজিম হিকমত: কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে বিশ্বসাহিত্যের আলোকবর্তিকা

নজরুলকে শুধু বিদ্রোহের কবি কিংবা শ্রেণিসংগ্রামের কবি হিসেবে দেখলে তাঁর পূর্ণাঙ্গ পরিচয় ধরা পড়ে না। কারণ কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা মতাদর্শ নয় বরং তাঁর সাম্যের কেন্দ্রে ছিল মানুষ। ‘সাম্যবাদী’, ‘কুলি-মজুর’সহ বহু রচনায় তিনি সমাজের প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষের কথা বলেছেন। আজকের বাংলাদেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, বেকারত্ব কিংবা সামাজিক বঞ্চনার প্রশ্ন উঠলেই তাই তাঁর সাম্যের কবিতা নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

কবির জীবনাবসান হলেও যে সমাজে অন্যায় আছে, আজও সেখানে তাঁর দ্রোহ ফিরে আসে; যেখানে বৈষম্য আছে, সেখানে তাঁর সাম্যের ডাক ফিরে আসে; যে সমাজে ধর্মীয় বিভাজন আছে, সেখানে তাঁর সম্প্রীতির চেতনা ফিরে আসে। তাই যত মত ও পথ, ততই প্রাসঙ্গিক কাজী নজরুল।

ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ কাজী নজরুলের সৃষ্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। কালজয়ী ইসলামী গান, গজল, হামদ-নাত যেমন লিখেছেন তেমনি তাঁর কলমেই সৃষ্টি হয়েছে শ্যামাসংগীত, ভজন ও হিন্দু পুরাণভিত্তিক গান-কবিতা। ফলে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের মানুষও তাঁর সৃষ্টিতে নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সুর খুঁজে পান। অন্যদিকে অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক পরিসরে নজরুল হয়ে ওঠেন ধর্মীয় সম্প্রীতির অন্যতম প্রতীক। বর্তমানেও ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্ন যখন মানুষকে বিভাজিত কওে তখন নজরুলের বহুত্ববাদী স্বর মনে করিয়ে দেয় মানুষের পরিচয়কে কোনো একক খাঁচায় বন্দি করা যায় না।

নজরুল শুধু রাজপথের নন, অন্দরেরও কবি। তাই বাংলাদেশের ঘরে ঘরে এখনও তাঁর গান বাজে। বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানের অন্যতম বড় উৎসব ঈদুল ফিতরের চাঁদরাতে ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানটি যেন উৎসবেরই অবিচ্ছেদ্য সুর। আবার প্রেম, বিচ্ছেদ, আকুলতা, অভিমান কিংবা ব্যক্তিগত বেদনার মুহূর্তে ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী, দেবো খোঁপায় তারার ফুল’, ‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে’, ‘আলগা কর গো খোঁপার বাঁধন’, ‘আমায় নহে গো ভালোবাসো শুধু ভালোবাসো মোর গান’সহ অসংখ্য গানে বাঙালি এখনও খুঁজে পায় নিজের অনুভূতির ভাষা।

আরও পড়ুন: বিয়ের রাতেই স্ত্রীকে রেখে পালিয়েছিলেন নজরুল, ১৬ বছর পর চিঠিতে কী লিখেছিলেন

এত সুর আর দ্রোহের কবির সক্রিয় জীবন থমকে যেতে শুরু করে ১৯৪০ এর দশকে। ১৯৪২ সালে নির্বাক হয়ে পড়েন তিনি। যে কণ্ঠ একসময় ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বজ্রের মতো গর্জে উঠেছিল, সেই কণ্ঠই ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যায়। পরে ১৯৭৪ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়। একই বছর তাঁর সবচেয়ে ছোট ছেলে কাজী অনিরুদ্ধ মারা যান। ক্রমেই অবনতি হতে থাকে কবির শারীরিক অবস্থার।

কবির জীবনের শেষ দিনগুলো কাটে ঢাকার পিজি হাসপাতালে (বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়)। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন তিনি। কবির জীবনাবসান হলেও যে সমাজে অন্যায় আছে, আজও সেখানে তাঁর দ্রোহ ফিরে আসে; যেখানে বৈষম্য আছে, সেখানে তাঁর সাম্যের ডাক ফিরে আসে; যে সমাজে ধর্মীয় বিভাজন আছে, সেখানে তাঁর সম্প্রীতির চেতনা ফিরে আসে। তাই যত মত ও পথ, ততই প্রাসঙ্গিক কাজী নজরুল।

জাবি শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ফেসবুকে মানহানিকর পোস্টের অভিযোগ
  • ২৭ আগস্ট ২০২৬
নেপালে আকস্মিক বন্যার কারণ কী? সেখানে এত পর্যটক কেন গিয়েছিল…
  • ২৭ আগস্ট ২০২৬
ডুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক সিরাজুল হক আর নেই
  • ২৭ আগস্ট ২০২৬
ফুল-ফ্রি স্কলারশিপ নিয়ে পড়ুন চেক প্রজাতন্ত্রে 
  • ২৭ আগস্ট ২০২৬
সেপ্টেম্বরে পে স্কেলের গেজেট হলে অক্টোবর থেকেই বাড়তি সুবিধা…
  • ২৭ আগস্ট ২০২৬
হোয়াটসঅ্যাপের নিরাপত্তায় নতুন ফিচার, টু-স্টেপ ভেরিফিকেশনে এ…
  • ২৭ আগস্ট ২০২৬