বাংলাদেশে কি সন্তান দত্তক নেওয়া যায়?

১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৬ AM
শিশু দত্তক

শিশু দত্তক © সংগৃহীত

বিয়ের সাত বছর পরও সন্তান হচ্ছিল না সাইফ সালেহীনের। বাংলাদেশে চিকিৎসার পাশাপাশি ভারত ও সিঙ্গাপুরেও চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছেন তিনি। তাতেও কোনো ফল হয়নি। শেষ পর্যন্ত সন্তান দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেখানেও তৈরি হয় জটিলতা। বাংলাদেশে শিশু দত্তক নেওয়ার নির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। আদালতের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ায় শিশুর অভিভাবকত্ব পাওয়া যায়।

গোপনীয়তার স্বার্থে সাইফ সালেহীনের ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি জানান, আইনি জটিলতা এড়াতে ছয় বছর আগে ২০১৯ সালে স্ট্যাম্প পেপারে স্বাক্ষর করে একটি শিশু নেন। তখন শিশুটির বয়স ছিল মাত্র ১৮ দিন।

সাইফ সালেহীন বলেন, তার নেওয়া মেয়েটি ছিল তার জৈবিক বাবা-মায়ের ষষ্ঠ সন্তান। শিশুটিকে নেওয়ার সময় তার আসল বাবা-মায়ের সঙ্গে স্ট্যাম্পে চুক্তি করা হয়। সেখানে বলা হয়, ওই শিশুর ওপর তাদের আর কোনো অধিকার থাকবে না। ভবিষ্যতে তারা শিশুটিকে নিজেদের কাছে নিতে পারবেন না। এর বিনিময়ে তাদের মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়া হয়।

তবে আইনজীবীরা বলছেন, স্ট্যাম্প পেপারে স্বাক্ষর করে এভাবে সন্তান নেওয়া আইনসিদ্ধ নয়। বাংলাদেশে শিশু নেওয়ার বিষয়টি মূলত ধর্মভিত্তিক ‘পারসোনাল ল’ বা ব্যক্তিগত আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। পারসোনাল ল বলতে সংশ্লিষ্ট ধর্মের ধর্মীয় বিধান ও নিয়মের ভিত্তিতে পরিচালিত আইনকে বোঝায়।

এ কারণে প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশে নিঃসন্তান দম্পতিরা আসলে শিশু দত্তক নিতে পারেন, নাকি শুধু অভিভাবকত্ব পেতে পারেন? এ ক্ষেত্রে কোন আইন অনুসরণ করতে হয়? আর আইনি প্রক্রিয়াটিই বা কতটা জটিল?

বাংলাদেশের একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা লুৎফা নাজনীনও (ছদ্মনাম) বিয়ের ১১ বছর পর সন্তান না হওয়ায় শিশু নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রায় দুই বছর আগে তিনি এ বিষয়ে উদ্যোগী হন। পরিচিতজনদের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, আদালতের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ায় কোনো শিশুর অভিভাবকত্ব পাওয়া যায়।

পরে তিনি আজিমপুরের সরকারি শিশু সদনে যোগাযোগ করেন। সেখানে দেড় মাস বয়সী একটি মেয়েশিশুকে পছন্দ করেন তিনি। শিশুটিকে মাত্র তিন দিন বয়সে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফেলে যাওয়া হয়েছিল।

শিশুটির অভিভাবকত্ব পেতে পারিবারিক আদালতে আবেদন করেন লুৎফা নাজনীন। কয়েক মাস শুনানির পর কিছু শর্ত সাপেক্ষে আদালত তাকে শিশুটির অভিভাবকত্ব দেন। লুৎফা নাজনীন বলেন, শিশুটির ভবিষ্যৎ কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আদালত তার পড়ালেখার খরচের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা এফডিআর করে রাখতে বলেন। এর প্রমাণ হিসেবে তিনি সরকারি দপ্তরে রসিদও জমা দেন।

আদালত যখন নিশ্চিত হয় যে তিনি শিশুটির দায়িত্ব নিতে সক্ষম, তখন তাকে শিশুটির আইনগত অভিভাবক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে এই পুরো প্রক্রিয়া সহজ ছিল না। আদালতসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে দীর্ঘদিন দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছে বলে জানান তিনি।

আইনজীবীরা বলছেন, মুসলিম আইনে সন্তান দত্তক নেওয়ার কোনো বিধান নেই। ফলে বাংলাদেশে অনেক সময় যে ‘দত্তক’ নেওয়ার কথা বলা হয়, সেটি আসলে শিশুর অভিভাবকত্ব পাওয়া।

অভিভাবকত্বের মাধ্যমে শিশুকে নিজের জিম্মায় রেখে লালন-পালন করা যায়। তবে এতে শিশুটি আইনগতভাবে নিজের জৈবিক সন্তান হয়ে যায় না। অর্থাৎ অভিভাবকত্ব পাওয়া এবং সন্তান দত্তক নেওয়া এক বিষয় নয়।

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন এবং ১৯৩৭ সালের মুসলিম ব্যক্তিগত আইন বা শরিয়াহ অনুযায়ী এতিম কিংবা অসহায় শিশুকে লালন-পালন করা যায়। তবে শিশুর বাবা-মায়ের নামের জায়গায় লালন-পালনকারী বাবা-মায়ের নাম ব্যবহার করা যায় না। ইসলামী আইনে এর বৈধতা নেই।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিতি সানজানা বলেন, ‘গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট, ১৮৯০’ অনুযায়ী যে কেউ কোনো শিশুর অভিভাবকত্ব পেতে পারেন। বাংলাদেশে মুসলিম আইনে দত্তকের ধারণা নেই। তাই গার্ডিয়ানশিপ পাওয়া এবং দত্তক নেওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

তার ভাষ্য, কোনো শিশুকে নিয়ে বিরোধ না থাকলে কয়েকটি শুনানির মাধ্যমেই আইনি প্রক্রিয়ায় অভিভাবকত্ব পাওয়া সম্ভব। তবে বিরোধ বা জটিলতা থাকলে প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ হয়। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হলে সময় আরও বেড়ে যায়। তবে এ ধরনের আবেদনের ক্ষেত্রে আদালত শিশুর সর্বোচ্চ স্বার্থ ও সর্বোত্তম কল্যাণকে গুরুত্ব দেয় বলে জানান তিনি।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। হিন্দু উত্তরাধিকার আইন (সংশোধিত) অনুযায়ী সন্তান দত্তক নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এই আইনে দত্তক সন্তান ও জৈবিক সন্তানের মধ্যে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য করা হয় না। তবে উচ্চ আদালতের একটি নির্দেশের পর বর্তমানে শুধু ছেলে শিশুকে দত্তক নেওয়ার বিষয়টি আইনসিদ্ধ। অর্থাৎ এ আইনের আওতায় শুধু ছেলে শিশুকেই দত্তক নেওয়া যায়। এখানে অভিভাবকত্বের চেয়ে দত্তক নেওয়াকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

হিন্দু পুরুষ বিবাহিত, অবিবাহিত কিংবা বিপত্নীক—যেকোনো অবস্থায় সন্তান দত্তক নিতে পারেন। তবে নারীদের ক্ষেত্রে রয়েছে কিছু সীমাবদ্ধতা। একজন অবিবাহিত হিন্দু নারী সন্তান দত্তক নিতে পারেন না। বিবাহিত নারীকে সন্তান দত্তক নিতে হলে স্বামীর অনুমতি প্রয়োজন। হিন্দু বিধবা নারীও সন্তান দত্তক নিতে চাইলে স্বামীর মৃত্যুর আগে দেওয়া অনুমতিপত্র দেখাতে হবে।

মুসলিম আইনের মতো খ্রিস্ট ধর্মেও সন্তান দত্তক নেওয়ার নির্দিষ্ট কোনো বিধান নেই। এ ধর্মের অনুসারীরা শিশুর অভিভাবকত্ব নিতে পারেন। ‘গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট, ১৮৯০’ অনুযায়ী খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরাও মুসলিমদের মতো শিশুর আইনগত অভিভাবকত্ব পেতে পারেন।

১৯৮৯ সালে জাতিসংঘের শিশু অধিকার কনভেনশন গৃহীত হয়। বাংলাদেশ ওই কনভেনশনে স্বাক্ষর করলেও দত্তক গ্রহণ-সংক্রান্ত ২১ নম্বর ধারায় অনুস্বাক্ষর করেনি। এর অন্যতম কারণ হিসেবে মুসলিম ধর্মীয় বিধানে দত্তক গ্রহণের স্বীকৃতি না থাকার বিষয়টি সামনে আসে। তবে যুদ্ধশিশুদের পুনর্বাসনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে একটি বিশেষ আইন করা হয়েছিল। ওই আইনে এতিম ও পরিত্যক্ত শিশুদের দত্তক নেওয়ার সুযোগ ছিল।

পরবর্তী সময়ে শিশু পাচার ও ধর্মান্তরের অভিযোগ সামনে আসে। ১৯৮২ সালে আইনে সংশোধন আনা হয়। এরপর বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশি শিশু দত্তক দেওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। আইনটি বাতিল হওয়ার আগে এর আওতায় অনেক যুদ্ধশিশু ও পরিত্যক্ত শিশুকে দত্তক দেওয়া হয়েছিল।

১৯৬৭ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ থেকে শিশু দত্তক নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা অনিয়মের অভিযোগও ছিল। নেদারল্যান্ডসে দত্তক নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রেও এমন অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল। তবে বিদেশে বসবাসকারী কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশি নাগরিক হলে তিনি অভিভাবকত্বের মাধ্যমে কোনো শিশুকে নিজের জিম্মায় নিতে পারেন।

আইনজীবীরা বলছেন, শিশুকে দেশের বাইরে নিতে হলে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিয়ে আবেদন করতে হবে। আদালতের অনুমতি পাওয়ার পরই শিশুকে দেশের বাইরে নেওয়া যাবে।

আইন অনুযায়ী, জৈবিক সন্তান ছাড়া পালক সন্তান স্বাভাবিকভাবে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় না। অভিভাবক হিসেবে কোনো শিশুকে লালন-পালন করলেও মুসলিম ও খ্রিস্টান আইনে সেই শিশু পালক বাবা-মায়ের সম্পত্তির আইনগত উত্তরাধিকারী হয় না বলে জানান আইনজীবী মিতি সানজানা। তবে মুসলিমদের মধ্যে পালক সন্তানকে হেবা বা উপহার হিসেবে সম্পত্তি দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। মিতি সানজানার মতে, এভাবে সম্পত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রেও আইনি জটিলতা রয়েছে।

তিনি বলেন, হেবা করতে হলেও সেটি ফাস্ট ব্লাড বা নিকট রক্তসম্পর্কের মধ্যে হতে হবে। দাদা, দাদি, নানা ও নানির বাইরে হেবা করা যায় না। তবে দেশে অনেকে এভাবে সম্পত্তি দিয়ে থাকেন। তার মতে, এ ক্ষেত্রে অনেক সময় জালিয়াতির আশ্রয় নিতে হয়। তবে মুসলিমরা ওসিয়তের মাধ্যমে পালক সন্তানকে সম্পত্তি দিতে পারেন। কিন্তু পুরো সম্পত্তি ওসিয়ত করা যায় না।

মিতি সানজানা বলেন, ওসিয়ত মৃত্যুর পর কার্যকর হয়। আইন অনুযায়ী মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ওসিয়ত করা যায়। পুরো সম্পত্তি ওসিয়ত করার সুযোগ নেই। তবে এ ক্ষেত্রেও কিছু আইনি জটিলতা রয়েছে। পালক বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর পালক সন্তানকে ওই সম্পত্তি ভোগ করতে হলে অন্য ওয়ারিশদের অনাপত্তি প্রয়োজন হতে পারে।

এ জন্য পালক সন্তানকে আলাদা আবেদনের মাধ্যমে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে ‘সন্তান দত্তক নেওয়া’ কথাটি প্রচলিত হলেও এর আইনি কাঠামো ধর্মভেদে ভিন্ন। মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রে মূলত আদালতের মাধ্যমে অভিভাবকত্ব পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর হিন্দুদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে দত্তক নেওয়ার আইনি ব্যবস্থা রয়েছে।

জাতীয়তাবাদী ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের ২৭১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ…
  • ০২ নভেম্বর ২০২৬
২০২৭ সালে সরকারি ছুটি ২৯ দিন
  • ০২ নভেম্বর ২০২৬
ছাত্রলীগের সম্পৃক্ততার অভিযোগে জবি শিক্ষার্থীকে মারধর করে প…
  • ০২ নভেম্বর ২০২৬
ইলানের মাকে হারাতে চাই না!
  • ০২ নভেম্বর ২০২৬
নোয়াখালীতে নতুন গ্যাসকূপের সন্ধান, দৈনিক মিলবে ১০ মিলিয়ন …
  • ০২ নভেম্বর ২০২৬
গাকৃবিতে শিল্প-সহযোগিতা ও ক্যারিয়ার গঠনে দিনব্যাপী সেমিনার
  • ০২ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950