আইফোন ১৮ প্রো © সংগৃহীত
প্রযুক্তিপ্রেমীদের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাজারে এসেছে অ্যাপলের নতুন ফ্ল্যাগশিপ আইফোন ১৮ প্রো ও আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্স। নতুন এই সিরিজে ক্যামেরা, চিপ, ব্যাটারি ও ডিসপ্লেতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার কথা বলা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় চমক হতে পারে ক্যামেরায় ভ্যারিয়েবল অ্যাপারচার প্রযুক্তি। পাশাপাশি অ্যাপলের প্রথম ভাঁজ করা আইফোনও উন্মোচনের ঘোষণা এসেছে, যা প্রযুক্তি বাজারে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নতুন আইফোনের দামও আগের মডেলের তুলনায় বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অ্যাপলের এবারের বড় পণ্য উন্মোচন অনুষ্ঠান ‘সারপ্রাইজ অ্যান্ড শাইন’ অনুষ্ঠিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার কুপারটিনোর অ্যাপল পার্কে। বাংলাদেশ সময় বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাত ১১টায় শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে নতুন আইফোনের পাশাপাশি অ্যাপল ওয়াচ, এয়ারপডস ও স্মার্ট হোমের বিভিন্ন পণ্যের ঘোষণা এসেছে।
জন টার্নাস প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি অ্যাপলের প্রথম বড় পণ্য উন্মোচন অনুষ্ঠান। ফলে নতুন পণ্য ঘোষণার পাশাপাশি নেতৃত্বে পরিবর্তনের কারণেও এবারের আয়োজনটি ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
আইফোন ১৮ প্রো ও প্রো ম্যাক্সে বড় পরিবর্তন
আইফোন ১৮ প্রো ও আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্সে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসতে পারে ক্যামেরায়। বিশেষ করে প্রো ম্যাক্স মডেলে প্রথমবারের মতো ডিএসএলআর ক্যামেরার মতো ভ্যারিয়েবল অ্যাপারচার বা মেকানিক্যাল আইরিস যুক্ত হওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্যামেরায় প্রবেশ করা আলোর পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ফলে কম আলোতে ছবি তোলার সময় আরও ভালো ফল পাওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পোর্ট্রেট ছবিতে আরও স্বাভাবিক ব্যাকগ্রাউন্ড ব্লার পাওয়ার সুবিধাও মিলতে পারে।
প্রযুক্তিবিষয়ক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যামেরা ব্যবস্থায় এই পরিবর্তন আইফোনের ইতিহাসে অন্যতম বড় আপগ্রেড হতে পারে। নতুন নকশায় ফোনের সামগ্রিক আকৃতিতে বড় পরিবর্তন না এলেও ক্যামেরা মডিউল আগের তুলনায় কিছুটা বড় হতে পারে।
থাকছে নতুন প্রজন্মের চিপ
নতুন আইফোনের কর্মক্ষমতা বাড়াতে এ২০ ও এ২০ প্রো চিপ ব্যবহারের গুঞ্জন রয়েছে। প্রো মডেলে ২ ন্যানোমিটার প্রযুক্তিতে তৈরি এ২০ প্রো চিপ ব্যবহার করা হতে পারে।
নতুন প্রজন্মের এই চিপ ব্যবহারের ফলে ফোনের প্রসেসিং ক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি তাপ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যাটারি ব্যবস্থাপনাতেও উন্নতি হতে পারে। সিরিজের সব মডেলেই ১২ গিগাবাইট র্যাম ব্যবহারের সম্ভাবনার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
উন্নত মোবাইল নেটওয়ার্ক সংযোগের জন্য নতুন সি২ মডেম এবং স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ৫জি সংযোগের সুবিধা যুক্ত হতে পারে। ওয়াই-ফাইয়ের কার্যকারিতা বাড়াতে এন২ চিপ ব্যবহারের কথাও শোনা যাচ্ছে।
ছোট হতে পারে ডায়নামিক আইল্যান্ড
আইফোন ১৮ প্রো সিরিজের ডিসপ্লেতেও পরিবর্তনের গুঞ্জন রয়েছে। নতুন এলটিপিও প্যানেলের পাশাপাশি ডিসপ্লে আগের তুলনায় আরও উজ্জ্বল হতে পারে।
এ ছাড়া ডায়নামিক আইল্যান্ডের আকার প্রায় ৩৫ শতাংশ ছোট করার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। ফলে সামনের ডিসপ্লেতে ব্যবহারকারীরা আরও বেশি জায়গা পাবেন।
আইফোন ১৮ প্রোতে ৬ দশমিক ৩ ইঞ্চি এবং আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্সে ৬ দশমিক ৯ ইঞ্চির পর্দা থাকার ধারণা করা হচ্ছে।
ব্যাটারিতে বড় পরিবর্তন
ব্যাটারি সক্ষমতা বাড়াতেও কাজ করেছে অ্যাপল। বিশেষ করে প্রো ম্যাক্স মডেলে ব্যাটারির আকার বাড়িয়ে ৫ হাজার ৫০০ মিলিঅ্যাম্পিয়ার আওয়ারের বেশি করা হতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এতে আগের মডেলের তুলনায় ব্যাটারি ব্যাকআপ প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
তবে বড় ব্যাটারি ব্যবহারের কারণে আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্স আগের মডেলের তুলনায় সামান্য মোটা ও ভারী হতে পারে। চীনের বিভিন্ন সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, ফোনটির পুরুত্ব প্রায় শূন্য দশমিক ২৫ মিলিমিটার এবং ওজন প্রায় ৭ গ্রাম বাড়তে পারে।
রঙেও আসতে পারে নতুনত্ব
নতুন আইফোন ১৮ প্রো ও প্রো ম্যাক্সে রঙের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসতে পারে। লাইট ব্লু, ডার্ক চেরি বা বারগান্ডি এবং নতুন ডার্ক ব্ল্যাক শেডে ফোন দুটি বাজারে আসার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
দাম কত হতে পারে
নতুন আইফোনের দাম নিয়ে প্রযুক্তি বিশ্বে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা চলছে। বিশ্ববাজারে র্যামের দাম বেড়ে যাওয়ায় আইফোন ১৮ প্রো তৈরির খরচও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, আইফোন ১৮ প্রোতে ব্যবহৃত মেমোরি চিপের খরচ আইফোন ১৭ প্রোর তুলনায় প্রায় ১৫০ ডলার বেশি হতে পারে। তবে উৎপাদন খরচের পুরোটা ক্রেতার ওপর চাপানো হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
বিভিন্ন পূর্বাভাসে আইফোন ১৮ প্রোর দাম ১ হাজার ১৯৯ থেকে ১ হাজার ৩৯৯ ডলারের মধ্যে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ আগের মডেলের তুলনায় সর্বোচ্চ প্রায় ৩০০ ডলার পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে। তবে অ্যাপলের পক্ষ থেকে মূল্য সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক তথ্যই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।
ভাঁজ করা আইফোনে বড় চমক
এবারের অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আলোচিত পণ্যগুলোর একটি অ্যাপলের প্রথম ভাঁজ করা আইফোন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এর সম্ভাব্য নাম ‘আইফোন আলট্রা’ বলা হলেও ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে ‘আইফোন ডুও’ নামের কথাও এসেছে।
বইয়ের মতো ভাঁজ করা যাবে ফোনটি। ভাঁজ অবস্থায় বাইরে প্রায় ৫ দশমিক ৫ ইঞ্চির একটি ডিসপ্লে এবং পুরোপুরি খুললে ভেতরে ৭ দশমিক ৮ ইঞ্চির ওলেড ডিসপ্লে থাকতে পারে।
ফোনটির পুরুত্ব হতে পারে মাত্র ৪ দশমিক ৫ মিলিমিটার। এটিকে পাতলা রাখতে অ্যাপল নতুন ‘লিকুইড মেটাল হিঞ্জ’ ও বিশেষ গ্লাস অ্যাডহেসিভ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে। এতে ডিসপ্লের ভাঁজের দাগ বা ক্রিজ প্রায় অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফোল্ডেবল আইফোনে বাদ যেতে পারে ফেস আইডি
অতি পাতলা নকশার কারণে ভাঁজ করা আইফোনে ফেস আইডি না থাকার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। এর পরিবর্তে পাওয়ার বাটনে সাইড-মাউন্টেড টাচ আইডি বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর থাকতে পারে।
ক্যামেরার ক্ষেত্রেও আইফোন ১৮ প্রোর তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে থাকতে পারে ভাঁজ করা মডেলটি। এতে পেছনে দুটি ৪৮ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা—একটি ওয়াইড ও অন্যটি আলট্রাওয়াইড—থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আলাদা টেলিফটো ক্যামেরা নাও থাকতে পারে।
ফোনটিতে ১২ গিগাবাইট র্যাম ও এ২০ প্রো চিপ ব্যবহারের কথাও শোনা যাচ্ছে। এ ছাড়া ফিজিক্যাল সিম কার্ডের পরিবর্তে শুধু ই-সিম ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
ভাঁজ করা আইফোনটির দাম ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় আড়াই থেকে তিন লাখ টাকার কাছাকাছি।
কবে পাওয়া যেতে পারে নতুন আইফোন
আইফোন ১৮ প্রো ও প্রো ম্যাক্সের প্রি-অর্ডার ১২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ক্রেতাদের হাতে ফোন পৌঁছাতে পারে ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে। তবে ভাঁজ করা আইফোনের ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময় আরও বেশি হতে পারে এবং এটি অক্টোবরের দিকে বাজারে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে অ্যাপল এবার তাদের আইফোন উন্মোচনের কৌশলেও পরিবর্তন আনতে পারে। আইফোন ১৮-এর সাধারণ মডেল ও আইফোন ১৮ই এ বছরই প্রো মডেলের সঙ্গে উন্মোচন না করে ২০২৭ সালের বসন্তে আনার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। আইফোন ১৮ এয়ার নিয়েও আলাদা সময়ে বাজারে আসার গুঞ্জন রয়েছে।
নতুন অ্যাপল ওয়াচ ও এয়ারপডস
আইফোনের পাশাপাশি নতুন অ্যাপল ওয়াচ ও এয়ারপডসও উন্মোচন করেছে অ্যাপল। অ্যাপল ওয়াচ সিরিজ ১২-এ বড় ধরনের নকশাগত পরিবর্তনের বদলে স্বাস্থ্যসুবিধা ও বিভিন্ন সেন্সরে উন্নতি আনার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে অ্যাপল ওয়াচ আলট্রা ৪-এর নকশায় পরিবর্তন আসতে পারে। অনুষ্ঠানে এয়ারপডস ৫-এরও দেখা মিলতে পারে। এতে হৃৎস্পন্দন পরিমাপের সুবিধা যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ক্যামেরায় বড় আপগ্রেড, নতুন প্রজন্মের চিপ, উন্নত ব্যাটারি ও ছোট ডায়নামিক আইল্যান্ডের মতো পরিবর্তনের কারণে আইফোন ১৮ প্রো সিরিজ নিয়ে প্রযুক্তিপ্রেমীদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আর অ্যাপলের প্রথম ভাঁজ করা আইফোন বাজারে এলে স্মার্টফোনের প্রতিযোগিতায় সেটিই হতে পারে এবারের সবচেয়ে বড় চমক।