আপনার ওপর কি কোরবানি ওয়াজিব, কীভাবে বুঝবেন? কার নামে হবে কোরবানি?

২৭ মে ২০২৬, ০৩:৫৩ PM
হাটে পশু

হাটে পশু © টিডিসি

কোরবানির সময় এলেই অনেকেই নিজের নাম ছাড়াও বাবা-মা, নাবালক সন্তান বা মৃত আত্মীয়স্বজনের নামেও কোরবানি দিয়ে থাকেন। অনেক পরিবারে আবার একটি পশু কোরবানিতে কয়েকজন শরিক হন, কেউ কেউ মৃত আত্মীয়-স্বজনের জন্য নামেও অংশ রাখেন।

কোরবানি কার নামে হবে, কার ওপর ওয়াজিব এবং অন্যের নামে কোরবানি দেওয়া যাবে কিনা‒ এসব বিষয় নিয়ে ইসলামি শরিয়তে নির্দিষ্ট কিছু বিধান রয়েছে। মূলত, ছাগল, ভেড়া বা দুম্বার মতো প্রাণী একজনের পক্ষ থেকে একটি কোরবানি হিসেবেই আদায় করা হয়। অর্থাৎ, এসব পশুতে একাধিক ব্যক্তি শরিক হতে পারেন না। তবে গরু, মহিষ বা উটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাতজন পর্যন্ত শরিক হয়ে কোরবানি দেওয়া যায়। প্রত্যেকের নিয়ত ও অংশ আলাদা হলেও কোরবানি একটি পশুর মাধ্যমেই আদায় করা সম্ভব।

‌‘সাতজন মানে সাতটি নামের পক্ষ থেকে। সাতটি নামের চেয়ে কমও হতে পারে, বেশি হতে পারবে না। ভাগের ক্ষেত্রে নামের বিষয়টি হলো, অমুকের পক্ষ থেকে (কোরবানি হচ্ছে) এবং এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোরবানির পশু জবাই আল্লাহ'র নামে করতে হয়,’ বলেন ইসলাম বিষয়ক লেখক ও বিশ্লেষক শরীফ মুহাম্মদ।

কিন্তু মৃত বাবা-মায়ের নামে কোরবানি করা যাবে? স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই কি আলাদা কোরবানি প্রয়োজন? নাবালক সন্তান বা যাদের আয় রোজগার নেই, তাদের নামে কোরবানি দেওয়া যাবে?

কোরবানি মূলত কার ওপর ওয়াজিব?
ঈদ-উল-আযহা বা কোরবানির ঈদ বাংলাদেশের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব। প্রতিবছর কোরবানির ঈদে সৃষ্টিকর্তার সন্তষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে মুসলিম বিশ্বসহ বাংলাদেশের মুসলমানরা পশু কোরবানি করে থাকেন। আরবি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, প্রতিবছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখ কোরবানির দিন ও পরবর্তী দুই দিন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা কোরবানি দিয়ে থাকেন। ধর্মীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, যাদের ওপর কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব তারা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কোরবানি না দেন, তাহলে গোনাহের ভাগীদার হতে হবে।

ইসলামের বিধান অনুযায়ী, নেসাব অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তির কাছে সাড়ে সাত ভরি পরিমাণ স্বর্ণ অথবা, সাড়ে ৫২ ভরি পরিমাণ রুপা বা এর সমমূল্যের নগদ টাকা অথবা সম্পদ থাকলে তার জন্য কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব। যাদের এই পরিমাণ সম্পদ বা সম্পত্তি নেই, তাদের জন্য পশু কোরবানি বাধ্যতামূলক নয়। এই নিয়ম নারী-পুরুষ সবার জন্য প্রযোজ্য।

ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.) সময় মানুষের সম্পদের হিসাব অনেক ক্ষেত্রে স্বর্ণ-রুপা দিয়েই করা হতো। তাই, ইসলামে ‘নেসাব’ নির্ধারণে স্বর্ণ ও রুপাকে ভিত্তি ধরা হয়েছে। বর্তমান বাজারে মানভেদে সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণের দাম প্রায় ১৮ লাখ কিংবা ১৮ লাখের চেয়ে কিছুটা বেশি। অন্যদিকে, সাড়ে ৫২ ভরি রুপার দাম প্রায় তিন লাখ টাকার কাছাকাছি। সেক্ষেত্রে রুপার নেসাব ধরলে যারা স্বচ্ছল নয়, তাদের ওপরও কোরবানি ওয়াজিব হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ এ বিষয়ে বলছিলেন, ‘ওই সময় (ইসলামের নবী মুহাম্মদের সময়) সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ এবং সাড়ে ৫২ ভরি রুপার দাম এক ছিল। যুগ পরিক্রমায় এখন দামে পার্থক্য হয়ে গেছে।’ ‘তাই, এখন সাড়ে ৫২ ভরি রুপা বাজারে যে দামে বিক্রি হয়, সেই পরিমাণ অর্থ যদি জিলহজ মাসের ১০, ১১, ১২–এই তিন দিনে যদি কারও হাতে জমা থাকে, তাহলে উনি কোরবানি দিবেন।’

কখন অন্য কারও নামে কোরবানি দেওয়া যাবে?
ইসলামি বিধান অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারী-পুরুষের ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়। তবে অনেকেই আছেন, যারা অন্যদের নামেও কোরবানি দেন। যেমন, কেউ তার কোনো পরিবারের সদস্য বা প্রিয় মানুষের নামে কোরবানি দেন। অনেকেই আছেন, যারা তাদের মৃত বাবা-মায়ের নামে বা কোনো আত্মীয়ের নামে কোরবানি দেন।

বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে মৃত বাবা-মা বা স্বজনদের নামে কোরবানি দেওয়ার প্রচলন অনেক পুরোনো। ইসলামি দৃষ্টিতে মৃত ব্যক্তির নামে কোরবানি দেওয়া জায়েজ। অনেকেই মনে করেন, এর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির জন্য সওয়াবের দোয়া করা হয়। তবে, জীবিত বা মৃত, অন্য কারও নামে কোরবানি দেওয়ার সর্বপ্রথম শর্ত হলো, আগে নিজের ওয়াজিব কোরবানি আদায় করতে হবে। ‘তারপর সে অন্য কারও নামও যুক্ত করতে পারবে,’ বলছিলেন শরীফ মুহাম্মদ।

অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদও বলছিলেন, নিজের নামে দিয়ে অন্যদের নামে দেওয়া যায়। তা হতে পারে কোনো মহান ব্যক্তি বা কোনো প্রিয় মানুষ বা পরিবারের সদস্য। ‘তবে মৃত ব্যক্তির পক্ষে কোরবানি দিলে সেই মাংস গরীবকে একটু বেশি দিলে ভালো হয়।’ এছাড়া, অনেকেই আছেন যারা তাদের নাবালক সন্তানের নামে কোরবানি দেন। নাবালক সন্তানের নামেও কোরবানি দেওয়ার জায়েজ আছে বলে জানান শরীফ মুহাম্মদ।

সব শরীককে কি সমান অর্থ দিতে হবে?
বিধান অনুযায়ী, সব শরীককে সমান অর্থ দিতে হবে এবং মাংসও সমবন্টন করতে হবে। ইসলাম বিষয়ক লেখক ও বিশ্লেষক শরীফ মুহাম্মদ বলেছেন, ‘সাত জন যদি একদমই স্বতন্ত্র হয়, যেমন- ভিন্ন ভিন্ন পরিবারের বা ভিন্ন ব্যক্তি, তাহলে তারা প্রত্যেকে সমান টাকা দিবেন এবং মাংসও সমানভাবে ভাগ করে নিবেন।’ তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও রয়েছে। যেমন, অনেকেই আছেন, যারা কোরবানি দিতে চান কিন্তু প্রতি ভাগে যে পরিমাণ টাকা দিতে হবে, তিনি সেই পরিমাণ দিতে পারছে না।

তখন ‘কেউ তাকে ১০ হাজার টাকা উপহার হিসেবে দিতে পারে। কিন্তু মাংস সমানভাবে ভাগ করে দিতে হবে। কেউ উপহার হিসেবে দিলে সমস্যা নাই,’ বলছিলেন অধ্যাপক আব্দুর রশীদ। তবে কেউ যদি সন্তান হিসেবে তার মায়ের বা বাবার নামে কোরবানি দেন, এমনকি পরিবারের অন্য কারও নামে বা একাধিক ব্যক্তির নামে স্বেচ্ছায় কোরবানি দেন, তখন তাদের কাছে সেই টাকা চাওয়া জরুরি না বলে জানিয়েছেন ইসলামি স্কলাররা।

‘আর স্বামী হিসেবে কেউ যদি স্ত্রীর নামে কোরবানি দিতে চান, স্ত্রীর কোরবানি ওয়াজিব হোক বা না হোক, সেক্ষেত্রে স্ত্রীকে না জানিয়ে করার চেয়ে জানিয়ে করা ভালো। তখন স্ত্রীর নিয়ত করতে হবে যে তার কোরবানিটা তার স্বামী করছেন,’ বলেন শরীফ মুহাম্মদ। যদিও অধ্যাপক আব্দুর রশীদের মতে, মৃত ব্যক্তি বা অন্য কারও নামে কোরবানি দিলে এখানে অনুমতির প্রয়োজন নাই। যে কারও নামেই কোরবানি দেওয়া যেতে পারে।

আর কোনো নারী যদি অবিবাহিত হন এবং তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়, তাহলে তাকেও আগে নিজের ওয়াজিব কোরবানি আদায় করতে হবে। এরপর তিনিও তার বাবা-মা বা অন্য কোনো আত্মীয়-স্বজন বা প্রিয়জনের নামে নিজ অর্থেই কোরবানি দিতে পারবেন।

ঋণ নিয়ে কোরবানি করা যায়?
এদিকে, অনেকেই আছেন, যারা খুব স্বচ্ছল নন, কিন্তু কোরবানি দিতে চান। সেক্ষেত্রে তারাও কোরবানি দিতে পারবেন এবং তা নফল হিসেবে কবুল হবে উল্লেখ করে ইসলাম বিষয়ক লেখক ও বিশ্লেষক শরীফ মুহাম্মদ বলছিলেন, এখানে একটা শর্ত আছে।

‘ধরলাম, বাচ্চাদের মন খারাপ হয়ে আছে। সেজন্য তিনি কোরবানি দিতে চান। তাহলে হবে না। এখানে শর্ত হলো, কোনো সামাজিক উপলক্ষ্যই এখানে মূখ্য হতে পারবে না। নিয়ত থাকতে হবে যে আল্লাহকে খুশি করার জন্য করছি। অর্থাৎ, এটা প্রদর্শনমূলক না,’ বলেন তিনি। এক্ষেত্রে ওই ব্যক্তি ঋণ নিয়ে সেই নফল কোরবানি আদায় করতে পারবেন। ‘কিন্তু বারবার ঋণ করার পর সেই ঋণ ওয়াদামাফিক পূরণ না করতে পারলে সেটারও দরকার নাই করার।’

এছাড়া, ‘যারা একশো বা হাজার কোটি টাকা শিল্পঋণ নিয়েছেন এবং ওটা হিসাব নিকাশ করার পর দেখা গেল, ওনার আর কিছুই থাকছে না, তখন তার কোরবানি দিতে হবে না।’

‘কিন্তু ব্যক্তিগত লোন, তা ১০ হাজার টাকা হোক বা ১০ লাখ টাকা হোক, এটা প্লাস-মাইনাস করে যদি দেখা যায় যে লোন পরিশোধ করেও আপনার কাছে নেসাব পরিমাণ অতিরিক্ত টাকা আছে, তাহলে আপনার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়ে যাবে,’ যোগ করেন তিনি। [বিবিসি বাংলা]

ট্যাগ: কোরবানি
প্রধানমন্ত্রীর স্লোগানকে হাদিসের সঙ্গে তুলনা, দায়িত্ব হারাল…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
রাস্তার মাঝে পিকআপ নষ্ট হতেই ছিনতাই, ৮ ঘণ্টার মধ্যে ৯ লাখ ট…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘খারাপ শিক্ষক’ নিয়োগ দিলে তার উল্টো ইমপ্যাক্…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
এশিয়ান ইউনিভার্সিটির বাসের ধাক্কায় ঝরল ৪ প্রাণ
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
রাজধানীতে সকালেই একসঙ্গে প্রাণ হারালেন ৪ জন
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কার মুখে ট্রাম্পের দল, এগিয়ে ডেম…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950