সাক্ষাৎকার
স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত জ্যোতি

‘বিসিএসের প্রস্তুতিতে বেশি পড়ার চেয়ে কৌশলী হওয়া জরুরি’

মোস্তারা খানম জ্যোতি

মোস্তারা খানম জ্যোতি © টিডিসি সম্পাদিত

৪৫তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন মোস্তারা খানম জ্যোতি। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করে বিসিএসের মাধ্যমে পেশাগত জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন তিনি। তবে তার...
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমান উল্যাহ আলভী
আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৫ AM

৪৫তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন মোস্তারা খানম জ্যোতি। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করে বিসিএসের মাধ্যমে পেশাগত জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন তিনি। তবে তার এই অর্জনের পথ সহজ ছিল না। বিসিএস সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছাড়াই প্রস্তুতি শুরু করা, অল্প সময়ে প্রিলিমিনারির জন্য নিজেকে তৈরি করা, অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ওঠা এবং লিখিত পরীক্ষায় অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি মোকাবিলা—সব মিলিয়ে তার যাত্রায় ছিল নানা চ্যালেঞ্জ।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করা মোস্তারা খানম জ্যোতির শিক্ষাজীবনের শুরু লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার শিশু নিকেতন কিন্ডারগার্টেন স্কুলে। পরে বগুড়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বৃত্তিসহ এসএসসি এবং সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন তিনি। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মেডিকেলে ভর্তি হলেও একপর্যায়ে বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ ক্ষেত্রে তার মা ছিলেন প্রধান অনুপ্রেরণা।

৪৫তম বিসিএসের প্রিলিমিনারির জন্য প্রায় পাঁচ মাস প্রস্তুতি নেন জ্যোতি। পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে থাকা, প্রতিদিনের পড়ার পরিকল্পনা তৈরি, গণিত ও ইংরেজি অনুশীলন, বিগত বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ এবং নিয়মিত পরীক্ষা দেওয়ার মতো কৌশল অনুসরণ করেন তিনি। বিসিএসের প্রস্তুতির অভিজ্ঞতা, পড়াশোনার কৌশল, পরিবার ও মায়ের অনুপ্রেরণা, ক্যাডার পছন্দ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন মোস্তারা খানম জ্যোতি। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, কীভাবে সীমিত সময়ের প্রস্তুতি নিয়ে কাঙ্ক্ষিত ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন এবং নতুন চাকরিপ্রার্থীদের জন্য তার পরামর্শ কী।

আপনার এই অর্জনের অনুভূতি কেমন?
আলহামদুলিল্লাহ, নিজের এই অর্জন নিয়ে আমি ভীষণ আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ। দীর্ঘ একটা পথ পেরিয়ে এই জায়গায় আসতে হয়েছে। এই যাত্রায় যেমন পরিশ্রম ছিল, তেমনি ছিল অনিশ্চয়তা, অপেক্ষা এবং নিজেকে বারবার নতুন করে প্রস্তুত করার প্রয়োজন। তাই এই অর্জন আমার কাছে শুধু একটি চাকরি পাওয়া নয়; বরং দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা ও ধৈর্যের একটি স্বীকৃতি।

তবে আমি মনে করি, সাফল্য কখনোই একান্ত ব্যক্তিগত কোনো অর্জন নয়। এর পেছনে পরিবারের দোয়া, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতা এবং অনেক মানুষের অবদান থাকে। সবকিছুর জন্য মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ। এখন আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই অর্জনের মর্যাদা রক্ষা করে মানুষের জন্য দায়িত্বশীলভাবে কাজ করা।

শৈশবের স্মৃতি ও স্বপ্ন সম্পর্কে জানতে চাই। ছোটবেলা থেকেই কি চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছা ছিল?
শৈশবের স্মৃতিগুলো আমার কাছে খুবই মূল্যবান। ছোটবেলায় আমার মধ্যে স্বপ্ন দেখার একটা প্রবণতা ছিল, আর কোনো কিছু ভালোভাবে করতে পারলে নিজের কাছে একটা তৃপ্তি কাজ করত। তবে এখনকার জায়গায় পৌঁছানোর পরিকল্পনা ছোটবেলা থেকেই খুব স্পষ্ট ছিল, এমনটা বলব না। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে অভিজ্ঞতা, দায়িত্ব ও উপলব্ধির মধ্য দিয়ে নিজের লক্ষ্য আরও পরিষ্কার হয়েছে। পেছনে তাকালে মনে হয়, শৈশবের সেই ছোট ছোট অভিজ্ঞতা, পরিবারের শিক্ষা এবং জীবনের নানা পরিস্থিতিই ধীরে ধীরে আমাকে আজকের মানুষ হতে সাহায্য করেছে।

আপনার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে জানতে চাই
আমার শিক্ষাজীবনের শুরু লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার শিশু নিকেতন কিন্ডারগার্টেন স্কুলে। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনোর পর মায়ের চাকরির বদলির সুবাদে বগুড়ায় আসি এবং বগুড়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। এই বিদ্যালয় থেকেই বৃত্তিসহ এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই।

May be an image of one or more people, people studying and text

এরপর উচ্চমাধ্যমিকের জন্য ভর্তি হই সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়ায়। ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছা ছিল। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যেই শুরু করি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি। পরবর্তী সময়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ, ঢাকা থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করি। পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, শিক্ষাজীবনের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই আমার পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আর চিকিৎসক হওয়ার সেই স্বপ্নের মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল আমার পেশাগত জীবনের যাত্রা।

বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে এলো? শুরুতে কি বিসিএস সম্পর্কে ধারণা ছিল?
সত্যি বলতে, বিসিএস নিয়ে আমার খুব একটা ধারণা ছিল না। মেডিকেল লাইফে একাডেমিক পড়াশোনার বাইরে বিসিএস কিংবা অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা নিয়ে তেমন একটা ভাবা হয়নি। তবে বহির্বিশ্বের নানা ঘটনা আমাকে বরাবরই আকৃষ্ট করত। গল্পের বই পড়ার অভ্যাসও ছিল, নিতান্তই নিজের মনের খোরাক মেটানোর জন্য।

পারিবারিক কিছু কারণে এমবিবিএস শেষ করার পর ইন্টার্নশিপ করার জন্য আমাকে বগুড়ায় আসতে হয়। আমার প্রিয় ক্যাম্পাস, ছয় বছরের সহপাঠী আর পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে নতুন জায়গায় এসে মানিয়ে নেওয়াটা বেশ কঠিন ছিল। সেই সময় আমিও কিছুটা দ্বিধায় ছিলাম—বিসিএসের প্রস্তুতি নেব, নাকি পোস্টগ্র্যাজুয়েশনের জন্য প্রস্তুতি শুরু করব। ইন্টার্নশিপ চলাকালে ৪৪তম বিসিএসের পরীক্ষা হয়। তখন বিসিএসের সিলেবাস সম্পর্কেও আমার পরিষ্কার ধারণা ছিল না। রেজিস্ট্রেশন করলেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়া হয়নি।

এরপর ইন্টার্নশিপ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় ৪৫তম বিসিএসের সার্কুলার প্রকাশিত হয়। হাতে সময় খুবই কম ছিল। কোন কোন বিষয় পড়তে হবে, কত নম্বরের পরীক্ষা—এসব বিষয়েও তখন আমার বিস্তারিত ধারণা ছিল না। সেই সময় খুব বেশি হিসাব-নিকাশ না করে প্রস্তুতি শুরু করার সিদ্ধান্ত নিই এবং একটি অনলাইন কোচিংয়ে ভর্তি হই। বিসিএসের জন্য আমাকে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দিয়েছেন আমার মা। বলতে গেলে, বিসিএসের পথে আমার মূল অনুপ্রেরণাই ছিলেন তিনি। অনেক সময় নিজের লক্ষ্য নিয়ে আমরা দ্বিধায় থাকি, তখন কাছের মানুষের বিশ্বাস ও উৎসাহ আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। আমার ক্ষেত্রেও মায়ের উৎসাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

আমার জন্য অনলাইন ক্লাস বেশ কার্যকর ছিল। এতে সময় বাঁচত, আবার প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের সুবিধামতো রেকর্ড করা ক্লাসও শোনা যেত। এরপর প্রায় পাঁচ মাস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিই। সেই সময়টাতে ধীরে ধীরে নিজের প্রস্তুতির ধরন বুঝতে শিখেছি। শুরুতে বিসিএস সম্পর্কে খুব বেশি না জানলেও প্রস্তুতির মধ্য দিয়েই শিখেছি কীভাবে এগোতে হয়।

প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি কীভাবে নিয়েছিলেন? আপনার দৈনন্দিন পড়াশোনার কৌশল কী ছিল?
আমার প্রস্তুতির সময়টা ছিল অনেকটাই নিজের জগতে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার সময়। প্রিলিমিনারি পরীক্ষার জন্য প্রায় পাঁচ মাস প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, মন স্বাভাবিকভাবেই নানা দিকে বিক্ষিপ্ত থাকে। দীর্ঘ সময় একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে মনোযোগ ধরে রাখতে হলে কখনো কখনো চারপাশের কিছু বিষয় থেকে সচেতনভাবে দূরে থাকা প্রয়োজন। আমার সোশ্যাল মিডিয়া প্রায় দুই বছর ডিঅ্যাক্টিভেটেড ছিল। এটা আমাকে অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি কমিয়ে নিজের কাজে মনোযোগ দিতে সাহায্য করেছে।

প্রস্তুতি নিতে গিয়ে আমার একটি উপলব্ধি হয়েছে কী পড়তে হবে, তা জানার চেয়েও অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হলো কী পড়তে হবে না, সেটা বুঝতে পারা। বিসিএসের সিলেবাস অনেক বিস্তৃত। তাই সবকিছু পড়ার চেষ্টা না করে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, প্রশ্নের ধরন এবং নিজের দুর্বলতা বুঝে প্রস্তুতি নেওয়া বেশি কার্যকর বলে মনে হয়েছে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ডায়েরিতে সেদিন কী কী পড়ব, তার একটি পরিকল্পনা লিখে নিতাম। এটা আমাকে পড়াশোনার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করত এবং নিয়মিত পড়ার অভ্যাস ধরে রাখতে সাহায্য করত। প্রতিদিনের রুটিনে কিছু বিষয় নির্দিষ্ট ছিল। যেমন, সকালে গণিত এবং ইংরেজি ফ্রি-হ্যান্ড রাইটিংয়ের অনুশীলন রাখতাম। পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়ও পড়তাম।

আরও পড়ুন: জেলের সন্তানের পুলিশ হওয়া হলো না, বিসিএস গেজেটে নেই ঢাবির চিন্ময় বর্মণও

ইংরেজি অনুবাদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলাম। সপ্তাহে অন্তত ছয়টি অনুবাদ টাইমার সেট করে অনুশীলন করতাম। প্রস্তুতি শেষে হিসাব করে দেখেছিলাম, আমার ৭০টিরও বেশি অনুবাদ অনুশীলন করা হয়েছে। এতে শুধু ভাষার দক্ষতাই নয়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লিখে শেষ করার অভ্যাসও তৈরি হয়েছিল। প্রিলিমিনারির ক্ষেত্রে আমি প্রথমে একটি টপিক সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়ার পর সেই টপিকের প্রশ্ন সমাধান করতে পছন্দ করতাম। যদিও বিগত বছরের প্রশ্ন সমাধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আমার কাছে সেগুলো বিশেষভাবে কাজে দিয়েছে প্রশ্নের ধরন ও গুরুত্বপূর্ণ টপিক বুঝতে।

লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতিও মূলত বাসায় অনলাইনভিত্তিকভাবে নিয়েছিলাম। তবে প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে সময় ব্যবস্থাপনা ও পরীক্ষার পরিবেশের সঙ্গে অভ্যস্ত হওয়ার জন্য অফলাইনে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছি। আমার কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা ছিল। কারণ, বাসায় বসে উত্তর জানা আর পরীক্ষার হলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই উত্তর গুছিয়ে লিখে আসা এক বিষয় নয়। সব মিলিয়ে, আমার প্রস্তুতির মূল ভিত্তি ছিল পরিকল্পনা, নিয়মিত অনুশীলন, নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি কমিয়ে আনা। 

প্রিলিমিনারি, লিখিত ও ভাইভায় ভালো করার ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মনে করেন?
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়, বিসিএস প্রস্তুতির ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, প্রিলিমিনারির প্রস্তুতি একবার ভালোভাবে নেওয়া গেলে পরবর্তী বিসিএসগুলোর জন্য সেটি একটি শক্ত ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। যেমন, ৪৫তম বিসিএসের প্রিলিমিনারির জন্য আমি প্রায় পাঁচ মাস সময় পেয়েছিলাম। কিন্তু পরবর্তী ৪৬তম ও ৪৮তম বিসিএসের ক্ষেত্রে প্রস্তুতির জন্য প্রায় এক মাস করে সময় পেয়েছি। তখন একেবারে নতুন করে শুরু করতে হয়নি; আগের প্রস্তুতিকে ঝালিয়ে নেওয়া, দুর্বল জায়গাগুলো ঠিক করা এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পুনরায় অনুশীলন করার সুযোগ পেয়েছি।

দ্বিতীয়ত, প্রিলিমিনারির প্রস্তুতিতে প্রশ্ন বিশ্লেষণ ও নিয়মিত প্রশ্ন সমাধান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমার মনে হয়, শুধু কতগুলো প্রশ্ন সমাধান করলাম, সেটাই মূল বিষয় নয়; বরং প্রশ্নের পেছনের বিষয়টি কতটা বুঝলাম, সেটাও জরুরি। আরেকটি বিষয় হলো পরীক্ষার হলে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কৌশল। আমার মনে হয়েছে, অনেকের প্রস্তুতি ভালো থাকলেও পরীক্ষার হলে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে যান। বিশেষ করে কতগুলো প্রশ্নের উত্তর করবেন, তা নিয়ে দ্বিধায় থাকেন।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, নিজের প্রস্তুতির ভিত্তিতে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সক্ষমতা যাচাই করা উচিত। তাই অনুশীলনের সময় আমি তুলনামূলক বেশি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতাম, যাতে নিজের সক্ষমতা ও ঝুঁকি নেওয়ার সীমা বুঝতে পারি। তবে সেটি কখনোই অন্ধভাবে আন্দাজে উত্তর দেওয়ার অর্থ নয়; বরং জ্ঞান, আত্মবিশ্বাস ও অনুশীলনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। আমি জীবনে তিনটি বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা দিয়েছি এবং প্রতিটিতেই ১৮০টির বেশি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আলহামদুলিল্লাহ, মহান আল্লাহ আমাকে নিরাশ করেননি। তবে এটি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা; সবার জন্য একই সংখ্যক প্রশ্নের উত্তর দেওয়া উপযুক্ত হবে, এমনটা মনে করি না।

লিখিত পরীক্ষার ক্ষেত্রে আমার কাছে উপস্থাপনা বা প্রেজেন্টেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই উত্তরও পরিচ্ছন্ন হাতের লেখা, সঠিক কাঠামো, প্রাসঙ্গিক তথ্য, প্রয়োজনীয় শিরোনাম এবং সময়ের মধ্যে গুছিয়ে লেখার মাধ্যমে আরও কার্যকরভাবে উপস্থাপন করা যায়। পরীক্ষক যেন সহজেই উত্তরের মূল বক্তব্য বুঝতে পারেন, সেটি মাথায় রাখা দরকার।

ভাইভার ক্ষেত্রে সমসাময়িক বিষয় সম্পর্কে ধারণা রাখা, নিজের শিক্ষাগত ও পেশাগত ক্ষেত্র সম্পর্কে পরিষ্কার জ্ঞান এবং আত্মবিশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয়, ভাইভার জন্য একেবারে বিচ্ছিন্নভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার চেয়ে দীর্ঘদিনের পড়াশোনা থেকে অর্জিত জ্ঞানকে আত্মস্থ করা এবং নিজের বক্তব্য স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করতে পারাটা বেশি কাজে দেয়। সবশেষে বলব, বিসিএসের প্রস্তুতিতে সবার জন্য একই কৌশল কার্যকর হবে না। নিজের শক্তি ও দুর্বলতা বুঝে নিজের উপযোগী পদ্ধতি তৈরি করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার সাফল্যের পেছনে পরিবারের ভূমিকা কতটা? প্রস্তুতির সময় সন্তানকে কীভাবে সময় দিতেন?
আমার পরিবার বলতে মা, বাবা, ছোট ভাই আর আমার সন্তানকে নিয়েই আমার ছোট্ট জগৎ। আমার মা একজন সরকারি চাকরিজীবী, বাবা ব্যবসায়ী আর ছোট ভাই বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। বিসিএস প্রস্তুতির সময় আমার ছোট্ট পাখিটার বয়স ছিল মাত্র দেড় বছর। আমি পড়তে বসলে ও আমার পড়ার টেবিলে এসে বসে থাকত। কখনো হতাশ হয়ে পড়লে ওর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলতাম—ওর উপস্থিতিই তখন আমার অনেক বড় প্রশান্তি ছিল।

May be an image of child and headscarf

আমার এই যাত্রায় মা-বাবার অবদান বলে শেষ করা যাবে না। মা প্রতিটি প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় আমার সঙ্গে গিয়েছেন, লিখিত পরীক্ষার সময়ও পাশে থেকেছেন, পরীক্ষার হলের বাইরে অপেক্ষা করেছেন। তাঁদের ভালোবাসা, সহযোগিতা ও দোয়া আমার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল। সর্বোপরি, আমার পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের প্রতি আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। আলহামদুলিল্লাহ, তাঁদের পাশে পাওয়া আমার জীবনের অনেক বড় নিয়ামত।

স্বাস্থ্য ক্যাডারকে প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেওয়ার বিশেষ কারণ কী?
আমার ক্যাডার চয়েস বরাবরই টেকনিক্যাল ছিল। আমার প্রথম পছন্দ ছিল স্বাস্থ্য ক্যাডার। এর পেছনে ব্যক্তিগতভাবে একটি গভীর উপলব্ধি কাজ করেছে। জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় আমি চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান অর্জনে ব্যয় করেছি। আমার মনে হয়েছে, বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে সেই অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার যথাযথ প্রয়োগ করার সুযোগ পাব এবং নিজের পেশাগত দায়িত্বও তুলনামূলকভাবে স্বাচ্ছন্দ্য ও আত্মতৃপ্তির সঙ্গে পালন করতে পারব। মানুষের সেবা করার পাশাপাশি নিজের দীর্ঘদিনের অধ্যয়নকে বাস্তব জীবনে কাজে লাগাতে পারার বিষয়টি আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

অবশ্যই, এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত চিন্তা, অগ্রাধিকার ও মূল্যবোধের বিষয়। প্রত্যেক মানুষের পছন্দ, দক্ষতা, আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আলাদা। তাই ক্যাডার চয়েসের ক্ষেত্রে অন্য কারও পছন্দকে অনুসরণ না করে নিজের ব্যক্তিত্ব, যোগ্যতা, পেশাগত আগ্রহ এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এ কারণেই ৪৫তম বিসিএসে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর ৪৬তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও আমি আর ভাইভায় অংশগ্রহণ করিনি। আমার কাছে নির্দিষ্ট একটি লক্ষ্য অর্জনই ছিল গুরুত্বপূর্ণ; কেবল আরও একটি বিসিএসে উত্তীর্ণ হওয়া বা অন্য কোনো ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার বিষয়টি নয়।

আমার মনে হয়, ক্যাডার নির্বাচন করতে গিয়ে শুধু সামাজিক পরিচিতি, মর্যাদা কিংবা মানুষের চোখে কোন ক্যাডারের গ্রহণযোগ্যতা বেশি এসবের পেছনে ছোটা উচিত নয়। বরং যে পেশায় নিজের দক্ষতা কাজে লাগানো যাবে, কাজের প্রতি আগ্রহ ও দায়িত্ববোধ বজায় থাকবে এবং দীর্ঘমেয়াদে মানসিক তৃপ্তি পাওয়া যাবে, সেটিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কারণ ক্যারিয়ার শুধু একটি পদবি বা সামাজিক পরিচয় নয়; এটি জীবনের দীর্ঘ একটি পথচলা। সেই পথচলায় নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে পারাটাও সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

যারা বিসিএসের প্রস্তুতি নিতে চান, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
তাদের প্রতি আমার পরামর্শ কীভাবে শুরু করব, কী পড়ব, এই দোটানায় না থেকে শুরু করে দিন। প্রস্তুতি নিতে নিতেই নিজের দুর্বলতা ও প্রস্তুতির ধরন বুঝে উঠতে পারবেন। সিলেবাস সম্পর্কে ভালো ধারণা নিয়ে একটি নির্দিষ্ট গাইডলাইন ধরে এগিয়ে যান। একটি টপিকের পেছনে চার-পাঁচটি বই ঘেঁটে সময় ব্যয় করার চেয়ে একটি নির্ভরযোগ্য গাইডলাইন অনুসরণ করে টপিকের ৮০ শতাংশ আয়ত্তে রাখা বেশি কার্যকর। অনেক সময় ২০ নম্বরের পেছনে অতিরিক্ত সময় দিতে গিয়ে নিজের শক্তিশালী ৮০ নম্বরের প্রস্তুতিটুকুও পলিশ করার সুযোগ হারাই। তাই পরিশ্রমের পাশাপাশি কৌশলী হওয়াটাও জরুরি।

আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে, সৃষ্টিকর্তার ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাখুন। আমার বিশ্বাস, তাকদিরে যা আছে, তা নির্ধারিত সময়েই আসবে। আমার কাজ শুধু গন্তব্যের পথে এগিয়ে চলা কচ্ছপের গতিতে হলেও থেমে না যাওয়া। কারণ, ধীরগতিতে এগোলেও যে পথচলা থামায় না, একদিন গন্তব্য তার কাছেই ধরা দেয়। ইনশাআল্লাহ।

আপনার সাফল্যে অনেকেই অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। তাদের উদ্দেশে কিছু বলবেন?
সবার অভিনন্দন, শুভকামনা ও ভালোবাসায় সত্যিই অভিভূত। আমার অর্জন কারও অনুপ্রেরণার কারণ হয়েছে, জেনে আনন্দিত। তবে আমি বিশ্বাস করি, একটি পদবি মানুষকে পরিচিতি দেয়, দায়িত্ব বাড়ায়; কিন্তু প্রকৃত মর্যাদা নির্ভর করে মানুষ হিসেবে সে কেমন, তার সততা, মানবিকতা ও আচরণের ওপর। পদ অর্জন সাফল্য, আর সেই পদের মর্যাদা নিজের চরিত্রে ধারণ করতে পারা সার্থকতা। দোয়া করবেন, যেন দুটোই অর্জন করতে পারি।

চাকরিপ্রার্থীদের একমাত্র লক্ষ্য বিসিএস হওয়া উচিত কি না?
দেখুন, প্রতিটি মানুষ স্বতন্ত্র। কারও পরিস্থিতির সঙ্গে কারওটা পুরোপুরি মিলবে না। আমরা আপাতদৃষ্টিতে যাদের প্রিভিলেজড মনে করি, তাদেরও হয়ত অজানা কিছু জটিলতা রয়েছে। তাই অন্যের পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেরটা তুলনা না করে, নিজের অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করাটাই গুরুত্বপূর্ণ। তুলনা নয়, প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত নিজের সঙ্গে।

চাকরির প্রস্তুতির যাত্রায় যখন যে সুযোগ আসবে, সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তবে নিজের একটি নির্দিষ্ট প্রায়োরিটি থাকা জরুরি। এতে লক্ষ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকে এবং ভবিষ্যতের বিভ্রান্তি এড়ানো যায়। নিজেকে যত বেশি বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নেওয়া সম্ভব, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পরিধিও তত বাড়বে। মনে রাখতে হবে, একবার অর্জিত কোনো দক্ষতাই একেবারে বৃথা যায় না; জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে তা কাজে লাগবেই।

আরও পড়ুন: মাদ্রাসা থেকে ঢাবিতে—প্রয়াত মায়ের স্বপ্ন পূরণে প্রথমবারেই বিচারক রুহানি

তবে বিসিএসের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুততর ফলাফল প্রকাশের প্রবণতা এবং চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির ফলে সুযোগের পরিসর আগের তুলনায় কিছুটা বিস্তৃত হয়েছে। তাই বিসিএসকে লক্ষ্য হিসেবে রাখা অবশ্যই যৌক্তিক, তবে সেটিকেই একমাত্র পথ ভেবে অন্য সম্ভাবনাগুলো বন্ধ করে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

ভবিষ্যতে নিজের পেশাগত জীবন নিয়ে কী পরিকল্পনা করছেন?
ভবিষ্যতে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে আরও দক্ষ চিকিৎসক হিসেবে গড়ে তুলতে চাই এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থবহ অবদান রাখতে চাই। আমার কাছে সাফল্যের প্রকৃত অর্থ শুধু নিজের অবস্থানকে সমৃদ্ধ করা নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া যোগ্যতা ও সুযোগকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো এবং আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও মানুষের হক যথাযথভাবে আদায় করতে পারা।

৪৫তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় কোনো কঠিন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন? সেখান থেকে কী শিখেছেন?
৪৫তম বিসিএসকে ঘিরে আমার অনেক আবেগ ও ভালোবাসা জড়িয়ে আছে। আমাদের সময়ই হঠাৎ করে লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নের প্যাটার্ন পরিবর্তন হয়। ইংরেজি পরীক্ষায় সাধারণত একটি ইজি আসত, কিন্তু সেবার এসেছিল দুটি। আমি বিষয়টি খেয়াল করিনি। হল থেকে বেরিয়ে অন্য একজন পরীক্ষার্থীর মুখে দুটি সহজ আসার কথা শুনে ভীষণ হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। জীবনে কোনো পরীক্ষায় এর আগে এভাবে ২৫ নম্বর ছেড়ে আসিনি। একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল, পরবর্তী পরীক্ষাগুলো আর দিয়েই বা কী হবে!

কিন্তু তখন আমার মা আমাকে সাহস দিয়েছিলেন, ধৈর্য ধরে বাকি পরীক্ষাগুলো শেষ করতে বলেছিলেন। তাঁর সেই আশ্বাস আমাকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেছিল। এই অভিজ্ঞতা থেকে আমি শিখেছি, পরীক্ষায় শুধু প্রস্তুতিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; পরীক্ষার হলে মাথা ঠান্ডা রেখে প্রশ্ন ভালোভাবে পড়া, সময় ব্যবস্থাপনা এবং মানসিক স্থিরতা ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর কোনো একটি পরীক্ষা প্রত্যাশামতো না হলে হতাশ হয়ে পরবর্তী পরীক্ষাগুলো নষ্ট করা উচিত নয়। বরং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে যেতে হবে। কারণ, একটি খারাপ পরীক্ষা মানেই পুরো যাত্রার সমাপ্তি নয়।

সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে ভিডিও, শিবির নেত…
  • ১৬ অক্টোবর ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানের প…
  • ১৬ অক্টোবর ২০২৬
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটন…
  • ১৬ অক্টোবর ২০২৬
অযোগ্য শিক্ষকের অধীন পিএইচডি করলে তত্ত্বাবধায়কের চেয়ে বেশি …
  • ১৬ অক্টোবর ২০২৬
আইসিসির ডিমেরিট পয়েন্ট পাওয়ার পর লর্ডসের পিচই তুলে ফেলল এমস…
  • ১৬ অক্টোবর ২০২৬
জবির আইন অনুষদের ২০ শিক্ষার্থী পেলেন তপন বিহারী নাগ ট্রাস্ট…
  • ১৬ অক্টোবর ২০২৬