শাকিলা আখতার সুমনা © টিডিসি সম্পাদিত
৪৫তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন শাকিলা আখতার সুমনা। বিডিএস সম্পন্ন করে সংসার সামলানো ও ডেন্টাল চেম্বারে কাজের পাশাপাশি বিসিএসের প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পড়াশোনা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং দুর্বল বিষয়গুলোতে বাড়তি মনোযোগ দিয়ে এগিয়েছেন লক্ষ্যের দিকে। আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি মনে রাখতে মানচিত্রের সাহায্য নেওয়াও তার প্রস্তুতির অন্যতম কৌশল ছিল। এই যাত্রায় স্বামীর সহযোগিতা ও নানার অনুপ্রেরণা তাকে এগিয়ে যেতে শক্তি জুগিয়েছে। বিসিএস প্রস্তুতি, প্রতিকূলতা, সাফল্যের অনুভূতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
নিজের সাফল্য নিয়ে অনুভূতি কেমন?
আলহামদুলিল্লাহ, প্রথমেই মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তার রহমতেই ৪৫তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে সফল হয়েছি। এটি আমার জীবনের অনেক বড় অর্জন। আমি বিশ্বাস করি, সাফল্যের জন্য নিজের প্রচেষ্টার পাশাপাশি আল্লাহর রহমতও গুরুত্বপূর্ণ। এই অর্জনের পেছনে আমার পরিশ্রম, ধৈর্য ও একাগ্রতা ছিল। সব মিলিয়ে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ এবং নিজের প্রচেষ্টার জন্যও আত্মতৃপ্তি অনুভব করছি।
আপনার শৈশবের গল্প জানতে চাই।
আমার শৈশব খুব সাধারণভাবে কেটেছে। ছোটবেলায় খুব বিত্তবান হওয়ার স্বপ্ন ছিল না। আমার মনে হতো, একজন সাধারণ কর্মজীবী মানুষ হিসেবে সুন্দর ও নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারাটাই অনেক বড় বিষয়। তবে আমার মায়ের স্বপ্ন ছিল, আমি যেন ডাক্তার হই। আমার খালাতো বোন ছিল শৈশবের খেলার সঙ্গী ও পড়াশোনার সহপাঠী। তার স্বপ্ন ছিল বড় একজন ডাক্তার হওয়ার। তার স্বপ্নের সঙ্গে সঙ্গে আমিও হয়তো ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করি।
আমার এক খালা, নানা ও জ্যাঠাতো ভাই ছোটবেলা থেকেই ভালো কিছু করার জন্য উৎসাহ দিতেন। স্কুলের শিক্ষকেরাও আমাকে ভালোবাসতেন এবং জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রত্যাশা করতেন। আমার বাবা খুব বিত্তশালী না হলেও চাইতেন, আমি যেন জীবনে ভালো কিছু করি। পেছনে ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, নিজের স্বপ্ন খুব বড় করে গড়ে ওঠার আগেই পরিবারের সদস্য ও শিক্ষকদের ভালোবাসা এবং প্রত্যাশা আমাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে।
স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কেমন ছিল?
আমার শিক্ষাজীবন শুরু হয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পঞ্চম শ্রেণিতে খালা আমাকে একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। ওই শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাই। এরপর অষ্টম শ্রেণিতে গঙ্গাচড়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন করি। এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ এবং রংপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাই। পরে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে রংপুর মেডিকেল কলেজের ডেন্টাল ইউনিটে ভর্তির সুযোগ পাই। সেখান থেকে বিডিএস ডিগ্রি সম্পন্ন করি।
আরও পড়ুন: ‘বিসিএসের প্রস্তুতিতে বেশি পড়ার চেয়ে কৌশলী হওয়া জরুরি’
আমার শিক্ষাজীবনে শিক্ষকদের অবদান অনেক। পঞ্চম শ্রেণিতে আবুল আলা স্যার ও নরেশ স্যার বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহযোগিতা করেছেন। অষ্টম শ্রেণিতে আবদুল মুত্তালেব মিঠু স্যার আমার ভেতরের আগ্রহ ও সম্ভাবনা বুঝতে পেরে উৎসাহ দিয়েছিলেন। আমি মনে করি, একজন শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু পড়ানো নয়, শিক্ষার্থীর সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলাও। এসএসসি পর্যায়ে কৃষ্ণ চন্দ্র রায় স্যার এবং মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় ডাক্তার নাবিল ভাই আমাকে সহযোগিতা করেছেন। তাদের সহায়তা আমার শিক্ষাজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
কখন থেকে বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করেছেন? আপনার অনুপ্রেরণা কে ছিলেন?
আমি ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করি। ইন্টার্নশিপ শেষ হওয়ার পর প্রায় দুই বছর সংসার সামলানোর পাশাপাশি চেম্বারে প্র্যাকটিস করছিলাম। একপর্যায়ে বুঝতে পারি, চেম্বারে কাজ করার পাশাপাশি বিসিএসের জন্য প্রয়োজনীয় মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করা সম্ভব হচ্ছে না।
তখন প্রস্তুতিতে পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। এ জন্য রংপুরে চলে এসে নতুনভাবে পড়াশোনা শুরু করি। সময় ও অগ্রাধিকার নতুন করে সাজানো আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত ছিল। আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণার একজন ছিলেন আমার স্বামী। তিনি সব সময় সাহস দিতেন এবং বিশ্বাস করতেন, আমি পারব। তাঁর এই সমর্থন আমাকে মানসিক শক্তি জুগিয়েছে।
আমার নানা ছিলেন আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা। জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার সময় তিনি আমার খোঁজখবর নিতেন এবং আমার প্রতি আস্থা রাখতেন। দুর্ভাগ্যবশত, আমার এই সাফল্য তিনি দেখে যেতে পারেননি। বিষয়টি আমার জীবনের একটি অপূর্ণতা। তবে তাঁর ভালোবাসা ও বিশ্বাসের কথা আমি সব সময় মনে করি।
বিসিএস প্রস্তুতির সময়টা কেমন ছিল?
আমার প্রস্তুতির সময়কাল ছিল মূলত ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল। রংপুর মেডিকেল কলেজের লাইব্রেরিতে বন্ধুদের সঙ্গে দলবদ্ধভাবে পড়তাম, পাশাপাশি বাসায়ও প্রস্তুতি নিতাম। নিজের অগ্রগতি যাচাই করতে নিয়মিত বিভিন্ন কোচিংয়ের পরীক্ষায় অংশ নিতাম। প্রতিদিন গড়ে আট থেকে ১০ ঘণ্টা পড়াশোনা করতাম। প্রস্তুতির সময় সংসারকে সব সময় যথেষ্ট সময় দিতে পারিনি। আমার ছোট বোন তখন আমার সঙ্গে থাকত এবং নিজের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সে পারিবারিক ও দৈনন্দিন কাজে আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছে। বর্তমানে সে নার্সিংয়ের তৃতীয় বর্ষে পড়ছে।
পড়াশোনায় আমার তুলনামূলক দুর্বলতা ছিল বাংলাদেশ বিষয়াবলি ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিতে। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হওয়ায় এসব বিষয়ে ভালো করতে বাড়তি সময় দিতে হয়েছে। বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে তুলনামূলক কম সময় লাগত বলে সাধারণ জ্ঞানের অংশে বেশি মনোযোগ দিতাম। বিশেষ করে বিভিন্ন দেশের অবস্থান, সাগর, সমুদ্রস্রোত, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ মানচিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে পড়তাম। পাশাপাশি নিয়মিত পরীক্ষা দিয়ে দুর্বলতা চিহ্নিত করতাম এবং সে অনুযায়ী প্রস্তুতির কৌশল পরিবর্তন করতাম।
প্রস্তুতির বিশেষ কোনো কৌশল ছিল? কোন বিষয়টি আপনাকে এগিয়ে রেখেছিল বলে মনে করেন?
আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি পড়ার ক্ষেত্রে মানচিত্র ব্যবহার ছিল আমার প্রস্তুতির অন্যতম কৌশল। শুধু তথ্য মুখস্থ না করে বিভিন্ন দেশের অবস্থান, সাগর, প্রণালি ও গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক স্থান সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করতাম। যেমন- ভূমধ্যসাগর, কৃষ্ণসাগর, বাব-এল-মান্দেব প্রণালি ও এডেন উপসাগরের অবস্থান, কোন দেশগুলোর সঙ্গে এগুলোর সংযোগ রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এগুলোর ভূমিকা কী, তা মানচিত্রের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করতাম।
এভাবে পড়ায় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিভিন্ন দেশের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও বাণিজ্যপথ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সহজ হয়েছে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, সেটিও বুঝতে সুবিধা হতো। আমার কাছে মানচিত্র ছিল আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিকে সামগ্রিকভাবে বোঝার একটি মাধ্যম। কোনো বিষয় শুধু মুখস্থ না করে বুঝে পড়লে তা দীর্ঘদিন মনে থাকে এবং পরীক্ষায় ভিন্নভাবে প্রশ্ন এলেও উত্তর দেওয়া সহজ হয়।
পরিবার সম্পর্কে বলুন। আপনার সাফল্যে পরিবারের ভূমিকা কতটা?
আমার সাফল্যের পেছনে পরিবারের অবদান অনেক বেশি। বিশেষ করে আমার স্বামী প্রস্তুতির পুরো সময় পাশে থেকেছেন। তাঁর বিশ্বাস ও সহযোগিতা আমার কাছে অনেক মূল্যবান। আমি পরিবারের বড় সন্তান। মনে হতো, পরিবারের প্রতি আরও আগে থেকেই অনেক দায়িত্ব পালন করা উচিত ছিল। কিন্তু বিসিএসের প্রস্তুতির দীর্ঘ সময়ে পরিবারের জন্য ইচ্ছামতো কিছু করতে পারিনি। তারপরও কেউ আমার প্রতি অভিযোগ করেনি। বরং সবাই ধৈর্য ধরে পাশে থেকেছে এবং নিজেদের মতো করে ত্যাগ স্বীকার করে আমাকে পড়াশোনার সুযোগ দিয়েছে।
আমার এই পথচলায় পরিবারের সদস্যরাও সময়, শ্রম ও ধৈর্য দিয়েছেন। তাদের সহযোগিতা ছাড়া এতটা পথ এগিয়ে আসা কঠিন হতো। আলহামদুলিল্লাহ, এখন আমি সফল হয়েছি, আমার পরিবারও খুশি। এই অর্জনের মাধ্যমে নিজের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি পরিবারের দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও বিশ্বাসেরও কিছুটা প্রতিদান দিতে পেরেছি বলে মনে করি।
ক্যাডার চয়েস কীভাবে পছন্দক্রম নির্ধারণ করেছিলেন?
ক্যাডার পছন্দের বিষয়টি স্বামীর সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমার পছন্দক্রমে প্রথমে প্রশাসন, দ্বিতীয়তে পুলিশ এবং তৃতীয়তে স্বাস্থ্য ক্যাডার ছিল। আমি ডেন্টাল বিষয়ে পড়াশোনা করেছি। তাই স্বাস্থ্য ক্যাডারে কাজ করার সুযোগ পেলে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগাতে পারব বলে মনে হয়েছিল। অন্যদিকে, প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারের প্রতিও আগ্রহ ছিল বলে সেগুলোকে প্রথম ও দ্বিতীয় পছন্দে রেখেছিলাম।
আলহামদুলিল্লাহ, শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্য ক্যাডারেই সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই ক্যাডারের সরাসরি সম্পর্ক থাকায় আমি খুব খুশি। আমার মতে, ক্যাডার পছন্দের ক্ষেত্রে শুধু সামাজিক মর্যাদা বা জনপ্রিয়তা নয়, নিজের যোগ্যতা, আগ্রহ, কাজের ধরন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। যে ক্যাডারেই সুযোগ আসুক, দায়িত্ব নিয়ে কাজ করার মানসিকতা থাকা জরুরি।
যারা বিসিএস দিতে চান, তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
আমার পরামর্শ হলো, ধৈর্য ধরে নিয়মিত প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে হবে। বিসিএস একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া, তাই শুরু থেকেই পরিশ্রমের পাশাপাশি মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন। পড়াশোনার সঙ্গে নিয়মিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়া জরুরি। ভালো কোনো কোচিং বা স্টাডি গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজের প্রস্তুতি যাচাই করা যেতে পারে। পরীক্ষার মাধ্যমে দুর্বলতা চিহ্নিত করে সেসব বিষয়ে বেশি অনুশীলন করতে হবে।
ব্যক্তিগত জীবন ও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে কখনো পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে। তখন পরিস্থিতি অনুযায়ী রুটিন পরিবর্তন করা গেলেও প্রস্তুতির ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে। অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা না করে নিজের দুর্বলতা বুঝে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যাডার হওয়ার পর সবার কাছ থেকে কেমন মন্তব্য পাচ্ছেন?
ক্যাডার হওয়ার পর পরিবার, আত্মীয়স্বজন, শিক্ষক ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে অনেক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা পাচ্ছি। তাদের অনেকেরই প্রত্যাশা ছিল, আমি জীবনে ভালো কিছু করব। ৪৫তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে তাদের সেই প্রত্যাশা কিছুটা পূরণ করতে পেরেছি। যারা আমার জন্য স্বপ্ন দেখেছেন, তারা আমার সাফল্যে আনন্দিত হচ্ছেন এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
ভবিষ্যতে একজন দক্ষ চিকিৎসক ও দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে চাই। স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দিয়ে দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নিজের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।সহকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করতে চাই, যাতে সম্মিলিতভাবে জনগণকে আরও ভালো সেবা দেওয়া যায়। আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ ও দলগত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে ভূমিকা রাখাই আমার মূল লক্ষ্য।
আপনার সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান কার?
আমার জীবনের সাফল্যে সবচেয়ে বড় অবদান আমার নানার। ছোটবেলা থেকেই তিনি আমাকে ভালোবাসা, উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। আমার প্রতি তার বিশ্বাস ছিল, আমি জীবনে ভালো কিছু করব। তবে খুব আফসোস হয়, তিনি আমার এই সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। এরপর আমার বর্তমান জীবনে সবচেয়ে বড় অবদান আমার স্বামীর। বিসিএস প্রস্তুতির সময় থেকে প্রতিটি ধাপে তিনি আমাকে সাহস দিয়েছেন এবং বিশ্বাস জুগিয়েছেন যে আমি পারব। তার সহযোগিতা আমার জন্য অনেক বড় শক্তি ছিল। নানার ভালোবাসা ও দোয়া এবং স্বামীর সহযোগিতার জন্য আমি সব সময় কৃতজ্ঞ থাকব।
জীবনের দীর্ঘ যাত্রায় কোনো ব্যর্থতা বা কঠিন সময় কি আপনাকে ভেঙে দিয়েছিল? সেখান থেকে কীভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন?
বড় কোনো ব্যর্থতায় ভেঙে পড়ার অভিজ্ঞতা খুব বেশি নেই। তবে বিডিএসের শেষ পেশাগত পরীক্ষার ফলাফল আমাকে মানসিকভাবে কষ্ট দিয়েছিল। আমাদের বিডিএস কোর্সে চারটি পেশাগত পরীক্ষা হয়। প্রথম তিনটিতে আমি প্রথম স্থান অধিকার করেছিলাম, কিন্তু শেষ পরীক্ষায় দ্বিতীয় হই। আমাদের ক্ষেত্রে স্বর্ণপদক দেওয়ার জন্য চারটি পরীক্ষার সম্মিলিত ফল নয়, শুধু শেষ পেশাগত পরীক্ষার ফল বিবেচনা করা হয়। ফলে স্বর্ণপদকটি আমার পাওয়া হয়নি।
আরও পড়ুন: মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের স্বপ্ন থেকে বিচারক, লীনা বললেন—‘জীবন কতটা আনপ্রেডিক্টেবল’
স্বর্ণপদক অর্জনের প্রত্যাশা থাকায় বিষয়টি আমাকে কষ্ট দিয়েছিল। তবে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে নিজেকে বুঝিয়েছিলাম, হয়তো সামনে আরও ভালো কিছু অপেক্ষা করছে। আজ ৪৫তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর মনে হয়, হয়তো সেই ভালো কিছুরই একটি অংশ এটি। এই অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, প্রত্যাশামতো কিছু না হলে হতাশ হয়ে থেমে না গিয়ে ধৈর্য ধরে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়।
জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত কোনটি, যখন মনে হয়েছিল এত দিনের পরিশ্রম সার্থক হয়েছে?
আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বরের রাত। সেদিন ৪৫তম বিসিএসের ফলাফল প্রকাশিত হয় এবং আমি স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হই। সেই সময় কিছুটা দুশ্চিন্তায় ছিলাম। কারণ, পরদিনই ছিল ৪৭তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা। আমার ছোট বাবুকে নিয়ে চিন্তা হচ্ছিল, পরীক্ষায় বসব কি না তা নিয়েও দ্বিধায় ছিলাম। এর মধ্যে সামান্য জ্বরও ছিল। মনে মনে আল্লাহর কাছে আশা করছিলাম, ৪৫তম বিসিএসের ফল ভালো হলে পরদিনের পরীক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তা কিছুটা কমবে। অবশেষে ফলাফল প্রকাশিত হলে দেখি, আমি সফল হয়েছি। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও অপেক্ষার পর মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত আনন্দের ও আবেগের। এরপরও পরদিন ৪৭তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম।
চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বিসিএসকে একমাত্র লক্ষ্য বানানো কি ঠিক?
আমার মনে হয়, বিসিএসকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানানো উচিত নয়। চাকরি জীবনের একটি অংশ; জীবন চাকরির জন্য নয়, বরং চাকরি জীবনের জন্য। বিসিএসের প্রস্তুতিতে অর্জিত জ্ঞান অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক চাকরির পরীক্ষাতেও কাজে আসে। তাই প্রস্তুতির পাশাপাশি সমমানের অন্যান্য চাকরির সুযোগের দিকেও নজর দেওয়া উচিত।
এ ছাড়া তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। সরকারি চাকরির মাধ্যমে যেমন দেশের সেবা করা যায়, তেমনি উদ্যোক্তা হয়ে নিজের কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি আরও ১০–১৫ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। তাই বিসিএসের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও বিকল্প পরিকল্পনা রাখা, নিজের দক্ষতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনে উদ্যোক্তা হওয়ার কথাও ভাবা উচিত। সাফল্যের পথ একটিই নয়।
বিসিএস পরীক্ষার সঙ্গে জড়িত এমন কোনো স্মৃতি আছে, যা আপনার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছে?
৪৫তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার আগে আমার নানা পাকস্থলীর ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। প্রস্তুতির কারণে পরীক্ষার কয়েক দিন আগে তকে দেখতে যেতে পারিনি। বিষয়টি আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছিল। পরীক্ষা দেওয়ার পর বাসায় না ফিরে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে সরাসরি হাসপাতালে নানাকে দেখতে যাই। তার শারীরিক অবস্থা বেশ খারাপ ছিল। নাকে নল লাগানো ছিল, কিছু খেতে পারছিলেন না। এমন অসুস্থ অবস্থাতেও আমাকে দেখে তিনি প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘বুবু, তোমার পরীক্ষা কেমন হয়েছে?’
কথাটি আমার মনে আজীবনের জন্য গেঁথে আছে। নিজের এত কষ্টের মধ্যেও তিনি আমার পরীক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করছিলেন। তার প্রতি আমার ভালোবাসা ও তার আমার প্রতি বিশ্বাসের গভীরতা সেই মুহূর্তে আরও বেশি অনুভব করি। আজ আমার সাফল্যের কথা ভাবলে নানার সেই প্রশ্নটি বারবার মনে পড়ে। আফসোস হয়, তিনি আমার এই অর্জন দেখে যেতে পারেননি। তবে তাঁর ভালোবাসা, দোয়া ও অনুপ্রেরণা আমার জীবনের অমূল্য স্মৃতি হয়ে থাকবে।