সহকারী অধ্যাপক শাকিলা জেবিন © সংগৃহীত
সমাজের নানা সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে আজ নারীরা শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখছে। তবে এ অগ্রযাত্রাকে আরও শক্তিশালী করতে প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস, শিক্ষা ও সমান সুযোগ। এমনটাই মনে করেন হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাকিলা জেবিন। শিক্ষকতা পেশায় একজন নারী হিসেবে তার অভিজ্ঞতা, সমাজে নারীর শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের অগ্রগতি এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি বার্তা নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস এর হাবিপ্রবি প্রতিনিধি রিয়া মোদক।
শিক্ষকতা পেশায় একজন নারী হিসেবে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?
শাকিলা জেবিন: শিক্ষকতা পেশা আমার কাছে শুধু একটি চাকরি নয়, এটি দায়িত্ব ও গর্বের একটি জায়গা। একজন নারী শিক্ষক হিসেবে আমি সব সময় চেষ্টা করি শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের মানসিক, নৈতিক ও ব্যক্তিত্বগত বিকাশেও ভূমিকা রাখতে। বিশেষ করে আমি চাই আমার নারী শিক্ষার্থীরা আত্মবিশ্বাসী ও স্বাবলম্বী হয়ে উঠুক এবং জীবনের কোনো ক্ষেত্রেই নিজেকে পিছিয়ে মনে না করে। তারা যেন বুঝতে পারে শিক্ষা তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি ও সাফল্য দেখা আমার জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা ও সম্মানই আমাকে এই পেশায় আরও অনুপ্রাণিত করে।
বর্তমান সমাজে নারীর শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
শাকিলা জেবিন: গত কয়েক দশকের তুলনায় বর্তমান সময়ে নারীরা অনেকটাই এগিয়ে এসেছে। আগে যেখানে নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন খুবই সীমিত ছিল, এখন ধীরে ধীরে হলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে নারীরা শুধু শিক্ষা অর্জনের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখছে না; বরং সেই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করছে। ব্যবসা, প্রশাসন, গবেষণা কিংবা অন্যান্য পেশাগত ক্ষেত্রেও নারীদের অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে। এটি আমাদের সমাজের জন্য একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবে এই অগ্রযাত্রাকে আরও এগিয়ে নিতে শিক্ষা, সচেতনতা এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন নারী শিক্ষক হিসেবে পেশাগত জীবনে কোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে কি?
শাকিলা জেবিন: পেশাগত জীবনের শুরুতে কিছু সামাজিক ও পেশাগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস ধরে রেখে কাজের প্রতি নিষ্ঠা দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। সময়ের সঙ্গে উপলব্ধি করেছি, একজন শিক্ষকের আসল শক্তি তার দক্ষতা ও আন্তরিকতার মধ্যেই প্রকাশ পায়।
বর্তমান সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
শাকিলা জেবিন: বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব সত্যিই চোখে পড়ার মতো। আজকের মেয়েরা শুধু জ্ঞান অর্জনেই সীমাবদ্ধ নেই; তারা গবেষণা ও বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্বেও সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও সমানভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এই যৌথ অংশগ্রহণই বিশ্ববিদ্যালয়কে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
সমাজে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে আপনি মনে করেন?
শাকিলা জেবিন: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানুষের মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এখানে যদি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঠিক মূল্যবোধ ও সমতার ধারণা তৈরি করা যায়, তাহলে তারা সমাজকে ভিন্নভাবে দেখতে শেখে। ধীরে ধীরে নারীদের প্রতি একটি সম্মানজনক ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে। তাই সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আপনার জীবনে এমন কোনো নারী আছেন কি, যিনি আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছেন?
শাকিলা জেবিন: আমার জীবনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা আমার মা। তার ধৈর্য, পরিশ্রম ও মূল্যবোধ আমাকে সব সময় সামনে এগিয়ে যেতে সাহস দিয়েছে। জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আমি তার কাছ থেকেই পেয়েছি। একজন নারী হিসেবে এই অনুপ্রেরণা আমাকে শক্তি দেয়, আর একজন শিক্ষক হিসেবে আমি চাই সেই সাহস ও আত্মবিশ্বাস আমার শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের, বিশেষ করে মেয়েদের জন্য আপনার বার্তা কী?
শাকিলা জেবিন: শিক্ষার্থীদের, বিশেষ করে মেয়েদের বলব, সবচেয়ে আগে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। আত্মবিশ্বাস ও শিক্ষাকে পুঁজি করে স্বাবলম্বী হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। জীবনের পথে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা আসবে, কিন্তু সাহস ও ধৈর্যের সঙ্গে সেই বাধাগুলো অতিক্রম করতে হবে। শিক্ষা শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের বিষয় নয়, এটি মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখায় এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। তাই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে নিজের সম্ভাবনাকে এগিয়ে নেওয়াই সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত।