রোড সেফটি ফাউন্ডেশন © এআই সৃষ্ট ছবি
পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে ঘরমুখো ও কর্মস্থলমুখী যাত্রায় দেশের সড়কগুলোতে ভয়াবহ দুর্ঘটনার চিত্র উঠে এসেছে। ঈদের আগে ও পরে ২১ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত ১৩ দিনে দেশে ২৯২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৮৩৭ জন। নিহতদের মধ্যে ৩৪ জন নারী ও ৪৮ জন শিশু রয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রোড সেফটি ফাউন্ডেশন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। সংগঠনটি ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এবারের ঈদযাত্রায় প্রতিদিন গড়ে ২১ দশমিক ৬১ জন নিহত হয়েছেন। গত বছরের ঈদুল আজহার আগে-পরে ১২ দিনে নিহত হয়েছিলেন ৩১২ জন, যেখানে দৈনিক গড় মৃত্যু ছিল ২৬ জন। সে হিসাবে এবার প্রাণহানি ১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ কমেছে।
প্রাণহানি কমলেও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা এখনো সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে। ১৪১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১২৪ জন, যা মোট নিহতের ৪৪ দশমিক ১২ শতাংশ। দুর্ঘটনায় নিহত পথচারীর সংখ্যা ৩৭ জন এবং চালক-সহকারী নিহত হয়েছেন ৩৩ জন। সড়ক দুর্ঘটনার পাশাপাশি একই সময়ে ১৩টি নৌ দুর্ঘটনায় ৮ জন নিহত ও ১৫ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ২২টি রেল দুর্ঘটনায় ১৭ জন নিহত এবং ৯ জন আহত হয়েছেন।
যানবাহনভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীরাই সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া থ্রি-হুইলার যাত্রী ৪৮ জন, ট্রাক ও পণ্যবাহী যানবাহনের আরোহী ৩২ জন, বাসযাত্রী ২১ জন এবং প্রাইভেটকার ও অ্যাম্বুলেন্সের যাত্রী ১১ জন নিহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনার স্থান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। মোট দুর্ঘটনার ৩৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ আঞ্চলিক সড়কে এবং ৩৩ দশমিক ২১ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে সংঘটিত হয়েছে। দুর্ঘটনার ধরন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যানবাহন দুর্ঘটনার হার সবচেয়ে বেশি, যা মোট দুর্ঘটনার ৪৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৯৫টি দুর্ঘটনায় ১০১ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে সবচেয়ে কম প্রাণহানি হয়েছে সিলেট বিভাগে, যেখানে ৯টি দুর্ঘটনায় ৭ জন নিহত হয়েছেন। জেলা হিসেবে ফরিদপুরে সবচেয়ে বেশি ১৯টি দুর্ঘটনায় ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
আরও পড়ুন: সন্তানের অবহেলায় বাবা-মার করুণ পরিণতি, কী আছে ভরণপোষণ আইনে?
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এবারের ঈদে রাজধানী ঢাকা থেকে এক কোটির বেশি মানুষ নিজ নিজ গন্তব্যে যাত্রা করেছেন এবং সারা দেশে প্রায় চার কোটি মানুষ যাতায়াত করেছেন। ট্রেন ছাড়া সড়ক ও নৌপথে তুলনামূলক কম ভোগান্তি হলেও বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং পরিবহন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা লক্ষ্য করা গেছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, মহাসড়কে ধীরগতির যান চলাচল, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।
সংগঠনটি সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন, বিআরটিএ ও বিআরটিসির সংস্কার, আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন অপসারণ, দক্ষ চালক তৈরি, মহাসড়কে সার্ভিস রোড নির্মাণ এবং রেল ও নৌপরিবহন উন্নয়নের সুপারিশ করেছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প নেই। সময়োপযোগী নীতিমালা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এর জন্য সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।