তত্ত্বীয় গবেষণাই সার, পেটেন্ট শূন্যতায় দেশীয় গবেষকরা

০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৩৭ PM , আপডেট: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৩৫ AM
পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর

পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর © সংগৃহীত ও সম্পাদিত

দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন বাড়ছে। বাড়ছে বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রকাশনার সংখ্যাও। কিন্তু প্রকাশনার তুলনায় পেটেন্ট আবেদন ও অনুমোদনের হার একেবারে নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের (ডিপিডিটি) তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে দেশের গবেষকরা মাত্র ৮৩টি গবেষণাকর্মের পেটেন্ট আবেদন করেছিলেন, যেখানে অনুমোদিত হয়েছে মাত্র ১৫টি।

দেশ থেকে বিদেশি গবেষকদের পেটেন্ট সংগ্রহের হারও এর তুলনায় ৪ গুণেরও বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গবেষকদের অসচেতনতা এবং সুস্থ পেটেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে না ওঠার পাশাপাশি উদ্ভাবনমুখী গবেষণা না থাকারও প্রতিফলন এটি।

পেটেন্ট হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্ভাবককে প্রদত্ত একটি আইনগত অধিকার, যার মাধ্যমে তিনি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তার উদ্ভাবিত নতুন পণ্য, প্রক্রিয়া বা প্রযুক্তির ওপর একচেটিয়া মালিকানা ও ব্যবহারাধিকার পান। এ সময়ে অন্য কেউ তার অনুমতি ছাড়া সেই উদ্ভাবন তৈরি, ব্যবহার বা বিক্রি করতে পারে না। অর্থাৎ পেটেন্ট উদ্ভাবকের সৃষ্টিকে আইনগত সুরক্ষা দেয় এবং উদ্ভাবনে উৎসাহ জোগায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিক পেটেন্ট ড্রাফটিংয়ের অভাব এবং পেটেন্টের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি বাংলাদেশের একটি সুস্থ পেটেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে ওঠেনি। ফলে এই হার এখনও তলানিতে রয়েছে।

২০২৪ সালে এই শাখা থেকে মোট ১৩৯টি পেটেন্ট অনুমোদিত হয়। এর মধ্যে দেশি মাত্র ১৫টি। যেখানে মোট আবেদন ছিল ৩৮৯টি, এর মধ্যে দেশি পেটেন্টের আবেদন হয়েছিল ৮৩টি। তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে সর্বোচ্চ ২৯টি পেটেন্ট অনুমোদিত হয়। ওই বছর মাত্র ৬৯টি পেটেন্ট অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছিলেন গবেষকরা। এর বাইরে ওই বছর বিদেশি গবেষণার পেটেন্ট নেওয়া হয় ২১১টি।

যা বলছে পরিসংখ্যান
ডিপিডিটির পেটেন্ট ও শিল্প নকশা শাখার তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে এই শাখা থেকে মোট ১৩৯টি পেটেন্ট অনুমোদিত হয়। এর মধ্যে দেশি মাত্র ১৫টি। যেখানে মোট আবেদন ছিল ৩৮৯টি, এর মধ্যে দেশি পেটেন্টের আবেদন হয়েছিল ৮৩টি। তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে সর্বোচ্চ ২৯টি পেটেন্ট অনুমোদিত হয়। ওই বছর মাত্র ৬৯টি পেটেন্ট অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছিলেন গবেষকরা। এর বাইরে ওই বছর বিদেশি গবেষণার পেটেন্ট নেওয়া হয় ২১১টি।

একইভাবে ২০২২ সালে ৭ ও ২০২৩ সালে মাত্র ৪টি দেশি গবেষণার পেটেন্ট অনুমোদন দেয় ডিপিডিটি, যেখানে এ দুই বছর আবেদন হয়েছিল যথাক্রমে ৭১ ও ৬৬টি। ওই দুই বছরেও যথাক্রমে ১৪৭ ও ৫০টি বিদেশি পেটেন্ট অনুমোদন দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব আবেদন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনুপযুক্ত পেটেন্ট স্পেসিফিকেশন প্রস্তুতির কারণে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, যার মূল কারণ পেটেন্ট ড্রাফটিং ও দাখিল প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতনতার অভাব। গবেষকদের ভাষ্য, কার্যকর ও সুসংগঠিত পেটেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা গেলে পেটেন্ট অনুমোদনের হার বৃদ্ধি পাবে, দেশীয়ভাবে পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পেটেন্ট অর্জনে সহায়তা করবে, আমদানি নির্ভরতা কমাবে এবং দেশের অর্থনীতিকে টেকসই রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে।

২০২৩ সালে হেলিয়ন জার্নালে ‘পেটেন্ট ইকোসিস্টেম ইন বাংলাদেশ: কারেন্ট স্ট্যাটাস, চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড প্রসপেক্টস’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। গবেষণাটি করেন বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বছরের অনুমোদি ২৯টি পেটেন্ট অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল ১২ হাজার ৬৪৮টি গবেষণাপত্রের বিপরীতে। অর্থাৎ ওই বছর পেটেন্টের বিপরীতে গবেষণাপত্রের অনুপাত ছিল ১:৪৩৬।

আরও পড়ুন: কারিগরি ও মাদ্রাসার এমপিও নীতিমালার ওপর মতামত দিল অর্থ বিভাগ

ওই গবেষণা অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দাখিলকৃত মোট আবেদনের মাত্র ২৩ শতাংশ পেটেন্ট অনুমোদিত হয়েছে। এ ছাড়া ১৯৯৬ থেকে ২০২১ সময়কালের জন্য পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেড মার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) থেকে সংগৃহীত উপাত্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ পেটেন্ট অফিস ১৯৯৬ সালে মাত্র ১৮টি এবং ২০২১ সালে ২৯টি পেটেন্ট আবেদন অনুমোদন করেছে। এই সময়কালে অনুমোদিত পেটেন্টের সংখ্যা ৪ থেকে ২৯-এর মধ্যে ওঠানামা করেছে।

অপরদিকে একই সময়সীমায় স্কিমাগো ও স্কোপাস ডাটাবেজ থেকে সংগৃহীত স্কোপাস সূচিভুক্ত প্রকাশনার তথ্যে দেখা যায়, প্রকাশনার সংখ্যা দ্রুতগতিতে (এক্সপোনেনশিয়ালি) বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ১৯৯৬ সালের ৫৩৮টি থেকে ২০২১ সালে বেড়ে ১২ হাজার ৬৮৪টিতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশে গবেষণা কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে; কিন্তু পেটেন্ট অনুমোদনের হার সেই অনুপাতে উন্নত হচ্ছে না।

গবেষণা প্রতিবেদনটিতে বিভিন্ন দেশের পেটেন্ট প্রাপ্তির তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়। সে হিসাবে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৭ লক্ষ ২৬ হাজার ৫৫২ গবেষণাপত্রের বিপরীতে ২ লক্ষ ৯৮ হাজার ৫৭৫টি পেটেন্ট নেওয়া হয়, যার অনুপাত ১:২.৪৩। একইভাবে জাপানে ১ লক্ষ ৪৪ হাজার ৭৭৮ গবেষণার বিপরীতে ২ লক্ষ ৭৮ হাজার ১১৭ (১:০.৫২), দক্ষিণ কোরিয়ায় ১ লক্ষ ১ হাজার ৬৯২ গবেষণাপত্রের বিপরীতে ১ লক্ষ ৫৮ হাজার ৪৯৫ (১:০.৬৪), চীনে ৮ লক্ষ ৬০ হাজার ১২ গবেষণাপত্রের বিপরীতে ৬ লক্ষ ৩৯ হাজার ৩০৯ (১:১.৩৫) এবং ভারতে ২ লক্ষ ৩৭ হাজার ৪২৯ গবেষণাপত্রের বিপরীতে ১৪ হাজার ৬১৩টি (১.১৬.২৫) পেটেন্ট নেওয়া  হয়।

আমাদের দেশটা আসলে ডেভেলপ হয়নি ওইভাবে। ফলে আমাদের সচেতনতাও আসে না। পেটেন্ট বিষয়টা মানুষ এখনো ভাল করে বুঝতে পারেনি। এমনকি যারা পিএইচডি করে আসছেন, তারাও জানেন না যে পেটেন্ট করতে হয় উদ্ভাবনটাকে ড. অশোক কুমার রায়, পরিচালক (পেটেন্ট ও শিল্প নকশা), পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি)

তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উচ্চ আয়ের ও প্রযুক্তিগতভাবে সমৃদ্ধ কয়েকটি দেশ— যেমন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এবং চীন, যা দ্রুত উচ্চ আয়ের ও প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী অবস্থানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, পাশাপাশি একটি নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ ভারতেও পেটেন্ট ও প্রকাশনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১২ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও ভারতের পেটেন্ট পরিস্থিতি বলছে, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় পেটেন্টের সংখ্যা অত্যন্ত বেশি এবং তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল।

এর পেছনের মূল কারণ হল এসব দেশের সমৃদ্ধ গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্কৃতি, শক্তিশালী অবকাঠামো এবং সুসংগঠিত পেটেন্ট ইকোসিস্টেম। অন্যদিকে উন্নত দেশগুলোর পেটেন্ট ইকোসিস্টেম অনুসরণ করে চীন দশ বছরে দ্রুত পেটেন্ট সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে— যা ১ লাখ ৫২ হাজার ১০৬ থেকে বেড়ে ৬ লক্ষ ৩৯ হাজার ৩০৯-এ পৌঁছেছে। ভারতও দ্রুতগতিতে পেটেন্ট সংখ্যা বাড়াচ্ছে, তবে এখনও উচ্চ আয়ের দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।

ওই পাঁচটি দেশের স্কোপাস সূচিভুক্ত প্রকাশনার চিত্র উপস্থাপন করে গবেষণায় বলা হয়, পেটেন্ট পরিসংখ্যানের সঙ্গে একটি সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। উচ্চ আয়ের ও প্রযুক্তিগতভাবে সমৃদ্ধ দেশ— যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রকাশনার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে চীন ও ভারত খুব দ্রুত হারে তাদের প্রকাশনার সংখ্যা বাড়াচ্ছে। যেমন ২০১২ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে চীনের প্রকাশনার সংখ্যা ৪ লক্ষ ১৬ হাজার ৩৭২ থেকে বেড়ে ৮ লক্ষ ৬০ হাজার ১২ এবং ও ভারতের ১ লক্ষ ১০ হাজার ২০৫ থেকে বেড়ে ২ লক্ষ ৩৭ হাজার ৪২৯-এ পৌঁছেছে।

এর মধ্যে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ গবেষণা ও উন্নয়ন ইতিহাস রয়েছে। উভয় দেশই একটি শক্তিশালী পেটেন্ট ইকোসিস্টেম বজায় রাখে। ২০২১ সালে তাদের পেটেন্ট ও প্রকাশনার অনুপাত যথাক্রমে ১:০.৫২ এবং ১:২.৪৩, যা নির্দেশ করে যে অধিকাংশ গবেষণা কার্যক্রম শেষ পর্যন্ত পেটেন্টযোগ্য পণ্যে রূপান্তরিত হয়েছে। বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়া ও চীন বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে, গবেষণায় তাদের পেটেন্ট ও প্রকাশনার অনুপাতের নিকটতা নির্দেশ করা হয়েছে। তবে ভারত ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই অনুপাত তুলনামূলকভাবে অনেক বিস্তৃত— যথাক্রমে ১:১৬.২৫ এবং ১:৪৩৬।

চ্যালেঞ্জ কোথায়
বাংলাদেশে সুসংগঠিত গবেষণা সংস্কৃতির সূচনা তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক, যদিও গঙ্গা বদ্বীপ অঞ্চলে গবেষণা কার্যক্রম শুরু হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর। বিংশ শতাব্দীর অধিকাংশ সময়জুড়ে বাংলাদেশকে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হয়েছে। তবে একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে, যখন বাংলাদেশ ধীরে ধীরে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসে একটি শক্তিশালী অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হতে থাকে।

তবুও দেশে প্রকৃত অর্থে পদ্ধতিগত গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয় যখন বাংলাদেশ সরকার জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নীতি–২০১১ প্রণয়ন করে। এর আওতায় বিপুল সংখ্যক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো স্থাপন ও সংস্কার করা হয়, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গবেষক নিয়োগ দেওয়া হয়, তাদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয় এবং বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে গবেষণা অনুদান প্রদান করা হয়।

পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) দেশে পেটেন্ট অনুমোদন ও মেধাস্বত্ব অধিকার সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করে। বাংলাদেশে পেটেন্ট ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে পেটেন্ট ও ডিজাইন আইন, ১৯১১ দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে পেটেন্ট ইকোসিস্টেম শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। সরকার পেটেন্ট পরীক্ষণ প্রক্রিয়ার দক্ষতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং পুরোনো পেটেন্ট ও ডিজাইন আইন, ১৯১১ সংশোধন করে বাংলাদেশ পেটেন্ট আইন, ২০২২ প্রণয়ন করেছে। একই সঙ্গে পেটেন্ট ও অন্যান্য মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তির জন্য মেধাস্বত্ব আইন ও আদালতকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।

২০২৩ সালে প্রকাশিত ওই গবেষণা প্রতিবেদনে গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই অনুপাত থেকে বোঝা যায় যে অধিকাংশ গবেষণা কার্যক্রম পেটেন্টযোগ্য চূড়ান্ত পণ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাদের বক্তব্য, বাংলাদেশ পূর্বে একটি স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) ছিল, যদিও সম্প্রতি এটি অস্থায়ীভাবে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। সাধারণত স্বল্পোন্নত ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে সুসংগঠিত গবেষণা সংস্কৃতি তেমনভাবে দেখা যায় না। এর প্রধান কারণ হল উন্নত ল্যাবরেটরি চর্চার অভাব, পর্যাপ্ত বিনিয়োগের ঘাটতি এবং যথাযথ গবেষণা ও উন্নয়ন অবকাঠামোর অভাব।

বাংলাদেশে মূলত যে গবেষণাগুলো হয়, তার বেশিরভাগই একাডেমিক গবেষণা। এর অন্যতম একটা কারণ হচ্ছে যে আমাদের যে পাবলিকেশনের রিকোয়ারমেন্ট (প্রকাশনা চাহিদা) আছে, আমরা ওটা বাড়ানোর চেষ্টা করি বা ওটা সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করি। এজন্য আমাদের একাডেমিক রিসার্চের পাবলিকেশন সংখ্যা অনেক বেশি। আর যেহেতু এসব গবেষণার সিংহভাগই তত্ত্বীয়, প্রায়োগিক গবেষণা কম থাকে... পেটেন্ট কার্যকর হয় মূলত প্রায়োগিক বা অ্যাপ্লাইড রিসার্চের ক্ষেত্রে অধ্যাপক ড. খাজা ইফতেখার উদ্দিন আহমেদ, প্রো-ভিসি, গ্রিন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

এক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। মোটাদাগে বলা যায়— সাধারণ জনগণের মধ্যে পেটেন্ট ও মেধাস্বত্ব সুরক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, পেটেন্ট অফিসে সীমিত সম্পদ ও দক্ষতার ঘাটতি এবং পেটেন্ট অধিকার প্রয়োগের সীমিত সক্ষমতা। এসব সমস্যার সম্মিলিত প্রভাবে পেটেন্ট অনুমোদনের সংখ্যা কমে যায় এবং পেটেন্ট ও বৈজ্ঞানিক প্রকাশনার অনুপাত আরও বিস্তৃত হয়।

গবেষণায় বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার উন্নতির জন্য ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউআইপিও) পেটেন্ট ম্যানুয়াল অনুসরণ করে একটি মানসম্মত পেটেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। এজন্য বাংলাদেশকে ডব্লিউআইপিও নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের মতো উন্নত দেশগুলোর চর্চা গ্রহণ করতে হবে।

যা বলছে ডিপিডিটি
পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের (ডিপিডিটি) পরিচালক (পেটেন্ট ও শিল্প নকশা) ড. অশোক কুমার রায় দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, পেটেন্টের আবেদন ও অনুমোদন আগের তুলনায় বাড়ছে। পরিসংখ্যানগতভাবে ২০২১ সালের পেটেন্ট আবেদনের তুলনায় ২০২৪ সালে আবেদন বেড়েছে দেড় গুণ। কিন্তু এর হারটা যেভাবে বাড়ানো দরকার, আসলে তা খুব বেশি না। তিনি বলেন, আমাদের দেশটা আসলে ডেভেলপ হয়নি ওইভাবে। ফলে আমাদের সচেতনতাও আসে না। পেটেন্ট বিষয়টা মানুষ এখনো ভাল করে বুঝতে পারেনি। এমনকি যারা পিএইচডি করে আসছেন, তারাও জানেন না যে পেটেন্ট করতে হয় উদ্ভাবনটাকে।

দেশি গবেষকদের তুলনায় বিদেশি গবেষকদের আবেদন ও অনুমোদনের হার বেশি জানিয়ে ড. অশোক কুমার রায় বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটলে পেটেন্টের জন্য মূল্য দিতে হয়। অর্থাৎ, ওই পেটেন্ট দিয়ে যে পণ্য তৈরি হবে, বিক্রি করতে গেলে উল্লেখযোগ্য একটা অংশ দিয়ে দিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে হতে পারে যে পণ্যের প্রফিটটাই ওরা নিয়ে নিবে। এজন্য বিদেশি গবেষকরাও আমাদের এখানে পেটেন্টের আবেদন করেন।

প্রকৃত সমস্যা কোথায়
বাংলাদেশের গবেষণাকর্মে পেটেন্ট আবেদন ও অনুমোদনের হার কম হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ দেখছেন গ্রিন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. খাজা ইফতেখার উদ্দিন আহমেদ। তার মতে, শুধু সচেতনতার অভাবই নয়, গবেষণার ধরণ ও অর্থায়নের যথাযথ সংকুলান না থাকায় পেটেন্ট গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়নি। বিশেষ করে কেবল প্রকাশনা সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য গবেষণা করা এবং উদ্ভাবনী গবেষণা না থাকাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।

বাংলাদেশে সুসংগঠিত গবেষণা সংস্কৃতির সূচনা তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক, যদিও গঙ্গা বদ্বীপ অঞ্চলে গবেষণা কার্যক্রম শুরু হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর। বিংশ শতাব্দীর অধিকাংশ সময়জুড়ে বাংলাদেশকে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হয়েছে। তবে একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে, যখন বাংলাদেশ ধীরে ধীরে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসে একটি শক্তিশালী অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হতে থাকে। তবুও দেশে প্রকৃত অর্থে পদ্ধতিগত গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয় যখন বাংলাদেশ সরকার জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নীতি–২০১১ প্রণয়ন করে।

অধ্যাপক ড. খাজা ইফতেখার উদ্দিন আহমেদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বাংলাদেশে মূলত যে গবেষণাগুলো হয়, তার বেশিরভাগই অ্যাকাডেমিক গবেষণা। এর অন্যতম একটা কারণ হচ্ছে যে, আমাদের যে পাবলিকেশনের রিকোয়ারমেন্ট (প্রকাশনা চাহিদা) আছে, আমরা ওটা বাড়ানোর চেষ্টা করি বা ওটা সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করি। এজন্য আমাদের অ্যাকাডেমিক রিসার্চের পাবলিকেশন সংখ্যা অনেক বেশি। আর যেহেতু এসব গবেষণার সিংহভাগই তত্ত্বীয়, প্রায়োগিক গবেষণা কম থাকে... পেটেন্ট কার্যকর হয় মূলত প্রায়োগিক বা অ্যাপ্লাইড রিসার্চের ক্ষেত্রে।

তিনি বলেন, আরেকটি হচ্ছে আমাদের এখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক গবেষণা হয় না। বাইরের দেশে ফান্ড বা অর্থায়ন প্রধানত আসে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো থেকে। মাইক্রসফট, গুগল, মেটা অথবা অ্যাপল— এগুলো বড় বড় কোম্পানি যেমন, একদম ছোট কোম্পানির ক্ষেত্রেও এমনটা হতে পারে। ওরা যেটা করে— ওদের রিসার্চার অর্থাৎ স্টক মেম্বাররা উদ্ভাবনগুলো নিয়ে এলে তারা প্যাকেজ ফাইল করে। কারণ ওই ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টিটাকে তারা ক্যাপচার করতে চায়। অর্থাৎ দেশের বাইরে একাডেমিয়ার তুলনায় প্রধানত ইন্ডাস্ট্রিতে পেটেন্টটা আসে।

আরও পড়ুন: ৫০তম বিসিএসের ফল ১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে: পিএসসি চেয়ারম্যান 

এই গবেষক বলেন, আমাদের এখানে ওরকম হাইটেক ইন্ডাস্ট্রি নেই একেবারে। দেশে যে ইন্ডাস্ট্রিগুলো আছে, যেমন গার্মেন্টস বা এরকম শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে আসলে ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টির খুব একটা সুযোগ নেই। কারণ এগুলো এস্টাব্লিশড ম্যানুফ্যাকচারিং প্রসেস (অর্থাৎ আগে থেকেই নির্ধারিত ও প্রচলিত উৎপাদন পদ্ধতিতে চলে)।

তিনি বলেন, আমাদের এখানে কৃষিভিত্তিক যে ইন্ডাস্ট্রি, ওখানে আমরা যে যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছি, সেখানে হয়তো উদ্ভাবনের সুযোগ আছে। এ ছাড়া আমাদের দেশের যেসব সমস্যা, সেগুলোকে চিহ্নিত করে আমরা যদি কাজ করি, তাহলে আমাদের হয়তো নিজস্ব কিছু উদ্ভাবন থাকতে পারে। কিন্তু ওই সংস্কৃতিটা নাই যে সেটিকে পেটেন্ট করবেন বা কমার্শিয়ালাইজ করবেন।

ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমি কোলাবরেশনের গুরুত্ব তুলে ধরে ড. খাজা ইফতেখার উদ্দিন আহমেদ বলেন, যদি ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমির কোলাবরেশন হয়, বা ইন্ডাস্ট্রি এটা মনে করে, তাহলে উদ্ভাবনী গবেষণা বাড়তে পারে। তবে সেটাও আমাদের এখানে খুব সীমিত। এই সংস্কৃতিটা যদি গড়তে হয়, তাহলে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ দরকার— যেন আমাদের রিসার্চ পেপারগুলো থেকে কিছু পেটেন্ট আসতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন শিল্পকারখানা গুটিয়ে নিতে বলল ইরান
  • ১৫ মার্চ ২০২৬
মার্কিন সামরিক বিমান চলাচলের অনুরোধ প্রত্যাখান করল সুইজারল্…
  • ১৫ মার্চ ২০২৬
প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে সিদ্ধান্ত…
  • ১৫ মার্চ ২০২৬
প্রত্যাশিত চাঁদা না পেয়ে হাতুরিপেটা, ফের আটক উপজেলা ছাত্রদল…
  • ১৫ মার্চ ২০২৬
একুশে বইমেলা উপলক্ষে ড্যাফোডিল প্রেসের ৭টি নতুন বই উন্মোচন
  • ১৫ মার্চ ২০২৬
নিজেদের আদর্শিক ক্যাচাল দূরে রেখে বাংলাদেশ প্রশ্নে আমাদের এ…
  • ১৫ মার্চ ২০২৬
×
ADMISSION
GOING ON
SPRING 2026
APPLY ONLINE
UP TO 100% SCHOLARSHIP
UNIVERSITY OF ASIA PACIFIC 🌐 www.uap.ac.bd
Last Date of Application:
22 April, 2026
📞
01789050383
01714088321
01768544208
01731681081