‘বিমলাইন ফর স্কুলস ২০২৬’ বিজয়ী হয়ে ইতিহাস গড়েছেন বাংলাদেশের ৬ শিক্ষার্থী © টিডিসি সম্পাদিত
বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পদার্থবিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিযোগিতা ‘বিমলাইন ফর স্কুলস (BL4S) ২০২৬’-এ বৈশ্বিক বিজয়ী হয়ে ইতিহাস গড়েছেন বাংলাদেশের ৬ শিক্ষার্থী। ইউরোপীয় পারমাণবিক গবেষণা সংস্থা (সার্ন) আয়োজিত এই প্রতিযোগিতার ১৩তম আসরে বিশ্বের ৮৯টি দেশের ৭১২টি গবেষণা প্রস্তাবনার মধ্য থেকে নির্বাচিত পাঁচটি সেরা দলের একটি হয়েছে বাংলাদেশী ৬ তরুণের দল ‘টিম পোলারিস’।
প্রতিযোগিতার ১৩ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো বাংলাদেশি দল এ সাফল্য অর্জন করল। কণা পদার্থবিদ্যা এবং অ্যাডভান্সড সায়েন্সের জটিল এই বৈশ্বিক আসরে বাংলাদেশের কোনো দলের এটাই প্রথম এবং সর্বোচ্চ সাফল্য। গেল সপ্তাহে ইউরোপীয় পারমাণবিক গবেষণা সংস্থা (সার্ন) তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিজয়ী দলগুলোর নাম ঘোষণা করে।
টিম পোলারিসের সদস্যরা হলেন নোয়াখালীর চৌমুহনী সরকারি সালেহ আহমদ কলেজের শিক্ষার্থী সালমান আলম সোহান, মো. আব্দুল রহিম পরশ ও এস এম তাওসিফ, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের নাজিফা তাসনিম এবং রংপুর কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নাজিয়া তিতিম। দলটির কোচ ছিলেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো. নিশাদ আহমেদ জীবন।
বাংলাদেশি দল ছাড়াও ১৩তম আসরে বিজয়ী হয়েছে ভারতের ‘অ্যাটো-পায়োন’, তুরস্কের ‘পায়ন-আইএসটি’, যুক্তরাজ্যের ‘মোবাইল এমআইপি-এস’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেন্টাউরি স্টারস’ দল৷
২০২৬ সালের এই প্রতিযোগিতায় রেকর্ড সংখ্যক দল অংশ নিয়েছে৷ ৮৯টি দেশ থেকে সাড়ে ৪ হাজারের বেশি উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীর সমন্বয়ে গঠিত ৭১২টি দল তাদের প্রস্তাবনা জমা দিয়েছিল৷
২০১৪ সালে কর্মসূচিটি শুরুর পর থেকে এবারই সবচেয়ে বেশি প্রতিযোগী অংশ নিয়েছেন৷ আয়োজকরা জানিয়েছেন, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৩৮ শতাংশই ছিল নারী শিক্ষার্থী৷ এটিকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (STEM) এর ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী নারীদের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততার প্রতিফলন বলে মনে করছে সার্ন৷
সার্ন-এর এই উদ্যোগটি বিশ্বজুড়ে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের এমন সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিকল্পনা বা নকশা করতে আহ্বান জানায়, যা কণা ত্বরক বা ‘পার্টিকেল এক্সিলারেটর’-এর রশ্মি ব্যবহার করে পরিচালনা করা সম্ভব৷ এ বছর প্রস্তাবনাগুলোর বৈজ্ঞানিক গুণমান ও অভিনবত্বের ওপর ভিত্তি করে এই পাঁচটি দলকে বিজয়ী হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে৷
টিম পোলারিসের বিজয়ের পেছনে রয়েছে ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত রেডিয়েশন থেরাপির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নিয়ে গবেষণা প্রস্তাব। বর্তমানে রেডিয়েশন থেরাপিতে ব্যবহৃত স্কিন্টিলেটর রোগীর শরীরে কতটুকু বিকিরণ পৌঁছাচ্ছে তা পরিমাপ করতে সাহায্য করে। তবে প্রচলিত প্লাস্টিক স্কিন্টিলেটর দীর্ঘ সময় উচ্চমাত্রার বিকিরণের সংস্পর্শে থাকলে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে চিকিৎসার ব্যয় বেড়ে যায়।
এর বিকল্প হিসেবে দলটি পলিসাইলক্সেন নামের একটি উপাদান ব্যবহারের প্রস্তাব দেয়। এটি প্রচলিত প্লাস্টিকের তুলনায় বেশি টেকসই এবং উচ্চমাত্রার বিকিরণ সহ্য করতে সক্ষম। বিচারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই উদ্ভাবনী গবেষণা ধারণাই। গবেষণাটি সফল হলে ক্যানসার চিকিৎসা থেকে শুরু করে মহাকাশ গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
টিম পোলারিসের কোচ নিশাদ আহমেদ জীবন বলেন, ‘আমরা শুরুতে এত বড় সাফল্যের কথা ভাবিনি। গবেষণাটি সফল হলে রেডিওথেরাপির ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে কমানো সম্ভব হতে পারে। বাংলাদেশকে এ পর্যায়ে তুলে ধরতে পেরে আমরা গর্বিত। ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আরও বড় অর্জন সম্ভব।’
বিজয়ী দল হিসেবে টিম পোলারিস আগামী আগস্টে জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব বনের ELSA (Electron Stretcher Accelerator) পার্টিকেল অ্যাক্সিলারেটরে সরাসরি তাদের গবেষণা পরিচালনার সুযোগ পাবে। এই গবেষণা কেন্দ্রটি ক্যানসার চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট গবেষণা এবং ডিটেক্টর ফিজিক্সে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এ ছাড়া দলটি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম কণা পদার্থবিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান (সার্ন) পরিদর্শনের সুযোগও পাবে, যেখানে একসময় আবিষ্কৃত হয়েছিল বহুল আলোচিত হিগস বোসন কণা। বিশ্বসেরা বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজ ও শেখার এই সুযোগ বাংলাদেশের তরুণ গবেষকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।