ঢাবির বাসে ‘দম্পতি’ পাশাপাশি বসা নিয়ে বিরোধ, শিক্ষার্থীদের মারধর, অভিযুক্ত ছাত্রী থানা হেফাজতে

০৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:০৭ PM
ঢাবির লোগো

ঢাবির লোগো © টিডিসি সম্পাদিত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আনন্দ বাসে এক ‘দম্পতি’র পাশাপাশি বসাকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও বাস ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা হয়েছে। মামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিযুক্ত ওই ছাত্রীকে থানা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে নারায়ণগঞ্জের ভূইগড় স্টপেজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনন্দ বাসে এ ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত ছাত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ৯ম ব্যাচের শিক্ষার্থী।

জানা যায়, ঢাবির আনন্দ বাসে এক দম্পতি পাশাপাশি বসলে নিয়ম অনুযায়ী তাদের আলাদা বসতে বলা হয়। পরে তাদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা প্রথমে পরিচয় দিতে অস্বীকৃতি জানান। একপর্যায়ে ওই ছাত্রী নিজেকে ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী বলে পরিচয় দেন। পরে তিনি ফোন করে নারায়ণগঞ্জের ভূইগড় স্টপেজে লোকজন জড়ো করেন। বাসটি সেখানে পৌঁছালে তারা শিক্ষার্থীদের মারধর ও ভাঙচুর চালায়। এ সময় বাসে থাকা কয়েকজন ছাত্রীও আহত হন।

এ ঘটনায় বাসে থাকা আনন্দ কার্যকরী কমিটি ২০২৫-২৬-এর সভাপতি তরিকুল ইসলাম তারেক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, একটি ছেলে-মেয়ে বাসের সামনে পাশাপাশি বসে থাকতে দেখি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে ছেলে-মেয়েদের একসঙ্গে বসার নিয়ম নেই। তখন পেছন থেকে একজন শিক্ষার্থী ওই মেয়েকে ভদ্রভাবে বলেন, আপু, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের নিয়ম অনুযায়ী ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে বসা যায় না। আপনারা ভাইয়াকে পেছনে এসে বসতে বলেন।

ওই ছাত্রী বলেন, তিনি চার বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে যাতায়াত করছেন এবং নিয়ম জানেন। পরে তিনি বলেন, ভাই-বোন একসঙ্গে বসলে সমস্যা কী? তখনও তিনি জানাননি যে পাশে বসা ব্যক্তি তার স্বামী। পরে ওই ব্যক্তি পেছনের সিটে গিয়ে বসেন।

অভিযুক্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে থানা হেফাজতে আছেন। তার বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। তবে ছাত্রীর স্বামীকে এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।— ওসি, ফতুল্লা থানা

তারেক বলেন, এরপর বাসের এক জুনিয়র শিক্ষার্থী ওই ছাত্রীর কাছে পরিচয়পত্র দেখতে চান। কিন্তু তিনি পরিচয়পত্র দেখাতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, আমি চার বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করি। সবাই আমাকে চেনে। কিন্তু বাস্তবে তাকে কেউ চিনত না। পরে তিনি একটি আইডি কার্ড দেখান। তবে সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীদের ব্যবহৃত পরিচয়পত্রের মতো ছিল না। এরপর তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ই-মেইল, বিভাগীয় গ্রুপ বা অন্য কোনো প্রমাণ দেখাতে বলা হয়। কিন্তু তিনি তা দেখাতে পারেননি।

‘শেষ দিকে তিনি আমাকে বলেন, তুমি কি আমাকে চেনো না? আমি বলি, আপু আমি আপনাকে চিনি না। তখন তিনি বলেন আপনারা আমাকে হয়রানি করছেন। এ সময় বাসে থাকা একজন সিনিয়র ছাত্রীও ওই শিক্ষার্থীকে নিজের পরিচয়পত্র দেখিয়ে সহযোগিতা করতে বলেন। কিন্তু এরপরও ওই ছাত্রী পরিচয়পত্র দেখাতে রাজি হননি। পরে ওই ছাত্রীর সঙ্গে থাকা ব্যক্তি তাকে পরিচয়পত্র দেখাতে বলেন। তখনও আমরা জানতাম না তিনি তার স্বামী। পরে বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়ে যায়। তবে এরপর ওই ব্যক্তি বিভিন্ন জায়গায় ফোন দিতে শুরু করেন। ওই দম্পতির স্টপেজ আসার পরপরই ১৫ থেকে ২০ জন যুবক বাসে উঠে হামলা চালায়।’

তারেক বলেন, ওরা বাসে উঠে প্রথমে গালাগালি শুরু করে। পরে মারধর শুরু করে। ছেলেদের মধ্যে যারা সামনে ছিল, তাদের সবচেয়ে বেশি মারধর করা হয়। মেয়েরাও রক্ষা পায়নি। হামলাকারীদের মধ্যে অনেকেই স্থানীয় বখাটে ও মাদকাসক্ত ছিলেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে আমাকে ফোন করে বিষয়টি টাকা-পয়সার মাধ্যমে মীমাংসার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক ইবনে আলী মোহাম্মদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বাসে হামলার ঘটনার পর খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কয়েকজনের ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। পরে এ ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বিরোধের একপর্যায়ে উত্তেজনা তৈরি হয়। এ সময় ছাত্রীদের হেনস্তা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের সঙ্গে অশোভন আচরণ ও গালিগালাজ করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে ওই ছাত্রীর বিরুদ্ধেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো শিক্ষার্থীর দোষ প্রমাণিত হলে তাকে অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনা হবে।—ইসরাফিল প্রাং, প্রক্টর, ঢাবি

মামলা ও পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে তিনি বলেন, অভিযুক্ত ছাত্রীর স্বামীকে থানায় আসতে বলা হলেও তিনি আসেননি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ছাত্রী এবং সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজনকে থানা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। মামলায় ওই ছাত্রী ও তার স্বামীকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও ৩০ থেকে ৪০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। 

এ ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) পরিবহন সম্পাদক মো. আসিফ আব্দুল্লাহ নিজের ফেসবুক একাউন্টে এক স্ট্যাটাসে লেখেন, বাসে হামলা করার ঘটনায় ফতুল্লা থানায় মামলা করা হয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে থানায় হেফাজতে রাখা হয়েছে। শুক্রবার সকাল ১১ টার মধ্যে তার স্বামীকে থানায় হাজির করবে বলেছে। আজ দিনের বেলা আনন্দ রুটের শিক্ষার্থীদের নিয়ে আমরা প্রক্টর বরাবর অফিশিয়াল অভিযোগ দাখিল করবো ইনশাআল্লাহ।

এদিকে অভিযুক্ত ঢাবির ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ৯ম ব্যাচের ছাত্রী মাহিকা দীপ্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংসদ গ্রুপে এক স্ট্যাটাসে লেখেন, নারায়ণগঞ্জে বসবাস করার কারণে আমি নিয়মিত আনন্দ বাসে যাতায়াত করি। আজ ক্যাম্পাসে থিসিসের কাজ শেষে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার বাসে বাসায় ফিরছিলাম। রাত হওয়ার কারণে আমার স্বামী আমার সঙ্গে ছিলেন। রাতের বাসে সাধারণত যাত্রী কম থাকে। তাই আমি ও আমার স্বামী পাশাপাশি একটি সিটে বসি। কিন্তু বাসের প্রেসিডেন্ট তারেক আমাদের বলেন, ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে বসা যাবে না। তখন আমি বলি, আমরা স্বামী-স্ত্রী। কিন্তু তারা বলেন, তবুও একসঙ্গে বসা যাবে না। এরপর আমার স্বামী পেছনের একটি সিটে গিয়ে বসেন।

তিনি বলেন, এরপর তারা আমার ছাত্রত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং আমার পরিচয়পত্র দেখতে চান। আমি আমার বিভাগের পরিচয়পত্র দেখাই। কিন্তু তারা বলেন, এ ধরনের কার্ড তারা আগে কখনো দেখেননি। আমি বলি, আমি সব সময় এই পরিচয়পত্রই দেখিয়ে আসছি। কিন্তু তারা বারবার বলেন, এটি ভুয়া। এরপর তারা আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ই-মেইল দেখাতে বলেন। আমি ই-মেইল দেখাই। পরে রেজিস্টার্ড বিল্ডিংয়ে গিয়ে কোড দেখাই, রেজিস্ট্রেশন দেখাই এবং ভর্তি সনদও দেখাই। তারপরও তারা আমাকে বিশ্বাস করেননি।

ওই ছাত্রী লেখেন, এ সময় তারা আমার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক ও আক্রমণাত্মক আচরণ করেন। বাসের পেছনের অংশে বসে থাকা কয়েকজন ছেলে আমার সম্পর্কে আজেবাজে মন্তব্য করছিল। আমি সেগুলো শুনেছি। পরে আমার স্টপেজে নামার আগে আমি তারেককে বলি, একজন সিনিয়র হিসেবে তিনি আমার সঙ্গে যে আচরণ করেছেন, তা মোটেই কাম্য নয়। আমি পরিবহন অফিসে এ বিষয়ে অভিযোগ করব। এর মধ্যে বাসে থাকা আরেকজন মেয়ে আমার সঙ্গে শিষ্টাচার নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। তিনি আমাকে ভদ্রতা শেখার পরামর্শ দেন। একপর্যায়ে ওই মেয়ের সঙ্গে আমার তর্ক হয়। ঠিক তখনই আমার বাবা এলাকার একজন পরিচিত ব্যক্তি হওয়ায় তার পরিচিত এক-দুইজন বাসে উঠে আসেন। 

তিনি বলেন, আমি ও আমার স্বামী পরিস্থিতি সামাল দিয়ে বলি, এটি আমাদের ব্যক্তিগত বিষয়। এরপর আমরা বাস থেকে নেমে যাই। কিন্তু এখন আমার নিজের বাসের সহপাঠীরাই আমার বিরুদ্ধে ফতুল্লা থানায় মামলা করেছেন। তাদের অভিযোগ, আমি নাকি ছেলেপেলে দিয়ে তাদের মারধর করিয়েছি। এত রাতে একজন মেয়ে হিসেবে আমাকে এখন থানায় যেতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক মো. ইসরাফিল প্রাং (ইসরাফিল রতন) দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ফতুল্লা থানায় মামলা হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছেও লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত করবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব তথ্য ও দাবি ছড়িয়েছে, সেগুলোর সত্যতা যাচাই করে তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, ঘটনার সূত্রপাত সম্পর্কে বিভিন্ন মাধ্যমে কিছু তথ্য পাওয়া গেলেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।

এক প্রশ্নের জবাবে ইসরাফিল প্রাং বলেন, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তার বিরুদ্ধেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো শিক্ষার্থীর দোষ প্রমাণিত হলে তাকে অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনা হবে।

ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাহবুব আলম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, অভিযুক্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে থানা হেফাজতে আছেন। তার বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। তবে ছাত্রীর স্বামীকে এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

ওসি বলেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী ওই ছাত্রী ঢাবির বসা নিয়ে অন্য শিক্ষার্থীদের সাথে তর্কে জড়ান। বাসে থাকতেই তার স্বামী ফোন দিয়ে স্থানীয় কিছু যুবক জড়ো করে। বাস অভিযুক্ত ছাত্রীর গন্তব্যস্থলে আসলেই স্থানীয় কয়েকজন ওই বাসে থাকা ঢাবি শিক্ষার্থীদের মারধর করেন। পরে ডাকসু সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এসে মামলা করে। 

ওসি আরও জানান, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত তিনজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া ২৫ থেকে ৩০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে জড়িত অন্যদের পরিচয় শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মাদক সেবনের সময় ৩ যুবক আটক, গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ
  • ০৭ আগস্ট ২০২৬
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে কত দিন খেলবেন মেসি—জানালেন তাপিয়া
  • ০৭ আগস্ট ২০২৬
সাতসকালে সড়কে ঝরল ১৬ জনের প্রাণ
  • ০৭ আগস্ট ২০২৬
আর্মি স্টেডিয়ামের বিপরীত পাশে আ. লীগের মিছিলের প্রস্তুতি, অ…
  • ০৭ আগস্ট ২০২৬
ঝিনাইদহে দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে চালক নিহত
  • ০৭ আগস্ট ২০২৬
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নওফেলের বাসভবনে আগুন
  • ০৭ আগস্ট ২০২৬