জেল থেকে জার্নালে
লেখক আব্দুল্লাহ আর রিয়াদ © টিডিসি সম্পাদিত
পাহাড়ের সবুজ যখন নীরবে বদলে যাচ্ছে, তখন সেই পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক ভাষা তুলে ধরেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) তরুণ গবেষক আব্দুল্লাহ আর রিয়াদ। গবেষণার টেবিল, রাজনৈতিক সংগ্রাম ও কারাবরণের অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে তাঁর এই অর্জন যেন মনে করিয়ে দেয় কাজী নজরুল ইসলামের সেই অদম্য উচ্চারণ, “চির উন্নত মম শির।”
গবেষণাপত্রটির শিরোনাম “Exploring vegetation dynamics, driving factors, and future vegetation coverage in the Chittagong Hill Tracts of Bangladesh”। এটি প্রকাশিত হয়েছে Elsevier-এর Environmental Challenges জার্নালে, যা একটি Q1 জার্নাল এবং এর CiteScore 10.8।
গবেষণাপত্রটির প্রথম লেখক ও যোগাযোগকারী লেখক আব্দুল্লাহ আর রিয়াদ, যিনি বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগে পিএইচডি করছেন। তাঁর সহ-লেখকরা হলেন একই বিভাগের অধ্যাপক বিশিষ্ট জিও-স্পেশাল গবেষক মোহম্মদ সফি উল্যাহ এবং গবেষক মো. খায়রুল ইসলাম তুহিন।
গবেষণায় ১৯৮৯, ১৯৯৮, ২০০৮, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের ‘ল্যান্ডস্যাট স্যাটেলাইট’ ছবি ব্যবহার করে পার্বত্য চট্টগ্রামের উদ্ভিদ আচ্ছাদনের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকরা NDVI differencing, Combinatorial matrix, Spatial regression এবং ANN-CA model ব্যবহার করে অতীতের পরিবর্তন বোঝার পাশাপাশি ২০৩০ সালের সম্ভাব্য সবুজ আচ্ছাদনের পূর্বাভাসও দিয়েছেন।
গবেষণার ফলাফল উদ্বেগজনক। ১৯৮৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে Sparse vegetation, অর্থাৎ স্বল্প-ঘনত্বের সবুজ আচ্ছাদন ছিল ১৫.৮৩ শতাংশ। সহজভাবে বলতে গেলে, এটি এমন এলাকা যেখানে ঘাস, ঝোপঝাড় বা কম ঘনত্বের গাছপালা থাকে। ২০২৪ সালে এই স্বল্প-ঘনত্বের সবুজ আচ্ছাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮.১৭ শতাংশে। অন্যদিকে Moderate vegetation, অর্থাৎ মাঝারি-ঘনত্বের সবুজ আচ্ছাদন কমেছে ৭৭.৭৫ শতাংশ থেকে ৬৫.২৯ শতাংশে। এটি এমন এলাকা যেখানে ফসলি জমি, মাঝারি গাছপালা বা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বনভূমি থাকে। অর্থাৎ পাহাড়ের তুলনামূলক ভালো সবুজ আচ্ছাদন ধীরে ধীরে পাতলা, দুর্বল ও বিক্ষিপ্ত সবুজে রূপ নিচ্ছে।
আরও সহজভাবে বললে, পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক এলাকা আগে ছিল মাঝারি-ঘনত্বের সবুজে ভরা—যেখানে বন, ফসলি জমি ও গাছপালার উপস্থিতি তুলনামূলক ভালো ছিল। কিন্তু সময়ের তার একটি বড় অংশ এখন স্বল্প-ঘনত্বের বা বিক্ষিপ্ত সবুজ আচ্ছাদনে পরিণত হচ্ছে, যেন পাহাড়ের বুকের সবুজ নিজেই নীরবে জানিয়ে দিচ্ছে—তার সবুজায়নের ঘনত্ব কমছে, প্রাণশক্তি দুর্বল হচ্ছে।
গবেষণার পূর্বাভাস বলছে, বর্তমান ধারা চলতে থাকলে ২০৩০ সালে স্বল্প-ঘনত্বের বা বিক্ষিপ্ত সবুজ আচ্ছাদন বেড়ে ২৯.৭১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, আর মাঝারি-ঘনত্বের সবুজ আচ্ছাদন কমে ৬৪.৩৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। Dense vegetation বা ঘন বনভূমি থাকবে মাত্র ১.০৩ শতাংশ। এই তথ্য শুধু পরিবেশবিদদের জন্য নয়, বরং নীতিনির্ধারক, বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং জলবায়ু পরিকল্পনাকারীদের জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা।
গবেষণায় দেখা গেছে, ভূমির ঢাল, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ভূমির উচ্চতা, আর্দ্রতা সূচক, জনসংখ্যার চাপ এবং মানববসতির সম্প্রসারণ পার্বত্য চট্টগ্রামের উদ্ভিদ আচ্ছাদনের পরিবর্তনকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করছে। অর্থাৎ শুধু পাহাড়ি ভূমির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নয়, মানুষের বসতি বৃদ্ধি, জনসংখ্যার চাপ, ভূমি ব্যবহার এবং অবকাঠামো সম্প্রসারণও পাহাড়ের সবুজকে বদলে দিচ্ছে। বিশেষ করে মানবসৃষ্ট চাপ ও মানববসতির সম্প্রসারণের কারণে পাহাড়ি এলাকার উদ্ভিদ আচ্ছাদন ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে।
আব্দুল্লাহ আর রিয়াদ একদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের একজন ছাত্রনেতা এবং অমর একুশে হল ছাত্রদল-এর সাবেক সভাপতি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে তাঁকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়েছে। সর্বশেষ কারাগারে পাঠানোর আগে তাঁকে তিনদিন গুম করে রাখা হয়েছিল বলেও তিনি জানান। সে সময় ছাত্রদলের ছয় নেতার অবস্থান প্রকাশ ও তাঁদের আইনি সহায়তার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে আব্দুল্লাহ আর রিয়াদসহ কয়েকজন ছাত্রদল নেতাকে কারাগারে পাঠানোর খবরও প্রকাশিত হয়।
কারাগার, রাজনৈতিক চাপ কিংবা নিখোঁজ থাকার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা—কোনোটিই তাঁর গবেষণার পথ থামাতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথের অমর আহ্বানের মতো—“একলা চলো রে”—তিনি পড়াশোনা ও রাজনীতি, দুটিই চালিয়ে গেছেন দৃঢ়তার সঙ্গে। তাঁর এই পথচলা যেন দেখায়, সংগ্রাম শুধু রাজপথে নয়, জ্ঞানচর্চার ভেতরেও লেখা যায়।
আব্দুল্লাহ আর রিয়াদের এই গবেষণা দেখিয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ শুধু একটি পরিবেশগত বিষয় নয়; এটি জলবায়ু সহনশীলতা, জীববৈচিত্র্য, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরিবেশ নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
গবেষণাটি তথ্য প্রমাণভিত্তিক ভূমি ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পিত মানববসতি নিয়ন্ত্রণ, বন সংরক্ষণ এবং জলবায়ু সহনশীল নীতিমালা গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছে। সময়মতো সংরক্ষণ, পুনঃবনায়ন ও ভূমি ব্যবহারে পরিকল্পিত পদক্ষেপ না নিলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশগত ভারসাম্য আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
জনসাধারণ, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের জন্য গবেষণাপত্রটির লিংক এখানে