মাভাবিপ্রবির কৃষ্ণচূড়া লেন: স্মৃতি, রঙ আর হারিয়ে যাওয়ার গল্প

মাভাবিপ্রবির কৃষ্ণচূড়া লেন

মাভাবিপ্রবির কৃষ্ণচূড়া লেন © টিডিসি সম্পাদিত

ক্যাম্পাসের প্রথম ফটক দিয়ে অগ্রসর হয়ে ডিনস কমপ্লেক্স পেরিয়ে আরেকটু সামনে গেলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম ফটক। সেখান থেকে দ্বিতীয় একাডেমিক ভবন পর্যন্ত বিস্তৃত লাল-সবুজ আবেশে মোড়া এক পথ— যা সবার কাছেই এখন ‘কৃষ্ণচূড়া লেন’ নামে পরিচিত।

সারিবদ্ধ কৃষ্ণচূড়া গাছের রক্তিম ফুলে ঋতুভেদে বদলে যায় পুরো ক্যাম্পাসের রূপ, যেন সবুজের বুকে আঁকা এক উজ্জ্বল লাল ক্যানভাস। যা গিয়ে ঠেকেছে কৃষ্ণচূড়া লেনে। এই লেনের পাশের দেয়ালে একসময় আঁকা ছিল এক টুকরো অনুভব, যেখানে লেখা ছিল বিখ্যাত সেই লাইনটি— ‘দেখা হবে বন্ধু, দেখা হবে প্রিয়, হয়তো মনের টানে কিংবা ভুল করে এই কৃষ্ণচূড়া লেনে।’

শিক্ষার্থীদের কাছে এই শব্দগুলো কেবল রঙের অক্ষরই ছিল না—ছিল বরং এক প্রজন্মের অপেক্ষা, দেখা হওয়ার অগোছালো প্রতিশ্রুতি, আর ফিরে আসার নীরব ইশারা। কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে সেই দেয়াল যেন শুধু পথচিহ্ন নয়, হয়ে উঠেছিল স্মৃতির দরজা।

কিন্তু সময় যে বড় নিষ্ঠুর শিল্পী। সে যেমন রঙ আঁকে, তেমনি মুছেও ফেলে। আজ সেই দেয়ালের গায়ে আবহাওয়া, বৃষ্টি আর অবহেলার আঁচড়ে কবিতার অক্ষরগুলো ক্ষয়ে গেছে। শব্দগুলো আর সম্পূর্ণ দাঁড়ায় না—তবু ভাঙা ভাঙা লাইনে আটকে আছে কিছু অনুভব, কিছু হারিয়ে যাওয়া ডাক।

কৃষ্ণচূড়া লেনের ইতিহাস জানতে হলে ফিরে যেতে হবে সুদূর অতীত ২০১৯ সালে। তৎকালীন ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের অষ্টম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা নিজেদের কিছু টাকা জমিয়ে প্রাণের ক্যাম্পাসকে নতুন রূপে সাজিয়ে তোলার প্রত্যাশায় পঞ্চম ফটকের রাস্তা ঘিরে সারিবদ্ধভাবে রোপণ করেছিলেন আটটি কৃষ্ণচূড়া গাছ। গাছগুলো ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে এবং কৃষ্ণচূড়া ফুলের সৌন্দর্য চারপাশে মুগ্ধতার আবেশ সৃষ্টি করতে আরম্ভ করে। ঠিক তখনই প্রাঙ্গণটিকে ভিন্ন নামে, ভিন্ন সাজে প্রতিষ্ঠিত করার ইচ্ছাটা শিক্ষার্থীদের মাঝে আরও সুস্পষ্ট হতে শুরু করে।

এরই ধারাবাহিকতায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, দর্শনার্থীদের লোকমুখে ছায়াঘেরা এই রাস্তাটির নাম ‘কৃষ্ণচূড়া লেন’ হিসেবে প্রচলিত হতে শুরু করে। তখন ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের অষ্টম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা রাস্তার পাশের দেয়ালে রঙ দিয়ে একটি গ্রাফিতি এঁকে লিখে দিয়েছিলেন ‘কৃষ্ণচূড়া লেন’।

কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো সারিবদ্ধভাবে রোপণের কারণ ছিল রাস্তাটিতে প্রখর রোদে যাতায়াতকারীদের দীর্ঘদিনের কষ্ট লাঘব করা। এ রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীরা যাতায়াত করেন। দূর থেকে গাছগুলোকে দেখে অনেকেই ফুলের তোড়া বলে অভিহিত করেছেন বলেও জানা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের অষ্টম ব্যাচের শিক্ষার্থী মাসুদ রানা বলেন, এই ক্যাম্পাস আমাদের কাছে শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, এটি হৃদয়ে আবেগ ও স্মৃতির স্থল। ক্যাম্পাসকে সুন্দরভাবে সাজানোর স্বপ্ন থেকেই আমরা কৃষ্ণচূড়া গাছ রোপণ করেছিলাম। গাছগুলো বড় হয়ে যখন সৌন্দর্য ছড়াতে শুরু করে, তখন এই স্থানটিকে আলাদা পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়োজন অনুভব করি। আজ ‘কৃষ্ণচূড়া লেন’ শুধু একটি রাস্তা নয়, এটি আমাদের ভালোবাসার স্মারক।

সময়ের সাথে সাথে এই লেন শুধু ক্যাম্পাসের পথই নয়, হয়ে উঠেছে দর্শনার্থীদেরও আকর্ষণের কেন্দ্র। প্রতি বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বহিরাগত দর্শনার্থীরা ভিড় করেন এই লালিমায় মোড়া পথটিতে। অনেকেই ছবি তোলেন কৃষ্ণচূড়ার নিচে দাঁড়িয়ে, কেউবা প্রাচীন দেয়ালের পাশে থাকা নামের লেখার সঙ্গে স্মৃতি ধরে রাখেন ফ্রেমে। কিন্তু দেয়ালের লেখনী ক্ষয়ে পড়ায় সেখানে দর্শনার্থীদের ভিড়ও এখন আর তেমন চোখে পড়ে না।

লাইফ সায়েন্স অনুষদের শিক্ষার্থী আবিদা সুলতানা বলেন, কৃষ্ণচূড়া আমাদের ঋতুবৈচিত্র্যের এক অনন্য প্রতীক। গ্রীষ্মের দহনজ্বালার মাঝে যখন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে আসে, তখন এই রক্তিম ফুলই যেন প্রকৃতির নীরব প্রতিবাদ হয়ে ফুটে ওঠে। সবুজের বুকে লালের সেই বিস্তার ক্যাম্পাসকে শুধু রাঙায় না—এক গভীর জীবন্ত আবহ তৈরি করে, যেখানে প্রতিটি পথ মনে হয় কোনো শিল্পীর তুলিতে আঁকা। কৃষ্ণচূড়ার মুগ্ধকর উপস্থিতি এই ক্যাম্পাসকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত, আরও অনুভবময়— যেন প্রকৃতি নিজেই এখানে এসে থেমে গেছে একটু সৌন্দর্য রেখে যাওয়ার জন্য। তবে মাভাবিপ্রবির কৃষ্ণচূড়া লেনের সৌন্দর্যবর্ধনকারী সেই দেয়ালের স্মৃতিচিহ্ন ক্রমেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

আরেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের বৃষ্টি আক্তার মৌ বলেন— কৃষ্ণচূড়া শুধু একটি ফুল নয়, এটি ঋতুর অনুভবকে রঙে রূপ দেয়। এর উপস্থিতিতে ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণায় যেন নতুন প্রাণের স্পন্দন জেগে ওঠে। আর পথটির সেই দেয়ালে লেখা কথাগুলো যেন হৃদয়ে এক রেশ রেখে গেছে— ‘দেখা হবে বন্ধু, দেখা হবে প্রিয়...’ এই আশার বাণী আবার কবে দেখা হবে?’

ক্যাম্পাসে ঘুরতে এসেছিলেন সাকিব আল আদনান নামের এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, সময় পেলেই পরিবারকে নিয়ে এখানে আসি। এখানে বাহারি রঙের ফুল ফুটতে দেখা যায়। সূর্যমুখী, জারুল, গাঁদা ফুলের পাশাপাশি কৃষ্ণচূড়া ফুলের মাঝেও আলাদা একটা শোভা আছে, যা আমাদের মতো প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য অনন্য আকর্ষণ। তবে না বললেই নয়, এখানে আগে দেয়ালে যে কৃষ্ণচূড়া লেন লেখা ছিল, সেটি পূর্ণাঙ্গ থাকাকালীন যখনই এখানে আসতাম আমরা বন্ধুরা ছবি তুলতাম। অনেক সুন্দর ছবি আসত। এখন এটি প্রায় ক্ষয়ে গেছে। আশা করি, এটি আবার সংস্কার করা হবে। কারণ এটি এই রাস্তার সৌন্দর্য বর্ধনকারী উপাদান।

তিনি আরো বলেন, ক্যাম্পাসের এতসব বাহারী ফুল এখানে ঘুরতে আসা মানুষদের দৃষ্টিনন্দন করার প্রধান হাতিয়ার। খুব ভালো লাগে যখন লাল রঙে ভরপুর প্রকৃতির সৌন্দর্যমণ্ডিত এই ক্যাম্পাস দেখি। আমার কাছে মনে হয় এই ক্যাম্পাসের সবচেয়ে মুগ্ধতার জায়গা হল কৃষ্ণচূড়া লেন এবং তৃতীয় একাডেমিক ভবন। এছাড়াও এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা আমার বেশ ভালো লাগে।

তবে এই সৌন্দর্যের ভিড়েই এক নীরব ক্ষয় লুকিয়ে আছে ক্যাম্পাসের একটি দেয়ালে আঁকা সেই গ্রাফিতি। যা কৃষ্ণচূড়া লেনে যুক্ত করেছে এক অনন্য মাত্রা। অথচ রোদ, ঝড়, বৃষ্টি আর অবহেলায় সেই শব্দগুলো ভেঙে গেছে টুকরো টুকরো স্মৃতিতে। যেন এক সময়ের প্রাণবন্ত প্রতিশ্রুতি এখন দেয়ালের গায়ে নিঃশব্দে নিঃশ্বাস ফেলে। এই হারিয়ে যাওয়া শুধু রঙের নয়, এক প্রজন্মের আবেগেরও। যে দেয়াল একদিন সাক্ষী ছিল হাসি, আড্ডা আর ফিরে আসার অঙ্গীকারের, আজ তা ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে।

দেয়ালের লেখা মুছে গেলেও হৃদয়ের আহ্বান মরে না। তা থেকে যায় কৃষ্ণচূড়া পাতার ফাঁকে ফাঁকে, দখিনা হাওয়ার ভেতরে দোল খেলতে থাকা ওই লাল রঙের মাঝপথে। যা এখনো নিঃশব্দে বলে যায়, দেখা হবে… কোথাও না কোথাও, আবার কোনো এক কৃষ্ণচূড়া লেনে।

ইতালিতে বছরে ১০ হাজার কর্মী পাঠাবে সরকার 
  • ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মেধাবী শিক্ষার্থীদের এআই প্রশিক্ষণ না দিলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার …
  • ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফেনীতে যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উঠে গেল সড়ক বিভাজকে 
  • ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মধুর ক্যান্টিনকে ‘ইশারাত মঞ্জিল’ নামে ফেরানোর অপচেষ্টা চলছে…
  • ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভোলায় ৪১ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক
  • ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাবিতে র‍্যাগিংয়ের দুই ঘটনায় ২০ শিক্ষার্থীকে ৬ লাখ ১৫ হাজার…
  • ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
FALL 2026
Application Deadline Wednesday, 16 Sept 2026
Apply Now

Admission Test Schedule

  • Test Date: Friday, 18 Sept 2026
  • Written Exam: 10:00 – 11:00 AM
  • Oral Viva: 11:30 AM onwards

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9