মাভাবিপ্রবি
মাভাবিপ্রবির নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম শহিদুল ইসলামে © টিডিসি সম্পাদিত
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম শহিদুল ইসলামের লেখা বিভিন্ন কবিতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র সমালোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে তার লেখা কবিতা ‘কামনার কম্পন’ সিরিজ, ‘ব্যর্থতা’, ‘ইচ্ছার আগুন’, ‘যে সম্পর্কের এখনও কোন নাম নেই’, ‘প্রাপ্তি’ ও ‘ফাগুন মাসের আগুনের আঁচ’সহ বিভিন্ন কবিতার ভাষা, দেহাত্মক উপস্থাপন ও ধূমপানসংক্রান্ত পোস্ট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাভাভিপ্রবির শিক্ষার্থীদের নেতিবাচক আলোচনা দেখা গেছে। সমালোচনা হচ্ছে কবিতায় নারীর অশ্লীল ও যৌন উপস্থাপনা নিয়েও।
গত ১৪ মে, বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এবিএম শহিদুল ইসলামকে মাভাবিপ্রবির উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে তার শিক্ষাগত প্রেক্ষাপট, অনুষদ ও পূর্বের বিভিন্ন কবিতা, ব্যক্তিগত পোস্ট ও সাহিত্যচর্চার বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় আসে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (মাভাবিপ্রবি) আইন ২০০১-এর ১০ (১) ধারা অনুযায়ী ‘চ্যান্সেলর, তদ্কর্তৃক নির্ধারিত শর্তে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ এমন একজন ব্যক্তিকে চার বছর মেয়াদের জন্য ভাইস-চ্যান্সেলর পদে নিয়োগদান করিবেন।’ কিন্তু এসবের তোয়াক্কার না করে মার্কেটিং বিভাগের একজন অধ্যাপককে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বানানোয় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
শুধু তাই নয়, নতুন উপাচার্যের বিষয়ে ঘোষণা আসায় শিক্ষার্থীরা এ-ও প্রশ্ন তুলেছেন, একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য কীভাবে বিজ্ঞান অনুষদের না হয়ে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের কেউ হতে পারেন? যদিও এর পরপরই নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে তার লেখা কবিতা ও এর ভাষাগত গাম্ভীর্য নিয়ে।
শিক্ষার্থীরা মনে করেন, একজন বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের ব্যক্তিত্ব, সামাজিক উপস্থাপন ও প্রকাশ্য লেখালেখিতে সংযম, নৈতিকতা ও একাডেমিক পরিপক্বতার প্রতিফলন থাকা উচিত। কিন্তু উপাচার্যের ফেসবুক প্রোফাইলে নারীকেন্দ্রিক, কামনা-বাসনামূলক ও বিতর্কিত বিষয়বস্তুর উপস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে বলেও মন্তব্য করছেন অনেকে।
বিগত দিনে স্যারের লেখা যেমনই হয়ে থাকুক, ছাত্র হিসেবে আমি স্যারকে অনুরোধ করব এখন তিনি আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। তার দায়িত্বও এখন অনেক। আশা করি, উপাচার্য হিসেবে তিনি আমাদের এমন লেখা উপহার দেবেন; যা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র নির্বিশেষে সকলের জন্য হয়ে উঠবে আদর্শের এবং শিক্ষণীয়।-মো. আক্তারুজ্জামান সাজু, আহ্বায়ক, কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের আহ্বায়ক মো. আক্তারুজ্জামান সাজু দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘শিল্পে একজন ব্যক্তির নিজস্ব স্বাধীনতা রয়েছে। তিনি যা লিখেছেন এবং প্রকাশ করেছেন; তা তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সেখানে হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই। সাহিত্য যেহেতু সৃষ্টিশীলতার একটি রূপ; তাই একজন লেখক নিজের মনোভাব কিভাবে প্রকাশ করবেন সেখানেই তার সৃষ্টিশৈলী প্রকাশ পায়।
কবিতার গঠনশৈলী, ভাষাগত ইঙ্গিত এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব কবিতা প্রকাশের পর তার প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, বিগত দিনে স্যারের লেখা যেমনই হয়ে থাকুক, ছাত্র হিসেবে আমি স্যারকে অনুরোধ করব এখন তিনি আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। তার দায়িত্বও এখন অনেক। আশা করি, উপাচার্য হিসেবে তিনি আমাদের এমন লেখা উপহার দেবেন; যা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র নির্বিশেষে সকলের জন্য হয়ে উঠবে আদর্শের এবং শিক্ষণীয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মাহবুবুর রহমান এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভিসি নিয়োগ নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। একজন ব্যক্তি কোন রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাস করেন, সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়। তিনি জাতীয়তাবাদী, বামপন্থী বা অন্য যে কোনো আদর্শের হতে পারেন। সমস্যা সেখানে নয়। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শুধু প্রশাসনিক পদ নয়; তিনি পুরো ক্যাম্পাসের নৈতিক ও একাডেমিক অভিভাবক। তার ব্যক্তিত্ব, সামাজিক উপস্থিতি, মূল্যবোধ, বক্তব্য ও আচরণ শিক্ষার্থীদের সামনে একটি উদাহরণ তৈরি করে।’
আরও পড়ুন: উপাচার্যের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে তৃতীয় দিনের মতো ডুয়েটে শিক্ষার্থীদের অবস্থান, পুলিশ মোতায়েন
তিনি আরো বলেন, ‘যখন একজন ভিসির প্রকাশ্য প্রোফাইলজুড়ে নারীকেন্দ্রিক, কামনা-বাসনামূলক বা বিতর্কিত কনটেন্ট বেশি দেখা যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে—এই ব্যক্তি কি সত্যিই একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করার মতো পরিপক্ব, সংযত ও অনুপ্রেরণাদায়ক ব্যক্তিত্ব ধারণ করেন? একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কাছে আমরা চাই গবেষণামুখী দৃষ্টিভঙ্গি, দূরদর্শী নেতৃত্ব, প্রশাসনিক দক্ষতা, নৈতিক দৃঢ়তা এবং বিতর্কহীন একাডেমিক ভাবমূর্তি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে অনেক সময় এসবের চেয়ে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা বেশি গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সত্যিকার অর্থে বিশ্বমানের করতে হলে ভিসি নিয়োগে মেধা, ব্যক্তিত্ব, নৈতিকতা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিতে হবে।’
অন্যদিকে উপাচার্যের লেখা ‘যে সম্পর্কের এখনও কোন নাম নেই’ নামক আরো একটি কবিতাকে কেন্দ্র করে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ভেবেছিলাম ক্যাম্পাসটা একদিন মাদকমুক্ত হবে। বিড়ি চত্বর বন্ধ হবে, প্রকাশ্যে ধূমপান হবে না। ধূমপান করা যে একটা খারাপ কাজ, তাও আবার ক্যাম্পাসে—এইটা অনেক শিক্ষার্থী একেবারেই মনে করে না। তার ওপর শিক্ষকরা তো শিক্ষার্থীদের সামনেই ধূমপান করেন। এখন তো আবার আমরা এমন ভিসি পেয়েছি, যিনি কিনা হাতে বিড়ি নিয়ে সে নিয়ে আবার কাব্য রচনা করে ফেসবুকে পোস্ট করেন।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ শুধু প্রশাসনিক দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি প্রতিষ্ঠানের নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের প্রতীক। ফলে একজন উপাচার্যের ব্যক্তিগত লেখালেখি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিতি ও প্রকাশভঙ্গিও স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা তাদের অভিভাবকসুলভ নেতৃত্বের কাছে সংযত, দায়িত্বশীল ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব প্রত্যাশা করে। এ কারণেই নতুন উপাচার্যের সাহিত্যচর্চা ও ব্যক্তিগত পোস্টগুলো এখন শুধু ব্যক্তিগত রুচির বিষয় না থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ও নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
মাভাবিপ্রবির সহকারী প্রক্টর মো. আনোয়ার কবিরের ভাষ্য, নবনিযুক্ত উপাচার্য এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ঠিক কতটা করবেন; সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু। লেখালেখির বিষয়টি স্যারের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। আর সামনাসামনি স্যারের কথাবার্তা বেশ পরিপক্ক ও সময়োপযোগী। কর্মজীবনে তার অভিজ্ঞতাও অনেক তাই উপাচার্য হিসেবে তার ব্যবস্থাপনার দক্ষতাও বেশ চোখে পড়ার মত।
তিনি আরো জানান, স্যারের সাহিত্য রচনার দিক নিয়ে বলতে গেলে বলতে হয় যে, কবি-সাহিত্যিক যারা আছেন তাদের একেকজনের লেখা একেক রকম। হূমায়ূন আহমেদের লেখা একরকম আবার হুমায়ুন আজাদ রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর অন্যরকম। তাদের সকলের নিজস্ব ধরন আছে, ব্যক্তি স্বাধীনতা আছে। আর সামাজিক প্রভাবের দিক বিবেচনা করলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানান ধরণের পোস্ট /লেখা আছে। সেগুলোক ভিন্ন ভিন্ন চিন্তাধারার মানুষ ভিন্ন রকমভাবে গ্রহণ করবেন এটাই স্বাভাবিক। একজন ব্যক্তি অন্যের লেখাকে কীভাবে ধারণ করবেন; সেটা একান্তই ওই মানুষটির নিজস্ব রূচি এবং মানসিকতার পরিচায়ক।